উপন্যাসে বিপ্লবী আন্দোলন

ঢাকা, শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ৫ আশ্বিন ১৪২৬

উপন্যাসে বিপ্লবী আন্দোলন

ড. রকিবুল হাসান ৬:০৩ অপরাহ্ণ, আগস্ট ৩০, ২০১৯

print
উপন্যাসে বিপ্লবী আন্দোলন

ব্রিটিশশাসিত ভারতবর্ষের নানামাত্রিক আন্দোলন ও ইংরেজের দুঃশাসন সেসময় অনেক লেখকের রক্ত ফণা হয়ে ফুটে উঠেছিল। নজরুল তাদের মধ্যে বিশেষভাবে অন্যতম ও প্রধান। কবি হিসেবে নজরুল অবিশ্বাস্য খ্যাতি ও জনপ্রিয়তা লাভ করেছিলেন। ঔপন্যাসিক হিসেবে তিনি বিশেষ খ্যাতি অর্জন করতে না পারলেও তার উপন্যাসগুলোর মধ্যে ব্যক্তি-নজরুল, পারিবারিক জীবন, অভাব-অনটন, দুঃখ-দারিদ্র্য, প্রেম-প্রণয়, রাজনৈতিক চেতনা ও দেশপ্রেমের যে চিত্র আছে, তার মূল্য অনেক। ব্যক্তি নজরুলকে জানার জন্য তার উপন্যাস গুরুত্বপূর্ণ। তার প্রথম উপন্যাস ‘বাঁধনহারা’, দ্বিতীয় উপন্যাস ‘মৃত্যুক্ষুধা’ ও শেষ উপন্যাস ‘কুহেলিকা’। বাঁধনহারা মূলত পত্রোপন্যাস।

এই উপন্যাসে নজরুলের সৈনিক জীবনের অভিজ্ঞতা যেমন স্থান পেয়েছে, তেমনি পারিবারিক, সামাজিক, প্রেম-প্রণয়, অনুযোগ-অভিযোগ এবং আদর্শের কথাও রয়েছে। উপন্যাসের নায়ক নূরুল হুদা চরিত্রটি মূলত নজরুলের বায়োগ্রাফি। সংসারের বন্ধন ছিন্ন করে নজরুল যে একদিন পরাধীন দেশের মুক্তির জন্য, দেশের সাধারণ মানুষের জন্য জীবন দিয়ে তাদের জীবনকে প্রতিষ্ঠিত করার সংগ্রামে অবতীর্ণ হবে, তার আভাস নুরুল হুদা চরিত্রে পাওয়া যায়, যা নজরুল চরিত্রের প্রতিচ্ছবি।

‘মৃত্যুক্ষুধা’ উপন্যাসে দারিদ্র্যের ভয়ঙ্কর রূপ প্রতিফলিত হয়েছে। ক্ষুধা-দারিদ্র্য মানুষকে কীভাবে তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে ধাবিত করে, ধর্মবিশ্বাস ও জন্মার্জিত সংস্কার কীভাবে গুরুত্বহীন ও শিথিল হয়ে যায়, তা এ উপন্যাসের মূল বিষয়। এই উপন্যাস লেখার সময় নজরুলের জীবনযাপন ছিল অভাব-অনটনে জর্জরিত। জীবন চালানোই তখন কঠিন হয়ে উঠেছিল, এই বাস্তবতাই ‘মৃত্যুক্ষুধা’তে স্থান পেয়েছে। তার জীবনের সে-সময়ের কঠিন অভিজ্ঞতা যে কত বহু বিস্তৃত ও রূঢ়-কঠিন ছিল, তা এ উপন্যাসে উপস্থিত। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য, তার বহু বিখ্যাত ‘দারিদ্র্য’ কবিতাটিও এ সময়ে রচিত।

‘কুহেলিকা’ তার তৃতীয় উপন্যাস। এ উপন্যাসটি পাঠকের সবচেয়ে বেশি আগ্রহের বিষয়। এ উপন্যাসটি বিপ্লবী উপন্যাস হিসেবে পরিচিত। কুহেলিকার প্রমত্ত’র চরিত্রের সঙ্গে পথের দাবির সব্যসাচীর চরিত্রের মিল স্পষ্ট। সব্যসাচী চরিত্র নিমিত হয়েছে নরেন ভট্টাচার্য অর্থাৎ এম এন রায়ের চরিত্র অবলম্বনে।

যদিও অনেকে মনে করেন নজরুল প্রমত্ত চরিত্র সৃষ্টি করেছেন তার স্কুল-শিক্ষক নিবারণ ঘটকের চরিত্র অবলম্বনে। এর অনেক যুক্তিও রয়েছে। কিন্তু সেই অগ্নিকালের বাস্তবতা সম্মুখে রেখে নজরুলের বিপ্লবীসত্তা ও তার বিপ্লবী অন্যান্য রচনা বিচার করে ‘কুহেলিকা’ চরিত্রবিচারে অগ্রসর হলে রহস্যের দুয়ার ঠেলে প্রকৃত সত্যকে আরও অনেকখানি অনুমান করা সম্ভব হয়। পরাধীন ভারতের মুক্তির জন্যে যে সব বিপ্লবীরা জীবনবাজি রেখে সংগ্রাম করেছেন, তাদের প্রতি নজরুলের অপরিসীম শ্রদ্ধা ও অকুণ্ঠ সমর্থন ছিল। তিনি নিজেও ভারতমুক্তির জন্যে অগ্নিলেখনী ধারণ করেছিলেন। সে-জন্য তাকে জেল-জুলুম নিপীড়ন-নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে।

কুহেলিকায় প্রমত্ত’র নেতা বজ্রপাণি যে চরিত্রটি পরোক্ষভাবে উপন্যাসে উপস্থিত, তার মধ্যে বাঘা যতীনের চরিত্রটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যদিও আরও কিছু চরিত্রের মধ্যে বাঘা যতীনের বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের পরিচয় ফুটে উঠেছে। নজরুলের বিপ্লবী জীবনে বাঘা যতীনের প্রভাব যে স্পষ্ট তা তার কবিতাতেও লক্ষণীয়। নজরুলের প্রলয়-শিখা কাব্যগ্রন্থে ‘নব-ভারতের হলদিঘাট’ কবিতাটি বাঘা যতীনের বীরত্বগাথাকে কেন্দ্র করে তিনি রচনা করেছিলেন। ব্রিটিশ-বাহিনীর সঙ্গে বীরত্বপূর্ণ এবং প্রথম সম্মুখযুদ্ধ করে বাঘা যতীনের আত্মাহুতি দানের মাধ্যমে ভারত-স্বাধীনতা যে মহাকাব্য রচিত হয়েছিল, তার ভেতর ফুটে উঠেছিল নতুন এক ভারতের স্বপ্ন-বীজ, যার অঙ্কুরোদগম ঘটে বালেশ্বরের বুড়িবালাম নদীর তীরে।

কাজী নজরুল ইসলামের মনে বিপ্লবী বাঘা যতীনের বীরত্বপূর্ণ আত্মাহুতি ব্যাপক প্রভাব ফেলে। নজরুল ইসলাম তার ধূমকেতু পত্রিকায় অষ্টম সংখ্যায় বাঘা যতীনের ছবি বড় করে ছেপেছিলেন। একটি প্রবন্ধে বাঘা যতীন সম্পর্কে তিনি লেখেন ‘বাঙলার বিপ্লব-যুগের প্রথম সেনানায়ক-পুরুষ সিংহ, যতীন্দ্রনাথ’। ১২তম সংখ্যায় তিনি অন্যান্য বিপ্লবীদের ছবির সঙ্গে বাঘা যতীনের ছবি আবারও ছাপেন। বাঘা যতীনের প্রতি নজরুলের যে কী অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা ছিল, এসব তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

কুহেলিকাতে জয়তী চরিত্রটি যখন চোখের সামনে উজ্জ্বল আলোর মতো জ্বলে ওঠে, তখন বাঘা যতীনের দিদি বিনোদবালার ছবিটিও চোখের সামনে চলে আসে। এ যেন বিনোদ বালার স্বরূপে বিকশিত জয়তী চরিত্রটি। বাঘা যতীনের বাঘা যতীন হয়ে-ওঠার ক্ষেত্রে বিনোদবালার ভূমিকা ছিল অবিশ্বাস্যরকম। তরুণ বিপ্লবীদের কাছে বিনোদ বালা ছিলেন পরম শ্রদ্ধা, আশ্রয় ও সাহসের জায়গা। জয়তী চরিত্রটি তৈরির ক্ষেত্রে নজরুলের মনে অবচেতন বা সচেতনভাবে বিনোদ বালা প্রভাব রাখতে পারে।

বজ্রপাণি ও প্রমত্ত দুটি চরিত্র বাঘা যতীন ও এম এন রায়ের চরিত্র অবলম্বনে সৃষ্টি, তা এখন অনুমেয়। নজরুল বাঘা যতীনের বিপ্লবী কর্মকাণ্ড দ্বারা যে প্রভাবিত হয়েছিলেন তা তার সাহিত্যে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান। ভারতমাতাকে মুক্ত করার জন্য বাঘা যতীন ও এম এন রায় যে সশস্ত্র বিপ্লবী প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন, কুহেলিকার বজ্রপাণি এবং প্রমত্ত-র ভেতর তা লক্ষণীয়।

কুহেলিকা উপন্যাসে নিবারণ ঘটকের ছায়ায় প্রমত্ত চরিত্রটি অঙ্কিত বলে অনেক গবেষকের অভিমত রয়েছে। নজরুলের শিক্ষক হিসেবে তার মনে নিবারণ ঘটক প্রভাব ফেলবেন এটিই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রমত্ত চরিত্রটি যেভাবে অঙ্কিত হয়েছে, বাস্তব প্রেক্ষিতে সেটি কতটা গ্রহণযোগ্য সে প্রশ্ন একেবারে উড়িয়ে দেওয়া কঠিন। জার্মান ষড়যন্ত্রের যে কথা বলা হয়েছে, সেখানে তো নিবারণ ঘটক নেই। চুলচেরা বিচার-বিশ্লেষণ করলে সেটি তো এম এন রায়ের চরিত্র অবলম্বনে নির্মিত বলেই ধারণা হয়।

আরও একটি প্রসঙ্গ উল্লেখ করা যেতে পারে, পিণাকীর ফাঁসির ঠিক আগ-মুহূর্তে ম্যাজিস্ট্রেট তৎক্ষণাৎ মাটির টুপি খুলে তাকে যে অভিবাদন জানিয়ে বলেছিল, ‘আমি তোমায় প্রণাম করি বালক! মৃত্যু-মঞ্চই তোমার মতো বীরের মৃত্যুঞ্জয়ী সম্মান। তোমার মতো বীরের বন্দনা করবার সম্মান জীবনের নাই।’ বাস্তবে তা পরিলক্ষিত হয় বাঘা যতীনের ক্ষেত্রে।

কুহেলিকা উপন্যাসে নজরুলের ভাবুকমন যে বিপ্লবপন্থায় প্ররোচিত হয়েছে তার পরিণাম উপর্যুক্ত অংশে অনুরুদ্ধ হয়েছে। বাঘা যতীন ও এম এন রায়ের ‘আইকন-তত্ত্ব’ ক্রমশ বিচ্ছুরিত হয়েছে নজরুলের বিচিত্র চরিত্রের আভ্যন্তরিক ও আন্তর্জালিক আবহে। সেক্ষেত্রে কুহেলিকা উপন্যাসের বিধৃত বিপ্লবপন্থা অর্জন করে নতুন মাত্রা। একই সঙ্গে বিপ্লবপন্থার পরিণামেও কুহেলিকা হয়ে ওঠে নবতর শিল্পাঙ্গিক।