অপুই বিভূতিভূষণ

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২২ অক্টোবর ২০১৯ | ৭ কার্তিক ১৪২৬

অপুই বিভূতিভূষণ

শহীদ ইকবাল ২:০৭ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৩, ২০১৯

print
অপুই বিভূতিভূষণ

অসংযত অনুরাগে বলি, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯৪-১৯৫০) বাংলা উপন্যাসের গুরুত্বপূর্ণ লেখক। অনেক উপন্যাস লিখলেও পথের পাঁচালির জন্যই তিনি আলাদা মর্যাদার অধিকারী। উপন্যাস শুধু কাহিনী, চরিত্র বা ঘটনার বর্ণনা নয়। এর ভেতরে থাকে জীবনের সমগ্র রূপের সম্ভাব্য সংবাদ। পথের পাঁচালি সে অর্থে কী ধরনের সংবাদ বহন করে! কী তার গুরুত্ব? নিশ্চিন্দিপুর গ্রাম শুধু কোনো অঞ্চলের গ্রাম নয়, বঙ্গদেশের নিশ্চিন্দিপুর অনেক গ্রামের একটি গ্রাম। একটি প্রতীকী গ্রাম। এ গ্রামেই বাস করে ইন্দির ঠাকরুন, সর্বজয়া, হরিহর, অপু, দুর্গাসহ অনেকেই। পথের পাঁচালির মুখ্য চরিত্র এরাই।

এদের কেন্দ্র করে গ্রামীণ কাহিনী গড়ে উঠেছে। গ্রামের বৈশিষ্ট্য, গ্রামীণ উপাদান লেখকের বর্ণনায় এ উপন্যাসে সুধাময়। অত্যন্ত মনোহর, আকর্ষণীয় এ বর্ণনা। সূক্ষ্মতর বর্ণনার ভেতরে গেঁথে দিয়েছেন জীবনের সুখ-শান্তি-দুঃখ ও চাঞ্চল্য। কার্যত, এটি করুণ রসের কাহিনী। করুণ কিন্তু কারুখচিত। একটুও পলক পড়ে না, গতি হারায় না, নিস্তরঙ্গ বয়ে চলে। জীবনের সবকিছু এখানে জটিল নয়, কঠিন নয় কিন্তু কষ্ট-মায়ায় পরিপূর্ণ। নগর জীবনের কুটিলতা এখানে নেই, এখানকার জীবন জটিল মারপ্যাঁচে আটকানো নয়, নেই দ্রুততর ও বীভৎসরূপে ঘটিয়ে ফেলার কোনো অতর্কিত পীড়ন। এখানকার কাহিনী করুণামণ্ডিত ও উদাসীন আলেখ্যময়। তাই উপন্যাসের প্রাণ।

আদিম-বন্য সমাজের আচারনিষ্ঠা এ উপন্যাসে তাৎপর্যপূর্ণ। আর আছে দারিদ্র্য। এই দারিদ্র্যই পথের পাঁচালিকে দিয়েছে মহত্ত্বের মহিমা। পথের পাঁচালির তিনটি পর্বে মোট পরিচ্ছেদ ৩৫। ‘বল্লালী বালাই’ (প্রথম থেকে ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ), ‘আম-আঁটির ভেঁপু’ (সপ্তম থেকে ঊনত্রিংশ পরিচ্ছেদ) ও ‘অক্রূর সংবাদ’ (ত্রিংশ থেকে পঞ্চত্রিংশ পরিচ্ছেদ)। উপন্যাসটির প্রধান অংশ ‘আম-আঁটির ভেঁপু’। এটিই এখানে আলোচ্য করে তোলে লেখকের জন্মের ১২৫ বছর পূর্তি স্মরণে আনা যায়।

‘আম-আাঁটির ভেপু’ পথের পাঁচালির গুরুত্বপূর্ণ আখ্যান। অপুর বেড়ে ওঠা, সর্বজয়ার সংসার-সংগ্রাম, হরিহরের সংসারধর্ম-প্রচেষ্টা, দুর্গার মৃত্যু, নিশ্চিন্দিপুর ছেড়ে যাওয়া ইত্যাদি নিয়ে এ অংশের কাহিনী। এ অংশটিই উপন্যাসের প্রাণ, ঔপন্যাসিকের পূর্ণ সাফল্যও এর মধ্যেই নিহিত। কার্যত, ‘আম-আাঁটির ভেপু’র প্রস্তুতি আর পরিণতি যথাক্রমে ‘বল্লালী বালাই’ আর ‘অক্রূর সংবাদ’ পর্যন্ত। শিল্পবোদ্ধাগণের আকৃষ্টের কেন্দ্র আম-আাঁটির ভেপু, বস্তুত সেটির সাফল্যই পথের পাঁচালির সাফল্য বলে পরিগণিত।

‘আম-আঁটির ভেপু’-তে অপু বেড়ে ওঠে প্রকৃতির ভেতর দিয়ে। কিন্তু সেটি বাস্তব ঘটনাকে অস্বীকার করে নয়। প্রাত্যহিকতায় মেশানো দুঃখ-দারিদ্র্য-আনন্দ অপুর মনে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। অপু পূর্ণতা পায় দুর্গার কারণে। এ দিদিই তাকে বড় করে তোলে। বিস্ময় ও মুগ্ধ প্রকৃতির প্রতি আকৃষ্ট করে তার ভেতরে পুলক জাগায়। বাইরের প্রতি মায়া ও দাক্ষিণ্য বাড়িয়ে তোলে। গ্রামের বাইরের মাঠের ঝোপঝাড়, উলুখড়, বনকলমী, সোঁদাল ও কুলগাছ বিচিত্র প্রাণী, বেঙ্গল হেডকুঠি ‘বালক অবাক হইয়া চাহিয়া দেখিতেছিল। ছয় বৎসরের জীবনে এই প্রথম সে বাড়ী হইতে এতদূরে আসিয়াছে।’ এছাড়া কৃষি জীবনের উপায়-উপকরণ বা ঘরে-সংসারে নিত্য কর্মকাণ্ডের ভেতরে অপু-দুর্গা কাঁচা আম, কামরাঙ্গা আর নারকেলের মালা চুরি, রড়া ফলের বীচি পেড়ে আনা, সেজ ঠাকরুণের গালমন্দ সব চলতে থাকে। অপু মায়ের রূপকথা শুনে, বাবার কাশিদাসী মহাভারত আর তার যুদ্ধের কাহিনী কল্পরাজ্যে নিয়ে যায়।

কাহিনীতে দারিদ্র্যের নির্মম চিত্র আছে। ধার-দেনা, বন্ধক, রায়বাড়ির টাকা মিলে উপার্জনহীন হরিহর ‘এইবার ঠিক একটা কিছু হয়ে যাবে’ বা ‘এত কষ্ট এত অভাব থাকবে না’- এসব উক্তির বিপরীতে সর্বজয়ার সংসারে সুদিন আসে না। প্রতারণা করে বাগান লিখিয়ে নেওয়া, মহেশ বিশ্বাসের মন্তর নেওয়ার কাজ পিছিয়ে যাওয়া ইত্যকার অনেক অজুহাত একসময় সর্বজয়ার আশার বাঁধ ভেঙে যায়। এর মাঝে বৈরী প্রকৃতিও উন্মত্ত হয়ে ওঠে। কিন্তু ঝড়ের মাঝে দুর্গার আম-নারকেলের ঝোঁক, দুর্গম জঙ্গলের আকর্ষণ কমে না। সে যে কোনো অভিশাপ উপেক্ষা করে। এক অনিবার্য আকর্ষণে বাইরের প্রকৃতি যেন তাকে টেনে নিয়ে চলে। শুধু সেই নয়, অপুকেও এক বিস্ময়-বালকে পরিণত করে সে।

অপুর উদাত্ত প্রকৃতি সরল মনে অনেক রকম চিন্তা তৈরি করে। নিজের পরিবারের দারিদ্র্য, অভাবের কষ্ট, একমাত্র দিদির জন্য গভীর ভালোবাসা, পাশের বাড়ির সেজঠাকরুণের ভীতি, সতু-রাণুর বন্ধুত্ব, মন্দির-পূজো-সংস্কার, অনেককালের রূপকথার গল্প, ধর্মপুরাণ-বিশ্বাস, রামায়ণ-মহাভারত-বীরাঙ্গনা কাহিনী নতুন অপু সৃজিত হতে থাকে। সর্বজয়ার কষ্ট, হরিহরের প্রবাসী জীবন তার মনে প্রশ্ন এনে দেয়। হরিহরের পুরনো বই তার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। এর মধ্যে আশা-স্বপ্নে ধনাঢ্য নীরেনের আগমন বা দুর্গার সম্বন্ধ-আলাপ হরিহরের দরিদ্র পরিবারের বিরল অভিজ্ঞতা। দুর্গার একটি পরিণতির সংকেতও আছে এর মধ্যে। অবুঝ মনের প্রণয়, নীরেনের মতো জামাইয়ের জন্য আশার কুহক এ পাড়ার নতুন সংবাদ। চড়কতরার মাঠ, সোনাডাঙার মাঠ, রেলগাড়ী, শালিক পাখির আওয়াজ, নরোত্তম দাসের ভাব, নীলমণি রায়ের জঙ্গলাকীর্ণ ভিটে, ভুবন মুখুয্যের বাড়ির বিবাহ, সোনার কৌটো হারানো, সেজ ঠাকরুণের প্রহার, চড়ক উপলক্ষে আসর, নীলমণি হাজরার যাত্রাদল প্রভৃতি পথের পাঁচালির কৌম জীবন-সংস্কৃতির সংবাদ। এর ভেতর দিয়েই অপু-দুর্গার জীবনের প্রবাহ চলে।

কথক অনেক চরিত্রের ভেতর দিয়ে সমাজচিত্রকে অঙ্কনই শুধু নয়, গভীর ও কাল্পনিক জীবনসূত্রেরও সন্ধান করতে চেয়েছেন। অজয়-সান্নিধ্যে যাত্রা দলের আমোদ অপুর দৃষ্টিতে আলোর সন্ধান দেয়। সবকিছুর একপ্রকার দিব্যমহিমা তাকে মথিত করে তোলে। কাহিনীর অগ্রবর্তী অঙ্গনে দারিদ্র্য প্রকট হতে থাকে। হরিহরের প্রবাস জীবনের আশাও গুঁড়ে বালি। বৈষয়িক বুদ্ধির ভেতর দিয়ে সর্বজয়া এক সময় দুর্গার বিয়ের চিন্তায় পড়ে। প্রকৃতিও তাদের অনুকূল নয়। বিরামহীন বৃষ্টিতে শরীরে জল পড়ে। হরিহর-শূন্য বাড়িতে ‘অনেক রাত্রে সর্বজয়ার ঘুম ভাঙিয়া যায়- অপু ডাকিতেছে- মা, ওমা ওঠো- আমার গায়ে জল পড়চে-’। হিংস্রর অন্ধকারের ভেতরে অশনি পরিবেশে কাতর হয়ে পড়ে সর্বজয়া। নীলমণি ডাক্তার দুর্গাকে ফেরাতে পারেনি। হরিহর ফিরে এলে সর্বজয়া আর এ স্মৃতিময় গ্রামে বাস করতে চায় না। এক সময় তাই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। সমস্ত বাঁধন ছিন্ন করে পলাতক দরিদ্র পরিবার দরিদ্রজয়ের নেশায় আবাল্যের ভূমি ত্যাগ করে। আবার সেই রেলগাড়ী ভ্রমণের অপার আনন্দ অপুকে গ্রাস করে।

ঔপন্যাসিকের মানস-সৃষ্টি দুর্গা। দুর্গাই সর্বজয়ার মনোবৃত্তি হরিহরের আশান্বিত প্রহরকে কাহিনী-কাঠামোতে গ্রহণীয় করে তুলেছে। প্রকৃতির মায়া আর প্রণয় দুর্গার চাঞ্চল্যকে উপভোগ্য মর্জিতে দাঁড় করায়। কাঠবেড়ালি, বেড়ালছানা, পুকুর, বনকুঞ্জ, বাঁশবাগান, লতাগুল্ম এক বিজ্ঞানীর প্রখরতার খুঁজে বেড়ায় দুর্গা। চাপল্যের প্রভা তার অপরূপ। বিস্ময়মুগ্ধ তার দৃষ্টি। সে বিস্ময়ে অপুও অপার হয়ে ওঠে। বর্ণনা এই নিশ্চিন্দিপুরের-‘মাঠের ঝোপঝাপগুলো উলুখড়, বনকলমী, সোঁদাল ও কুলগাছে ভরা। কলমীলতা সারা জোটগুলোর মাথা বড় বড় সবুজ পাতা বিছাইয়া ঢাকিয়া দিয়াছে- ভেতরে স্নিগ্ধ ছায়া, ছোট গোয়ালে, নাটাকাঁটা, ও নীল-বন অপরাজিতা ফুল সূর্যের আলোর দিকে মুখ উঁচু করিয়া ফুটিয়া আছে, পড়ন্ত বেলার ছায়ায় স্নিগ্ধ বনভূমির শ্যামলতা, পাখির ডাক, চারিধারে প্রকৃতির মুক্ত হাতে ছড়ানো ঐশ্বর্য রাজার মতো ভাণ্ডার বিলাইয়া দান, কোথাও এতটুকু দারিদ্র্যের আশ্রয় খুঁজিবার চেষ্টা নাই, মধ্যবিত্তের কার্পণ্য নাই।’

এর মাঝে দুর্গার সন্তরণ, অভিযোজন, পরিচালন। এগারো বৎসরের দুর্গা ‘গড়ন পাতলা পাতলা, রঙ অপুর মতো অতটা ফর্সা নয়, একটু চাপা। হাতে কাচের চুড়ি, পরনে ময়লা কাপড়, মাথার চুল রুক্ষ্ম- বাতাসে উড়িতেছে, মুখের গড়ন মন্দ নয়, অপুর মতো চোখগুলি বেশ ডাগর ডাগর’ প্রকৃতির আনুগত্যে সে বহিমুর্খী। অপু যদি হয় অন্তর্মুখী, দুর্গা বহির্মুখী, বেপরোয়া। এটি একপ্রকার শিশু-চরিত্রের বৈশিষ্ট্যই বলা যায়। সংসারের ভর্ৎসনা, গালমন্দ কিছুই দুর্গাকে গৃহমুখী করতে পারে না। পরের বাগানের ফল চুরি, সোনা চুরি, নির্মম প্রহার কোনোকিছুই তার লোভকে দমায় না। একইভাবে এর বিপরীতে সে তুমুল স্নেহপ্রবণও বটে। অপুর প্রতি অন্তহীন ভালোবাসা, মায়ের মমতা, ইন্দির ঠাকরুণের মায়া, নীরেনের প্রতি আকর্ষণ, অন্নদা রায়ের পুত্রবধূর প্রতি প্রেম- এসব বিষয়ে দুর্গার একাগ্রতার শেষ নেই। ভালো-মন্দে, লোভে-আকর্ষণে, বিস্ময়ে-প্রেমে দুর্গা পাঠকপ্রিয়ও তাই। মৃত্যুর পরও সে অসম্ভব স্মৃতিমেদুর।

মুগ্ধ প্রকৃতি দেখে অপুর নেত্রে বিস্ময় সৃষ্টি হয়। নিশ্চিন্দিপুরের প্রকৃতিতে কী কী আছে? আমবন, রেলগাড়ি, রেলের রাস্তা, পুকুর, শেওড়ার বন, অরণ্য-জঙ্গল, কাঁটালতলা, বাঁশবন, নীলমণি রায়ের ভিটা, নোনাফল, পাখ-পাখালি, ‘বন-চালতা ময়না-কাঁটা ষাঁড়া গাছের দুর্ভেদ্য জঙ্গল’ আর মানুষে মানুষে ভেদ-বিভেদ, হিংসা-ঈর্ষা, স্নেহ-মায়া-মমতা সব তার বিস্ময়ের উৎস। নিশ্চিন্দিপুরের তেপান্তরের মাঠ মনোমুগ্ধময়। এ পর্যায়ে লেখকের বক্তব্যটি উদাহরণে আনা যায়-

‘তুমি চলিয়া যাইতেছ... তুমি কিছুই জানো না, পথের ধারে তোমার চোখে কি পড়িতে পারে, তোমার ডাগর নবীন চোখ বিশ^গ্রাসী ক্ষুধায় চারিদিককে গিলিতে গিলিতে চলিয়াছে- নিজের আনন্দের এ হিসাবে তুমিও একজন আবিষ্কারক। অচেনার আনন্দকে পাইতে হইলে পৃথিবী ঘুরিয়া বেড়াইতে হইবে, তাহার মানে নাই। আমি যেখানে আর কখনো যাই নাই, আজ নতুন পা দিলাম, যে নদীর জলে নতুন স্নান করিলাম, যে গ্রামের হাওয়ায় শরীর জুড়াইল, আমার আগে সেখানে কেহ আসিয়াছিল কিনা, তাহাতে আমার কি আসে যায়? তাহা যে অনাবিষ্কৃত দেশ। আমি আজ সর্বপ্রথম মন, বুদ্ধি, হৃদয় দিয়া উহার নবীনতাকে আস্বাদ করিলাম যে!’

এখানে অপুর হয়ে কথক বা কথাকার কথা বলেন। এটি অপুর আত্মকথা কথান্তরে বিভূতিভূষণের আত্মকথা। এখানে তাই বলা চলে, অপুর ভেতর দিয়ে ঔপন্যাসিক নিজের কথাই বলে চলছেন। নিজের জীবনের বা আত্মজীবনের কথা বলছেন। এজন্য বলা চলে, অপুই বিভূতিভূষণ, বিভূতিভূষণই অপু।