সাইকেল চালিয়ে দিগন্তে যাব

ঢাকা, শনিবার, ২৩ নভেম্বর ২০১৯ | ৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

সাইকেল চালিয়ে দিগন্তে যাব

সঞ্জীব পুরোহিত ২:৩০ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৫, ২০১৯

print
সাইকেল চালিয়ে দিগন্তে যাব

বড় মানুষদের কাছাকাছি না যাওয়াই ভালো। কাছাকাছি গেলে তাদের ছোটত্ব দেখা হয়ে যায়। ভেতরে আগে থেকে আঁকা মানুষটা রঙ হারায়। অনেকেই এটা মনে করেন। কবি শামসুর রাহমান এসবের ব্যতিক্রম। তিনি বাইরে ভেতরে অভিন্ন। একজন নিপাট বড় মানুষ। ‘নিউইয়র্কে রবীন্দ্রনাথ’ শিরোনামে কবি অমিয় চক্রবর্তীর একটা কবিতা আছে। আকাশচুম্বি স্কাইক্রেপার্সের বিপরীতে রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিত্ব নিয়ে তুলনা করেছেন তিনি। বলেছেন, রবীন্দ্রনাথই বড়। আমার কাছেও শামসুর রাহমানকে তাই-ই মনে হয়। লাল চালের গরম ভাত খেতে খেতে আমাদের কথা প্রায় প্রতি সপ্তাহেই হত।

সময়টা দুহাজার দুই থেকে চার। ওষুধ খেতে হত। তাই একটা বাজলেই খেতে বসতেন। আর আমি সপ্তাহে একদিন বাংলাদেশ বেতারে যেতাম। কবিতা পড়তাম। আর সে কবিতাটা রাহমান ভাইকেও শুনিয়ে আসতাম। হাঁটা পথ ছিল স্টেশন থেকে তার শ্যামলীর বাড়ি। সে বাড়ির গেটে কখনো কখনো সাঁটা থাকত জামায়াতে ইসলামীর পোস্টার। কারা যেন লাগিয়ে দিয়ে যেত। নানা অনুষ্ঠান। সভাপতি মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী। কখনো প্রধান অতিথি কবি আল মাহমুদ। দু’একবার রাহমান ভাইয়ের বাসায় আল মাহমুদ শেষ দিকেও এসেছেন। সম্ভবত ক্যামেরার কবি নাসির আলী মামুনের উদ্যোগে। পা ছুঁয়ে সালামও করেছেন। ইফতেখার ওয়াহিদ ইফতির কাছে সে ছবি আছে। আমি চেয়েছি। দেয়নি। এই একই তারিখে বাংলা কবিতার আরেক কীর্তিমান কবি মোহাম্মদ রফিকেরও জন্মদিন। তার কাছে শুনেছি একাত্তরের নানা কথা। 

কলকাতায় তখন থেকেই রাহমান ভাইয়ের বিরোধিতা করা শুরু করেছিলেন আল মাহমুদ। তবে মিনমিন করে। কবি মোহাম্মদ রফিক আরও বলেছেন, যারা হুমায়ুন কবীরকে হত্যা করেছে, তারাই রাহমান ভাইকে হত্যা করতে চেয়েছিল।

জীবিত বাংলা ভাষার কবিদের মধ্যে তিনি ছিলেন সবদিক দিয়ে শ্রেষ্ঠ। মানুষের বুকের ভেতর থেকে উঠে আসা শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা ঘিরে ছিল কবিকে। কতিপয় কবিতা লেখকের ঈর্ষা ঘিরে রাখত তাকে। এ ঈর্ষার রূপ সবসময় নিরীহ নয়। সহিংসও। তাকে বেশ ক’বার হত্যার প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে। যে গোষ্ঠী নানা সময়ে রবীন্দ্রনাথের বিরোধিতা করেছে, তারাই বারবার তারও বিরোধিতা করেছে। রবীন্দ্রনাথের গান তার কাছে ছিল অধিক রাবীন্দ্রিক। নিরীহ ঈর্ষাকারদের অনেককেই দেখেছি। দেখেছি কাছ থেকে। আড্ডায় নানা উচ্চবাচ্য করছেন। পরদিন মুখোমুখি হলে বিগলিত হয়েছেন বিনয়ে। যেমন কবি রফিক আজাদ। আমার অত্যন্ত কাছের মানুষ। শৈশবে যার কোলেও উঠেছি। পরবর্তীতে এক টেবিলের অধিবাসীও হয়েছি।

তিনি মাইক্রোফোনে ‘বাংলা ভাষায় এ সময়ের শ্রেষ্ঠ কবি, আমার প্রিয় কবি’ এ রকম নানা কিছু বলে বক্তব্য শুরু করতেন। এরশাদ বিরোধী মুভমেন্টের ভেতর দিয়ে জন্ম নিয়েছিল কবিতা পরিষদ। নব্বইয়ের পর তিনি এ সংগঠনের বিলুপ্তি চেয়েছিলেন। অনুপস্থিতও থেকেছেন। এ অনুপস্থিতি নিয়ে বিষেদ্গার করেছেন সে সময় ড. মুহম্মদ সামাদ। তার চরিত্র নিয়ে কটাক্ষ করেছেন হাকিম চত্বরে আয়োজিত কবিতা উৎসবে। ভালো লাগল আজ তিনি কবিতা পরিষদের সভাপতি। আরও ভালো লাগল আজ এ পরিষদ, বাংলা একাডেমি ও শামসুর রাহমান স্মৃতি পরিষদকে সঙ্গে নিয়ে তার জন্মদিনের আয়োজন করেছে।

কল্পনার কবির মতোই থই থই আবেগ ছিল তার। এক ঝাঁ ঝাঁ দুপুরে তার রুমে বসে আছি। তসলিমা নাসরিনের প্রসঙ্গ আসল। ‘একা একা কোথায় পড়ে আছে’ বলতে বলতে কেঁদে ফেলল! হাউমাউ টাইপ কান্না। আমি হতভম্ব। তসলিমা নাসরিনের একটা কবিতার কথা তুললাম। কবিতাটা ছিল মানুষের ওপর আস্থা নিয়ে। ‘মানুষে বিশ্বাস নেই/ আজ চুমু খেলে কাল ছুড়ে দেবে দূরে [...] বারবার শুধু শিল্পের কাছেই ফিরে আসি।/ শিল্পের কাঁধেই রাখি বিশ্বাসের ক্লান্ত করতল।’ তিনি এ কবিতার দুর্বলতা নিয়ে বলেছিলেন। লিখেও ছিলেন পরে। কারণ, শিল্পমাত্রই জীবননির্ভর। মানুষে আস্থা হারালে আর শিল্প থাকে না। আমার অবাক লাগে, তার বেসিক ছিল ভয়াবহ মজবুত। এ কথা জীবনানন্দও বলেছেন। বলেছেন, ‘কবিতা ও জীবন একই জিনিসের দুরকম উৎসারণ’। মানুষের ওপর বিশ্বাস হারানো পাপ, কথাটা রবীন্দ্রনাথের।
‘ভালোবাসা যদি কভু ফুল্ল মুখ তুলে চায়,/ভালোবেসে তবে আমি সাইকেল চালিয়ে দিগন্তে যাবো/বকুল শেফালি আর জুঁই নীল/
দীর্ঘ পথে ছড়াতে ছড়াতে’।

উনার কবিতা বিস্ময়কর! আপাত নিরীহ এ কবিতার ভেতর তাকান। ভালো করে তাকান। কী আছে এর ভেতর? আছে মানুষের সৃজনশীলতা। কল্পনাশক্তি। পাখির মতো উড়বার কল্পনা দীর্ঘপথ বেয়ে বেয়ে সার্থক হয়েছে। ইকারুসের মিথ থেকে ভিঞ্চির প্রচেষ্টাও হয়েছিল ব্যর্থ। শেষে ঠিকই উড়েছিল মানুষ। রাইট ব্রাদার্সের সাইকেল সারাইয়ের ওয়ার্কশপ থেকেই হয়েছিল সে সফল যাত্রা। কবি শামসুর রাহমানের আবেগ সে বিজ্ঞান আর ইতিহাস বিচ্যুত হয়নি।

একবার দেশের একজন বিশিষ্ট কবি আমার সঙ্গে জাহাঙ্গীরনগর যাবেন। কথা ঠিকঠাক। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়ি নিয়ে তার বিখ্যাত ডেরায় হাজির। তিনি ঘুম থেকে উঠলেন। চোখভরা পিঁচুটি। তিনি চোখ কচলে বললেন, যাবেন না। অগত্যা আমি চলে যাওয়ার জন্য উঠলাম। বললাম, ‘রাহমান ভাই অপেক্ষা করছেন’। এটা শুনে তড়াক করে তিনি লাফিয়ে নামলেন খাট থেকে। অ্যাকুয়ারিয়ামে মাছের খাবার ছড়িয়ে তিনি পাঞ্জাবি খোঁজা শুরু করলেন! যাচ্ছেন নির্মলেন্দু গুণ। তার নামেরও ছিল এত মহিমা। গিন্সবার্গের সঙ্গে তিনি দেখা করতে চাননি। অনাগ্রহ দেখিয়েছেন। একই প্রস্তাব নাসির আলী মামুন গুণদাকেও করেছিলেন। তিনি শুধু দেখাই করেননি। সময় কাটিয়েছেন। বইও লিখেছেন। আমি মামুন ভাইকে বললাম, এটা রাহমান ভাইয়ের দুর্বলতা।

তিনি বিট জেনারেশনের স্পিডকে মানতে পারেননি। এদের ন্যাংটোকাণ্ডে তাল মেলাতে ভয় পেয়েছেন। মামুন ভাই বাঁধ সাধলেন। বললেন, নগ্নতাকে তিনি অস্বীকার করেননি। তিনি তার শরীরের ছবিও তুলেছেন। সে ছবি আমাকে মামুন ভাই দিয়েছেনও। রাহমান ভাই সুন্দর করে লুঙ্গি পরতেন। বাটিকের লুঙ্গি। বাটিক রবীন্দ্রনাথের খুব প্রিয় ছিল। তিনি ইন্দোনেশিয়াতে এটি করা শিখেছিলেনও। একবার রাহমান ভাই পিঠের নিচে বালিশ দিয়ে আধশোয়া। লুঙ্গির গিঁট ঢিলেঢালা। পেটে অপারেশন হয়েছে। আমি সুভাষ মুখোপাধ্যায় সম্পর্কে বলছিলাম। বলছিলাম সুভাষকে নিয়ে একটি সংখ্যা করব। তিনি ‘বেয়াদব বেয়াদব’ বলে উঠে বসলেন বিপজ্জনকভাবে। আমার বয়স তখন ঊনিশ। ‘সুভাষ’দাকে সুভাষ সুভাষ বলছ’! আমি হতভম্ব। আমরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকেও রবীন্দ্রনাথ বলি। তুচ্ছার্থে নয়। এ কথাটা আমি বলতে পারলাম না। সরি বললাম।

তার স্নেহের বিবরণ দিলে নিজের প্রশংসা করা হবে প্রকারান্তরে। তাই ও পথ এড়িয়ে গেলাম। শুধু একটা কথা বলি। কথাটা কবি অনিমেষ চন্দন লিখেছিলেন অমিত্রাক্ষরে। তিনি দেশ পত্রিকায় আমার লেখা তার লেখার সঙ্গে পাঠাতে চেয়েছিলেন। আমি খুবই অপমানিত বোধ করেছিলাম। চন্দন ছাড়াও সেখানে ছিল সুহি, আর রুহি ছিল আমার কোলে। আমি না বলতেই তিনি শহীদ কাদরীর কথা বলেছিলেন। তার কবিতাও তিনি পাঠাতেন। শুধু তাই নয়, হাতের লেখা সুন্দর ছিল না বলে নিজের হাতে কপি করে পাঠাতেন রাহমান ভাই।