মায়ের মুখ

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ৪ আশ্বিন ১৪২৬

ধারাবাহিক গল্প

মায়ের মুখ

রকিবুল হাসান ১২:০১ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ০৬, ২০১৯

print
মায়ের মুখ

সেই কবে ছোটবেলা রবি ঠাকুরের কুঠিবাড়ী থেকে জবাফুলের চিকন এক ছোট্ট ডাল ভেঙে এনেছিলাম। ঘরের বাইরের দরজার পোটনির পাশে লাগিয়েছিলাম। বাড়ির রাস্তার দুদিক ঘিরেই ফুলের বাগান ছিল। গোলাপ রজনীগন্ধা হাসনাহেনার ভিড়ে সে দিন এই জবাফুলের সামান্য ডাল খুব বেশি গুরুত্ব পায়নি। এখন বাড়ির দিকে যখন তাকাই, সেসব অভিজাত ফুলের গাছ এখন আর নেই। কোথায় কবে কীভাবে অযত্নে অবহেলায় হারিয়ে গেছে, সে হিসাবও নেই। কিন্তু জবাফুলের গাছটা অযত্ন অবহেলার ভিতর দিয়েই বড় হয়েছে, ফুলে ফুলে ছেয়ে আছে। সারাবাড়ি তার সৌন্দর্যে আলো করে রেখেছে। আমি কতবার যে এই কথা ভেবেছি আর বিস্ময় চোখে দেখেছি, এখনো দেখি। সে হিসাব মেলানো সহজতর নয়।

জবাফুলের এই ডালটা লাগানোর সময় মা পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। বলেছিলেন, ‘এই ডালটা একদিন গাছ হয়ে অনেক বড় হবে।’ মায়ের কথাটা হয়তো সেদিন কানেই তুলিনি। হিসেবেই গুনিনি। একদিন সত্যি সত্যি এই ডালটা গাছ হলো। অনেক বড় গাছ হলো। টিনের ঘরের উপরে উঠে গেল।

বড় ঘরের প্রায় অর্ধেকটা চাল দখল করে নিল। ফুলে ফুলে ছেয়ে উঠল। বাড়িটার নামই কিভাবে কিভাবে পরিবর্তন হয়ে গেল ‘জবাফুল অলাবাড়ি’। অনেকটা পথ ভেঙে যেভাবে নতুন পথ তৈরি হয়ে যায়। প্রথমে বোঝা যায় না, পথটা তৈরি হওয়ার পর বোঝা যায়, একট নতুন পথ তৈরি হয়েছে। আমাদের বাড়ির নামের অবস্থাও অনেকটা নতুন পথের মতোই হয়ে উঠেছিল। স্মৃতিস্বর্ণআলো জড়ানো পুরনো সেই ঘরগুলো নেই। যে ঘরে আমার শিশুকালের গন্ধ লেগেছিল, যে ঘর আমার শৈশবের গন্ধ মাখা, যে ঘরে আমি একটু একটু করে যৌবন ছুঁয়েছি, সেসব এখন নেই।

ঘরে ফিরেই আমি যে সারা বাড়ি তছনছ করে ফেলতাম, মাকে চিৎকার করে ডাকতাম, খাবার দিতে একটু দেরি হলেই সারাবাড়ি মাথায় তুলতাম, আমার সেই বাড়িটা এখন আর নেই। সেই আমিও এখন আর নেই। আমার সব অত্যাচার সহ্য করা সেই মা-ও নেই। মাটির ঘরে চিরকালের ঘুমে ঘুমিয়ে গেছে। আমার যৌবন তখনো নদীর ঢেউ ছুঁইনি, ছুঁই ছুঁই করছে-তখনই মা হারিয়ে গেল। স্বপ্নরঙিন একটা পৃথিবীকে মুহূর্তে একটা কালো মেঘ এসে গ্রাস করে নিল। আলোমাখা পথ অন্ধকার হয়ে উঠল। অন্ধকার তো শুধুই অন্ধকার নয়। অন্ধকারেরও যে কত ভয়াবহ রূপ থাকে-ফণাধারী সাপের মতো কত বিষাক্ত ছোবল থাকে, ছোবলে কত নীলবিষ ছড়ানো থাকে-আমার শরীরে সেসব বিষ দখল নিতে থাকে। আমি আমাকে দেখতে থাকি-বিষে নীল হয়ে উঠতে থাকি-এত কষ্ট! এত যন্ত্রণা! তবুও সাহসের ফণা তুলে আমিও হাঁটতে থাকি পথ, সরাতে থাকি অন্ধকার, বিষাক্ত ছোবলের বিষ নাশ করতে থাকি-এক কঠিন দৃঢ়তায়। আমি কত গভীর হয়ে আমার ঘরটা দেখতে থাকি-আমার পুরো বাড়িটা দেখতে থাকি-আমার মায়ের পায়ের প্রতিটি শব্দ খুঁটতে থাকি-আমার মায়ের প্রতিটি নিঃশ্বাস অনুভব করতে থাকি-এঘরে-ওঘরে-উঠোনে-সারাবাড়ি জুড়ে মায়ের হেঁটে বেড়ানো দেখি-মায়ের আঁচলটা ধরে থাকি-স্মৃতির চোখে মাকে দেখি-আমার ঘরে ফেরা দেরি দেখে মায়ের উৎকণ্ঠিত মন আর দুশ্চিন্তার বিষণ্ন চোখ এখনো পথের দিকে ছুটে আসে-মা আমাকে খুঁজছেন। আমার বুকের ভেতর কান্নারা ঢেউ হয়ে ভেসে যায়-চোখের গভীর চোখের জলে ভারি হয়ে ওঠে আমি বোকার মতো মুখে হাত নিয়ে বসে থাকি, যেন বোকা এক পাখি। সবাই আমাকে দেখে-ভালোবাসে-স্নেহ-সম্মানে কাছে ডাকে। ভেতরে ভেতরে আমি যে অন্য এক আমি হয়ে থাকি-আমি সেই ছোট্টবেলার আমি হয়ে যাই-ভীষণ জেদি ও দুষ্টু আমি হয়ে যাই, মাকে সারাক্ষণ জ্বালা-যন্ত্রণায় অবাধ্য সেই ছোট্টবেলার আমি হয়ে উঠি-সেই আমাকে কেউ দেখে না। বাইরের আমি বিকালের নদীর ঢেউহীন শান্ত নিঃশব্দ স্রোত।

সন্ধ্যাভাঙা রাতে উঠোনে পাটিতে পাখিদের মতো সব ভাইবোন জড়োকুড়ো হয়ে বসে হারিকেনের আলোয় পড়তে বসার নামে শালিকের ঝাঁকের মতো কিচিরমিচির করা, সেই আমাকে খুঁজি-মা বসে আছেন পাশে-মিষ্টি শাসনে ও সোহাগে। কিচিরমিচির শব্দের ভেতর দিয়েই মায়ের চোখে স্বপ্নবুনন-একদিন আকাশ ছোঁবো আমরা। মা স্বপ্ন দেখেন হারিকেনের সামান্য আলোতে-একদিন আলোর ফোয়ারা হয়ে উঠবে তার আদরের পাখিরা।

মা, তোমার মনে আছে, সকাল হলেই স্কুলে যাওয়ার সময় প্রায় দিনই বিনা প্রয়োজনে তোমার কাছে টাকা চাইতাম। তুমি সব বুঝেও না বুঝে একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে চার আনা আট আনা পয়সা দিতে। কোনো দিন দিতে না পারার কষ্টে ধমক দিয়ে নিজেই কষ্ট পেতে। তোমার সেই মিষ্টি হাসি দিয়ে পয়সা দেওয়ার ছবিটা এখন আমার বুকের ভেতর ঝড়োবৈশাখ হয়ে ওঠে। তোমার কষ্ট পাওয়ার ছবিটা এখন পুরো মেঘ কষ্ট হয়ে আমার মনের আকাশে ভেসে বেড়ায়। পয়সার সঙ্গে এ সংসারে তোমার তো কোনো সম্পর্ক ছিল না, পয়সা তো ছিল বাবার দখলে।

সারাবাড়িতে উঠোনে এখনো আমি আমাকে খুঁজি-মা তোমাকে খুঁজি-মায়ের স্বপ্নভরা চোখ খুঁজি-মায়ের শরীরের গন্ধ খুঁজি। দুঃখের গান ছাড়া আর কিছুই পাই নে। রাত গভীর হয়, সারাবাড়ি শান্ত হয়ে আসে-আমি এক নিঃসঙ্গ দোয়েল উঠোনে বসে থাকি-আঁধারের চাদর আমাকে ঘিরে রাখে-মাটি স্পর্শ করে দেখি-যেখানে তোমার নিঃশ্বাস-তোমার গায়ের গন্ধ-তোমার চোখভরা মনভরা স্বপ্ন লেগে আছে-আমি স্বপ্নগুলো ধরতে অন্ধকারে হাত পাতি-মেঘ ভেঙে প্রবল বৃষ্টি নামে-আমার বুকের তামাদি মাটি হু হু করে কেঁদে ওঠে।

মা, তুমি একবার বলেছিলে, ‘বাপ, বৃষ্টি হয়ে গেছে। মাটি নরম আছে। এখন চালকুমড়োর চারা এনে ঘরের পাশে লাগা দে। এখন লাগালে তাড়াতাড়ি বড় হবে।’

চালকুমড়োর চারা খুঁজছি বৃষ্টিভেজা মাঠে হঠাৎ আখের জমিতে চোখের সামনে বিশাল একটা গোখরা সাপ। ফণা ধরে ফস ফস করতে লাগল। ভয় না পেয়ে সে কি আনন্দ তখন আমাদের। মাথায় এক বুদ্ধি সাপটা ধরে বাড়ি নিয়ে যাব। সেই সাপের সঙ্গে খেলা করছিল আমার আর এক ভাই, আর আমি দৌড়াতে দৌড়াতে বাড়ি আসি কলসি নিতে, সাপকে কলসিতে ভরব বলে। মা আমার অতি ব্যস্ততার সঙ্গে কলসি নেওয়া দেখে জিজ্ঞেস করল, কলসি নিয়ে কই যাচ্ছিস? -মা, সাপ ধরব। সাপ ধরার কথা শুনে মায়ের মন আর মুখের কি অবস্থা হয়েছিল-কি পরিমাণ দুশ্চিন্তা হয়েছিল, তা আর দেখা বা জানা হয়নি কোনো দিন। এক ভোঁ দৌড় দিয়েই সাপের কাছে চলে আসি। সঙ্গে এলো আর এক ভাই। এসে দেখি, সেই ভাইটা ভয়াল গোখরার সঙ্গে ঠিকই খেলছে। সাপের মুখের সামনে একটু পর পর একটু করে মাটি ছুঁড়ে দিচ্ছে, গোখরা সাপটা রাগে ক্ষোভে ছুঁড়ে দেওয়া মাটিতে দংশন করছে আর ফণা তুলছে।

আমরা তিনভাই যখন বিষধর গোখরার সামনে কলসির মুখ রেখে, কলসির মুখে মাটির ছোট ছোট টুকরো ছুঁড়ে দিতে থাকি, সাপটি কলসির মুখে ছোবল মারতে মারতে কলসির ভেতরে ঢুকে যেতেই, কলসির মুখ বিদ্যুৎ গতিতে গামছা দিয়ে বেঁধে ফেলি। তারপর যেন বিজয়ের আনন্দে সাপভর্তি কলসি নিয়ে যখন বাড়িতে আসি, মা শুনেই তো তার দুচোখে আর পুরো মুখে সে কি ভয় আর বিস্ময়! সেই চোখ আমি এখনো খুঁজি। বাড়ির কোথাও সেই চোখ এখন আর বিস্ময়ে দেখে না আমাকে। আমি নদীর নীরব স্রোতের মতো বাড়ির প্রতিটি ধূলিকণায় মিশে থাকি-মাকে কিছুতেই পাই না, কোথাও পাই না। উৎসবের ভেতরেও আমি কত যে নিঃসঙ্গ-আমার বুকে কষ্টের কি যে শ্মশান জ্বলে-আমার ভেতরে সমুদ্র কান্না আছড়ে পড়ে-সেই ছোট্ট আমি আমার ভেতরে অবুঝের মতো মা মা করে কেঁদে বেড়াই-আমার কোনো সান্তনা থাকে না। আমি এক পাথর মূর্তির মতো শুধুই চেয়ে থাকি। যেন পাথরের চোখ। (চলবে)