সব্যসাচী এক গল্পকার

ঢাকা, শুক্রবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৯ | ৩ কার্তিক ১৪২৬

সব্যসাচী এক গল্পকার

কাজল রশীদ শাহীন ২:৩৫ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ০৪, ২০১৯

print
সব্যসাচী এক গল্পকার

বাংলা সাহিত্য দুজনকে দিয়েছে সব্যসাচীর শিরোপা। সৈয়দ শামসুল হক ‘সব্যসাচী’ হিসেবে নিজেকে করেন এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত যে, অন্যজনের ‘সব্যসাচী’ তকমা লুপ্ত ও বিস্মৃতপ্রায়। তাঁর প্রতিভা ও সৃজনতরঙ্গ আজও অনিবার্য ও প্রশ্নাতীত। তিনি হলেন বুদ্ধদেব বসু। জীবনীকাররাও তাঁকে সব্যসাচী বললেও সেটা মৃদু ও অনুচ্চারিত। কিন্তু সৈয়দ হকের সব্যসাচী তকমা উচ্চারিত হয় প্রবলভাবে পঞ্চমুখে। সব্যসাচীর বৈয়াকরণিক সংজ্ঞা হলো, যার দুই হাত সমানভাবে চলে বা যিনি দুই হাতে কাজ করতে পারদর্শী। সাহিত্যে তাঁকেই সব্যসাচী বলা হয় যিনি সাহিত্যের একাধিক শাখায় সৃজন-অবদান রাখেন। বাংলা সাহিত্যকে নানান শাখা-প্রশাখায় ঋদ্ধ করতে বর্ণময় অবদান রেখেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছাড়াও আরও কয়েকজন। কিন্তু তাঁরা প্রত্যেকে পাননি সব্যসাচী’র উষ্ণীষ।

সাহিত্যের রাজনীতি এক্ষেত্রে ক্রীড়নকের ভূমিকা রাখে, নাকি পাঠক-সমালোচক আর মিডিয়ায় এখানে সর্বেসেবা। সৈয়দ হক একাধিক সাক্ষাৎকারে এই ভাষ্য হাজির করেছেন যে, সব্যসাচী বিশেষণ তার না পছন্দ ও প্রিয়। কবে কোথায়, কখন, কীভাবে, কাদের দৌলতে এই শব্দটা তার নামের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তাও তিনি জানেন না বা জানলেও করেননি খোলাসা। এসব আমরা যখন করি পাঠ কিংবা অন্তর্জাল ও অডিও-ভিডিওর কল্যাণে কি শ্রবণ-দর্শন, তখন উঁকিঝুঁকি দিয়ে যায় দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ। এন্তার ভাবনা তখন নিউরনে করে বিস্তার।

আমরা লক্ষ্য করি, বিশেষণ নিয়ে তার না থাকলেও হেলদোল তিনি তাকে (বিশেষণকে) দিয়েছেন সবিশেষ সমীহ ও মর্যাদা। প্রতিনিয়ত ওই তিলককে রেখেছেন সমুন্নত, সংঘবদ্ধ ও সৃজনউন্মুখ। এমনকি শেষশয্যা নেওয়ার সায়াহ্নক্ষণেও তিনি ওই ব্রতের ঘটাননি চিলতে পরিমাণ ব্যত্যয়। সৈয়দ হকের সব্যসাচী অভিধা এ কারণেই পেয়েছে পূর্ণতা, প্রাতিষ্ঠানিকতা ও স্বকীয় প্রজ্বলতা। প্রশ্ন হলো, যে অভিধা তার ছিল না খুব বেশি পছন্দ; সেই অভিধাকেই কেন তিনি দিলেন শরীর-মন ও হৃদয়ের সবটুকু ভালোবাসা, প্রেম ও প্রতীতি। তাহলে কি তিনি নিয়েছিলেন ডবল স্ট্যান্ডার্ড? না মোটেই, না কক্ষণই।

লেখালেখির প্রতি তার প্রেম ও প্রত্যয় কখনোই বলে না এমনটা। সৈয়দ হকের সৃজন ও কর্মের মধ্যেই খুঁজে ফিরতে হবে এই প্রশ্নের উত্তর। এজন্য প্রয়োজন বিশদ পরিসরও গবেষণা। আলোচ্য লেখায় আমরা দেখে নেব এ প্রশ্নের শুধু ভূমিকা মুখটুকু। কারণ ভূমিকার করার মতো স্থান কোথায়, সম্পাদকের বরাদ্দ-ভূমে। এ যেন, ‘ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই, ছোট সে তরী, আমারই সোনার ধানে গিয়েছে ভরি’। হায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর! সব্যসাচী নিয়ে উন্নাসিকতা কিংবা উপেক্ষার নেপথ্যে এই শানে নজুলও থাকতে পারে হাজির। সব্যসাচী তো বুদ্ধদেব বসুকেও বলা হয়। আবার তাদের নামের সঙ্গে এ তকমা যুক্ত না থাকলেও তাদের সৃজন সুরতে তো সব্যসাচীর সব বৈশিষ্ট্য ও বিশিষ্টতা নয় অনুপস্থিত। ধরা যাক, আবদুল মান্নান সৈয়দের কথা, কিংবা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। এরা কি নয় সব্যসাচী? হয়তো এঁরা হকের মতো নয় বর্ণিল ও বহুমুখিতায় ঋদ্ধ। কিন্তু বৈয়াকরণিক নিশ্চয় এঁদেরকে ‘সব্যসাচী’ থেকে পারবে না করতে পৃথক। সৈয়দ হকের মতো এঁরা সব্যসাচী হলেও, হক একেবারে স্বাতন্ত্রিক। কেন, সেই প্রশ্নের উত্তর তালাশেই এত গৌরচন্দ্রিকা ও ভণিতার কসরত।

সৈয়দ হক, তাদের মতো সব্যসাচী লেখক এ কথা যেমন সত্য, শিল্পের ইন্টারপ্রিটেশন (নবব্যাখ্যা) বলছে তিনি যতটা সব্যসাচী লেখক তার চেয়ে অধিক ‘সব্যসাচী’ গল্পকার। বিশেষণ, ব্যাখ্যা, সিদ্ধান্ত ও উপসংহার- যেভাবেই হোক না টানা, হকের সৃজন গন্তব্য ছিল এই সত্যের প্রতি। তিনি মূলত একজন ‘সব্যসাচী’ গল্পকারই হতে চেয়েছিলেন, এবং শেষাবধি হয়েছেন, সফলভাবে হয়েছেন।

রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলতে হয়, ‘মধ্যাহ্ন সূর্যের কোনো সঙ্গী থাকে না।’ সব্যসাচী গল্পকার হওয়ার মধ্য দিয়ে সৈয়দ হক বাংলা সাহিত্য তো বটেই, বিশ্বসাহিত্যেও স্থাপন করেছেন অবিস্মরণীয়, অভূতপূর্ব এক দৃষ্টান্ত। যদিও বিশ্বসাহিত্যের বিস্তৃত ও বিশাল ভুবনের সবটা সম্পর্কে আমরা নয় ততট ওয়াকিবহাল। তারপরও জানা ও সন্ধিৎসু অভিপ্রায় থেকে এ কথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, সব্যসাচী এক গল্পকারকে সাহিত্যের ভূগোল পেয়েছে প্রথমবারের মতো।

‘সৈয়দ হক একজন সব্যসাচী গল্পকার।’ এই বাক্যবন্ধ কি বেমক্কা শোনাচ্ছে? ঠাহর করতে হচ্ছে কষ্ট? ভাবছেন গল্পকার আবার সব্যসাচী হয় কীভাবে? না এখন পর্যন্ত তাফসিরে হয়নি কোনোপ্রকার গোলমাল কিংবা চাপান-উতোর। সৈয়দ শামসুল হক সব্যসাচী লেখক, বলা হয় এমনটাই-উচ্চারিত হয় এন্তার। এ নিয়ে কোনো তর্ক-বিতর্ক কিংবা কুতর্ক কোনোটাই হাজির হয়নি আজোবধি। অথচ তার লেখা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিস্তার করা হয়েছে বিতর্কের ফাঁদ। খেলারাম খেলে যা, আমাদের সাহিত্যের স্থানবিশেষে কয়েক দশক ধরে সর্বাধিক উচ্চারিত অনুষঙ্গ।

সৈয়দ হকের স্বতন্ত্র ও আভিজাত্য হলো, তিনি কারও দেখানো পথেই হাঁটেননি। তিনি নতুন পথ করেছেন রচনা। তিনি এক স্বরের মধ্যে বহুস্বরকে যতটা হাজির করেছেন, তার চেয়ে অধিক করেছেন বহুস্বরকে বিস্তৃত ও বহুধাবিভক্ত। এখানেই তিনি সবার থেকে আলাদা ও অভিনব সৃজন কারিগর। তার কয়েকটি সিগনেচার লেখা হাজির করলেই স্পষ্ট হবে আমাদের এই অনুসন্ধান। জীবনানন্দ দাশের সিগনেচার রাইটিংস বললে আমরা একবাক্যে যেমন বলে দিতে পারি বনলতা সেনের কথা। কিংবা কাজী নজরুল ইসলামের ক্ষেত্রে বিদ্রোহী। সৈয়দ শামসুল হকের ক্ষেত্রে এভাবে বলাটা দুরূহ। কারণ একটি নয়, বিভিন্ন মাধ্যমের একাধিক লেখা তার সিগনেচার রাইটিংস হয়ে উঠেছে। কবিতার ক্ষেত্রে পরানের গহীন ভিতর পঙ্ক্তিমালাকে আমরা এই মর্যাদা দিতে পারি।

পরানের গহীন ভিতর-১
জামার ভিতর থিকা যাদুমন্ত্রে বারায় ডাহুক,
চুলের ভিতর থিকা আকবর বাদশার মোহর,
মানুষ বেকুব চুপ, হাটবারে সকলে দেখুক
কেমন মোচড় দিয়া টাকা নিয়া যায় বাজিকর।
চক্ষের ভিতর থিকা সোহাগের পাখিরে উড়াও,
বুকের ভিতর থিকা পিরীতের পূর্ণিমার চান,
নিজেই তাজ্জব তুমি-একদিকে যাইবার চাও
অথচ আরেক দিকে খুব জোরে দেয়া কেউ টান।
সে তোমার পাওনার এতটুকু পরোয়া করে না,
খেলা যে দেখায় তার দ্যাখানের ইচ্ছায় দেখায়,
ডাহুক উড়ায়া দিয়া তারপর আবার ধরে না,
সোনার মোহর তার পড়ে থাকে পথের ধুলায়।
এ বড় দারুণ বাজি, তারে কই বড় বাজিকর
যে তার রুমাল নাড়ে পরানের গহীন ভিতর।

এ কাব্যগ্রন্থের কবিতাবলীর বাইরেও তার ‘আমার পরিচয়’ কবিতাটি বহুল পঠিত। কবিতার ক্ষেত্রে এই কবিতাটি জনপ্রিয়তার স্রোতে ভেসে একসময় তার সিগনেচার পয়েমে রূপ নিলে চমকের কিছু থাকবে না। কারণ জনপ্রিয়তার বিস্তারি ক্ষমতা তাকে কখনো কখনো স্থায়িত্বও দেয়। সৈয়দ হক অনেক অনেক মানসম্পন্ন শিল্পানুগ কাব্যচর্চা করলেও শুধু বক্তব্যধর্মিতাগুণে এই কবিতাটি আমপাঠকের কাছে পৌঁছে গেছে, আবৃত্তিকাররা লুফে নিয়েছে। দেশাত্মবোধ ও দেশপ্রেমের এক দলিলে পরিগণিত হয়েছে আমার পরিচয়। সৈয়দ হক সব্যসাচী এক গল্পকার এই ডিসকোর্সকে বোঝা ও উপলব্ধির ক্ষেত্রে কবিতাটি তুলনামূলকভাবে অপরিহার্য।

সৈয়দ হকের সবচেয়ে বড়ো পরিচয় তিনি বাংলা সাহিত্যের সার্থক কাব্যনাট্যের রচয়িতা। কাব্যনাট্যের জাদুকরও বলা হয় তাকে। কাব্যনাটকের ক্ষেত্রে তার সিগনেচার রাটিংসের প্রসঙ্গ উত্থাপিত হলেই জোড়া নাটক এসে হাজির হয়। পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় আর নুরলদীনের সারা জীবন। দুটো নাটকই প্রবল জনপ্রিয়, মঞ্চসফল।
তার কাব্যনাটকের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, এর পাঠযোগ্যতা। আমাদের এখন অনেক মঞ্চসফল নাটক রয়েছে, যার পঠনক্ষমতা নেই। মঞ্চেই তার বিশিষ্টতা, রিডিংরুমে নয়। কিন্তু সৈয়দ হকের ঝাঁকের কাই হয়ে ঝাঁকে গিয়ে মিশেননি। তিনি উল্টো গ্রোতে উজানে তরী বয়েছেন এবং প্রবলভাবে হয়েছেন সফল ও সার্থক। তার সিগনেচার কাব্যনাট্য থেকে দেখে নেব কতিপয় সংলাপ।

পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়
আমার কি আছে? গ্যাছে সুক/ য্যান কেউ নিয়া গ্যাছে গাভীনের বাঁটে যতটুক/ দুধ আছে নিষ্ঠুর দোহন দিয়া। সুখ নাই এখন সংসারে /দুঃখেরও শক্তি নাই দুঃখ দেয় আবার আমারে /যেমন বিষের লতা, তারও জন্ম নাই কোনো নুনের পাহাড়ে।’
‘সন্ধ্যার আগেই য্যান ভর সন্ধ্যাবেলা/ কই যাই কি করি যে তার ঠিক নাই/ একদিক ছাড়া আর কোনো দিক নাই/ বাচ্চার খিদার মুখে শুকনা দুধ দিয়া/ খাড়া আছি খালি একজোড়া চক্ষু নিয়া’
সাধ্য নাই মুক্তিবাহিনীর/ এতটুকু কানা ভাঙ্গে রূপার কলসীর/ উড়া জাহাজের ঝাঁক ১০/২০/২৫ হাজার/ চক্কর দিতাছে তারা, যদি বোমা মারে একবার/ পিঁপড়ার মতো মারা যাবে মুক্তিবাহিনী তোমার।’
‘মানুষ আসতে আছে কালীপুর হাজীগঞ্জ থিকা... ক্রমান্বয়ে ফুলবাড়ী নাগেশ্বরী, যুমনার বানের লাহান’।
পায়ের আওয়াজ শুনি মাঠ হয়া পার শত শত হাজার হাজার/দৌড়ায় আসতে আছে এখানে।

সৈয়দ হকের নাট্য ভাবনা ও নাট্যরচনার নেপথ্যে ছোটগল্পের মতো চমকপ্রদ-কৌতূহলোদ্দীপক-বিস্ময় জাগানিয়া গল্প না থাকলেও আখ্যানটির রয়েছে পূর্বাপর এক বয়ান যা এখানে প্রাসঙ্গিকভাবেই উদ্ধরণ যোগ্য। তিনি লিখেছেন, ‘কাব্যনাট্যই শেষ পর্যন্ত আমার করোটিতে জয়ী হয়; টি এস এলিয়টের কাব্যনাট্য-ভাবনা আমাকে ক্রয় করে; আমি লক্ষ্য না করে পারি না যে আমাদের মাটির নাট্যবুদ্ধিতে কাব্য এবং সংগীতই হচ্ছে নাটকের স্বাভাবিক আশ্রয়; আরও লক্ষ করি, আমাদের শ্রমজীবী মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতাই হচ্ছে এক ধরনের কবিতাশ্রয়ী উপমা, চিত্রকল্প, রূপকল্প উচ্চারণ করা কথা, আমাদের রাজনৈতিক স্লোগানগুলো তো সম্পূর্ণভাবে ছন্দ ও মিলনির্ভর; লক্ষ্য করি, আমাদের সাধারণ প্রতিভা এই যে আমরা একটি ভাব প্রকাশের জন্য একই সঙ্গে একাধিক উপমা বা রূপকল্প ব্যবহার না করে তৃপ্ত হই না।

ময়মনসিংহ গীতিকা, যা বহুদিন থেকেই আমি নাটকের পাণ্ডুলিপি বলে শনাক্ত করে এসেছি, আমাকে অনুপ্রাণিত করে; একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে পঠিত ধ্রুপদী গ্রিক নাটক আমাকে আচ্ছন্ন করে রাখে; শেকসপিয়র, যাঁর নাটকের কথা বাবা অক্লান্তভাবে বলে যেতেন একদা, যা আমাকে এক তীব্র আলোকসম্পাতের ভেতর দাঁড় করিয়ে রাখে; এ অবস্থায় আমি, সত্তরের দশকের মাঝামাঝি, বিদেশ থেকে ছুটিতে দেশে ফিরে, ঢাকার প্রবল নাট্যতরঙ্গে ভেসে যাই এবং ফিরে গিয়ে রচনা করি ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ এক সংকীর্ণ ঘরে, টেবিলের অভাবে দেয়ালে পা ঠেকিয়ে হাঁটুর ওপর খাতা রেখে, অফিস যাতায়াতের পথে পাতাল রেলে মনে মনে; এই রচনাটি শেষ করে উঠবার পর মনে হয়, দীর্ঘদিন থেকে এরই জন্য তো আমি প্রস্তুত হচ্ছিলাম।’ (ভূমিকা, কাব্যনাট্য সমগ্র)।

বয়ানের আগে একটা গল্প অবশ্য আছে। আমাদের উদ্দেশ্য যেহেতু হকের গল্পের সৃজনশক্তি ও সম্ভাবনা আবিষ্কার-উন্মোচন ও নবব্যাখ্যা দাঁড় করানো, সেহেতু টুকরো গল্পগুলো জানা থাকলে আমাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে তা হবে সহায়ক। গল্পটা হলো-

সৈয়দ শামসুল হক মনে করতেন নাটকের সঙ্গে তার জীবনের শৈশবের একটা ঘটনা প্রভাবকের ভূমিকা পালন করেছে। বাল্যকালে টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়ে বেঁচে ওঠাকে নাট্যজগতে প্রবেশের বা নাটক রচনা করার কারণ বলে চিহ্নিত করেছেন। এবং এটাকে তিনি ‘নাটকের প্রথম দোলা’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। উল্লেখ্য, তার বাবা যৌবনে শখে নাটকে অভিনয় করেছিলেন। তিনি যৌবনে যাত্রাও করেছেন এবং মঞ্চস্থ করার প্রয়োজনে তিনি একটি নাটকও লিখেছিলেন।

স্পষ্টত যে, পিতৃস্নেহে ও সংস্পর্শে বাল্যকাল থেকেই তিনি নাটকের জন্য তৈরি হয়েছেন। নাট্যপ্রতিভা তার অনেক পর আলোর মুখ দেখলেও এর ভ্রুণ যে শৈশবে হয়েছে এবং ভেতরে ভেতরে তা পুষ্ট ও বর্ধিষ্ণু হয়েছে। মুনীর চৌধুরীর নাটকের মহড়া দেখেছেন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্য অধ্যয়নের সময়। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তাঁকে মুনীর চৌধুরী নিজে থেকেই বলেছিলেন, ‘তোমার হাতে নাটক হবে’।

সৈয়দ হকের ‘হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস, দম ফুরাইলে ফুঁস, তবুও তো ভাই কারও মনে নাইকো কোনো হুঁশ’ গানটিকে আমরা তার গানের ক্ষেত্রে প্রতিনিধিত্বশীল গান হিসেবে চিহ্নিত করতে পারি। অর্থাৎ এটিও তার একটি সিগনেচার রাইটিংস।

উপন্যাসের ক্ষেত্রে সমালোচিত হলেও ‘খেলারাম খেলে যা’ তার সিগেনেচার নভেল হওয়ার দাবি রাখে। যেখানে তিনি লিখেছেন, “বাবর কিছুতেই মনে করতে পারল না সেই ভদ্রলোকের নাম, যিনি লন্ডনের বিভিন্ন শৌচাগার আর দেয়ালের ছবি তুলে ‘দেয়াল লিখন’ নামের একটা অ্যালবাম বের করেছিলেন। তাতে কত রকম মন্তব্য!

রাজনৈতিক, ব্যক্তিগত, দাম্পত্য, যৌন-বিকার সম্পর্কিত কিই-বা বাদ গেছে। ও রকম একাকী জায়গায় মানুষ তার ভেতরের সত্তাটিকে বের করে আনে। গা শির শির করে। হাত নিশপিশ করে। লেখা হয়ে গেলে এমন একটা তৃপ্তি হয় যেন পরম আকাক্সিক্ষত কোনো গন্তব্যে পৌঁছানো গেছে। বাবর নিজেও তো এ রকম করেছে। দেয়ালে লিখেছে। একবার সেক্রেটারিয়েটের বাথরুমে গিয়ে দেখে ‘বাঞ্চোৎ’ লেখা। সিগারেট টানছিল বাবর। প্রথমে সিগারেটের ছাই দিয়ে চেষ্টা করল, কিন্তু লেখা গেল না। তখন চাবি দিয়ে সে ‘বাঞ্চোৎ’-এর পাশে একটা বিরাট প্রশ্নবোধক চিহ্ন আঁকল। নিচে লিখল-কে তুমি, না তোমার বাবা? আরেকবার এয়ারপোর্টের বাথরুমের দিকে কে যেন লিখে রেখেছে লাল পেনসিল দিয়ে বড় বড় হরফে-‘খেলারাম খেলে যা’। বাক্যটা আজ পর্যন্ত ভুলতে পারেনি বাবর। যে লিখেছে জগৎ সে চেনে। যে লিখেছে সে নিজে প্রতারিত। পৃথিবী সম্পর্কে তার একটি মন্তব্য বাথরুমের দেয়ালে সে উৎকীর্ণ করে রেখেছে ‘খেলারাম খেলে যা। কতদিন বাবর কানে স্পষ্ট শুনতে পেয়েছে কথাটা।’
গল্পের ক্ষেত্রে কোনটি হতে পারে তার সিগনেচার স্টোরি-তাস, রুটি ও গোলাপ, কবি, গাধা জোছনার পূর্বাপর, নাকি শীতবিকেল?

প্রবন্ধ, কলাম এবং অন্যান্য লেখালেখি মিলিয়ে কী, মার্জিনে মন্তব্য না, হৃৎকলমের টানে, নাকি কথা সামান্যই? মার্জিনে মন্তব্য’ই যথাযথ। সেখানে লেখালেখির নানা প্রসঙ্গ তিনি গল্পের আদলে হাজির করেছেন। আতকা না প্রাসঙ্গিকভাবেই, বিষয়ের পরম্পরা অক্ষুণ্ন রেখে। অনুবাদ সাহিত্যের ক্ষেত্রে তিনি তুলনারহিত। অবশ্য সর্বাগ্রে আসে ম্যাকবেথের নামে। শেকসপিয়র জনপ্রিয় ও মঞ্চোপযোগী করার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা যুগান্তকারী।

সৈয়দ হকের বিশাল সৃজনসম্ভারকে আমরা অবলোকন-বিশ্লেষণ-ব্যাখ্যা করলে তো বটেই, তার এই সিগনেচার রাইটিংসের আলোকে আমরা বলতে পারি, তিনি ছিলেন সব্যসাচী এক গল্পকার। তার গল্পসত্তা হাজির হয়েছে নানারূপে-নানাভাবে। অন্যেরা একস্বরের মধ্যে বহুস্বর খুঁজেছেন, একস্বরে বহুস্বর প্রতিস্থাপন করেছেন। তা তিনি সব্যসাচী হন কিংবা না হন। কিন্তু সৈয়দ হক একস্বরে বহুস্বর প্রতিস্থাপনের পাশাপাশি বহুস্বরে একস্বরকে প্রতিস্থাপন করেছেন। অর্থাৎ এককে তিনি এমনরূপে নির্মাণ করেছেন যে তা বহুর যোগ্য হয়ে উঠেছে। তার একের মধ্য দিয়ে বহুর মুক্তি ও নতুন সৃজন ঘটেছে।

সৈয়দ হকের এই এক হলো তার গল্পসত্তা। গল্পকার হক এতটাই শক্তিশালী, ক্ষমতাবান, বুদ্ধিদীপ্ত ও সমসাময়িক যে, কবিতা, নাটক, উপন্যাসে, গানে, প্রবন্ধ-কলামে গল্পকাররূপেই হাজির হয়েছেন। এ কারণে তার কবিতা, কবিতা হয়েও তা যেন গল্পেরই কবিতাভাষ্য।

তার কাব্যনাটকও তাই। সৈয়দ হকের করোটিতে এই ভাবনা যে উঁকি দিয়েছিল, বা এই সত্য হাজির ছিল তা তার গল্পপাঠে আমরা যেমন পাই, তেমনি শ্রেষ্ঠ গল্পের ভূমিকাতেও পাই। এর বাইরেও আরও বেশ কয়েকটি জায়গায় আমরা যখন এরকম শব্দ সন্ধানে হই কৌতূহলোদ্দীপক তখন তার সুপ্ত অভীপ্সাও আমাদের করে আলোড়িত।
হক, নিজেই তার গাধা জোছনার পূর্বাপর-র দুটো জায়গায় ‘গল্পপ্রবন্ধ’ শব্দ করেছেন চয়ন। এখন ‘গল্প যদি গল্পপ্রবন্ধ হয়, তাহলে প্রবন্ধও প্রবন্ধগল্প নয় কি? মার্জিনে মন্তব্য তো আমাদের তৃতীয় চক্ষুকে সেই তৃপ্তিতেই করে প্লাবিত ও বিলোড়িত। কাব্যনাটক নুরলদীনের সারাজীবন কিংবা পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়-এদের শরীর গল্প দ্বারা যেমন নির্মিত ও কাঠামোবদ্ধ ঠিক তেমনি সংলাপেও গল্প এসে হাজির হয় অলক্ষ্যে-সন্তর্পণে। এভাবে তার সকল রচনাতেই দৃষ্ট হয় ‘সব্যসাচী এক গল্পকার’র অমোঘ ও অনিন্দ্য এক সত্তা’।