নীল রমণীর প্রেম

ঢাকা, শুক্রবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৯ | ৩ কার্তিক ১৪২৬

নীল রমণীর প্রেম

রকিবুল হাসান ২:২১ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ০৪, ২০১৯

print
নীল রমণীর প্রেম

শ্যামা চৌধুরী যে কোনো মূল্যেই অফিসে নিজের ক্ষমতাকে প্রতিষ্ঠিত করতে চান। নিজের রূপের প্রতিও তার আস্থা কম নয়। তিনি জানেন তার শরীরী সৌন্দর্য দিয়ে সহজেই অনেক কিছু নিজের আয়ত্তে নিতে পারেন। তাছাড়া কথা বলার সময় বাংলা ইংরেজি মিশিয়ে একটা স্মার্টনেস দেখানোর ভাব আছে সবসময়। বানিয়ে গল্প সাজানোতে তার তুলনা নেই। অফিসের ভেতর সবসময় একটা অশান্তির লু হাওয়া বইয়ে দিতে তার মতো পারদর্শী পাওয়া কঠিন। তিনি খুব সাধারণ মাপের একজন অফিসার। কিন্তু তার ভাব তিনিই প্রধান। আগে অফিস চলেছে এভাবেই। আগের প্রজেক্ট ডিরেক্টর থাকতে তার বেশ দাপট ছিল। কিন্তু হুট করে তিনি চাকরি ছেড়ে আমেরিকায় চলে যাওয়ায়, নতুন প্রজেক্টর ডিরেক্টর হয়ে আসেন মিঠু মাহমুদ।

প্রজেক্ট ডিরেক্টর অফিসে সাধারণত পিডি স্যার নামেই পরিচিত। নতুন পিডি স্যারের সঙ্গে শ্যামা চৌধুরী এখন আর নতুন নন। দেখতে দেখতে বছর পার হয়ে গেছে। শ্যামা চৌধুরী শুরু থেকেই যেভাবে আগের পিডি স্যারের মতো এই পিডি স্যারকে নিজের আঁচলে বাঁধতে চেয়েছিলেন, তা হয়ে ওঠেনি। তার রূপের ঝলক আর আহ্লাদিমার্কা কথা কোনো কিছুই মুগ্ধ করেনি পিডি স্যারকে। অফিসে আগের মতো সেই দাপট এখন আর নেই শ্যামা চৌধুরীর। সে কারণে পিডি স্যারকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতে তার সব ধরনের চেষ্টা সবসময়ই সক্রিয়। নিজের ব্যর্থতায় পিডি স্যারের প্রতি তার ক্ষোভ-রাগ কম নয়। অভিমানও অনেক। ভেতরে ভেতরে পিডি স্যারের নামে দুর্নাম বদনাম রটাতেও তার বাধে না। এতে যদি পিডি স্যার তার কোনো সাহায্য বা সহযোগিতা চান। কিন্তু এসব দুর্নাম বদনামও তার গায়ে লাগে না।

কোনো কিছুতেই শ্যামা চৌধুরীকে তিনি বিশেষভাবে গুরুত্ব দেন না। সবার সঙ্গে পিডি স্যার একই রকম আচরণ করেন। যা একদম পছন্দ করেন না শ্যামা চৌধুরী। অফিসে পিডি স্যারের কাছে তিনি সবার থেকে আলাদা, বিশেষভাবে তাকে গুরুত্ব দেবে, এর জন্য তিনি কত কিছুই না করেন। কিন্তু তিনি কোনো কিছুতেই মিঠু মাহমুদের মন গলাতে পারেন না।

শ্যামা চৌধুরী অস্থিরচিত্তে নিজের শোবার ঘর থেকে বারান্দায় যান। গ্রিলে মুখ ঠেকিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকেন শ্যামা। রাতের নগরী হলেও আলোতে রাত যেন ঢেকে থাকে। মাথার ভেতর একই চিন্তা, পিডি স্যারকে কেন তিনি নিজের মতো করে নিতে পারছেন না! পিডি স্যার তার মাথায় এমনভাবে ঢুকেছেন, স্বামীর সঙ্গেও দিন দিন তার সম্পর্ক শীতল হয়ে গেছে। স্বামীর চেহারার জায়গায় পিডি স্যারের চেহারা ভাবেন। এরকম ভাবনাতেও তার অনেক ভালো লাগে। কিন্তু এসবের কোনো কিছুই পিডি স্যারকে বলতে পারেন না তিনি। এক অদ্ভুত যন্ত্রণা তাকে সারাক্ষণ সূচের মতো বিদ্ধ করতে থাকে।

সকালে অফিসে গিয়ে সেজেগুজে ফুলের ঘ্রাণ ছড়িয়ে পিডি স্যারের রুমে ঢোকেন। কিন্তু পিডি স্যার তার দিকে না তাকিয়েই এক সঙ্গে অনেক কাজ ধরিয়ে দিলেন। শ্যামার রাগ হয়। রাগ চেপে খুশি হওয়ার ভাব করেন। তিনি চান, পিডি স্যার আদর করে বসতে বলবেন, চা খেতে বলবেন। গল্প করবেন। ভালো লাগার একটা সুবাস ছড়াবে। কিন্তু এসবের কোনো বালাই নেই। অত সুন্দর চেহারার একজন পুরুষ মানুষের ব্যবহার যে এত অ-আন্তরিক ও নিরস হতে পারে, তা তার কল্পনাতেও ছিল না। সুন্দরী মেয়ে মানুষ দেখলে তো বস তো বস কত সাধক-সন্যাসী ধ্যান ভেঙে ফেলেন, ক্ষমতাধর কত রাজ-রাজারা সিংহাসন ছুড়ে ফেলেন, আর উনি যে কী একখান জিনিস!

শ্যামার ধারণা ছিল, তার সাজগোজ একসময় স্যারের চোখে নিশ্চয় ধরবে। কিন্তু সময় যতই গড়ায় স্যার একইরকম। ফলে প্রতিদিনই স্যারের রুম থেকে একগাদা কাজের ফিরিস্তি নিয়ে নিজের রুমে ঢুকেই টেবিলের ওপর কাগজগুলো আছড়ে মেরে মোবাইল ফোনটা হাতে নেন। স্বামীকে ফোন করেই ফুটন্ত কড়াইয়ের তেলের মতো বাক্য ছুড়তে থাকেন। তাতেও মনের জ্বালা মেটে না। পারলে মোবাইলই ভেঙে ফেলেন। ইউটিউবে সানি লিওনের ছবি দেখতে থাকেন। মনিটর এমনভাবে নিজের দিকে ঘুরিয়ে রাখেন, কেউ রুমে ঢুকলেও তার চোখ ছবির দিকে পড়বে না। কানে হেডফোন লাগিয়ে নেন।

হঠাৎ স্যারের ডাক পড়লেই মেজাজ খারাপ করে হেডফোন কান থেকে খুলে ঠাস করে টেবিলের ওপর রেখে দেন। জানেন, স্যারের ডাকে তো আদর-সোহাগের কোনো বালাই নেই, শুকনো নদীর মতো মুখ করে একগাদা কাজ ধরিয়ে দিয়েই বলবেন, রুমে যান, কাজগুলো দ্রুত শেষ করবেন। মনে মনে স্যারকে কতগুলো গালি দিয়ে কৃত্রিম হাসি দিয়ে স্যারের রুম থেকে বেরিয়ে আসেন শ্যামা। পিয়নকে ডেকে চা দিতে বলেন। পিয়ন চা দিতেই শ্যামা বললেন, আচ্ছা আমাদের পিডি স্যারের চরিত্র অনেক খারাপ তাই না!

-কী জানি ম্যাডাম।
-তুমি তো কিছুই জানো না। তুমি তো তার একনম্বর চামচা। যে কোনো কথা শুনেই তো স্যারকে বলে দাও। রাত্রি ম্যাডামের তো ঘরই ভেঙে গেল পিডি স্যারের জন্য। আর এখন নদী ম্যাডামের সঙ্গে যে লীলাখেলা করছেন, দেখো কী হয়!
-ম্যাডাম আপনি তো সব উল্টাপাল্টা বলতেছেন। রাত্রি ম্যাডামের তো বিয়েই হয়নি। এনগেজমেন্ট হয়েছে। আমাকে তো বলেছে। নদী ম্যাডামের সঙ্গে যে সম্পর্ক স্যারের, আপনার সঙ্গেও তো একই।
-আসলে তুমি একটা অন্ধ, বুঝছো। যাও। খালি তর্ক করতে পারো।
পিয়ন রুম থেকে বের হতে হতে আপন মনে বলে, আগের পিডি স্যারের সময় যা দেখাইছেন ম্যাডাম, এখন আর তা হচ্ছে না। এখন তো অফিসে কেউ আপনাকে এক পয়সাও দাম দেয় না। এ জন্য আপনার মাথামুণ্ড গেছে গা। কিসের ভেতর যে কী কথা কন!
মিঠু মাহমুদ অর্থাৎ পিডি স্যার ইন্টারকমে শ্যামার কাছে জানতে চান, গতকাল যে ফাইলটা রেডি করার কথা ছিল, সেটা হয়েছে কি-না!
শ্যামা জানান, স্যার করছি, প্রায় শেষের দিকে।
রেডি করে আমাকে দেখাবেন। বলেই লাইন কেটে দেন মিঠু মাহমুদ।

শ্যামা চৌধুরী ভাবেন, আচ্ছা, উনি তো আমাকে ডেকে নিয়ে সুন্দর করে কথাটা বলতে পারতেন। কী এক বুনোর সঙ্গে কাজ করছি রে বাবা! মনের ভেতরে রাগ জ্বলে ওঠে তার, মনে মনে বলেন, অর্ডার করলেই হলো! আসল কাজ বোঝার ক্ষমতা নেই, খালি আলতুফালতু কাজ দেওয়ার বেলায় আছেন। লোকটার গায়ে বোধহয় টিকটিকির রক্ত।

রুমে বসেই পিয়নকে ডেকে আচ্ছামতো একটা ঝাড়ি দেন শ্যামা চৌধুরী। বললেন, কী করো তুমি? তুমি তো কোনো কাজই করো না। কোথায় থাক? ডাকলে তো পাওয়াই যায় না। ভালোই চলছে অফিস, যেমন তোমার পিডি স্যার, তেমনি তুমিও। আর সবাই তো চলছে তেলের ওপর। পিডি স্যার তো তেলের ওপর ভাসছেন।

পিডি স্যারের কথা বলতেই পিয়ন জানতে চায় স্যার আবার কী করলেন ম্যাডাম? এটা আবার জিজ্ঞেস করো, দেখো না দুচোখ শকুনের মতো করে থাকেন! আমি তো তোমার অন্য ম্যাডামদের মতো না, বুঝছো। আমার একটা সম্মান আছে। আমার পরিবারের সম্মান আছে। আমি একটা আদর্শ নিয়ে থাকি। আমার টাকা-পয়সা তো কম নেই। আমার হাজবেন্ড একটা বড় চাকরি করেন। অনেক টাকা বেতন পান। বুঝছো! আমি নিয়মিত নামাজ পড়ি। অন্য ম্যাডামদের মতো আমি সস্তা না। এই পিডি স্যার একটা চরিত্রহীন লোক। তার সামনে যেতেই ইচ্ছে করে না। এরকম একটা চরিত্রহীন লোকের সঙ্গে কি কাজ করা যায়! আমার কথা কিছু বুঝতে পারছ? পারলে এখুনি গিয়েই তো বলে দিবা!

পিয়ন কোনো উত্তর না দিয়ে মনে মনে ভাবে, স্যার তো ম্যাডামের দিকে ফিরেও তাকায় না। স্যার কাজের কথা বললেই তো ম্যাডাম জ্বলে ওঠে। স্যারের রুমে যাওয়ার আগে তো মুখে স্নো-পাউডার কত কী মাখে। পিয়ন দুষ্টুমি বুদ্ধি করে মুখ কাচুমাচু করে ভয় ভয় ভাব করে বলে, ম্যাডাম, স্যার কি আপনারে খারাপ কিছু কইছে? আপনি সবসময় স্যারের পিছনে লেগে থাকেন!

পিয়নের কথাটা শ্যামার পছন্দ হয়। পিয়নের কথায় নিজেকে একটু ঠাণ্ডা করে নিয়ে বললেন, আরে তোমাকে তো সব কথা বলা যায় না। পিডি স্যার যে আমাকে কতদিন কত কথা বলেছে, তুমি তা চিন্তাও করতে পারবা না। আগের কথা বাদ দাও। গতকালের কথা শোনো, তবে এসব কথা আবার বাইরে বলো না। তুমি তো আবার তার এক নম্বর চামচা। তারপর আবার তোমার পেটের চামড়া পাতলা। আমাকে পিডি স্যার গোপনে এক সপ্তাহের জন্য মালয়েশিয়া নিয়ে যেতে চান।

পিয়ন ভাবে, স্যার একথা তাকে কোনোদিনই বলেননি। নিজের দাম বাড়ানোর জন্য এসব আমাকে শোনাচ্ছেন। পিয়ন বুদ্ধি করে বলল, ম্যাডাম, স্যার যেহেতু আপনাকে মালয়েশিয়া নিয়ে যেতে চাচ্ছেন, আপনি যান। গেলেই তো ভালো। আপনার দাম বেড়ে যাবে।

শ্যামা পিয়নের কথা শুনে কোনো উত্তর না দিয়ে মনে মনে বলেন, স্যার যদি সত্যি সত্যিই আমাকে মালয়েশিয়া নিয়ে যেতে চাইত, তাহলে কি আর তোমার মতো ভেড়াকে জানাতাম। হালকা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, শোনো, এসব আবার অফিসে কারো সঙ্গে শেয়ার করো না। রাত্রি আর নদী ম্যাডাম কিন্তু খুব খারাপ। এদের কোনো চরিত্র নেই। পিডি স্যারের সঙ্গে ওদের অন্যরকম সম্পর্ক আছে। আমি সব জানি। এসব ভুলেও কারোর সঙ্গে শেয়ার করো না। তোমাকে আমি অনেক বিশ্বাস করি। যাও। ভালো করে এক কাপ চা দাও। (চলবে)