ঘোলাটে আয়না

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২১ নভেম্বর ২০১৯ | ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

ঘোলাটে আয়না

রথো রাফি ১১:১৬ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ০৮, ২০১৯

print
ঘোলাটে আয়না

উন্মাদনাই হয়তো সত্যের সবচেয়ে নিকটে পৌঁছে যায়, আর সবাই বিভ্রমে পড়ে! সত্য বিভ্রমই হয়তো আমাদের প্রিয় মিনার, যার শিখরে চরে জগত দেখার খেলা বড় মনোহর, মনে হয় নিজস্ব নিখিল! মাঝে মাঝে মনে হয়, উন্মাদ হওয়া কত কঠিন। কিন্তু একটা কথা চালু আছে না, দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানো! এ কথা মনে পড়লে, কেমন একটু অপমান অপমান গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে, চারপাশে, এমনকি মগজের কিনারে কিনারে। ঘোর কেমন ভেঙে পড়তে চায়। মনে হয়, এতো কাছে এসে কেন বাদাম ফাটিয়ে বিচি না খেয়ে এভাবে ফিরে যাওয়া! কেন পড়ে থাকা বাদামের ছোলা ভোজন করে তৃপ্তির ঢেকুর তোলা! তবু কেউ কেউ বলে, সূর্যের দিকে সরাসরি তাকিও না, দৃষ্টি ঝলসে যাবে। চাঁদের আলো কিছুই স্পষ্ট করে না, তাই সুন্দর! কিন্তু অন্ধের প্রার্থনা কি দৃষ্টি নয়? আর দৃষ্টির মানে কি বিভ্রমে ঘুরপাক খাওয়া শুধু? এইসব প্যারাডক্স, এই শত স্বতোবিরোধ, এইসব অনন্য সফলব্যর্থতা- কেন এতো প্রিয় মানুষের।

শুধু মনে হয়, মহাজাগতিক কুয়াশার বনে ঘুরতে ঘুরতে কোথায় যেনো হারিয়ে যাচ্ছে তারাগুলো। কিন্তু নিজের আলোয় বিভ্রান্ত হয়ে তারা শুধু ভাবে, চারপাশ এখনও কেমন একটু আলোকিত, স্পষ্ট, আর এইতো চলা, ভেসে চলা। কিন্তু নিরুদ্দেশে ছুটে চলার কোন মানে অবশিষ্ট থাকে? আজ সত্যের নাকি অবসান, আজ স্পষ্টতার নাকি অবসান। কিন্তু দেখো তবু থামেনা চেষ্টা, সত্যবিভ্রমকে কেমন সত্য করে তুলছে প্রতিটি পদক্ষেপ, অস্পষ্টতাকে কেমন স্পষ্টরূপে দৃশ্যমান করে তুলছে দুচোখ! আর তবু মিথ্যের দেশ কী অসহনীয়! বলে, চলো এখান থেকে বেরিয়ে যাই! কিন্তু কোথায়, যদি সত্য মুক্তির যমজ ভাই, আর আমরা আসলে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়া একেকজন নীল আওলিয়া!

তবে কী মানে সন্ধানের? নীল হওয়া? তবে কী প্রতিটি বস্তুর গায়ে আরেকপরত রঙ মেখে বলবো, ও এখন সাতশস্তর গভীরে ঘুমিয়ে রয়েছে, জাগিও না! প্রতিটি বস্তুর অভ্যন্তর বলে কিছু নেই! দৃষ্টি শুধু প্রতিটি অভ্যন্তর দেশকে পাল্টে ফেলে বর্হিদেশে! অভ্যন্তর দেশ বলে কিছুই স্পষ্ট হয় না আর, শুধু তা দৃষ্টির ঘাতে ধসে পড়ে! কিন্তু মিটে না মানুষ তোমার সত্যপিপাসা! পিপাসাকাতর এক আওলিয়া আমাকে বলেন, যার অস্তিত্ব নেই, তার পিপাসা সবচেয়ে প্রবল, সবচেয়ে প্রিয় আর সবেচেয়ে আত্মঘাতী। সত্য সন্ধান সবচেয়ে আনন্দের আত্মঘাত। বলোতো, পর্দা ফাঁক করে সেদিন কী দেখলে? আমি বললাম, আকাশ!

আওলিয়া হেসে বললেন, যা নীল আর ফাঁকা, আর বিভ্রম! আমি হাসলাম, আওলিয়া তুমি নিজেও কী ট্রাজিক! দেখো, দুনিয়ায় কোথাও বিচার থেমে নেই! কিভাবে তবে বিচার চলছে? কারো জন্ম, কারো মৃত্যু কী আশ্চর্যভাবে নির্ধারিত হয়ে যাচ্ছে প্রতিদিন! আওলিয়া তুমি কি তবু চোখ বুজে থাকবে! দূর পাহাড়ে বরফ ঝরে, আর তুমি ঠাণ্ডায় জমে যাবে না বলে কোন লড়াই চালিয়ে যাচ্ছো? বলছো, ধৈর্যকে এক পলক চেখে নিচ্ছি। সেসব দেশ থেকেই তো ভাবতে ভাবতে এতো দূরে চলে এসেছি। এ কথা শুনে ফিরে আসি আমি, আর দৃশ্যের আঘাতে আগের মতোই আমার চোখ শুধু আহত হয়ে চলে।

আর মাঝে মাঝে ফিরে এলে আমি, বিভ্রমের পাহাড়ে তোমাকে অটল দাঁড়ানো দেখি। আর সে সময়ে ফের দূর দেশের দিকে তাকাই। দেখি, একদল মানুষ আরেকদল মানুষকে তাড়া করছে, তারা পরস্পরের মৃত্যু নির্ধারণ করে ফেলেছে। তারা সবাই কী অস্পষ্ট নিজেদের কাছে! আওলিয়া তুমি বলতো, প্রাণের অপচয় সত্যের অভাবে যদি এভাবে চলমান থেকে যায়, কী করে চোখ ধরে রাখি তোমার ওই পাহাড় চূড়ায়, ওই বিভ্রম চূড়ায়! আওলিয়া বলেন, প্রতিটি পুষ্প তার গর্ভে ধারণ করে অন্ধকার, আর অন্ধকারকে দৃশ্যমান করে তোলে তোমার সামনে, আর তুমি কিনা ভাবো, দৃশ্যই সত্য, কী সুন্দর!? আমি বলি, ও আওলিয়া, আমার ভয় হয়, রক্তপাতকে তুমি হয়তো পুষ্পিত গোলাপ ভেবে বসবে একদিন, সত্যের অভাবে! আর তা দিয়ে সাজাবে একটি অহংকারের করুণ কুরুক্ষেত্র! ও আওলিয়া, বলতো একবার, উন্মাদের কাছে সত্য নিয়ে কোনো ধারণার আর অস্তিত্ব থাকে কি! আওলিয়া মৃদু হেসে বললেন, চোখ মেলে আমি কিছু দেখতে পাই না, রহস্য ছাড়া। মাঝে মাঝে বিভ্রান্ত হয়ে ভেবেছি, এই বুঝি দেখা পেলাম আমার! কিংবা তোমাকে দেখলাম! কিন্তু তোমাকে যে দেখলাম, বলতো, তোমার সঙ্গে আমার দূরত্বকেও কি দেখলাম না! তাহলে কি দেখলাম?

এ সময় কালোপাঞ্জাবি ও পাগড়ি পড়া একজন আমাদের সামনে দিয়ে গান গাইতে গাইতে চলে যায়- প্রতিমুহূর্তে জন্ম আমার, প্রতি মুহূর্তে মৃত্যু, জন্মমৃত্যুতে মাখামাখি আমি, বলো হে জীবন, কোথায় কিভাবে থামি...। সে ও তার সূর দূরে মিলিয়ে যায়।

আওলিয়াকে বলি হাজার আমির ভীড়ে আপনি নিজেকে কেমন করে চিনবেন? কিংবা কেন আপনি প্রতিমুহূর্তে নিজের দেখা পেয়েও নিজেকে চিনতে পারেন না। এবার আওলিয়াও গান ধরেন, ‘ছোট্ট ঘাস বারোমাস রহস্যময়/বালির কণা রোদের নিচে রহস্যময়/শিশুর চলা যিশুর বলা রহস্যময়/বুড়োর মুখ বীজের বুক রহস্যময়/সরব শব্দ অরব শব্দ রহস্যময়/রহস্য বাড়ে রহস্য বাড়ে রহস্যময়/জলের উপর নৌকা ভাসে রহস্যময়/সহজ যতো চিচিং ফাঁক রহস্যময়/পাখিটা যে উড়তে পারে রহস্যময়/আমার বলা জলের চলা রহস্যময়/রহস্য খোলো রহস্য খোলো রহস্যময়’

এরপর আর কথা চলে না। আমার শুধু মনে হতে থাকে, সত্য নিজেই এক ট্রাজিক শব্দ, যে নিজের গায়ে বহন করে অনাদি সুস্থিরতা, অক্ষয় নিশ্চয়তা, চির পরিবর্তনহীনতা, অমলিন অটলতা, আর শাশ্বত নির্ভরতার অগণন গল্প! আওলিয়া কি আসলে অনেক আগেই পরিবর্তনশীল সত্যের স্রোতে হারিয়ে গেছেন! আমিই শুধু তার হুশ আশা করছি। এক অচীন ঘুমের দেশে তিনি যদি অনড় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন! তাহলে আমিই বা তার সঙ্গে কথা চালাচালি করছি কিভাবে! আমিও কি আসলে আরেকটি বিভ্রমচূড়া হয়ে উঠেছি, যেখানে ওই আওলিয়াকে মাঝে মাঝে দেখতে পাই।

আওলিয়া এবার আমার দিকে একটা আয়না ধরেন, আমি দেখতে পেলাম, সে নয়, চূড়ায় আমাকেই দেখা যায়। আর আয়নাটা ঘুরিয়ে নেওয়া মাত্রই আমি দেখলাম, সে আসলে আমার অপর! এরপর আমিও ভাবতে থাকি, হয়তো আমিও ভাসমান, আর তার মতো আজও ভাবছি ওই স্রোতে ভেসে যাইনি! আর আওলিয়া মৃদু হেসে বললেন, তার মনের কথা কখনও জানা যায় না। সে নিজেই জানে না। আমি ভাবি, হায়, সে প্রতিমুহূর্তে মনের কথাই বলছে, আর ভাবছে এটা তার মন নয়, নেহাতই বুদ্বুদ! ভাবি, এ জগতে কিভাবে আমি বারবার তার দেখা পাই!