জড় সেতু ও অসংখ্য প্রাণ

ঢাকা, রবিবার, ২০ অক্টোবর ২০১৯ | ৫ কার্তিক ১৪২৬

জড় সেতু ও অসংখ্য প্রাণ

মাসুদ রহমান ২:০৭ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৭, ২০১৯

print
জড় সেতু ও অসংখ্য প্রাণ

হার্ডিঞ্জ ব্রিজ দেবে যাচ্ছে- সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমে এমনই খবর এসেছে। রেলসেতুটি নাকি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কর্তৃপক্ষ উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমান সেতুটির স্থানেই একই দৈর্ঘ্যরে নতুন সেতু নির্মাণের। বহির্দেশে প্রকৌশলী-অপ্রকৌশলীর কাছে পরিকল্পনাটি প্রাথমিক ও তত্ত্বগতভাবে একটু বিস্ময় জাগাতে পারে। কুষ্টিয়া-পাবনা জেলার সীমান্তে পদ্মা নদীর ওপর নির্মিত এই সেতুর বয়স এখন একশ’ চার বছর। তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ব্রেইথওয়াইট অ্যান্ড কির্কের সঙ্গে একশ’ বছরের গ্যারান্টিতে চুক্তি হয়েছিল।

সে সময় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে সূর্য অস্ত যেত না। বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত উপনিবেশের মধ্যে পূর্ববঙ্গের প্রত্যন্ত এই অঞ্চলে একটি সেতুর জন্য এত উৎফুল্ল হওয়ার কারণ কী? রেল কর্তৃপক্ষের তখনকার ভাষ্যই শোনা যাক- “পদ্মানদী প্রায়ই গতি পরিবর্ত্তন করে ও অনেক সময়ে অন্তঃসলিলা রূপে প্রবাহিত হয়। এইরূপ চঞ্চল জলস্রোত পৃথিবীতে অতি অল্পই আছে। সুতরাং এই সেতু নির্ম্মাণ করিতে বিশেষ বুদ্ধিমত্তার প্রয়োজন হইয়াছিল। পদ্মার প্রবল স্রোতে স্তম্ভগুলি যাহাতে অবিচলিত থাকিতে পারে তজ্জন্য ইহাদের কোনো কোনটিকে নদীতল হইতে প্রায় ১৫০ ফুট নীচু হইতে গাঁথিয়া তোলা হইয়াছে। এই সেতু সংরক্ষণের জন্য পদ্মার উভয় তীর দিয়া প্রকাণ্ড পাথরের বাঁধ দিতে হইয়াছে এবং জল স্রোতের বেগ সংহত করিবার জন্য বহু পাশখাল খনন ও জলমধ্যে ‘পিরামিড’ নির্ম্মাণের প্রয়োজন হইয়াছে। ভারতের প্রধান প্রধান ইঞ্জিনিয়ারগণকে লইয়া গঠিত একটি সমিতির পরামর্শক্রমে এই সেতু সংরক্ষণ করা হয়। এই সেতুটি সমগ্র জগতের মধ্যে স্থপতিবিদ্যার একটি অপূর্ব্ব কীর্ত্তিস্বরূপ পরিগণিত।”

উদ্ধৃতিটি নেওয়া হয়েছে ১৯৪০ সালে পূর্ববঙ্গ রেলপথের প্রচার বিভাগ থেকে প্রকাশিত ‘বাংলায় ভ্রমণ’ নামক বিখ্যাত গ্রন্থ থেকে। তথ্যপূর্ণ হলেও বইটি কর্তৃপক্ষীয় প্রকাশনা; তাই ভাষায় প্রায় সর্বত্রই ছিল দাপ্তরিক বিশুষ্কতা। কিন্তু হার্ডিঞ্জ ব্রিজের প্রসঙ্গেই কাব্যিক বর্ণনা সহজেই চোখে পড়ে। রবীন্দ্র-কাব্যবাণী উদ্ধার করে পাঠককে প্রলুব্ধ করা হয়েছে ব্রিজের ওপর থেকে পদ্মার ‘অপূর্ব্ব ও অনির্ব্বচনীয়’ দৃশ্য দেখতে আসার জন্যে।

তো আমরা সরাসরি রবীন্দ্রনাথের কথায় আসতে পারি। এই ব্রিজকে বিষয় করে রবীন্দ্রনাথ কাব্যকথা লেখেননি। সেটা লিখেছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম; সে কথায় পরে আসব। রবীন্দ্রনাথ কিন্তু ব্রিটিশ শাসক তথা তখনকার ভাইসরয়ের নামে দেওয়া হার্ডিঞ্জ ব্রিজ কথাটাও বলেননি। স্থানীয়দের মতোই তিনি বলতেন সারা বা সাঁড়ার পুল।

পাবনা জেলার যে অংশে ব্রিজটির উত্তরপ্রান্ত সেই গ্রামের নাম সাঁড়া। রবীন্দ্রনাথের ‘খাপছাড়া’র ২৭ নম্বর ছড়ার কথা অনেকের মনে পড়তে পারে- ‘ঘাসি কামারের বাড়ি সাঁড়া/গড়েছে মন্ত্রপড়া খাঁড়া।’ ব্রিজ নির্মাণের আগে এই সাঁড়ার বৃহৎ ঘাটটি ছিল মালামাল, মানুষ-বিশেষ করে ট্রেনযাত্রীদের পারাপারের স্থান, যে পথে রবীন্দ্রনাথও গিয়েছিলেন। যেমন, ‘ছিন্নপত্র’-এর ৯ সংখ্যক পত্রে (সেপ্টেম্বর ১৮৮৭) জানাচ্ছেন অভিজ্ঞতার কথা- ‘সারা-ঘাটে স্টিমারে ওঠবার সময় মহা হাঙ্গাম। রাত্রি দশটা-জিনিস-পত্র সহস্র, কুলি গোটাকতক, মেয়েমানুষ পাঁচটা এবং পুরুষমানুষ একটিমাত্র। নদী পেরিয়ে একটি ছোটো রেলগাড়িতে ওঠা গেল-।’

ব্রিজ হওয়ার পরপরই যে ‘হাঙ্গামে’র অবসান ঘটেছিল তা নয়- ব্রডগেজ-মিটারগেজ লাইনের কারণে কিছুদিন কষ্ট করতে হয়েছিল যাত্রীসাধারণের। সেই প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘পদ্মায় যখন পুল হয় নাই তখন এপারে ছিল চওড়া রেলপথ, ওপারে ছিল সরু। মাঝখানে একটা বিচ্ছেদ ছিল বলিয়া রেলপথের এই দ্বিধা আমাদের সহিয়াছিল। এখন সেই বিচ্ছেদ মিটিয়া গেছে তবু ব্যবস্থার কার্পণ্যে যখন অর্ধেক রাত্রে জিনিসপত্র লইয়া গাড়ি বদল করিতে হয় তখন রেলের বিধাতাকে দোষ না দিয়া থাকিতে পারি না।’ কথাটি তিনি বলেছিলেন ‘বাংলা শব্দতত্ত্ব’ গ্রন্থের প্রথম প্রবন্ধ ‘ভাষার কথা’র শুরুতেই-কথ্য ও লিখিত ভাষার ব্যবধান বোঝাতে। তা এরকম খটমটে আলোচনায় যখন সাঁড়ার পুল ব্যবহার করেন, তখন বুঝতে পারি এই স্থাপনা কবিচিত্তের রসধারার উপরও স্থাপিত হয়েছিল।

কবি নজরুলের কথা বলছিলাম। তিন দৃশ্যবিশিষ্ট তার একাঙ্কিকা ‘সেতু-বন্ধ’-এর প্রথম ও দ্বিতীয় দৃশ্য নওরোজ (শ্রাবণ ১৩৩৪) পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল ‘সারা ব্রিজ’ নামে। ব্রিজটির নির্মাণ নিয়ে তার প্রকৃতি ভাবনা অপূর্ব দৃষ্টিকোণে উপস্থাপন করেছেন নাটিকাটিতে। একাঙ্কিকার কুশীলব একদিকে ইট, কাঠ, পাথর, লোহা, যন্ত্র, যন্ত্রী, অপরদিকে সেতু, মেঘ, বৃষ্টিধারা, তরঙ্গ, পদ্মা, জলদেবী, মীনকুমারী, ঝড়, বজ্রশিখা, বন্যা প্রভৃতি আর মাঝখানে রয়েছে ভারবাহী পশু ও মানুষ, পীড়িত মানবাত্মা। প্রথম দৃশ্যে দেখা যায় নৃত্যগীতরতা বৃষ্টিধারা-যারা একেকজন রেবা, চিত্রা, কঙ্কা, চূর্ণা প্রভৃতি নারী নামাঙ্কিতা।

মেঘরাজ এসে জানায় পদ্মাদেবী তাদের স্মরণ করেছেন। কারণ ‘তার বুকের ওপরে বাঁধ বাঁধবার জন্যে নাকি দুর্দান্ত যন্ত্রপাতির ষড়যন্ত্র চলছে। পদ্মা এ অপমান সইবেন না। তিনি আমাদের সাহায্য চান।’ শুনে চিত্রা বলে- ‘যন্ত্রপাতির স্পর্ধা তো কম নয়! তার রাজ্য পশ্চিম হতে ক্রমেই পূর্বে প্রসারিত হয়ে চলেছে উন্মত্ত বুভুক্ষায়-তা দেখছি, তাই বলে সে ঔদ্ধত্য যে পদ্মাকেও লাঞ্ছনা হানতে এগুবে- এ বার্তা শুধু নতুন নয় রাজা-অদ্ভুত।’ ব্রিটিশ বা পশ্চিমাদের সভ্যতা ও সাম্রাজ্য বিস্তার এভাবেই কবির কলমে উঠে এসেছে। ইউরোপিয়ানদের প্রধান অস্ত্র বিজ্ঞান বা যন্ত্রপাতি (যন্ত্রদের রাজা) সমগ্র মানবজাতির মুখপাত্রের মতো বলে- ‘আমাদের এ যুদ্ধ স্বর্গমর্ত্যরে চিরন্তন যুদ্ধ। এ যুদ্ধ জড় ও জীবের, বস্তু ও প্রাণের, মৃত্যু ও মৃত্যুঞ্জয়ের। অমৃতে আমাদের অধিকার নেই, তাই আমরা অমৃতকে তিক্ত করে তুলতে চাই।’
কবির সৃজনশিল্পে ঘটনার সমাপ্তি এভাবে ঘটলেও বাস্তবে তো পদ্মার ওপর পুল ঠিকই নির্মিত হয়েছিল। তবে ক্ষুদ্র এ নাটিকা রচনার মধ্যে এ ইঙ্গিত মেলে যে, সে সময় ব্রিজটির নির্মাণ পুরো দেশবাসীর ব্যাপক আগ্রহের বিষয় ছিল। এক বাউল গানের মধ্যে ঘটনাটির লোক-ঔৎসুক্য বেশ ভালোভাবেই প্রকাশিত হয়েছে। মুহম্মদ মনসুরউদ্দীনের সংগ্রহ থেকে-
পদ্মা নদীর পুল বেঁধেছে ভাল,
কত ইট পাটকেল খাপ্ড়া কুচি পদ্মার কূলে দিল,
কত জায়গার মানুষ ঐ ডাঙ্গাতে ম’ল,
পুলের খাম্বা ষোল জোড়া,
উপরে তার গিল্টি করা,
কাঁকড়া কলে মাটি তুলে খাম্বা বসাইল।
বাউল কবি তার গুহ্য সাধনপন্থার কথা এই ব্রিজ নির্মাণের ঘটনাবলির রূপকে প্রকাশ করেছেন। তবে এই বৃহৎ ব্রিজটি যে ক্ষুদ্র মানবকে বাউলিয়ানায় নিয়ে যেতে পারে সেরকম কাহিনীও আছে বাস্তবে। বস্তুত প্রকৃতি আর জননির্মিতি মিলে এমন মোহিত করা সৌন্দর্য সম্ভবত পৃথিবীতে অল্পই আছে। বেশ দূর থেকে রেললাইন উঁচু হয়ে এসেছে। সুউচ্চ ব্রিজটি থেকে বিশাল-বিস্তৃত নদীমধ্যে বড় নৌকাকেও নেহাত ক্ষুদ্র দেখায়। সেসব নৌযান, পাকশীর ছোট্ট সাজানো-গোছানো শহর ও ভেড়ামারার ক্ষুদ্র-বিচ্ছিন্ন গ্রামগুলোর মানুষের জীবনপ্রবাহ যেভাবে চোখে পড়ে, তাতে ব্যক্তি মানুষের জীবন ও কালের ক্ষুদ্রতাও ইঙ্গিতপূর্ণ হয়ে ওঠে।

ব্রিজের পূর্বপান্তে পাকশী স্টেশন সমতল থেকে পাহাড়সম উঁচু; নির্জনতার সেখানে নিত্য উপস্থিতি, সঙ্গে বাউরী বাতাস। যে কেউ সেখানে এক মরমি-ঔদাস্যে আক্রান্ত হবে। আর যদি হয় পূর্ণিমা রাত? কবি অমিয় চক্রবর্তী জানিয়েছেন তার দাদা অরুণচন্দ্রের কাহিনী-৯ এপ্রিল ১৯১৭-এর কথা- ‘পরলোকের ইঙ্গিত পাবার ব্যাকুলতা তাকে পেয়ে বসেছিল। সেই ইঙ্গিতই হল সম্পূর্ণ শেষ, এই জীবনের শেষ। ভরা পূর্ণিমায় পদ্মানদী নীচে বয়ে চলেছে, ঈশ^রদি স্টেশনের কাছে ব্রিজের উপর রেল লাইনের কাছে শুয়ে জ্যোৎস্নায় নিমগ্ন ছিলেন। দার্জিলিং মেল তার উপর দিয়ে চলে গেল।’

ঘটনাটি কবির মনে চিরকালের এক বেদনাখ- হয়ে রয়ে যায়। আরেকজন কবি শঙ্খ ঘোষও স্মৃতিকাতর হন যখন-তখন; তিনিও কৈশোরে কিছুকাল পাকশীতে ছিলেন। ‘জাবাল সত্যকাম’ কবিতায় তারই অনুরণন- ‘পদ্মার তুফান দেয় টান নৌকো খান খান/ পেরিয়ে এসেছি কত সেতু।’

কথা-কবিতা-গানে এভাবেই কত যে শিল্পী হার্ডিঞ্জ ব্রিজ সংযোজিত জীবনের ধারা ও অনুভূতি চিত্রিত করেছেন, তার পূর্ণ হিসেব নেওয়া মনে হয় অসম্ভব। যেমন বেহিসেবি মনে হয় এই ব্রিজ বিষয়ে ব্রিটিশের আবেগ-উচ্ছ্বাসের স্থায়িত্ব। বলছি স্বাধীনতার অব্যবহিত পরের একটি প্রসঙ্গ মনে করে। যথারীতি মুক্তিযুদ্ধকালে সেতুটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। যুদ্ধের শেষ দিকে পাকিস্তানি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ থেকে ব্রিজটি মুক্ত করতে মিত্রবাহিনী বিমান থেকে সেতুটিতে বোমাবর্ষণ করে। এতে ১২তম স্প্যানটি বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে একাংশ নদীতে পড়ে যায়। যুদ্ধ শেষে ব্রিটিশ সরকার নিজ খরচে একটি প্রকৌশল সংস্থাকে পাঠিয়ে স্প্যানটি উদ্ধার করে। আর ভারত সরকার নিজ খরচে নতুন স্প্যান লাগিয়ে দেয়। এসব তথ্য ওই স্প্যানটির গায়েও লেখা রয়েছে।

তবে লেখা নেই ব্রিজটিকে ঘিরে কত নাম-না-জানা মানুষের জীবনের সুখ-দুঃখের ইতিহাস। কত ইতিহাস হয়তো বিস্মৃতির তলে চলে গিয়েছিল। হয়তো আজ আবার ব্রিজটির বয়সজনিত জীর্ণদশার খবর শুনে কারো কারো হৃদপদ্মার গভীর তলদেশ থেকে সেসব ইতিহাস আবার ভেসে উঠছে। ভেসে উঠছে অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঢেউ হয়ে। ঢেউয়ের ওপর ঢেউ ওঠে। সেই অগণ্য স্মৃতি-সত্তার আবেগেই ব্রিজটিকে আগের মতোই রেখে দেওয়ার ও দেখার দাবি করছে মানুষরা। একটি জড় সেতুকে ঘিরে মানুষের এই আবেগ মহৎ কি-না জানি না, কিন্তু অমূল্য যে তা নিশ্চয় করে বলতে পারি।