নীল রমণীর প্রেম

ঢাকা, শনিবার, ২৩ নভেম্বর ২০১৯ | ৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

নীল রমণীর প্রেম

রকিবুল হাসান ৩:০২ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১১, ২০১৯

print
নীল রমণীর প্রেম

(গত সংখ্যার পর)
ইন্টারকমে শ্যামা চৌধুরীর ডাক পড়ে মিঠু মাহমুদের রুমে। শ্যামা দ্রুত ঠোঁটে লিপস্টিক নেন, নিজেকে সুন্দর করে সাজিয়ে নেন, চুলগুলোতে একটু ফ্যাশন করেন। মুখে হাসি মেখে, মিঠু মাহমুদের রুমে ঢোকেন। তিনি তখন কম্পিউটারে কাজ করছিলেন। কম্পিউটারে কাজ করতে করতেই বললেন, ফাইলের কী অবস্থা?

স্যার প্রায় শেষের দিকে, শিগগিরই হয়ে যাবে। বলেই ভাবে, লোকটা কি মানুষ! এত সুন্দর করে সেজেগুজে আসলাম। চোখ তুলেও তাকাল না। ঘরে গিয়ে মনে হয় লোকটা বউয়ের দিকেও তাকায় না। ভাবনা শেষ না হতেই মিঠু মাহমুদ বললেন, কাজের প্রতি আপনার আগ্রহ বা দায়িত্ব- দুটোর কোনোটাই দেখি না। সব সময় আপনার একই কথা, শেষের দিকে স্যার, হয়ে যাবে। এই শেষ আপনার কবে হবে বলুন তো। যান। ফাইলটা তাড়াতাড়ি রেডি করে নিয়ে আসেন।

শ্যামা রুম থেকে রাগে গজগজ করতে করতে নিজের রুমে এসে ঠাস করে চেয়ারে বসে বলেন, লোকটা একদম বাজে। অভদ্র! বসতে পর্যন্ত বলে না। আরে আমি তো দেখতে অত অসুন্দর না। বহু রূপসীর থেকে আমি অনেক বেশি রূপসী আছি। আমার দিকে এখনো কতজন হাঁ করে থাকে। কতজন এখনো আমার ঘর ভেঙে আমাকে ঘরে নেওয়ার জন্য একপায়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমারও তো স্বামী আছে। সেও তো পুরুষ মানুষ। আমার রূপের কাছে সে তো ভেড়া হয়ে থাকে। আর উনি কী এক স্যার হয়েছেন! পিডি স্যার! পৃথিবীতে আর কেউ যেন পিডি স্যার হননি! মনে হয় উনিই শুধু হয়েছেন! ক্লিনটন যে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ছিলেন, সেও তো লিউনিস্কিকে আদর করত। আর আমার পিডি স্যার যেন ক্লিনটনের থেকেও বড়! আমাকে তার মনেই ধরে না। আমি কি লিউনিস্কির চেয়ে কম! কোন রূপসী তার মনে ধরেন! তিনি কী মনে করেন, আমাকে মনে ধরবে না, আর আমি তার হুকুমমতো কাজ করব! বললেই কাজ করে দেব! আমার রূপের রশিতে তাকে বেঁধে ভেড়া না বানানো পর্যন্ত আমিও ছাড়ছি না। অফিসের কাজেরও বারোটা বাজিয়ে, তার বসগিরি ছোটাব, তারপর যদি ছাড়ি।

বাসায় খুবই মনখারাপ শ্যামা চৌধুরীর। সোফায় বসে আনমনে টিভি দেখতে দেখতে স্বামীকে বললেন, আমার শরীর ভালো লাগছে না। তুমি বাইরে থেকে খাবার নিয়ে আসো। রাত অনেক গড়িয়ে গেছে। স্বামী খাবারের কথা বলতেই, বললেন, আমার খিদে নেই। তুমি খেয়ে শুয়ে পড়। শ্যামা চৌধুরীর স্বামী কোনো কথা না বাড়িয়ে একা খেয়ে বিছানায় গিয়ে শোয়। ঘরের দিকে তাকিয়ে বিরক্ত স্বরে বিড়বিড় করে বলে, আস্ত একটা ভেড়া। পিডি স্যার কত সুন্দর! সারাদিন অত সুন্দর স্যারকে দেখে, রাতে এই ভেড়ার কাছে কে শুতে চায়! কেমন যেন ঘিনঘিন লাগে শ্যামার। রাত ক্রমেই গাঢ় হতে থাকে, কী ভেবে সব লাইট বন্ধ করে অন্ধকার ড্রয়িং রুমে বসে মনে মনে বলে, পিডি স্যার, আমি আপনাকে সহজে ছাড়ব না। আমার রূপের আঁচলে আপনাকে আমি বাঁধবোই।

শ্যামা চৌধুরী অফিসে বসে অনেকক্ষণ ফাইলগুলো নাড়তে থাকেন। একটা একটা পাতা উল্টাতে থাকেন। রিপোর্ট তৈরি করার কথা ভাবেন। আবার অমনি রেখে দেন। কম্পিউটারে সালমান শাহ-শাবনূরের সিনেমা দেখতে থাকেন। মোবাইল নিয়ে স্বামীকে ফোন করে ঝাড়ি দিতে থাকেন। বাসায় তাড়াতাড়ি গিয়ে রান্না করার হুকুম দেন। আবার হুট করে ভাবেন, আচ্ছা, অনেকক্ষণ হয়ে গেল স্যার আমাকে ডাকছেন না কেন? পিয়নকে ডেকে বললেন, স্যার রুমে নেই?

পিয়নের ছোট্ট উত্তর- আছেন তো।

শ্যামা চৌধুরী আর কিছু না বলে মনে মনে ভাবেন, যতই আপনি আমাকে গুরুত্ব না দেন, এক সময় আপনাকে আমার এই রূপ দিয়েই জখম করব। তাতেও যদি আপনার হুস না হয়, তাহলে এই রূপের ফণাতেই আপনাকে নীলবিষে খতম করে দেব। যদি আপনি পুরুষ মানুষ হন, আপনার গায়ে যদি মনুষ্য রক্ত থাকে, আপনার গায়ে আমি আগুন ধরাবই। শ্যামা রুমে ঢুকতেই স্যার তার দিকে তাকিয়ে কিছু একটা ভেবে বসতে বললেন। শ্যামা ভাবেন, তাহলে আজ একটু হলেও মনে ধরেছে।

মিঠু মাহমুদ বললেন, শ্যামা, রিপোর্টটা সাবমিট না করলে আমরা তো বিলটা সাবমিট করতে পারছি না। একটা রিপোর্ট তৈরি করতে একদিন দু’দিন লাগতে পারে, দশদিন পনের দিন তো লাগতে পারে না। আমি আপনাকে নিয়ে খুবই হতাশ।

শ্যামা চৌধুরী কী উত্তর দেবেন বুঝতে পারেন না। হুট করে মনগড়া উত্তর দেন, আসলে কিছুদিন ধরে আমার বাসায় ঝামেলা চলছে। মানসিকভাবে আমি ঠিক নেই। আমার হাজবেন্ড তার অফিসের এক মেয়ের সঙ্গে পরকীয়া করছেন। দাম্পত্য জীবন বলতে যা বোঝায়, আমার আসলে এখন আর তা নেই। সমাজ দেখানো একটা সংসার করছি আর কী! বিবাহিত হয়েও অবিবাহিতের মতোই জীবন কাটাচ্ছি। এক ছাদের নিচে ঘুমালেও আমাদের মাঝে হাজার মাইল দূরত্ব। সরি স্যার, ব্যক্তিগত কথা বলে ফেললাম। কিছু মনে করবেন না।

পিডি স্যার এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করলেন না। কোনো আগ্রহও দেখালেন না। পিডি স্যারের সামনে নিজের চোখ মুছলেন শ্যামা চৌধুরী। চোখের কোণে পানি ছিল কি-না তিনি নিজেও জানেন না। স্যারকে দেখানোই ছিল আসল।

ঠিক আছে আপনি রুমে যান। রিপোর্টটা তৈরি করে ফেলুন।

শ্যামা অনেক খুশি। রুমে গিয়ে মন ভরে এক কাপ চা খান। ফাইলগুলো নাড়েন। কিন্তু রিপোর্টে তার মন বসে না। কম্পিউটারে গান শুনেন, নাটক দেখে সময় পার করেন। শ্যামা অফিস থেকে বের হয়ে একটু পরেই স্যারকে ফোন দেন, স্যার আপনি কি অফিস থেকে বের হয়েছেন?

হ্যাঁ, আমি তো পথে।
স্যার, আপনি কোথায়?
গুলশান এক নম্বরে।

স্যার, আমি তো দুই নম্বরে। আমি তো এখানে কোনো ট্রান্সপোর্ট পাচ্ছি না। আমাকে আপনার গাড়িতে একটু লিভ দেবেন?
-সরি শ্যামা। আমার এখানে একটা জরুরি মিটিং আছে।
-ওকে স্যার। আপনি বললে আমি অপেক্ষা করতে পারি। স্যার একটা কথা বলব?
-বলুন।
-আমার মনটা আজ অনেক খারাপ। আপনি যদি আমাকে একটু সময় দিতেন। কিছুটা সময় যদি আপনার সঙ্গে কাটাতে পারতাম। হাতিরঝিল তো পাশেই। সারাদিন তো আপনার সঙ্গেই থাকি। এটুকু যদি আপনি আমাকে না বোঝেন, পাশে না থাকেন, কার কাছে যাব, কার কাছে নিজের কষ্টের কথা বলব। আপনি অনেক বড় বস হলেও মানুষ তো। একজন ভালো মানুষ আপনি। অফিসের বাইরে আমরা তো ভালো বন্ধুও হতে পারি।

-দেখুন শ্যামা, আমি এ ধরনের আচরণ পছন্দ করি না। অফিসের বাইরে সহকর্মীর সঙ্গে কোনো সম্পর্ক আমি অপছন্দ করি। আপনি ভুল বলছেন এবং ভুল করছেন। রাখছি।

শ্যামা চৌধুরীর মনে হলো নিজেই নিজের গালে কষে একটা চড় মারে। বিন্দুমাত্র ভদ্রতা জানেন না লোকটা। একটা সুন্দরী মেয়ের এমন আবেদন যে পুরুষমানুষ বিন্দুমাত্র চিন্তা না করে উপেক্ষা করে, সেকি আসলেই পুরুষ! নাকি বীর্যহীন পুরুষের একটা অবয়বমাত্র! সেধেপড়ে একটা মেয়ে তার কাছে ফুলের মতো খসে পড়তে চাইছে, আর তিনি কী যে ভাবেন! নিজেকে মহাপুরুষ মনে করেন! মহাপুরুষের রক্তেও তো আগুনের ঝাঁপটা থাকে। এ কেমন মহাপুরুষ! মন নেই, আবেগ-কামনা কিছুই নেই। একটা মরাগাঙ যেন মহাপুরুষের ভান ধরে পড়ে আছে।

ইদানীং পিডি স্যার না ডাকলেও কোনো না কোনো অজুহাতে সকালেই তার রুমে যান শ্যামা চৌধুরী। কিন্তু পিডি স্যার সেই আগের মতোই। কোনো পরিবর্তন নেই। লোকটা যেন রোবট। অফিসের কাজের বাইরে আর কিছুই যেন নেই তার মস্তিষ্কে। ছুটি নিতেও ইচ্ছে করে না। পিডি স্যারের কাছে কাছে থাকতেই ভালো লাগে। তারপরও ইচ্ছে করেই অসুস্থতার কথা বলে দুদিনের ছুটি নিলেন শ্যামা। ছুটির দ্বিতীয় দিনে বেলা ১১টার দিকে স্যারকে ফোন দেন শ্যামা।

স্যার, আমার একটা ছোট্ট রিকোয়েস্ট আছে।
-বলুন কী রিকোয়েস্ট?
-আগে বলুন রাখবেন কি-না?
-আমি ব্যস্ত আছি, যা বলার দ্রুত বলুন।
-স্যার আপনি এভাবে কথা বলেন কেন? আমাকে আপনি একচক্ষেও দেখতে পারেন না। -দেখুন শ্যামা, আমি অনেক ব্যস্ত। আর আপনি তো অসুস্থ। -না, আমি অসুস্থ না। অসুস্থতা বলে ছুটি নিয়েছি। -কী বলছেন এসব! অফিসে এত কাজ আর আপনি মিথ্যে বলে ছুটি নিয়েছেন! এটা ঠিক করেননি।
-শুনুন, ঠিক-বেঠিক জানি না। আমার একটা রিকোয়েস্ট আছে, বলেছি। আপনাকে রাখতে হবে। আজ দুপুরে আমার বাসায় আসবেন।
-মানে?
-মানে কিছুই না। আমি নিজে আপনার জন্য রান্না করছি। আপনাকে তো আমি কোনোদিন বাসায় আসার জন্য রিকোয়েস্ট করিনি। এই প্রথম। আশা করি আপনি আমার কথা রাখবেন।
-সরি। আপনার অনুরোধ রাখতে পারছি না। আমি জানতাম আপনি এই কথাই বলবেন। তারপরও আমি চাই আপনি আজ আমার রিকোয়েস্ট ফেলবেন না। আমার হাজবেন্ড বাসাতে নেই। ও সকালে চিটাগং গিয়েছে। বাসাতে আমি একা। আপনি আসুন প্লিজ। আপনার জন্য অনেক সারপ্রাইজ আছে।
-আপনার বাসায় আসতে পারলে ভালো লাগত। কিন্তু আমি সত্যিই দুঃখিত, আপনার রিকোয়েস্ট রাখতে পারছি না।
-আপনি কখনো গোলাপের ফুটে ওঠা কাছ থেকে দেখেছেন? দেখেন নি। আসুন, আমি নিজে আপনাকে আজ দেখাব। আপনি মুগ্ধ না হয়ে পারবেনই না।
-দেখুন, আমি আপনাকে একজন সহকর্মী হিসেবে সম্মান করি। কিন্তু আপনার কথা, আপনার আচরণ, আমার কাছে শোভন মনে হচ্ছে না। আমি সত্যি দুঃখিত।
স্যার, আমি যা চাই তা পেয়েই ছাড়ি। আর যদি না পাই তা ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলি। আপনাকে যেদিন প্রথম দেখেছি, সেদিন থেকেই আমি আপনার জন্য পাগল হয়ে গেছি। সেদিন থেকেই আমার ঘর ভালো লাগে না, আমার স্বামী ভালো লাগে না। অফিসে যতসময় থাকি, মনে হয় এইতো আমার শান্তি, কারণ এখানে আপনি আছেন। কিন্তু এখানে দোজখও আছে, অন্য কোনো মেয়ে আপনার রুমে ঢুকলে আমার সারাশরীরে কেউ যেন এসিড ঢেলে দেয়। তখন আমার মনের ভেতর বেপরোয়া ঝড় বয়ে যায়।
-শুনুন, অনেক সীমা লঙ্ঘন করেছেন। রাখছি।
শ্যামা চৌধুরী আবার ফোন দেন। একবার দুবার অনেকবার। মিঠু মাহমুদ বিরক্ত হয়ে ফোন রিসিভ করে বললেন, আপনি ভুল করছেন। আপনাকে আমি একজন সহকর্মী ছাড়া আর কিছুই ভাবি না। অফিসের জরুরি কাজ ছাড়া আমাকে ফোন দেবেন না।
শ্যামা চৌধুরী ফোনটা বিছানার এক পাশে ফেলে রাখে। ভাবে, এভাবে নিজেকে সমর্পণ করে ব্যর্থ হয়ে, আগামীকাল অফিসে কীভাবে যাব! কীভাবে পিডি স্যারের সামনে যাব! নিজের কাছে নিজের এত বড় অপমান! এত বড় পরাজয়! আমিও ছাড়ব না। কারণ স্যারের উপরও স্যার আছেন।


(চলবে)