তবু সেই তিনজন ‘শালিখ’ কোথায়?

ঢাকা, শনিবার, ২৩ নভেম্বর ২০১৯ | ৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

তবু সেই তিনজন ‘শালিখ’ কোথায়?

হেনরী স্বপন ১:৫১ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৮, ২০১৯

print
তবু সেই তিনজন ‘শালিখ’ কোথায়?

কবিতা কল্পনার নির্মাণ। বোধের অন্তঃস্থলে স্বপ্ন-কল্পাঞ্চল যুক্ত হয়ে যে কবিতার সৃষ্টি হয়; হুবহু বাস্তবতার অন্ধকারে সেই কাব্যজ্যোৎস্নাও অন্ধকার ভেঙ্গেই ফুটে ওঠে... ‘শ্যামলী তোমার মুখ সেকালের শক্তির মতন!’ বোধের পরাবাস্তবতায়ই কবিতার আশ্রয় মেলে ধরে। সেখানে বোধ-স্বপ্ন পেষণের শব্দ হয়ে ওঠে ক্লাসিকাল। শরীর খুঁড়ে সেইসব শব্দচিত্রণের প্রোট্রেট আঁকতে হয়। মেঘ মাল্লার শুনতে হয় বিরহ সেতারের। নির্জনতায়। কবির চিন্তায় জাগ্রত সময়কে আত্মস্থ করে নেয়ার। প্রকৃত কবির জীবনদর্শন সর্বত্রই যখন সজ্ঞাহীন-বল্গাহীন আত্মজীবনের দিকে ছোটে। তখন আমরা সেই কবিতায় অন্তত দু’দ- শান্তি খুঁজে ফিরি। দূর বাস্ততার টোটেমে কিংবা প্রহেলিকা যেখানে-মায়া অনুরণিত হয়-যদিও-’মাথার ভিতরে/স্বপ্ন নয়, কোন এক বোধ কাজ করে,/স্বপ্ন নয়-শান্তি নয়-ভালবাসা নয়,/হৃদয়ের মাঝে এক বোধ জন্ম লয়;

আহা! ভালবাসা নয় কেনো? এ্যাপিফানি-এই উচ্ছ্বাসে কবির চৈতন্যবোধেও বৈপরিত্যের প্রকাশ ঘটে বলে? অসম্ভব তো কিছুই নয়। সব কিছুকেই নির্মাণের সাথে মিলিয়ে নিতে হয়।কেননা, চারিদিকে জীবনে সমুদ্র সফেন... শুধু কল্লোলিত ধ্বনি! বুকের ভেতরে তরপায়! স্রেফ কবিতার উত্তেজনায় ঘোরাক্রান্ত হয় বলেই কি; আমাদের সমস্ত ভালবাসা মরে যায়। চিতাকাঠ জ্বলে জ্বলে ওঠে-গহীন অন্তরে। তবুও তো কল্পনা জাগে। দীর্ঘায়িত হয় মন্থনে। বহুবর্ণে-বহুমাত্রিকতায়। আগাগোড়া ঐতিহ্য- অস্তিত্বের প্রিজমে। তবু এই কবিতার মতোই-’চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা,/মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য...

এ-ও কি, সেই রোমান্টিকতার প্রভুত্ব! ফ্রান্স-ফরাসি এতিহ্যের মতোই কি নয়? প্রান্তরের মুখ মনে পড়ে-মুখোশ্রীর অপরূপে। রঁদ্যার ভাস্কর্যের সেইসব নারীর সৌন্দর্যের ধূসর জগৎ হয়ে ওঠে দিগিদিগ। অনুভবের প্রবাহে- সংকেত শুধু। যে কবিতায় হৃদয়ের ভাষা থাকে; বিষয়বর্গে বিভিন্ন সেই ভাষার প্রকাশ একেবারেই ভিন্ন হবে। যে পৃথক ভাষা দিয়ে কবির অমোঘ পরিচয় আবি®কৃত হয়। যদিও... “শকুন ও শেয়ালের খাদ্য আজ তাদের হৃদয়।”

যা শুধু গভীর স্বপ্নের ভিতরে অটুট রয় ফরমালিনের আশ্রয়ে। কবিতা কবির ভাবুকতায় সামিল হলে; পার্থিব স্পর্শের আকাঙ্খায় কবি তখন মেটামরফসিসের অনুভূতিতে উড়ন্ত পাখি হয়ে ফিরে আসতে চাচ্ছেন নিজের জন্মভূমিতে। সর্বকালের এই অনুভূতিক নির্মাণ কেবল কবির অসম্ভবে নয়। বরং এর বিস্তার এতোটাই জন্ম-জন্মন্তরের সামগ্রীকতায় উদগ্রীব! যেনো এমন আকাঙ্খার স্বদেশীকতা! যা কেবল বিস্তারিত করে তোলাই অনির্ণেয়-অসম্ভব-ও। তাই কবিতার এই অর্থময়তাকে পাঠ্য এবং পাঠকের জন্য সিম্বল এই দুইয়ের কনটেন্টে অধিকার করে নেয় কবি-অপরকেও। এ জন্যেই তো কবি পরজন্মের অর্ন্তগত মনোলোকে এমোন এক বিশেষ অনুভব জাগিয়ে তোলেন-’আবার আসিব ফিরে ধানসিড়িটির তীরে-এই বাংলায়/হয়তো মানুষ নয়-হয়তো বা শঙ্খচিল শালিখের বেশে;/হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে/কুয়াশার বুকে হেসে একদিন আসিব এ কাঁঠাল-ছায়ায়।

তাই, আধুনিক রবীন্দ্রত্তোর আধুনিকতা শুনতে ভালোবাসি এলিয়ট উচ্চারিত এই কথায় যে, “দেশপ্রেম নিয়ে কবিতা লেখা যায় না।” কিংবা রিলকের এই বিশ্বাসেও স্পষ্ট,..“আমাদের বুদ্ধিনির্ভর সচেতনতা ও উদ্দেশ্য প্রসূত কর্ম- যত অলাদা হবে, ততই সহজে তা রক্ষা করতে পারবে আমাদের প্রেরণার জগৎকে।”... এই দুই কবির চরম বিশ্বাস ও জীবন ভাবনার মাঝামাঝি সম্ভবত জীবনানন্দই বুঝতে পেরেছিলেন আরও যথার্ত সমকালের সংকট উত্তরণের সঠিক পথটিকে। তাই জীবনানন্দ বললেন,-“আমি বলতে চাই না যে, কবিতা সমাজ বা জাতি বা মানুষের সমস্যা- খচিত অভিব্যক্ত সৌন্দর্য হবে না। তা হতে বাঁধা নেই। অনেক শ্রেষ্ট কাব্যেই তা হয়েছে। কিন্তু সে সমস্ত চিন্তা, ধারণা, মতবাদ, মীমাংসা কবির মনে প্রকম্পিত হয়ে কবিতায় কঙ্কালকে যদি দেহ দিতে যায় কিংবা সেই দেহকে দিতে চায় যদি অঙ্গ- তা হলে কবিতা সৃষ্টি হয় না- পদ্য লিখিত হয় মাত্র। ঠিক বলতে গেলে পদ্যের আকারে সিন্ধান্ত, মতবাদ ও চিন্তার প্রক্রিয়া পাওয়া শুধু।” কবির এই সুদূর চিন্তার ফলে ক্রমশই আধুনিক মানুষ থেকে আধুানিকতর মানুষের কাছে জীবনানন্দের প্রবল প্রভাবের কারণ এখানেই নিহিত।

তাহলে, একথা অনস্বীকার্য যে, মহৎ কবি এবং কবি প্রতিভার সঞ্চারণ ঘটে থাকে নানা স্তরে। সূত্রায়ণের শুদ্ধতাকে সে কেবল আধুনিকায়নেই নয়; উত্তরাধুনিক অভিধায় নির্দিষ্ট হন সমকালীন কাব্যতত্ত্বে কিংবা শুদ্ধতম-পুরোহিত হন-উপমা উপর্যপরী সৌন্দর্যতত্ত্বের নিবন্ধনে। দেরিদা তত্ত্বের বি-নির্মাণেও টেক্সকে ডি-কনস্ট্রাক্ট করতে গিয়ে রিভার্সাল ও ট্রান্সফর্মেশান পদ্ধতির অতি জটিল ও সতর্ক যাত্রায় হাজার বছর ধরে-কবির এই পথ- পরিভ্রমণ চলছে পৃথিবীর পথে কিংবা ধূসর জগতে, তবুও জীবনের রিফ্লেক্ট শুধু জ্যোৎস্নায় প্লাবিত নৈসর্গিক কবিতার মতো যেনো এইসব উপমায় উজ্জীবিত কবিও অন্তরদৃষ্টি মেলে দেখেন- জ্যোৎস্নারাতে বেবিলনের রাণীর ঘাড়ের উপর/চিতার উজ্জল চামড়ার/শালের মতো জ্বল জ্বল করছিল বিশাল আকাশ!’

যে আকাশে নক্ষত্রেরা কেবল; শ্বাশ্বত রাত্রির বাসিন্দাই নন। সেখানে কখনও তেড়ে ওঠে; রৌদ্রের গোধুলি-ভোরের সকাল-কুয়াশায় নিভৃত আলোর রোশনাই। বিকিরণ। সেই যে ভিজেরৌদ্রের উত্তাপে বসে কবি লিখছেন, হয়তো হবে কোনও এক কবিতার খসড়া। কিন্তু কবিকে-জিজ্ঞেস করলে বলতেন,-দেখিস না কী রকম ইস্পাতের মতো নীলাকাশ।

তবু কবি কল্পনার সেই আকাশ জুড়ে শুধু নানা- রং। গাঢ়-ফিকে-ধূসর-কিংবা অনেক নীল সেখানে-/‘...থাকে শুধু অন্ধকার ; মুখোমুখি বসিবার/বনবলতা সেন’/তবে, কে এই সেন বংশের মেয়ে? কবির হৃদয়ে সর্বাধিক আলোকিত এই নারীর মুখ। যে অন্ধকারে প্রণয়মগ্ন হতে পারে। নিবিড় নৈকট্যে দ্বিধাহীন বসিবার শরীর সাহস আছে যার। যে মুখম-লে শ্রাবস্তীর সৌন্দর্য স্বপ্ন জগতে বিপুল আয়োজনে ফুটে উঠে-

জীবনানন্দ তো কবিতায় উল্লেখের আগেই তাঁর ‘কারুবাসনা-উপন্যাসের স্মৃতিনির্মিত নায়িকার বর্ণনায়-বনলতা প্রসঙ্গে লিখেছেন ; যে উদ্ধৃতি পাঠে বিষয়টি অনেকটাই স্বচ্ছ হয়ে যায়- “সেই বনলতা-আমাদের পাশের বাড়িতে থাকত সে। কুড়ি-বাইশ বছরের আগের সে এক পৃথিবীতে,...বছর আষ্টেক আগে বনলতা একবার এসেছিল। দক্ষিণের ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে চালের বাতায় হাত দিয়ে মা ও পিসিমার সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা বললে সে। তারপর আঁচলে ঠোঁট ঢেকে আমার ঘরের দিকেই আসছিল। কিন্তু কেন যেন অন্যমনস্ক নত মুখে মাঝ পথে গেল থেমে, তারপর খিড়কির পুকুরের কিনারা দিয়ে শামুক গুগলি পায়ে মাড়িয়ে বাঁশের জঙ্গলের ছায়ার ভিতর দিয়ে চলে গেল সে।

নিবিড় জামরুল গাছটার নীচে একবার দাঁড়াল, তারপর পৌষের অন্ধকারের ভিতর অদৃশ্য হয়ে গেল।” জীবন ও কাব্যের অন্বয়ে লেখা এই চরিত্র চিত্রণ হয়েছে ১৯৩৩-এ।-জানা যায় ১৯৩৪-এ বনলতা কাব্যের পান্ডুলিপি তৈরি হয়েছিল। এবং ১৯৪২-এ বুদ্ধদেব বসুর উদ্যোগে কবিতা ভবন থেকে ‘এক পয়সায় একটি’ গ্রন্থমালা সিরিজে বনলতা সেন প্রকাশিত হয়। তখন থেকেই কাব্যের এই নায়িকা বাংলা সাহিত্যের জায়মান হয়ে ওঠে। সর্বাধিক পাঠ্য-সময় থেকে সময়ন্তর যাত্রায় কবির এই নারীর রহস্য আজও অটুট। যদিও যুগসন্ধির এই যাত্রা এক বিপন্ন বিস্ময়! বহু বিরূপতা-বিদ্রুপের চাপ সয়ে সয়ে পরাক্রান্ত আজও তাঁর সমস্ত কাব্যের চেতনাজগত-পাঠকের অবচেতন মনীষায় জটিল-জটিলতর মনে হয়। কিন্তু এখন সে একজন শ্রেষ্ঠ কবির উত্তারাধিকারী। কবি সর্বত্র হৃদয়ের সত্য-উপলব্ধির প্রকাশ করেছেন তাঁর বহু কবিতার নৈসর্গিক ইমপ্রেসান থেকে। যদিও কবির একটিমাত্র গ্রন্থ রূপসীবাংলাই তো পুরো বাংলাদেশকে রিপ্রেজেন্ট করতে পারতো। এই গ্রন্থের সব লেখাই কবি জীবিত থাকাকালীন লিখেছিলেন। কিন্তু তা প্রকাশিত হয়েছিল মৃত্যুর পর। কেননা, এই বরিশালের স্মৃতিঘেরা বগুড়া রোডের বাড়িতেই কবি যেনো ধ্যানস্থ এখনও এই তপোবনে। এজন্যেই এই বাংলার পরে এতোটাই পক্ষপাত ফুটে ওঠে তাঁর কাব্য দৃঢ়তায়- “তোমরা যেখানে সাধ চলে যাও, আমি এই বাংলার পরে রয়ে যাব,/দেখিব কাঁঠালপাতা, ঝরিতেছে ভোরের বাতাসে,/দেখিব খয়েরি ডানা শালিখের...।”

তাই, চিল-বিল-খাল এই তিনে যদি হয়-বরিশাল! তাহলে এই শহরের উড়ন্ত শঙ্খচিল আর শালিখ দেখলেই আমি জীবনানন্দকে খুঁজে পাই। কিন্তু কবি খুঁজছেন, অন্য জীবনের অন্য মানে। কেননা, সময়-কাল-প্রকৃতি ও সময়ের মানুষ-মানুষীই যেনো তার সমস্ত কবিতার প্রয়াস-এ-জীবনে আমি ঢের শালিক দেখেছি,/তবু সেই তিনজন শালিক কোথায়...