শামসুর রাহমানের কবিত্বের ধ্বজা

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২১ নভেম্বর ২০১৯ | ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

শামসুর রাহমানের কবিত্বের ধ্বজা

অনীক মাহমুদ ২:৩৭ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৫, ২০১৯

print
শামসুর রাহমানের কবিত্বের ধ্বজা

আমাদের নমস্য কবি শামসুর রাহমান জন্মেছিলেন গত শতকের বিশের দশকের শেষান্তে- ১৯২৯ সালের ২৩ অক্টোবর। লোকান্তরিত হয়েছেন ২০০৬ সালের ১৭ আগস্ট। বাংলা ত্রিশোত্তরের কাব্যধারার উপান্তে জন্ম নিয়ে সৃজনশীলতার বহুমাত্রিক কালনৈপুণ্যে তিনি হয়ে উঠেছিলেন অনন্য কবি প্রতিভার অধিকারী। তার জন্মদিন যেমন ফিরে ফিরে আসে তেমনি লোকান্তরের মর্মদাহও ফিরে ফিরে আসে। তবে একজন মানুষের কৃতি ও কৃতিত্ব তার জীবনসত্যের সঙ্গে অন্বিত হয় বলে জন্মদিনের উচ্ছ্বাসই প্রকৃত অর্থে প্রেরণার আধার হিসেবে প্রজন্মের মধ্যে ক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথ ‘মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই’ বলে যে আকুতি জানিয়েছিলেন, সেটা কর্মের মাহাত্ম্যে জারিত হয়েছিল। শামসুর রাহমান রবীন্দ্র-উত্তর কাব্যের ধারাস্রোতকে সমকালীন জীবনের সংবেদের সঙ্গে যুক্ত করে মহাকালীন পরিব্রাজনাকে যেভাবে করায়ত্ত করেছিলেন তার সাধনা ও সিদ্ধি আজকে আমাদের আশান্বিত করে।

ফরাসি পণ্ডিত আঁদ্রে মারোয়া তার ‘শিল্পীর সাধনা’ গ্রন্থে বলেছিলেন, সাধারণ পাঠকের হাততালির সঙ্গে পণ্ডিতের হাততালি না পেলে লেখক বাঁচে না। কথাটি সর্বোতভাবে সত্য। সাধারণ পাঠক লেখকের গ্রন্থাবলি কেনেন। পণ্ডিতরা ভালো লেখার প্রশংসা করেন- পাঠক সৃষ্টিতে তারা সাহায্যও করেন। লেখকের মৃত্যুর পরে পণ্ডিতরা তার লেখা একাডেমিক কাজে ব্যবহার শুরু করেন। লেখা তখন সখের সাহিত্য থেকে ব্যবহারিক সত্যমূল্যে উপনীত হয়। যে জীবনানন্দ দাশ নিজের জীবদ্দশায় মাত্র ১০১ টাকা পুরস্কার পেয়েছিলেন, তার গল্প-উপন্যাসগুলো পত্রিকা সম্পাদকের দফতর থেকে ফেরত এসে এসে বাক্সবন্দি হয়েছে। লেখকের মৃত্যুর পরে সেগুলো আবার মণি-মাণিক্যের তকমা ধারণ করল। মিডিয়া অনেক সময় তেলীর মাথায় তেল দেয়। সেখানে পণ্ডিতের দৃষ্টি একজন বিস্মৃত লেখকের বাঁচার রসদও হয়ে উঠতে পারে।

যদিও জীবনানন্দ, ইয়েটস, গ্যেটে প্রমুখ যশস্বী লেখক অধ্যাপক-পণ্ডিতদের ব্যঙ্গ করছেন। শামসুর রাহমানের প্রথম গবেষক- অধ্যাপক ইজাজ হোসেন কবির সহযোগিতা না পাওয়ার অনুযোগ করেছিলেন। তারপরও তিনি কবির উপরে বইটি রচনা করেছিলেন মনের জোরে। যাই হোক, সমকালীন জীবনের সকল আবর্ত-সংবর্ত শামসুর রাহমান তার কবিতায় ধারণ করেছেন। সেগুলোতে মহাকালীন জীবনের রসনৈপুণ্য জারিত করারও প্রয়াস পেয়েছেন। জীবদ্দশায় তার গ্রন্থাবলি ও কবিতা নিম্নক্লাস থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্য তালিকাভুক্ত হয়েছে। মৃত্যুর ১৩ বছর পরে দেখি দেশে-বিদেশে শামসুর রাহমান চর্চার আগ্রহ শনৈঃ শনৈঃ বৃদ্ধি পেয়েছে। আমার নিজের কর্মক্ষেত্র রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে কবির সাহিত্যকর্ম নিয়ে এককভাবে দুটি পিএইচ.ডি. গবেষণা সম্পন্ন হয়েছে। বাংলা বিভাগ থেকে ‘শামসুর রাহমানের কবিতা : বিষয়বৈচিত্র্য ও শিল্পপ্রকরণ’; আইবিএস থেকে আরেকটি অভিসন্দর্ভ ‘শামসুর রাহমানের কবিতায় পুরাণ ও ইতিহাস প্রসঙ্গ’। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে পিএইচ.ডি. ডিগ্রিপ্রাপ্ত আরেকটি অভিসন্দর্ভ ‘শামসুর রাহমানের কবিতা : বিষয় ও প্রকরণ’ (২০১১), চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে প্রণীত আরেকটি পিএইচ.ডি. অভিসন্দর্ভ ‘শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদ : নগর ও গ্রাম বাংলার দুই প্রতিনিধি’; জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের একটি এম.ফিল. অভিসন্দর্ভ ‘শামসুর রাহমানের কবিতা : ব্যক্তিক ও সামষ্টিক চেতনার রূপায়ণ’ (২০১১)। বিশ^বিদ্যালয় পর্যায়ে কবির সাহিত্য ও কবিকৃতি পণ্ডিত সমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। অর্থাৎ তার কবিতার ব্যবহারিক মূল্যের ধারা অনেকটাই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

স্বীকৃতি মিলেছে জাতীয় জীবনের অনন্য ভূমিকায়। আমার ধারণা আমাদের বাংলা সাহিত্য কবির কৃতি ও সাধনায় হয়েছে সমৃদ্ধ। শামসুর রাহমানের কবিতা আজকের দিনেও কেন প্রাসঙ্গিকতা না হারিয়ে সত্যমূল্যে দীপ্ত হয়ে উঠছে সে সম্পর্কে দু’একটি কথা বলা যেতে পারে।

প্রথমত, শামসুর রাহমান যে আধুনিকতার চর্চা করলেন তা হচ্ছে তার সমকালীন জীবনের পটে মহাকালীন জীবনের সংশ্লেষ দীপিত করার আধুনিকতা। আধুনিকতার সমকালীন বাতাবরণে যে মহাকালীন দ্যোতনা থাকে তা কবিত্বগুণে এমন বিবর্ধনসৌষ্ঠব অর্জন করে। শামসুর রাহমানের ‘আসাদের শার্ট’, ‘বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা’, ‘স্বাধীনতা তুমি’, ‘দুঃখ’, ‘আমার মাকে’, ‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে হে স্বাধীনতা’, ‘উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ’, ‘বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়;, ‘তোমারই পদধ্বনি’ প্রভৃতি কবিতার উপজীব্য কবি তার চেনা পরিবেশের ভেতর থেকেই চয়ন করেছিলেন। এই সাধারণ বিষয়গুলোকে তিনি যখন কাব্যিক অসাধারণত্বে বিভূষিত করেছেন তখন সেগুলো আর সাধারণ বিষয়ে সীমায়িত থাকেনি। এ কারণেই রক্তমাখা আসাদের শার্ট হয়ে উঠেছে- ‘আমাদের হৃদয়ের রৌদ্র-ঝলসিত প্রতিধ্বনিময় মাঠে,/ চৈতন্যের প্রতিটি মোর্চায়।/আমাদের দুর্বলতা, ভীরুতা, কলুষ আর লজ্জা/সমস্ত দিয়েছে ঢেকে একখণ্ড বস্ত্র মানবিক;/ আসাদের শার্ট আজ আমাদের প্রাণের পতাকা।’

আমরা স্মরণ করতে পারি রবীন্দ্রনাথের ‘যেতে নাহি দিব’ কবিতার চার বছরের শিশুর কথাটি ‘যেতে আমি দিব না তোমায়’। চার বছরের শিশুর কথায় মৃত্যুশীল সকল মানুষেরই কথা। এটাই নির্বিশেষ হয়ে যাওয়ার দৃষ্টান্ত।

দ্বিতীয়ত, শামসুর রাহমান বিষয়ের সঙ্গে বিষয়ীকে ভালোভাবে সন্নিবিষ্ট করতে যত্নশীল থেকেছেন। এ কারণে আঙ্গিক বিবর্ধনের ক্ষেত্রে কবির যথেষ্ট সোৎসাহ পরিলক্ষিত হয়। ভাব অনুসারে তিনি ভাষা ব্যবহার করেছেন। কবিতায় শব্দৈশ্বর্য স্থাপন করে তাকে অধিকতর গ্রহণযোগ্য করে তোলার ক্ষেত্রে তিনি যথেষ্ট পারঙ্গম ছিলেন। ইংরেজি, আরবি, ফারসি, শব্দকে কীভাবে নতুন আর্টে ও স্বাদে বাংলা ভাষায় ব্যবহার করা যায়, তা তিনি পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছেন। নগরজীবনের আটপৌঢ়ে প্রাত্যহিকতা ও অবক্ষয়ের চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে তিনি লোকজ আমেজমিশ্রিত শব্দাবলিও ব্যবহার করেছেন। তবে শান্ত-স্থিতধী এই কবির প্রিয় ছন্দ অক্ষরবৃত্ত। বর্ণনাধর্মিতার প্রতি বেশি অনুরক্তি ছিল বলে তিনি শব্দকার্পণ্যে অভ্যস্ত হতে পারেননি। এ কারণে তার প্রায় কবিতা অবয়বের দিক থেকে একটু বড় আকারের। স্বরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত, অক্ষরবৃত্ত ও গদ্যছন্দ তিনি অকাতরে ব্যবহার করেছেন। বাকরীতির সঙ্গে কাব্যরীতির সংমিশ্রণও তার কবিতায় দেখা যায়। ষাটটির উপরে তিনি কাব্য রচনা করেছেন। নাট্যকাব্য, পত্রকাব্য, কাহিনীকাব্য রচনা করলে তার কাব্যের বহুমাত্রিক যোজনা আরও বিস্তৃত হত।

শামসুর রাহমানের কবিতায় গণচৈতন্যের দাবি বিশেষভাবে ক্রিয়াশীল। দেশ-কালের পর্ব-পর্বান্তরের সঙ্গে শ্রমজীবী মানুষের মুক্তির এষণা তার কবিত্বশক্তির মর্মমূলকে স্পর্শ করেছিল। তার মুক্তজীবনের স্বাচ্ছন্দ্য কখনোই কোনো আচ্ছন্নতার দোসরতা করেনি। আদর্শের বৈপরীত্য ও তার কবিত্বের ধার ঘেঁষতে পারেনি। শামসুর রাহমান তার এক কালজয়ী প্রতিভার নৈপুণ্যের চিরায়ত বাঙালির জীবন, জীবিকা, প্রাত্যহিকতা ও শিল্প নৈপুণ্যের দাবিকে যেভাবে সুন্দরম ও সত্যময়তার উদ্ভাসিত করেছেন জাতি তা কোনোদিনই ভুলবে না। তিনি যুগ যুগ ধরে বেঁচে রইবেন কাব্যপ্রেমী বাঙালির অন্তরে।