রূপালী পর্দার বিদ্রোহী

ঢাকা, শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ৫ আশ্বিন ১৪২৬

রূপালী পর্দার বিদ্রোহী

অনুপম হায়াৎ ৫:৪৩ অপরাহ্ণ, আগস্ট ৩০, ২০১৯

print
রূপালী পর্দার বিদ্রোহী

বিজ্ঞানের অষ্টম আবিষ্কার এবং শিল্পকলার সপ্তম কলা হচ্ছে চলচ্চিত্র। আবার সপ্তকলাকে ধারণ করে চলচ্চিত্র হয়ে উঠেছে স্বয়ংসম্পূর্ণ এক মাধ্যম। এর আবিষ্কার পাশ্চাত্যে বৈজ্ঞানিকের ল্যাবরেটরিতে আর বিস্তার ঘটেছে ব্যবসায়ীদের হাতে। আর এটি শিল্প হয়ে উঠেছে সৃজন ও মননের স্পর্শে। এ ব্যাপারে অবদান রেখেছেন সৃজনশীল চিত্রপরিচালক, শিল্পী ও কবি-সাহিত্যিকরা।

বাংলা চলচ্চিত্র উন্মেষপর্বে সেই নির্বাক ও সবাক যুগে (১৯১৭-১৯৪৬) ক্রমেই শিল্পিত ও অভিজাত হয়ে ওঠে যুগস্রষ্টা কয়েকজন কবি-সাহিত্যিকের সৃষ্টিকর্ম ধারণ করে। যেমন সেই নির্বাক যুগে ১৯২২ সালে প্রথম চলচ্চিত্রায়িত হয় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস ‘বিষবৃক্ষ’, শরৎচন্দ্রের উপন্যাস ‘আঁধারে আলো’ এবং ১৯২৩ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটগল্প ‘মানভঞ্জন’। আর ১৯৩১ সাল থেকে বাংলা চলচ্চিত্র গানে গানে সরব হয়ে ওঠে কাজী নজরুল ইসলামের সংগীত ও সুরের স্পর্শে তার প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের মাধ্যমে।

কালজয়ী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬)। বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সংগীত, সাংবাদিকতা, রাজনীতি, নাটক, বেতার, গ্রামোফোন ও চলচ্চিত্র তার প্রতিভার স্পর্শে হয়েছে উজ্জ্বল। ১৯৪২ সালের জুলাই মাসে অসুস্থ হওয়ার আগে পর্যন্ত তিনি মেতেছিলেন ‘সৃষ্টি সুখের উল্লাসে’। তার সৃষ্টির ক্ষেত্র ছিল আধুনিক বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী জনপ্রিয় শিল্প গণমাধ্যম চলচ্চিত্রও। চলচ্চিত্রে তিনি অবদান রেখেছেন সুরভা-ারি, পরিচালক, সংগীতকার, সুরকার, গীতিকার, অভিনেতা, গায়ক, চিত্রনাট্যকার, সংলাপকার ও সংগঠক হিসেবে। ১৯৩১ থেকে ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে অসুস্থ হওয়ার আগে পর্যন্ত চিত্রলোকে নজরুল ছিলেন এক সক্রিয় ব্যক্তি। শুধু বাংলা চলচ্চিত্র নয়, নজরুলের দানে সমৃদ্ধ হয়েছে হিন্দি, উর্দু ও পাঞ্জাবি ভাষায় নির্মিত চলচ্চিত্রও।

নজরুলের জন্ম বায়োস্কোপ চালুর যুগে। তার জন্মের দুই/তিন বছরের মধ্যেই মানিকগঞ্জের হীরালাল সেন কলকাতায় প্রথম বায়োস্কোপ বা চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। হীরালালই প্রথম বাঙালি চলচ্চিত্রকার। আর ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে বিদ্রোহী প্রেমিক কবি নজরুল চলচ্চিত্রে জড়িত হয়ে বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে পথিকৃতের মর্যাদা পান।

নজরুল মোট কটি চলচ্চিত্রের সঙ্গে জড়িত ছিলেন তা এখনো পুরোপুরি বলা সম্ভব নয়। কেননা নজরুলের জীবন ও কর্ম মহাখনিতুল্য। গত ৪০-৫০ বছর ধরে গবেষণা করেও অনেকে নজরুল সম্পর্কে খুব সামান্যই জানতে পেরেছেন। এ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে দেখা যায়, নজরুল ২০-২১টি ছবির সঙ্গে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। এসব ছবির মধ্যে রয়েছে- জলসা (আবৃত্তি ও গান), ধূপছায়া, প্রহ্লাদ, বিষ্ণুমায়া, ধ্রুব, পাতালপুরী, গ্রহের ফের, বিদ্যাপতি (বাংলা), বিদ্যাপতি (হিন্দি), গোরা, সাপুড়ে (বাংলা), সাপেড়া (হিন্দি), নন্দিনী, চৌরঙ্গী (বাংলা), চৌরঙ্গী (হিন্দি), দিকশূল, অভিনয় নয়, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম (প্রামাণ্য চিত্র), বিদ্রোহী কবি (প্রামাণ্য চিত্র), কবি নজরুল (প্রামাণ্য চিত্র), কাজী নজরুল ইসলাম (প্রামাণ্য চিত্র) ও একটি উর্দু ছবি।

অবিভক্ত বাংলায় ব্যবসায়িক ভিত্তিতে চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করে পারসি চিত্র প্রতিষ্ঠান ম্যাডান থিয়েটারস। এই প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে কলকাতায় প্রথম নির্বাক বাংলা ছবি ‘বিশ্বমঙ্গল’ নির্মিত হয় ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে। ম্যাডান থিয়েটারসই ১৯৩০-৩১ খ্রিস্টাব্দে প্রথম সবাক বাংলা ছবি নির্মাণেরও উদ্যোগ নেয় বাণিজ্যিক কারণে। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে নজরুলকে ম্যাডান থিয়েটারস ‘সুরভাণ্ডারি’ নিযুক্ত করে। নজরুলের সুরভাণ্ডারি নিযুক্ত হওয়ার সংবাদটি কলকাতার দৈনিক ‘বঙ্গবাণী’ পত্রিকায় ১৯৩১ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সংখ্যায় ছাপা হয়। সুরভাণ্ডারি হিসেবে নজরুলের দায়িত্ব ছিল সবাক চিত্রে অংশগ্রহণকারী নট-নটীদের কণ্ঠস্বর পরীক্ষা করা। উল্লেখ্য, সুরভাণ্ডারি পদটি সংগীত পরিচালকেরও ওপরে। ম্যাডান থিয়েটারসে সুরভাণ্ডারি হিসেবে নজরুলের যোগদানের পরই পরীক্ষামূলকভাবে ৩০-৪০টি সবাক খণ্ডচিত্র নির্মিত হয়।

এগুলো ‘জলসা’ নামে মুক্তি পায় ১৯৩১ সালের ১৩ মার্চ। সম্ভবত এই চিত্রে নজরুল তার ‘নারী’ কবিতাটি আবৃত্তি ও একটি গান পরিবেশন করেছিলেন; কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের, বাংলা সবাক চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অবিস্মরণীয় সেই ঘটনার প্রামাণ্য নিদর্শনটি এখন দুষ্প্রাপ্য। ম্যাডান থিয়েটারসের অন্যতম পার্টনার মিসেস পিরোজ ম্যাডান ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দে পায়োনীয়ার ফিল্মস কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। এই প্রতিষ্ঠান থেকে গিরিশ চন্দ্রের ‘ধ্রুব চরিত’ নিয়ে ছবি নির্মাণের ঘোষণা দেওয়া হয়। ‘ধ্রুব’র পরিচালক নিযুক্ত হন কাজী নজরুল ইসলাম ও সত্যেন্দ্রনাথ দে। নজরুল এ ছবির সংগীত পরিচালনা ও গান রচনা করেন। তিনি ছবির নারদ চরিত্রে রূপদান করেন এবং গানেও কণ্ঠ দেন।