ডাইলের পোলাপান

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২১ নভেম্বর ২০১৯ | ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

ডাইলের পোলাপান

খালেদ চৌধুরী ১:০৮ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ০৮, ২০১৯

print
ডাইলের পোলাপান

কাগজে শব্দ চাষ করবে ভেবে, লোকটা লেখা শুরু করে-বাবা চোর পাহারা দেয়। পশ্চাৎদেশে লাঠি রেখে পাছা ঘষতে হয়। চোর ডাকাতের সঙ্গে কারবার। দৈনিক দু’বেলা ৮ ঘণ্টা চোর পাহারা দিতে হয়। সকাল থেকে ৬ ঘণ্টা রাতে ২ ঘণ্টা অথবা দুপুর থেকে ৬ ঘণ্টা রাতে ২ ঘণ্টা অথবা রাতে দুই দফায় ৬ ঘণ্টা। শীত, বৃষ্টি, গরম। এভাবেই চলতে থাকে খাকি পোশাকের খোয়ারি জীবন। তার ওপর আবার আছে প্যারেড। তার ওপর আবার আছে সন্ধ্যায় রুলকল। তার পর আছে পাগলা ঘণ্টা।

কোনো চোর বা ডাকাত বা খুনি দেয়াল টপকে পালালে ঘণ্টা বাজানো হয়। পাগলা ঘণ্টা। সঙ্গমরত অবস্থায় থাকলেও দৌড়ে এসে চার দেয়ালে পজিশন নিতে হয়। আমার মার ভাষায় এ হলো কুত্তা চাকরি। আর আমরা হইলাম ডাইলের পোলা। ঘরে আমাদের কিছু থাকুক আর না থাকুক। প্রতিদিন ডাল রান্না হয়। কুত্তার চাকরিতে রেশন পাওয়া যায়। ২২ কেজি চাল, ২২ কেজি আটা, ৮ কেজি ডাল, ৫ লিটার তেল, ২ কেজি চিনি। প্রতি মাসে রেশন মাপার সময় মার মুখ-সিলভারের ডেকসিতে উজ্জ্বল সূর্যের মতো লাগত। কিছু চাল, ডাল, আটা, চিনি বিক্রি করতে পারতেন। দুর্গন্ধ আর তিক্ত স্বাদের জন্য চাল, আটা আমাদের নাক ধরেই খেতে হতো। কেউ কেউ বিক্রি হয়া মাল ফেরত দিয়ে যেত। চোরের খাবার এর থেকে ভালো আর কী হবে। চোর আর চোর পাহারাদার তো এক!

বাবার সংসারে মন নেই। মা চায়? বাবা যেন আমাকে পড়ায়। নাইন পর্যন্ত পড়াশোনা করা বাবা-প্রাথমিক শিক্ষাটা ভালোই পারতেন। ছবিও আঁকতে পারতেন। মা ভাগ অঙ্কে আটকে যেত। আমি পড়া মুখস্থ করতে কিছুতেই পারতাম না। বাবা মারতেন চোরের মাইর। অপেক্ষায় থাকতাম। কখন কারেন্ট যাবে। তখন পড়তে হবে না। কবে হরতাল? স্কুল বন্ধ থাকবে। আলিফ লায়লার দিনগুলোতে অ্যান্টেনা ঘুরিয়ে, সাদাকালো টিভিতে কলোনির সমস্ত মানুষ-মরজিনা আর আলাউদ্দিনের কারিশমা দেখে দিন কাটাতাম। সকালে রুটির জন্য জেল গেটে যেতাম। চোর ডাকাতের না খাওয়া অবশিষ্ট রুটি ঘরে আনতাম। সেই রুটি রোদে শুকিয়ে মা বস্তাবন্দি করে রাখত। কখনো বেচত। দুই টাকা দেড় টাকা কেজি। মেথরপট্টির লোকেরা খাবার জন্য শুকনা রুটি নিত। কেউ কেউ গরুর জন্য নিত। মাছের জন্য নিত। হরতালের দিনগুলো ছিল-বাড়তি আনন্দের। পিচঢালা রাস্তায় আম গাছের নিচে সাপুরের খেলা। মিছিলে প্রতিবাদ। মিছিলে প্রতিরোধ। হরতালের দিনে ডাইলের পোলাপানেরা সাপের খেলা দেখতে-আমগাছের নিচে যেতাম।

নাম না জানা সাপুরের চেলা তখন খেলা দেখাত। এই যে দেখছেন কালো সাপটা এইটা হইছে পানখ। এইটাকে ধরছি শ্রীমঙ্গলের চা বাগান থাইকা। ১০ জন মানুষরে কামরাইয়া এক বুড়ির বাড়িতে ডিমে তা দিতাছিল। পুরুষ পানখ জেদি হয়। ডিম থাইকা ফুটার পর সূর্যের আলো চোখে লাগলে সূর্যকে ঠোকর দিতে চায়। সংখ্যায় কম থাকার জন্য স্ত্রী পানখ পুরুষ পানখের সঙ্গে মিলিত হতে পারে না। তারা দারাস সাপের সঙ্গে মিলিত হয়। ডিমে তা দেওয়া সাপ ভয়ংকর। সাপুরের চেলা সাপের লেজটা ধরে নাড়াতে থাকে। বিন বাজে। সাপ নাচে না ফোঁস ফোঁস করে। ছোবল মারে। একটা ছোবল চেলার বাম হাতে লাগে, সঙ্গে সঙ্গে সে হাতটা মুখে নিয়ে চুষতে থাকে। মোছপাগ দেওয়া লোকটি পাশেই সিগারেট টানছিল। চেলার এই অবস্থা দেখে সাপুরে রাগত স্বরে বলে যা সর। ঠিক তখনই একটা প্রতিবাদী মিছিল আমাদের পাশ কাটিয়ে যায়।

সাপুরে সরদার বলে, এখন আপনার একটা সাপ দেখবেন তার নাম মালগাড়ি। এ কথা শুনে ডাইলের পোলাপান সমস্বরে হাসে। সাপুরে সরদার ধমক মারে। এই পোলাপান চুপ থাক। মোছওলা সাপুরে অজগর সাপের লেজ ধরে নাড়ায়। তখন বলে এই সাপের বিষ নেই। যদি একবার ধরে আর ছাড়ে না। এইটা বেহুদা সাপ। আপনাদের দেখাব নাগরাজ। কাঠের বাক্স থেকে সাপটা বের করে আর বলে, এইটাকে আমি প্রতিদিন ৩ লিটার দুধ আর দুইটা মুরগির বাচ্চা খাওয়াই। আপনারা এখন দেখবেন সাপ আর নেউলের খেলা। সাপটা বাঁধা নেউলের সামনে ফোঁস ফোঁস করে। মোছওলা সাপুরে বলে, এখনি তাদের যুদ্ধ লেগে যাবে। পাশ দিয়ে প্রতিরোধী মিছিল যায়।

সাপুড়ে এই কথা সেই কথা বলে কিন্তু নেউল আর সাপের যুদ্ধ লাগে না। তারপর বলে, সাপ অথবা নেউলের যে হেরে যায়, সে কিন্তু ওষুধ চিনে। সেই গাছের শিকড়ে কামড় দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভালো হয়ে যায়। ওই শেকড় যদি কেউ সঙ্গে রাখে। তার জিন-ভূতের কোনো ডর নেই। যে শিশুরা ঘরে প্রস্রাব করে, মহিলাদের মাসিকের সমস্যা, বাত ব্যথা- এক নিমিষের কারবার। সেই শেকড় আমার কাছে আছে। প্রতিপিস মাত্র ৫ টাকা। যারা নেবেন হাতে হাতে টাকা রাখেন। আমি মাত্র ২৩ জনকে দেব। ১২/১৩ জনের মতো গাছের শিকড় কিনে। সাপুরে বলে, আপনারা মনে করছেন এই টাকা আমি খাই। না।

সাপেরে দুধ কিনা দিই। এক এক সময় সাপের খেলার শেষ অংশে চমক থাকে। কখনো থাকে ল্যাংটা একটা ছবি। কামরুপ কামাক্ষ্যার সাপের সঙ্গে কোনো এক মাংসল তরুণীর অন্তরঙ্গতা। কখনো সাপুড়ের মৌখিক দাওয়াই। মহিলাদের কোনো জায়গায় ধরে রাখলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সঙ্গম করা যায়। কখনো বা সাপ উল্টে সাপের পা দেখানোর চেষ্টা। যদি কারও কপাল খুলে যায়। সব শেষে গোপন ছবি অথবা কোন জায়গায় ধরে রাখলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সঙ্গম করা যায় সেই অঙ্গের নাম। তার আগে ডাইলের পোলাপানরে বের করে দেওয়া হয়। আমার তখন মনে হতো কবে বড় হবো!