আলো আঁধারের কবি আজিজুর রহমান

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২১ নভেম্বর ২০১৯ | ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

আলো আঁধারের কবি আজিজুর রহমান

ইমাম মেহেদী ১২:৫১ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৫, ২০১৯

print
আলো আঁধারের কবি আজিজুর রহমান

একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি ও গীতিকার আজিজুর রহমান ১৯১৪ সালের ১৮ অক্টোবর কুষ্টিয়া জেলার (তৎকালীন নদীয়া) হাটস হরিপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মীর বশির উদ্দিন প্রামাণিক ও মাতা সবুরন নেছা। বাড়ির দক্ষিণ-পশ্চিমে গড়াই নদীর অপরূপ কলতান, উত্তরে পদ্মার ঢেউ, পূর্ব পাশে শিলাইদ। প্রকৃতির এই তিন সৌন্দর্যমণ্ডিত পরিবেশের মধ্যেই শৈশব কেটেছে তার।

পুরাতন কুষ্টিয়ার এমনই স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে কুষ্টিয়া হাইস্কুলে ভর্তি হন তিনি। কিন্তু মাত্র ১৩ বছর বয়সে ১৯২৭ সালে পিতার মৃত্যুর ফলে সংসারের দায়িত্ব নিয়ে আনুষ্ঠানিক শিক্ষার ইতি ঘটাতে হয় অষ্টম শ্রেণিতেই। ধরা-বাঁধা পড়াশোনার প্রতি তার অনীহা থাকলেও ছোটবেলা থেকেই বহু পুস্তকাদি স্বগৃহে সংগ্রহ ও পাঠের প্রতি কবির ছিল অকৃত্রিম মোহ। প্রবল ইচ্ছাশক্তি ও অনুসন্ধিৎসার ফলে তিনি স্বশিক্ষিত ব্যক্তি হিসেবে পরিণত হয়েছিলেন।

আবহমান গ্রামবাংলার নদী-তীরবর্তী অপরূপ পরিবেশ তাকে অনুপ্রাণিত করেছিল শিল্প-সংস্কৃতির জগতে। পুঁথি পাঠ, কৃষাণের গান, বাউলের আখড়ায় গান শোনা, রূপকথার গল্প ও কিচ্ছা কাহিনীর সঙ্গে ছিল পারিবারিক সম্পর্ক। প্রথম জীবনে সাহিত্যচর্চা শুরুর আগে নাটকে অভিনয়ে তার উৎসাহ ছিল বেশি। এ সময় তিনি গড়ে তোলেন যাত্রাদল। সে সময়ের বিশিষ্ট অভিনেতা ধীরেন দত্ত, উপেন ঠাকুরসহ অনেকেই অভিনয় করতেন তার দলে। যাত্রা ও নাটক মঞ্চস্থ হত শিলাইদহের ঠাকুর বাড়িতে।

১৯৩৪ সালে নিজ গ্রামে গড়ে তোলেন ‘চাঁদ স্মৃতি পাঠাগার’। দিনে দিনে এটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ একটি পাঠাগারে পরিণত হয়। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ বইপত্রের খোঁজে এখানে আসতেন। তার সাংগঠনিক ক্ষমতাও ছিল প্রবল। এলাকার মুসলিম যুবকদের নিয়ে ‘তরুণ জামাত’ নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। সংগঠনের সদস্যদের নিয়ে তিনি খেলাধুলাসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতেন।

১৯৩৫ সালে ফজলুল হক সেলবর্ষী সম্পাদিত ‘দৈনিক তকবীর’ পত্রিকায় (২০ আষাঢ় সংখ্যায়) প্রথম ‘মোয়াজ্জ্বিন’ শিরোনামে কবিতা প্রকাশের মাধ্যমে তার সাহিত্য জগতে প্রবেশ। পরবর্তীতে কবিতাটির নামকরণ করেন ‘নব অরুণের ডাক’। একই সালে মোহাম্মদ আকরাম খাঁ সম্পাদিত ‘মাসিক মোহাম্মদী’ পত্রিকার আশ্বিন সংখ্যায় প্রকাশিত হয় ‘পাষাণ পিয়া’ নামক কবিতা। ১৯৩৭ সালে এস ওয়াজেদ আলী সম্পাদিত ‘গুলিস্তা’ পত্রিকায় ‘এ নব আষাঢ়ে’ নামক কবিতা প্রকাশিত হয়। ১৯৩৮ সালে কবি শামসুর রাহমান সম্পাদিত ‘হানাফি’ পত্রিকার ঈদ সংখ্যায় প্রকাশিত হয় ‘গোড়াই নদীর তীরে’ কবিতাটি। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি নবযুগ, নবশক্তি, আনন্দবাজার, সওগাত অবনী, আজাদ, বুলবুল, ভারতবর্ষ, বঙ্গশ্রী, শনিবারের চিঠি, মৃত্তিকা ইত্যাদি পত্রিকায় লিখতে শুরু করেন।

১৯৪৪ সালে কলকাতার গ্রামোফোন কোম্পানি থেকে তার ‘কারো মনে দিও না আঘাত/সে আঘাত লাগবে কাবার ঘরে’ গানটি রেকর্ডিং হয়। গানের রেকর্ড নম্বর সিইআই-২৩২৯৮। গানটির সুরারোপ করেন বিখ্যাত সুরকার চিত্ত রায়, গায়ক ছিলেন প্রখ্যাত শিল্পী আব্বাসউদ্দিন আহমদ।

১৯৪৫ সালে আব্দুল কাদির ও রেজাউল করিম সম্পাদিত ‘কাব্য মালঞ্চ’ কবিতা সংকলনে ‘শহরের সান্ধ্য’ কবিতাটি সংকলিত হয়। অন্যদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলে বিশ্বে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও খাদ্য সংকট দেখা দিলে তিনি তৎকালীন নদীয় ফুড কমিটির সেক্রেটারির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

১৯৫৪ সালে কবি ফররুখ আহমদের সহযোগিতায় তিনি ঢাকা বেতারে যোগদান করেন। প্রথমে অনিয়মিত, পরে নিয়মিত শিল্পী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি বেতারে যুক্ত ছিলেন। ১৯৬০ সালে তৎকালীন বিখ্যাত কিশোর পত্রিকা ‘মাসিক আলাপনীর’ ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক নিযুক্ত হন। ‘আলাপনী’ পত্রিকা তৎকালীন সময়ে বহুল প্রচারিত প্রকাশনা হিসেবে প্রশংসিত ছিল। সম্পাদক হিসেবে নতুন লেখক তৈরি ও নবীন লেখকদের লেখা ধৈর্যসহকারে পড়ে ভুলত্রুটি সংশোধন করে ছাপাতেন। ১৯৬৪ সাল থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত তিনি ‘দৈনিক পয়গাম’-এর সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে যুক্ত ছিলেন। এ ছাড়াও তিনি ‘মাসিক খেলাঘর’ পত্রিকারও সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন।

১৯৬০ সালে কবি আজিজুর রহমানের প্রথম শিশু সাহিত্যের অনুবাদ ‘ডাইনোসোরের রাজ্যে ও আবহাওয়ার পয়লা কেতাব’ প্রকাশিত হয়। বেতারে চাকরিরত অবস্থায় ১৯৬১ সালে ছায়াছাবির গান রচনা করে ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেন। এই সময় এহতেশাম পরিচালিত ‘রাজধানীর বুকে’ চলচ্চিত্রের জন্য ‘এই রাজধানীর বুকে’, ‘এই সুন্দর পৃথিবীতে’, ফুলের হাওয়া লাগে বনে ঐ’, ‘ঝিকিমিকি তারা জ্বলে আকাশের গায়’, ‘এই রাত বলে ওগো তুমি আমার’, ‘এই পেয়ালা উঠেছে ভরে’ গান রচনা করেন তিনি। ‘আগন্তুক, পারুলের সংসার’ চলচ্চিত্র ছাড়াও মুস্তাফিজ পরিচালিত ‘হারানো দিন’ চলচ্চিত্রের জন্য ‘আমি রূপনগরের রাজকন্যা/ রূপের যাদু এনেছি’ সাড়াজাগানো এই গানটি রচনা করেন।

১৯৬২ সালে তিনি ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেন ‘জীবজন্তুর কথা’। ১৯৬৩ সালে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয় তার কিশোর কাব্যনাটিকা ‘ছুটির দিনে’। ঢাকা থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক পয়গাম’-এর সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে যোগদান করেন ১৯৬৬ সালে এবং ১৯৭০ পর্যন্ত পয়গাম-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৬৯ সালে ‘দেখ ভেবে তুই মন/আপনের চেয়ে পর ভালো তোর, ঝির ঝির বাতাসে/ পাল তুলে দে গান রচনা করেন’।

১৯৭০ সালে কবি আজিজুর রহমানের প্রথম প্রবন্ধ গ্রন্থ ‘আজাদের বীর সেনানী : কুমারখালীর কাজী মিয়াজান’ ‘সোসাইটি ফর পাকিস্তান স্টাডিজ, ঢাকা’ থেকে প্রকাশিত হয়। এ ছাড়াও দেশাত্ববোধক গানের সংকলন ‘এই মাটি এই মন’ ও পাঁচমিশালী গানের সংকলন ‘উপলক্ষের গান’ ১৯৭১ সালে প্রকাশিত হয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের’ জন্য রচনা করেন ‘রক্ত রঙিন উজ্জ্বল দিন/ বহ্নিশিখায় জ্বলছে’ ‘পলাশ ঢাকা কোকিল ডাকা আমার এ দেশ ভাইরে’, ‘ধানে ভরা গানে ভরা আমার এ দেশ ভাই’ শীর্ষক গানগুলো রচনা করেন। ১৯৭২ সালে ‘কায়কোবাদ সাহিত্য মজলিস’ এবং কবি জসীম উদ্দীন প্রতিষ্ঠিত ‘সাহিত্য সাধনা সংঘ’-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন তিনি।

১৯৭৫ সালের ১১ আগস্ট মাতৃবিয়োগ ঘটলে কবি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। অসুস্থ হয়ে পড়ায় ১৯৭৮ সালের পর কবির হাতে তেমন আর কলম ওঠেনি। একাকী বিছানায় শুয়ে দিন কেটেছে তার। শেষ জীবনে বিছানায় শুয়ে-শুয়ে লিখেছিলেন ‘পৃথিবীর এই পান্থশালায়/হায় পথ ভোলা কবি/জলের লেখায় বালুকাবেলায়/ মিছে এঁকে গেলে ছবি’ গানটি। এটাই ছিল কবির লেখা শেষ গান।

১৯৭৮ সালের ৯ সেপ্টেম্বর কবি আজিজুর রহমানের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ঢাকার পিজি হাসপাতালে ভর্তি হন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১২ সেপ্টেম্বর (২৬ ভাদ্র, ১৩৮৫ বাংলা) শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কবির শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী নিজ গ্রামে তাকে সমাধিস্থ করা হয়। মৃত্যুর পর ১৯৭৯ সালে তিনি মরণোত্তর ‘একুশে পদকে’ ভূষিত হন।