জীবনানন্দীয় ঘোর

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৯ | ৩০ কার্তিক ১৪২৬

জীবনানন্দীয় ঘোর

বীরেন মুখার্জী ১২:৪৭ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৮, ২০১৯

print
জীবনানন্দীয় ঘোর

ভেবেছি অনেকবার, অন্ধকারের হাত ধরে বেরিয়ে পড়ব নক্ষত্র সন্ধানে। যে নক্ষত্রের দিকে চেয়ে রচিত হবে সহস্র কবিতা। অগণন নক্ষত্রের আকাশের দিকে তাকিয়ে রক্তে তুলব সৃষ্টির গুঞ্জন। হারিয়ে যাব কোনো এক মানসীর মুখ ভালোবেসে, কিংবা ক্ষণিকের জন্য হলেও পিছন ফিরে তাকাব-অপলক। কখনো সমুদ্র, বনবীথি আবার কখনো ভালোবাসবো বাংলার বেনোজলে ঘাই মারা শোল মাছের পরিচিত ধ্বনি। এক সময় ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে যাব বাংলার শিশির ছোঁয়া ঘাসে, কাঁঠাল পাতা কিংবা শালিখ ভালোবেসে। ভুলে যাব মশারীর ক্ষমাহীন বিরুদ্ধতা।

আসলে যে কবিতাগুলো আমার চিন্তায় ক্রিয়াশীল, হাড়েমজ্জায় গেঁথে আছে, তা উল্টে-পাল্টে যেভাবেই দেখি না কেন তা থেকে কেবল জীবনানন্দীয় আলোই বিচ্ছুরিত হয়। সন্দেহ নেই জীবনানন্দ দাশ বিস্ময়কর কবি-প্রতিভা। দিনবদলের সঙ্গে সঙ্গে বাংলা ভাষাভাষীসহ সারা বিশ্বে তার কবিতার প্রাসঙ্গিকতা ও পরিচয়বৃত্ত ব্যাপকতর হচ্ছে। আমার মতে, রবীন্দ্রনাথের পর বাংলা সাহিত্যে জীবনানন্দই সবচেয়ে শক্তিশালী ও সামর্থ্যবান কবি-এ শক্তি ও সামর্থ্য তার সৃজনশীলতা আর সাহিত্যবোধের বিবেচনায়। 

জীবনানন্দের কবিতা এতটা প্রভাবসঞ্চারী যে, একবার তার কবিতার সঙ্গী হলে তাকে অতিক্রম করে যাওয়া প্রায় অসম্ভব। অতিক্রম করতে দ্বিধান্বিত হতে হয়। স্বেচ্ছায় কবিতাবরণ করেন। কেউ প্রশ্ন করতেই পারেন-কি আছে জীবনানন্দের কবিতার গভীরে? আমার পাল্টা প্রশ্ন-কী নেই তার কবিতায়! জীবনানন্দের কবিতা রচিত হয়েছে এক নতুন জীবন জিজ্ঞাসার আলোকে। মানুষের মনন, প্রকৃতি আর সৃষ্টিজগতের সারাৎসার নিয়ে তিনি নির্মাণ করেছেন কবিতার ক্যানভাস। শব্দে শব্দে ঢেলেছেন অনন্য বোধের নির্যাস। ক্রমে তিনি বিবেচিত হয়েছেন ‘চিন্তাভুবন প্রকাশের রূপকার আর বিস্তৃত ভাবনাবলয়ের নিরাবেগ ভাষ্যকার’ হিসেবে।

তিনি মনে করতেন কল্পনাশক্তির প্রাচুর্যই একজন কবির শক্তিমত্তার পরিচায়ক। হতে পারে আমার ভেতরেও ‘কল্পনাশক্তি’ পাখা মেলেছে। তবে শৈশবের জীবনানন্দ পাঠ আর পরিণত বয়সের জীবনানন্দ অধ্যয়নে বোধগত দূরত্ব অনেক বেশি। শৈশবের সারল্যবোধ আর পরিণত বয়সের চিন্তাসূত্র যে বিপরীতমুখী তা টের পেয়েছি পৌনপুনিক জীবনানন্দ পাঠে। তার কবিতা সাগরের টানে প্রতিনিয়ত ছুটতে থাকা নদীর নদীর স্রোতের মতোই আমার সত্তা ধরে টানে।

‘বৃষ্টির আগে ঝড়, ঝড়ের পরে বন্যা’র মতো জীবনানন্দ এমনভাবে জড়িয়ে রয়েছে; চারপাশেই জীবনানন্দীয় ঘোর। যা অতিক্রম করতে চাই না। ‘হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে,/সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে/অনেক ঘুরেছি আমি; বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে/সেখানে ছিলাম আমি; আরো দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে;/আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,/আমারে দু’দণ্ড শান্তি দিয়েছিল নাটোরের বনলতা সেন।’/জীবনানন্দ দাশের সবচেয়ে বেশি পাঠকপ্রিয় আর অনাবিল রহস্য সৃষ্টিকারী কবিতা ‘বনলতা সেন’। আমি বিস্ময়াভিভূত; এ পর্যন্ত যত পাঠ হয়েছে কবিতাটির, বেশির ভাগই বিভ্রান্তিমোড়া-ভুল পাঠ; এটিকে প্রেমের কবিতা বিবেচনা করে অনেকে আজো হয়তো খুঁজে চলেছেন ‘বনলতা’ নামক রহস্যমানবীর জন্ম-পরিচয় কিংবা কবির সঙ্গে পরিচয়-সম্পর্ক আর মিলন-বিরহের সর্বজনীন কৌতূহল।

হতে পারে ‘বনলতা সেন’ সেই কল্পনারী যে কিনা কবির কাব্যলক্ষ্মী। কিন্তু কবিতাটির নিবিড় পাঠ অনেক বিষয়ের দরজা তোলে ধরে আমার চিন্তাবিশ্বে। এক সরল অথচ নিগূঢ় চাতুর্য আমাকে টানে কবির এই চিরন্তন রঙের ক্যানভাস। জেগে ওঠে সভ্যতা আর জীবনের বিচিত্র সব প্রপঞ্চ। হাজার বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্যের পাখায় ভর দিয়ে মানব জীবনের প্রত্যাশা-প্রাপ্তি, বিস্ময়-বিভ্রান্তি আর জীবন-অবসানের ইঙ্গিত ও রসিকতা স্বস্তি, আনন্দ এগিয়ে যায়।

যার ভেতরে চিন্তার নান্দনিকতা অস্তিত্বমান; সে ঘোর কাটে না। ‘সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন/সন্ধ্যা আসে; ডানায় রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল;/পৃথিবীর সব রং নিভে গেলে পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন/তখন গল্পের তরে জোনাকীর রঙে ঝিলমিল;/সব পাখি ঘরে আসে সব নদী ফুরায় এ জীবনের সব লেনদেন,/থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।’

কবিতাটি শেষ স্তবকে এক মানবিক শূন্যতাবোধের গভীর-অবস্থান সৃষ্টি করে। কবিতাটি পাঠে এক অনাবিষ্কৃত সত্য; জাগতিক কৃত্রিম-কাঠামো শোভার অন্তরালে ক্লান্তিমোচনের মহৌষধ খোঁজে পাই। দুর্দমনীয় এক মানবীয় অস্তিত্ব অনির্ধারিত পরিপ্রেক্ষিত হয়ে পাখা দোলায়; মুগ্ধতার যন্ত্রণা প্রকাশের ভাষা হারিয়ে ফেলি। তিনি যখন ‘আকাশলীনা’ কবিতায় বলেন-‘সুরঞ্জনা, অইখানে যেয়ো নাকো তুমি,/বোলো নাকো কথা অই/ যুবকের সাথে;/ফিরে এসো সুরঞ্জনা:/নক্ষত্রের রুপালি আগুন ভরা রাতে;’
তখন ব্যথিত প্রেমিক হৃদয়ের সে আকুতি আমাকেও স্পর্শ করে, গভীরভাবে। জীবনানন্দ পাঠ করতে গিয়ে কখনো দিগ্ভ্রান্ত আবার কখনো আশ্রয়হীন হয়ে পড়ি; আবার অপ্রতিরোধ্য নিয়মে জীবনানন্দেই চির আশ্রয়ের সন্ধান পাই। তার উদার শস্যহীন ‘কার্তিকের মাঠে’ নিঃসঙ্কোচে হাঁটু মুড়ে বসার সুযোগ হয়।

প্রকৃতির চিরন্তন অন্ধকারময়তা, পৃথিবীর অপরূপ সৌন্দর্য-বিস্ময় আর মানবিক অনুভূতির জটিল বিষয়াদি নিয়ে আরেক বিস্ময় উদ্রেককারী কবিতা ‘আট বছর আগের একদিন’। জীবনের নানা জটিল আবর্তন কিংবা ঘোরপ্যাঁচে পড়ে স্বেচ্ছামৃত্যুর কথা জীবনে ভাবেনি এমন মানুষের সংখ্যা পৃথিবীতে হাতেগোনা।

কৈশোর উত্তীর্ণকালে আমারও স্বেচ্ছামৃত্যুর প্রতি এক ধরনের পক্ষপাত জন্ম নিয়েছিল। অবশ্য ততদিন বেশিমাত্রায় প্রভাবান্বিত হইনি জীবনানন্দে। সে সময় ‘মানবজীবনের অজানা-অধরা প্রবণতা, ব্যক্তির অনুদ্ঘাটিত আত্ম-পরিক্রমা, প্রকৃতির রহস্যঘেরা সত্যাসত্য ও লৌকিক-অলৌকিকতার মোহনবর্ণন’ সমৃদ্ধ ‘আট বছর আগের একদিন’ কবিতাটি আমার স্বেচ্ছামৃত্যু প্রবণতা রোধে সহায়ক হয়। কবিতার মধ্যে প্রোথিত ‘বিষয় আর বিষয়হীনতার’ দ্বন্দ্বের স্বরূপটি আমার মানসিক শক্তিবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে।
জীবনের এক পরম পরিণতি শাশ্বত-সত্য মৃত্যু; যা অস্বীকার করার কৌশল কিংবা শক্তি কোনোটাই মানুষের আয়ত্তে নেই। অবশ্য সবাই যে মৃত্যুকে ভয় পায়-এমনো নয়; সানন্দচিত্তে মৃত্যুকে আবাহন করা বা ইচ্ছামৃত্যু-গ্রহণকারী এক আপাত সুখী পুরুষের গল্পই যেন এ কবিতাটির মর্মেমর্মে ধ্বনিত হতে থাকে-
‘শোনা গেল লাশ কাটা ঘরে/নিয়ে গেছে তারে;/কাল রাতে-ফাল্গুনের রাতের আঁধারে/যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ/মরিবার হলো তার সাধ।’

পাঠের পর আত্মজিজ্ঞাসায় ভুগেছি; জীবনানন্দের ‘ট্রামনিয়তি’ কী তবে তার স্বেচ্ছামৃত্যু? আবার জানতে ইচ্ছে হয়-জ্যোৎস্না দেখার মধ্যে কী এমন প্রশান্তি বা বোধের জাগরণ ঘটে? এমনো কি মধুজ্যোৎস্না বর্তমান; যা উপভোগের নিমিত্তে মানুষ ভুলে যায় যাপিত সব তাপ!

‘বধূ শুয়ে ছিল পাশে-শিশুটিও ছিল;/ প্রেম ছিল, আশা ছিল-জ্যোৎস্নায়,-তবু সে দেখিল/কোন ভূত? ঘুম কেন ভেঙে গেল তার? /অথবা হয়নি ঘুম বহুকাল-লাশকাটা ঘরে শুয়ে ঘুমায় এবার।’ জ্যোৎস্নাশোভিত রাতে যে মানুষটি জীবনের ভার বহনের ক্লান্তি থেকে মুক্তি পেতে নিবিড় ঘুমের স্বপ্ন আঁকে, সে বিস্ময়, ব্যক্তিগত সে উপলব্ধি একমাত্র সে-ই ভালো জানে।

কিন্তু জিজ্ঞাসার শেষ হয় না। পৃথিবীর অসীম রহস্যের কতটুকু জানতে পেরেছে মানুষ? বাতাস কেন প্রবাহিত হয়? গাছের পাতার রং সবুজ কেন?-এসব প্রশ্নের উত্তর বিজ্ঞান হয়তো পেয়েছে। কিন্তু চাঁদের দিকে তাকালে মন ভালো হওয়ার কী হেতু!-এসব কি জানা যায়? এসব ভাবনারাজি; জীবনানন্দীয় ঘোরই অনুভবের চেষ্টা করছি, পথ হাঁটছি জীবনানন্দের সাথে। ‘আট বছর আগের একদিন’ কবিতাটির পাঠান্তে আমার মনে হয়-
‘জোনাকির ভিড় এসে সোনালি ফুলের স্নিগ্ধ ঝাঁকে’ আমাকে জীবন-মৃত্যুর মাঝখানে অনাদিকাল ঝুলিয়ে রেখেছে। পৃথিবীর সব বিস্ময়ের বিস্ময় তখন বাধা পড়ে-অসাধ্যের ফাঁদে। ‘বুড়ি চাঁদ’ ‘বেনোজলে ভেসে’ গেলেও জগতের ‘তুমুল গাঢ় সমাচার’ আদৌ কি জানা যায়? যারা গবেষক তারা হয়তো ‘বিষণ্ন-অবসরে অবসন্নতার ক্লান্তি বইতে গিয়ে হেমন্তের রোদের ঘ্রাণমোছা বিকেলকে অসহ্য মনে করতেই পারে’ কিন্তু পাঠক হিসেবে জীবনানন্দ যে ‘বোধ’ ভেতরে ছুড়ে দেয় তা এক সময় অবোধ্য-অনাবিষ্কৃতই থেকে যায়।

জীবনানন্দের কবিতা পুনপাঠে-
‘আরো-এক বিপন্ন বিস্ময়/আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে/খেলা করে;/আমাদের ক্লান্ত করে/ক্লান্ত-ক্লান্ত করে;/জানি-তবু জানি/নারীর হৃদয়-প্রেম-শিশু-গৃহ-নয় সবখানি;/ অর্থ নয়, কীর্তি নয়, সচ্ছলতা নয়-’

এভাবে কেউ ‘জীবনের প্রচুর ভাঁড়ার’ ‘শূন্য ক’রে চলে’ গেলেও; জীবনানন্দ দাশ ও তার সৃষ্টি পাশ কাটিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। আবারও নতুন জীবনের সন্ধানে, আলোহীন মাঠে একাকী হাঁটার স্বপ্নে মশগুল হই। রাত্রি আর নক্ষত্রের মাঝখানে জীবনকে উপলব্ধি করতে চাই, জীবনানন্দ দাশ সঙ্গী হন, জ্ঞাতসারে।