রথে ও দ্বৈরথে

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ৪ আশ্বিন ১৪২৬

আবুল মনসুর আহমদ

রথে ও দ্বৈরথে

কুদরত-ই-হুদা ১২:৪৩ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ০৬, ২০১৯

print
রথে ও দ্বৈরথে

আবুল মনসুর আহমদের নিষ্ঠ গুণগ্রাহীরা প্রায়ই একটা কথা বলেন, তাকে তার যথাযথ মর্যাদায় স্মরণ করা হয় না। রাজনীতিতে ও বাংলা সাহিত্যে তাকে যথাযথ স্থানে বসানো হয় না। কিন্তু তিনি স্মরণীয়। বিশেষ মর্যাদা তার প্রাপ্য। আবুল মনসুর আহমদকে যারা বেশি পছন্দ করেন, তাদের এইসব অনুযোগের কারণ জিজ্ঞেস করলে কী বলবেন? কল্পনা করা যাক। হয়তো চোখ গরম করে দাঁত খিচিয়ে বলবেন, ‘বুঝলেন না! রাজনীতি, সবই রাজনীতি!’

আবার আবুল মনসুর আহমদকে নিয়ে যারা বেশি হৈচৈ পছন্দ করেন না বা সংশয় পোষণ করেন, তাদের যদি জিজ্ঞেস করা হয়, কেন তারা তাকে যথাযথ মর্যাদা দিচ্ছেন না? তারা ফিসফিস করবেন। আর ‘সংস্কৃতি-ব্যবসায়ী’ হলে কৃত্রিম বিস্ময় চোখেমুখে ছড়িয়ে বলবেন, ‘জানেন না বুঝি! আবুল মনসুর আহমদ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য কী সব করেছেন জানেন না! পাকিস্তানের প্রতি তার আলাদা দরদ ছিল!’ আখেরে এ কথাও বলবেন, ‘কিন্তু লোকটা ধারালো ছিলেন!’ তার মানে ব্যাপারটা দাঁড়ালো এই যে, আবুল মনসুর আহমদ পেন্ডুলামের মতো ঝুলে থেকে হালকা দুলছেন। থাকা না থাকার মাঝামাঝি হয়ে আছেন। আসলেই কি তাই!

প্রথমত, গুণগ্রাহীদের অনুযোগ বিষয়ে বলা যাক। সত্যি সত্যিই কি আবুল মনসুর আহমদকে যথাযথ মর্যাদায় স্মরণ করা হয় না? মনে হয় না কথাটা ঠিক। এটা এক ধরনের ভ্রান্তি। আমি তো দেখি আবুল মনসুর আহমদকে আলাদাভাবে বিশেষ শ্রেণি বা গোষ্ঠীর স্মরণ করার দরকার নেই। কারণ, তার স্মরণ ও শরণ ছাড়া কি স্বাধীনতাপূর্ব বাংলাদেশের ইতিহাস লেখা যায়! তাকে বাদ দিয়ে স্বাধীনপূর্ব বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস কি পূর্ণতা পাবে! নাকি সম্ভব! লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, ইতিহাসের পটে রেখে এ পর্যন্ত বাংলাদেশের সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও রাজনীতি-বিষয়ক কোনো গবেষণাগ্রন্থ দেখা যাবে না, যেখানে আবুল মনসুর আহমদের শরণ ও স্মরণ নেই। তবে, যারা খেদোক্তি করেন, তা কিসের ভিত্তিতে করেন? তবে কি অনুযোগ এই যে, আবুল মনসুরকে নিয়ে বাড়াবাড়ি হয় না কেন? বাড়াবাড়ি হবে না এ কারণে যে, তিনি সেই কোটায় পড়েন না।

তিনি তো বাংলাদেশে বিদ্যমান কোনো রাজনৈতিক দলের প্রধান নেতা নন। গুণগ্রাহীদের আকাক্সক্ষা মোতাবেক বাড়াবাড়িভাবে বেঁচে থাকতে হলে রাজনৈতিক দল লাগে। যেমন, কোনো ধর্মের টিকে থাকতে হলে সেই ধর্মাবলম্বীদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা থাকা লাগে বা ওই ধর্মের লোকদের রাষ্ট্র-ক্ষমতায় থাকা লাগে। তা ছিল না বলে জৈনধর্ম ভারতবর্ষে খুব একটা আসন গেড়ে বসতে পারেনি। তাই বলে কি জৈন ধর্মমতের সারবত্তা বা দার্শনিকতা নাই হয়ে গেছে? হয়নি। কারণ ধর্মের কল বাতাসে নড়ে। আবুল মনসুরও ‘নাই’ হননি, হবেন না।

কারণ, তিনি তো তার রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সাংবাদিক ও সাহিত্যিক জীবনের দীর্ঘ ছায়া ফেলে গেছেন বাংলাদেশের ইতিহাসের চোখেমুখে, সর্ব অবয়বে। আমি তো দেখি, সাহিত্যিক আবুল মনসুর আহমদের অবদান তার স্বকালের সীমা অতিক্রম করে এখন প্রতাপের সঙ্গেই টিকে আছে। তার আয়না (১৯৩৫), ফুডকনফারেন্স (১৯৪৪)-এর উল্লেখ ছাড়া বাংলাদেশের রম্য-ব্যঙ্গ গল্পের ইতিহাস শুধু নয়, সমগ্র বাংলা সাহিত্যের রম্য-ব্যঙ্গ সাহিত্যের ইতিহাসই তো অসম্পূর্ণ। মনে রাখা দরকার, আবুল মনসুর আহমদ আয়নার গল্পগুলো লিখছেন ১৯২২ থেকে ১৯২৯ সালের মধ্যে। পূর্ব বাংলার বাঙালি মুসলমান শুধু নয়, অবিভক্ত বাংলার বাঙালি মুসলমান সৃজনশীল সাহিত্যিক সংখ্যা তো তখনো বলতে গেলে এক হাতের পাঁচ আঙুলের সমানও না।

তখনও বাঙালি মুসলমানের সাহিত্যিক প্রচেষ্টা মুসলিম পরিবারের খিড়কি পার হতে পারেনি। শিল্পীতার সাক্ষাৎ তো বহুত দুরস্ত। আবুল মনসুর আহমদের হাত ধরেই তো বাঙালি মুসলমানের ছোটগল্পের প্রয়াস-প্রচেষ্টা সমাজসংস্কারের প্রাথমিক স্তর পার হয়ে শিল্পের অন্দর মহলে পা রেখেছে। সেই হিসেবে আয়না বা ফুডকনফারেন্স তো বাঙালি মুসলমানের লেখা ক্লাসিক সাহিত্য হয়ে উঠেছে। ইতিহাসের স্বভাবই এই যে, সে ধীর পদক্ষেপে নির্মিত হয় শরীরের আড়ালে রক্তপ্রবাহের মতো।

বাংলাদেশের প্রবন্ধ সাহিত্যের ভিত্তি যে-দুইচারজনের হাতে রচিত হয়েছে আবুল মনসুর আহমদ তাদের অন্যতম। শিল্পসাহিত্য, রাজনীতি, সংস্কৃতি ইত্যাদি বিচিত্র বিষয়ে ছিল তার প্রবন্ধের যাতায়াত। এত বিচিত্রবিষয়গামী প্রাবন্ধিক এখনও তো রীতিমতো বিরল। এসব লেখালেখিতে চিন্তার দিক থেকে তিনি ছিলেন সতত প্রগতিশীল।

স্বদেশ আর স্বজাতির বেদনাময় ও সম্ভাবনাময় রেখায় ভরা তার প্রবন্ধগুলো। কারণ তার প্রবন্ধে বাক্সময় হয়ে উঠেছে সমকালের দগদগে ইস্যুগুলো।

তিনি ভাষা আন্দোলনের ভিত্তি নির্মাতাদের একজন। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সামনে চলে আসে রাষ্ট্রভাষার প্রসঙ্গটি। ১৯৪৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর তমুদ্দন মজলিসের পক্ষ থেকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা-না উর্দু নামে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করা হয়। সেই পুস্তিকায় যারা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে লিখেছিলেন তাদের অনেকের মধ্যে ছিলেন কাজী মোতাহার হোসেন, আবুল মনসুর আহমদ প্রমুখ। এই পুস্তিকায় আবুল মনসুর আহমদ তার ‘বাংলা ভাষাই আমাদের রাষ্ট্রভাষা’ প্রবন্ধে বলেন- “উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করিলে পূর্ব-পাকিস্তানের শিক্ষিত সমাজ রাতারাতি ‘অশিক্ষিত’ ও সরকারি চাকুরীর ‘অযোগ্য’ বনিয়া যাইবেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে ফারসির জায়গায় ইংরেজিকে রাষ্ট্রভাষা করিয়া বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ মুসলিম শিক্ষিত সমাজকে রাতারাতি ‘অশিক্ষিত’ ও সরকারি কাজের ‘অযোগ্য’ করিয়াছিল।”

আগেই বলেছি, ‘সংস্কৃতি-ব্যবসায়ী’ অনেকে মনে করেন, আবুল মনসুর আহমদ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের অন্যতম ব্যক্তি ছিলেন। এজন্য তাকে নিয়ে তারা ফিসফিস করেন। ফিসফিস করে বলেন, তিনি তো ‘পূর্ব পাকিস্তান রেঁনেসা সোসাইটি’র অন্যতম সভ্য ছিলেন। অভিন্ন বাঙালি সত্তাকে অস্বীকার করে তিনি পূর্ব বাংলার স্বাতন্ত্র্যে বিশ্বাসী হয়ে উঠেছিলেন। তিনি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই-সংগ্রাম করেছেন। কথা নতুন নয়। আবুল মনসুরের আত্মজীবনীসহ যেকোনো রচনা তার সাক্ষ্য দেবে। কিন্তু খেয়াল রাখা দরকার যে, চল্লিশের দশকের এমন কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী, রাজনীতিক খুঁজে পাওয়া মুশকিল হবে যারা পাকিস্তান আন্দোলনের পক্ষে কলম ধরেননি, বক্তব্য রাখেননি, উদ্বেলিত হননি। সুফিয়া কামাল থেকে শুরু করে আবদুল হক হয়ে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ পর্যন্ত সবার ক্ষেত্রেই কথাটা সত্য।

পাকিস্তান ছিল পূর্ব বাংলার বাঙালি মুসলমানের স্বপ্ন-আকাক্সক্ষা; তাদের প্রগতি। অবশ্য পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অল্পকাল পরে দেখা গেল তাদের স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হচ্ছে। তখন আবার সেই মোহ থেকে সবাই বের হয়ে গেছে। আবুল মনসুর আহমদও বেরিয়ে গিয়েছিলেন। এ বিষয়ে স্থানান্তরে আলাপ করা যাবে।

এখানে শুধু এই বলে রাখা ভালো যে, ১৯৪৪ সালে ‘পূর্ব পাকিস্তান রেঁনেসা সোসাইটি’র এক সম্মিলনীতে আবুল মনসুর আহমদ সভাপতির ভাষণে বলেছিলেন, ‘বাংলার মুসলমানরা পশ্চিমা [পশ্চিম পাকিস্তান] মুসলমানদের থেকেও পৃথক জাতি। শুধু ধর্ম জাতীয়তার বুনিয়াদ হইতে পারে না।’