নগরের সিসিফাস

ঢাকা, শনিবার, ২৩ নভেম্বর ২০১৯ | ৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

নগরের সিসিফাস

রেজওয়ান তানিম ২:২৫ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৫, ২০১৯

print
নগরের সিসিফাস

করোটিতে রৌদ্রের আশীর্বাদ মুছে ফেলে, প্রায়ান্ধ সন্ধ্যার কাছে ফিরে যাই... এ যেন বন্দিশিবির থেকে জেনে আসা মাতাল ঋত্বিকের হ্যাংওভার। এক ফোঁটা কেমন অনলে সব যেন এলোমেলো হলো, সুধাংশু আর যাবে না সারমেয় সমাচারে। বিধ্বস্ত নীলিমার কাছে বন্ধক রেখেছিলাম একান্ত গোলাপগুচ্ছ, খণ্ডিত গৌরবটুকু ছড়িয়ে দেব ইকারুস হয়ে, আকাশে আকাশে; আরও কোনো কৃষ্ণপক্ষে পূর্ণিমার দিকে।

অথচ দুঃসময়ের মুখোমুখি হতে হতে এখন আত্মপ্রতিকৃতির দিকে তাকাতেও ভয় পাই। শুধু দেশদ্রোহী হতে ইচ্ছে করে। মনে হয় আমি উঠে এসেছি সৎকারবিহীন, আমার সফেদ পাঞ্জাবিতে লেগে আছে ফিরিয়ে নেওয়া ঘাতক কাঁটা, ঊরুসন্ধিতে নামা রক্তের স্রোতে ভেসে গেছে আজ ধুলোয় গড়া শান্তির শিরস্ত্রাণ।

ফিরিয়ে নাও আমাকে হোমারের স্বপ্নময় হাত, আমার আদিগন্ত নগ্ন পদধ্বনিতে শুভবাদী রোদ চুমু খেয়ে যাক, দিয়ে যাক নিজের ছায়ার দিকে তাকানোর অদম্য স্পর্ধা। যে স্বপ্নেরা ডুকরে কেঁদে ওঠে, বারবার রূপের প্রবালে দগ্ধ সন্ধ্যারাতে; সে জানুক, আবারো একদিন, আকাশ আসবে নেমে।

উদ্ভট উটের পীঠে চলেছে যে স্বদেশ, যে স্বদেশ কবিতার সঙ্গে গেরস্থালি করেছিল কোন এক কালে, তাকে আমি ভালোবেসেছিলাম প্রথম গানের মতো, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে। আর আজ তাকে দেখি নক্ষত্র বাজাতে বাজাতে গেয়ে চলেছে গান- ধ্বংসের কিনারায় ব’সে।

বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা; আমাকে অভিশাপ দাও, আসাদের শার্টে লেগে থাকা রক্তের দাম, এখনো দেয়নি বাংলা। তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা, যে খাণ্ডবদাহনে জ্বলেছিল স্বপ্ন দ্যাখা বাংলাদেশ; সে বাংলাদেশ এখন কেমন এক ভাঙাচোরা চাঁদ, মুখ কালো করে ধুঁকছে।

না বাস্তব, না দুঃস্বপ্নের এই ছায়ার ত্রিভুজে নিজেকে ঢেকে রেখেও আমি আশাবাদী হই, বিশ্বাস করতে চাই- ইন্দ্রাণীর খাতা নেচে উঠবে কবিতাকে ভালোবেসে, দুঃখিনী সাঁথিয়ার উড়বে আশার রুমাল, শহীদ জননীকে নিবেদিত পঙক্তিমালা জ্বলজ্বল করবে বুকে তার বাংলাদেশের হৃদয় নিয়ে, একটি ফটোগ্রাফের ছবি হয়ে যাওয়া ছেলেটা হাসি হাসি মুখে তাকাবে এই মাতোয়ালা রাইতে, আমার মাতামহের টাইপরাইটার তেলাওয়াত করবে কোরআন, পরম সমর্পণে, জনৈক সহিসের ছেলেকে স্বপ্ন ভাড়া দেবে উৎসুক জনতা, হরতালে আসাদের শার্ট রক্তের ইতিহাস ভুলিয়ে এক ধরনের অহংকার লিখে দেবে।

এত অন্ধকারময় প্রাত্যহিক বেদনার কাছে কবিতাকে ভালোবেসে প্রার্থনা করি- টেবিলে আপেলগুলো হেসে উঠুক কিংবদন্তির জন্য, হাসপাতালের বেড থেকে মৃত্যু পথযাত্রী রোগীটিও সুখি হোক মৌলানা রুমীর কবিতায়, রূপালি স্নানে সকল টানাপড়েন ভুলে যাক পিতলের বক, যে অন্ধ সুন্দরী কাঁদছিল সে হয়ে উঠুক চড়ুইভাতির পাখি, হরিদাসীর সিঁথির সিঁদুরে লাগুক সতীত্বের ছায়া চিহ্ন, হৃদপদ্মে আমার জ্যোৎস্না দুলুক গন্তব্য না থাকার বেদনাকে ভুলে।

শুধু দু’টুকরো শুকনো রুটির নিরিবিলি ভোজ, আর ভগ্নস্তূপে গোলাপের হাসি; এইটুকুর জন্যই আমি স্বাধীনতা তোমাকে ভালোবাসি, টুকরো কিছু সংলাপের সাঁকো দিয়ে মানব হৃদয়ে নৈবেদ্য সাজাই, প্রেমের ও কবিতার। কবিতা, শুধু তোমারই পদধ্বনি আমাকে ঢেকে দেয় নগ্ন স্তব্ধতায়, কালের শ্রুতিলিপি হয়ে...