কবির পোশাক

ঢাকা, বুধবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৯ | ২৯ কার্তিক ১৪২৬

কবির পোশাক

গোলাম কিবরিয়া পিনু ২:৫৬ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ০১, ২০১৯

print
কবির পোশাক

কবিদের পোশাক-আশাক, বেশভূষা প্রথাগত সমাজ-বাস্তবতার চেয়ে খানিকটা খাপছাড়া হয় বা ভিন্ন হয়, কিন্তু আমার কবি-জীবন সেই অর্থে একেবারেই ভিন্ন, অনেকে ভাবে, আমি একজন নিরেট ভদ্রলোক টাইপের মানুষ, তাই বেশ-ভূষা কিংবা কবিদের বোহেমিয়ান জীবনাচরণের বাইরে অবস্থান করেও আমি কীভাবে কবিত্ব ধারণ করছি? এমন প্রশ্নের মুখোমুখি আমাকে অনেকবার হতে হয়েছে।

আমি এসব প্রশ্নের উত্তরে বলেছি। কবিদের পোশাক-আশাক ও বেশভূষা কবির নিজস্ব বিষয়। কবির রুচি ও স্বাধীনতা অনুযায়ী তার পোশাক-আশাক, চালচলন ইত্যাদি নির্ধারণ করতে পারেন। প্রত্যেক ব্যক্তির স্বাধীনতা রয়েছে এ বিষয়ে, সেই স্বাধীনতা খর্ব করা সমীচীন নয়। তবে আমার কবি-জীবন আমার জীবন দৃষ্টিভঙ্গির কারণে ভিন্ন বলতে পারেন ও বিবেচনাও করতে পারেন। শুধুই বেশভূষা বা পোশাক-আশাকে আলাদাভাবে কবিকে মানুষ চিহ্নিত করুক, তা হয়তো কখনো আমি চাইনি, একমাত্র আমার কবিতা দিয়ে আমাকে মানুষ কবি হিসেবে চিহ্নিত করুক, পোশাক-আশাক শুধু নয়, পেশা বা অন্য কোনো পরিচয়ের আবরণে কবির পরিচয় মুখ্য হয়ে উঠুক, তা আমি কখনো চাইনি।

ভিন্ন বা প্রচলিত ধারণায় স্থির থাকা পোশাক হয়তো কারো কারো ক্ষেত্রে কবির পরিচয় তুলে ধরতে হয়তো প্রেরণা জোগায়! তা আমার ক্ষেত্রে অন্যভাবে এসেছে। তবে পোশাকের চেয়ে বাস্তবতা এই যে, কিশোর বয়সে কবিতা লিখে পুরস্কৃত হয়েছি, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থেকেছি, তা আমাকে উৎসাহিত করেছে। পোশাকের চেয়ে কবিতা লেখার জন্য ধারাবাহিক অনুশীলন ও সময় সংরক্ষণ করতে হয়েছে। কত বই পড়েছি,কত সাময়িকী- পত্রিকা। কবিতা লেখার জন্য বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি। এসব হয়তো কবি হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে।

ভূমিকা রেখেছে- বিভিন্ন সংগঠন, মানুষের সাথে সাথে সম্পর্ক-দ্বন্দ্ব, সমাজ-দেশের পরিস্থিতি, ভাবনা- স্বপ্ন ইত্যাদি। কত রকমের মিথস্ক্রিয়া। জীবনের একটি মুহূর্ত, সমাজের ঘটনা ও বিভিন্ন অনুরণন কবিতা লিখতে তাড়িত করে ও প্রেরণা জাগায়। এসব আন্তঃসম্পর্ক হয়তো কবি হয়ে ওঠার পেছনে সূক্ষ্ম ভূমিকা রেখেছে- আমার ক্ষেত্রে, পোশাক নয়। নিছক পোশাক ছাড়া, আরও বিভিন্নভাবে নিজের অভিজ্ঞতালব্ধ জীবনের পটভূমি ব্যাখ্যা করে কবিশক্তির প্রসঙ্গটির কিছুটা ব্যাখ্যা করা যায়। তবে এ বিষয়ে আমাদের দেশে কবির পোশাক নিয়ে কিছু মিথ তৈরি হয়ে আছে, যা প্রচলিত ও ব্যবহৃত হয়ে থাকে; তা কতটুকু যুক্তিযুক্ত বা বাস্তবসম্মত তা ভেবে দেখা যেতে পারে।

আমি ভেবেছি, কবিতার চেয়ে যদি পোশাক-আশাক ও আচরণে কবির পরিচয় অতিরিক্তভাবে ব্যক্ত করা হয়, তাহলে তা কতটুকু মানানসই হয় বা কতটুকু যুক্তিযুক্ত হয়? তা বিবেচনার বিষয়। শুধু পোশাকী কবি হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করা আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি, তা সমীচীন নয় বলে আমার ব্যক্তিগত বিবেচনা। তবে আমি চাইছি কবি হিসাবে সমাজের অন্যান্য স্বাভাবিক-সাধারণ ও সুস্থ জীবনবোধের মানুষের মতো পোশাক-পরিচ্ছদ কবিরাও পরবেন, ভেতরে হয়তো ভিন্ন দার্শনিক-নৈতিকবোধ জিইয়ে রেখে ভিন্ন রকমের স্বপ্নঘেঁষা অঞ্চলে চলবেন, ভেতরে থাকবে সাধনার বিষয়, সৃজনশীলতার বিষয়, স্পর্ধার বিষয়, তা কেন শুধু বাহ্যরূপে পোশাক নির্ভর হয়ে প্রকাশিত হবে? এ-ভাবনা থেকে হয়তো অন্যান্য মানুষেরই মতোই আলাদাভাবে নিছক ‘পোশাকী-কবি’ হওয়ার প্রয়োজন হয়ে ওঠেনি। আধুনিক কবিরা শুধু আমাদের দেশে নয়, বিভিন্ন দেশেও খুব পোশাকী হয়ে ওঠেন? না। কবিদের জীবন বোহেমিয়ান হতে পারে, বিভিন্ন রকমের হতে পারে। কিন্তু আমি সবসময়ে কবির মর্যাদা কোনোভাবেই খাটো হোক পরিবারে, সমাজে, প্রতিষ্ঠানে বা অন্য কোনো পরিবেশে, তা সচেতনভাবেই কখনো চাইনি।

আমি মনে করি, কবিরা অগ্রজ্ঞান নিয়ে অগ্রগামী মানুষ, নিছক অক্ষরজীবী নন, কবিদেরও জ্ঞান ও বিভিন্ন ধরনের সামাজিক-রাজনৈতিক-প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতা অন্য কারো চেয়ে কম নয়। সে কারণে পোশাকী কবি পরিচয় বা কবির পোশাক-আশাকের কারণে তার মূল্য কমুক, তা আমি চাই না কিংবা কবির ওপর কবি হিসাবে ব্যক্তি ও সমাজ-প্রতিষ্ঠানের করুণা নিক্ষেপিত হোক, তাও চাই না। এসব বহুবিধ কারণে কবি-সত্ত্বাকে সবসময়ে মর্যাদার আসনে রাখার জন্য সচেষ্ট থাকার চেষ্টা করেছি।

এই সমাজের অন্ধগলিতে প্রবেশ করে, সমাজের নখদন্ত আক্রমণের মধ্যে পড়ে, সমাজের বিভিন্ন দ্বন্দ্বে পড়ে, অনুভব করেছি, হৃদয় ও মস্তিষ্ক ঠিক রেখেই কবির অবস্থান ঠিক রাখতে হবে। তবে, কবিজীবন আমারও রয়েছে- কবির পোশাকী বৈশিষ্ট্য ছাড়া আর অন্যান্য অনেক বৈশিষ্ট্য নিয়েই। কবিজীবন কোনো ভাবেই ক্ষুন্ন না হয়- সমাজের অন্যকোনো প্রলোভনে, ধাক্কায় কিংবা আক্রমণে, কবিজীবন সচেতনভাবেই রক্ষা করে চলেছি, এযেন নিজের সাথে নিজের প্রতিনিয়ত যুদ্ধ। আর এইভাবেই কবিত্ব রক্ষা করেছি- রক্ষা করতে হয় বলেই মনে করি।