আমার একটা দিন

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২১ নভেম্বর ২০১৯ | ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

আমার একটা দিন

সরোজ দেব ১:১০ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ০৮, ২০১৯

print
আমার একটা দিন

সকাল বেলা এই ভোর চারটে অথবা পাঁচটা হতে পারে। আমি ঘুম ঘুম চোখে ঘড়িটার দিকে তাকালাম। কিন্তু কেন যেন ঘড়িটার দিকে তাকাতে ইচ্ছে করল না, পুরো ঘড়ির ডায়ালটার দিকে একবার চোখ ভাসিয়ে কোল বালিশটাকে আরও একটু জড়িয়ে ধরে বালিশে মুখটাকে গুঁজে দিলাম। আমার ঘুম একবার ভেঙে গেলেও আবার একটু পরেই আস্তে আস্তে ঘুমের রেশটা চলে আসে। ঘুম চোখে ঘুমকে না তাড়িয়ে আবার একটু ঘুমোলাম। ঠিক সাড়ে ছয়টায় ঘুম ভাঙল। তখনও যেন সকালটা অনেক নরম, ধূসর একটা ছায়াচ্ছন্ন পরিবেশ- জানালা দিয়ে আসা ভোরের আলোকে দেখে। চারদিকে কোকিলের মিষ্টি ডাক, দূরে কোথাও একটা টিয়া নাম না জানা কোনো ঠিকানার সন্ধানে আকাশে উড়ে গেল ট্যাঁ ট্যাঁ আওয়াজ করে, জানালার কার্ণিশে পায়রাগুলোর ঝটপটানি যেন ওদের দলের সবাইকে জানাল ‘এই ওঠ তো! অনেক বেলা হলো- খাবার খুঁটতে যেতে হবে।’

জানালার গ্রিলে সকালের বাসি কাপড় ছাড়ার মতো একরাশ পালক ঝরিয়ে যে যার গন্তব্যস্থলের দিকে গেল। আমিও হাই তুলে সকালের বিছানাটাকে আরেকটু শরীরের উষ্ণতার ভরিয়ে রাখতে চাইলাম। কোত্থেকে একটা বোলতা উড়ে এলো, বোধহয় মেয়ে বোলতার খোঁজে, কিন্তু না পেয়ে গ্রিলের গরাদে একটা গুঁতো খেয়ে হুস করে গরাদের ফাঁক দিয়ে উড়ে গেল।

এই করে আমি রোজ বেলা করি। না উঠি, প্রাণায়ামটা করতেই তো আধঘণ্টা লেগে যাবে। সকালের কাজটা ঠিক ১০টার মধ্যে শেষ করতে পারলেই হলো, আবার ১১টা থেকে পুরো দুপুরটা রিলিজ পাওয়া যাবে। ব্যস! রান্না শেষ, ওকে খেতে দিয়ে এবার স্নানটা সেরে নেব কি-না ভাবছি, না থাক আরেকটু পরে যাব। সিডিটা চালাই, শুয়ে শুয়ে একটু গান শুনি। টিভিটা চালালাম; কিন্তু কেবল-লাইন অফ। ধ্যুর বাবা! কোনোদিন যদি একটা নির্দিষ্ট প্রোগ্রাম-(আজে বাজে, ভ্যাজ ভ্যাজানি সিরিয়াল দেখাও নয়) সেটাও যদি দেখতে না পাই তাহলে মেজাজটা ঠিক থাকে? দেখি তো কেবল অপারেটরটাকে পাই কি-না রাস্তার মোড়ে।

রাস্তার মোড়ে ওই ছেলেটা অনেক সময় আড্ডা মারে, গিয়ে দেখলাম। কিন্তু পেলাম না। ওর বন্ধু বলল, ও ডালহৌসিতে মাল আনতে গেছে। যাকগে সিডিটা চালিয়েই শুনি না হয়! বাংলার রবীন মজুমদার, সন্ধ্যা, লতা, কিশোর এর গান মা’র মুখে শুনে নিজেও কয়েক লাইন মুখস্থ করে রেখেছি-পুরোটা মুখস্থ হয়নি। মা কিন্তু মডার্ন ছিল, তার সময়কার যতটুকু শিক্ষা-দীক্ষা সে পেয়েছিল সেই অনুযায়ী মা’র খুব বই পড়ার ঝোঁক ছিল, সেটাও আমি পেয়েছি। মা খুব আধুনিক ভাবধারার ছিল। সেটাও আমাকে খুব টানে। মা’র টুকরো টুকরো অনেক গুণ ছিল। অনেক পরিবারের অনেক মহিলাকেই আমি দেখেছি কিন্তু নিজের মা’র সঙ্গে যেন আর কারোর তুলনা চলে না। হয়তো সে মায়ের শিক্ষাগত দিক থেকে অনেক উঁচুতে। সিডিটা শুনতে শুনতে দেড়টা বাজতে চলল, মা মারা গেছে চার বছর।

মা যদি আজ বেঁচে থাকত ঠিক বলত, ‘মনি সিডিটা বন্ধ করে স্নানে যা’। আমি আর মা একসঙ্গে খেতে বসতাম। হুট করে মা চলে গেল! কত গল্প, কত কথা মা’র সঙ্গে। এখন হঠাৎ হঠাৎ মনে হয়, ইস! এটা মাকে বলতে পারলে ভালো হত। কিন্তু কোথায় কি যেন শূন্যতা। বরের কাছেও যে বলি না, তা নয়, কিন্তু মনে হয় যে ওর কাছে বলাটা দেওয়ালকে বলার মতো। যাকগে, গানই মানুষের কল্পনার জগৎটাকে অনেক রঙিন করে, ভাবি ওরা কীভাবে সিনেমা করে গান গায়, মানুষের জীবনে তো এই রকম গান রঙ ভরায় না। সিনেমার পরিচালকরা বোধহয় গাঢ় বাস্তবতাকে এভাবেই গান, গল্পে, রঙ-চঙে মোড়কে মুড়িয়ে বাজারে ছাড়ে। কিন্তু শ্রোতা-দর্শক তো এত বোকা নয়, তাদের পেটেও কিছু দানা পানি পড়ে, ঘাস তো আর খায় না বাবা! যাকগে পৌনে দুটো ম্লান করে আসি।

তিনটে বাজলে ভাতের থালা নিয়ে বসে টিভিটা চালালাম। কেবল লাইন এসেছে। কী একটা রান্নার প্রোগ্রাম! ওহঃ! কুকিস বানানো শেখাচ্ছে। দেখতে তো ভালোই লাগে, খেতে আরও ভালো লাগে কিন্তু বাবা বানাতেই জান কয়লা। এটা কেন, ওটা কেন, গ্যাস খরচা। মা একবার বলেছিল, ‘তুই একটা রেসিপি পাঠা। কী যেন বেশ? বাঁধাকপির পায়েস’। সেটাও একবার দেখলাম, বানানো হলো টিভিতে রান্নার প্রোগ্রামে। ভাত খেলেই ঘুম পায়। না ঘুমোলে চলবে না। আস্তে আস্তে রেডি হই। গানের ক্লাসে যেতে হবে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সাজতে শুরু করলাম। পৌনে চারটেয় বেরোলাম। উঃ! কী রোদ, বাপুরে গরমটা যে কবে শেষ হবে...?

২.
সেই যে ঘরবাড়ি ছেড়ে কর্মের তাগিদে শহরে চলে আসতে হয়েছে। শহরের ইটকাঠ পাথরে ঘেরা, কংক্রিটের কর্মব্যস্ত জীবন। সবসময় কোলাহল, কর্মব্যস্ততা, টিকে থাকার লড়াই একটা মেকী জীবনযাত্রা যার মধ্যে কোনো সরলতা নেই।

অনেক দিন বাদে আমার নিজের ঘরে ফিরে এসে, বাড়ি যাওয়ার পথে সেই ছোটবেলার স্মৃতি ঘিরে ধরেছে। মেঠোপথের সেই সোঁদা গন্ধ। ঘাসের ওপর ফড়িং উড়ে বেড়াচ্ছে। আমি যেন সেই ছেলেবেলার আমি। কখন যে আপন মনে গুনগুনিয়ে উঠেছি নিজের অজান্তে, মনে নেই। খুব মনে পড়ছে, সেই বন্ধ বাক্স থেকে বের করে আনা মা’র নিজের হাতের তৈরি করা কাঁথা, যার গন্ধ আমাকে নাড়া দিচ্ছে। মায়ের হাতে গড়া মোটা আটার রুটি, উফ! তার যে কী অপূর্ব স্বাদ! কতদিন যে সে স্বাদ পাইনি। কত কষ্ট করে এই পাড়াগাঁয়ে অক্লান্ত পরিশ্রম করে আমাকে মানুষ করেছেন। মায়ের কথা মনে হতেই মনটা যেন ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল। অনেক দিন বাদে গ্রামে এসে মনে হচ্ছে মা আমার জন্য অপেক্ষা করছে।

বাবা এসেছিস আয়। আজও যখন ঘুম আসে না, তখন মা’র সেই ঘুম পাড়াবার মিঠে গানের সুর কানের কাছে বেজে ওঠে। যখন কোনো কিছুতে কষ্ট পাই দিশেহারা হয়ে যাই, মা’র ছবিটার দিকে তাকালেই যেন একটা সান্তনা পাই। ‘এই, আমি আছি তোর কাছে তোর পাশে।’ হ্যাঁ মা, হ্যাঁ মা, ওই তুমি দাঁড়িয়ে আছ দোরগোড়ায়। আমি আসছি। তোমার কাছে।

৩.
মাতা ধরিত্রী যেভাবে আমাদের পরম যত্নে ও স্নেহে ধরে আছেন ঠিক সেভাবে আমি আমার ছোটবেলায় আমার মাকে দেখেছি। মধ্যপাড়াতে আমার ছোটবেলা কেটেছে। আমি, বোন, মা থাকতাম। ওখানকার স্কুল বা পাঠশালাতে পড়াশোনা করতাম। রোজ মা ভোর বেলা উঠে দুটো গরু ও মুরগিগুলোকে বাইরে বের করত। আমাদের তৈরি করত স্কুলের জন্য। একটা ঘটনা লক্ষ্য করতাম, মা যেমন আমাদের যত্ন করে খাওয়াতো, জামা পরাতো, ঠিক তেমনি ওই প্রাণীগুলোর প্রতিও যত্ন করত। দেখে মাকে মাঝে মাঝে প্রশ্ন করতাম, ‘মা তুমি ওদের আমাদের মতো যত্ন করো কেন? ভালোবাসো কেন?’ মা বলতেন, ‘ওরাও আমাদের মতো প্রাণী, তোমাদের যত্ন না করলে তোমরা অভিযোগ করতে পারো কিন্তু ওরা তো পারে না। আমি ওদের না ভালোবাসলে ওদের মা কষ্ট পাবে। যেমন তোমাদের ভালো না বাসলে আমি পাই।’

মায়ের ওই কথাটা আমার কানে এখনও বাজে। শিশুরা খুব অসহায়। ওরা কারোর ওপর নির্ভরশীল। ওদের ভালোবাসলে ওরাও ভালোবাসবে। ওদের আমরা যেমন দেখাব ওরাও সেটা ফেরত দেবে। আমার দুই ছেলে রানা ও ঋষি ওদের দুজনকে একা একা মাঝে মাঝে থাকতে হয় আমার কাজের জন্য, তখন আমার খুব কষ্ট হয়। কিন্তু নিরুপায় হয়ে যাই।