সন্ন্যাসী রহস্য

ঢাকা, শুক্রবার, ২২ নভেম্বর ২০১৯ | ৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

সন্ন্যাসী রহস্য

গল্প

কর্মকার অনুপ ৫:২০ অপরাহ্ণ, আগস্ট ৩০, ২০১৯

print
সন্ন্যাসী রহস্য

পান্নালাল রায় জয়দেবপুর অঞ্চলের মানুষ না হলেও বহু বছর যাবৎ এই এলাকাতেই স্ত্রী ও তিন পুত্র নিয়ে বসবাস করছেন। তার কারণ পেশা। পান্নালাল বাবু এখানকার নামকরা উকিল। বহু বছর ধরে এখানে বসবাস ও পেশাদারী সফলতার কারণে সুনাম যেমন কুড়িয়েছেন, রোজগারের পথও সুগম ও প্রশস্ত করেছেন।

সংসারে যা খরচ তার চেয়ে উপার্জন ঢের। তাই ধনাঢ্য হিসেবে এলাকাতে চিহ্নিত হয়ে উঠেছিলেন। এর অবশ্য কিছু সুবিধা ও অসুবিধা আছে। সেসব মেনেই পান্নালাল মহাশয়ের সচ্ছল জীবন ভালোই চলছিল। কিন্তু একদিন এমন এক মহাবিপত্তি এসে তার ঘাড় জুড়ে আসন পাতবে তা বোধহয় তিনি স্বপ্নেও ভাবেননি।

সেবার দুর্গাপূজার পর চারদিকে চাউর হলো-এলাকাতে কোনো এক পিশাচসিদ্ধ সন্ন্যাসীর দেখা মেলে প্রায়ই। মানুষকে দেখেই তিনি তার অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ বলে দিতে পারেন। কিন্তু তাকে কখনো দিনের বেলায় দেখা যায় না। রাতের অন্ধকারে তিনি কোনো কোনো বাড়ির উঠানে হঠাৎ আবির্ভূত হয়ে ভিক্ষা সংগ্রহ করেন। গৃহস্থের দানে যদি তিনি সন্তুষ্ট হন তবে গৃহের কল্যাণে বর প্রদান করেন। বর প্রদান করে তিনি আবার কোথায় হাওয়ায় মিলিয়ে যান তা কেউ জানে না।

এদিকে এলাকায় এই পিশাচসিদ্ধ সন্ন্যাসীর খবরে যখন চারদিকে কানাকানি চলছিল তার কিছুদিন পূর্ব হতেই পাড়ায় পাড়ায় চুরির ঘটনা ব্যাপকভাবে বেড়ে গিয়েছিল। এমন ঘটনায় পুলিশের কাছে প্রায় প্রতিদিনই অভিযোগ আসছে। ধারাবাহিক এমন বেশ কয়েকটি অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ পাড়ায় পাড়ায় টহল বৃদ্ধি করল। কিন্তু তাতে অভিযোগের মাত্রা তেমন কমছে না। বাড়ি বাড়ি চুরি যেন ধারাবাহিক ঘটনা হয়ে উঠতে লাগলো।

দীপাবলির দিন সাতেক আগের কথা। পান্নালাল বাবু গেছেন পাড়ায় কালীপূজা আয়োজনের আলোচনায়। রম্ভা দেবী সান্ধ্যকালীন তুলসী পূজার জন্য উঠানের তুলসীতলায় আয়োজন করছেন। প্রদীপে আলো দিয়ে সবে মাত্র ধূপ জ্বেলেছেন। এমন সময় উঠানে লাল একখ- কাপড় জড়ানো, সারা গায়ে মুখে শুভ্র ছাই মাখা, ছ’ফুট লম্বা এক সন্ন্যাসীর আবির্ভাব হলো। রম্ভা দেবী সন্ন্যাসীকে দেখে দৌড়ে গিয়ে ষাষ্ঠাঙ্গে প্রণাম করলেন। সন্ন্যাসী তার ভিক্ষার ঝুলি পেতে দিয়ে বললেন, ভিক্ষা দে মা।

রম্ভা দেবী হাত পায়ে রক্তের চঞ্চলতা বৃদ্ধি পেতে লাগলো। কম্পিত স্বরে জানতে চাইলেন, কী ভিক্ষা দেবো বাবা?
-তোর যা ইচ্ছা দে। সবই তার ইচ্ছা।
এই বলে সন্ন্যাসী বাড়ির ভেতরে পাঁচিল ঘেষে হেঁটে বাড়ি প্রদক্ষিণ করতে লাগলেন এবং এমন এক মন্ত্র উচ্চারণ করেতে লাগলেন যা রম্ভা দেবী এর আগে কখনো শোনেননি। এমন দৃশ্য দেখে রম্ভা দেবী ভীত হয়ে ঘরের মধ্য থেকে আহার্য ফলমূল, মিষ্টান্নসহ অর্ঘ্য এনে সন্ন্যাসীর পায়ের কাছে রাখলেন। সন্ন্যাসী ভিক্ষা গ্রহণ করে রম্ভা দেবীকে উদ্দেশ্য করে বললেন, তোর মঙ্গল হউক। গৃহজুড়ে প্রশান্তি বিরাজ করুক।

রম্ভা দেবী এমন মঙ্গল বাক্য শুনে গদগদ হয়ে উঠলেন এবং আবার ষাষ্ঠাঙ্গে প্রণাম করার জন্য সন্ন্যাসীর পায়ের কাছে উপুড় হয়ে পড়লেন। কিন্তু প্রণাম শেষে যখন উঠলেন তখন আর কাউকে দেখতে পেলেন না।

রাতে পান্নালাল বাবু যখন বাড়ি ফিরলেন তখন সমস্ত ঘটনা খুব উৎফুল্ল কণ্ঠে রম্ভা দেবী তার স্বামীর কাছে বর্ণনা করতে লাগলেন। কিন্তু পান্নালাল বাবু তার স্ত্রীর কথায় তেমন গুরুত্ব দেবার প্রয়োজন দেখালেন না।

দীপাবলির দিনের ঘটনা। বাড়িময় ছেলেপুলের দল হৈ-হল্লা করে বেড়াচ্ছে, বাজি পোড়াচ্ছে। ছেলেপুলের এমন আনন্দে এসে বাড়ির অন্যরাও যোগ দিয়েছে। এমন সময় পান্নালাল বাবুর বাড়িতে মনোরঞ্জন শীলের আগমন। পান্নালাল বাবু বাড়ির উঠানেই ছিলেন। মনোরঞ্জন শীল বাড়িতে ঢুকেই পান্নালাল বাবুর দিকে হাত জোড় করে হে হে... হে হে... শব্দ করে একটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হাসি দিয়ে বলে উঠলেন, নমস্কার উকিল বাবু। কেমন আছেন?

পান্নালাল বাচাল গোছের লোক পছন্দ করেন না। বাচাল বলতে যেটা বোঝায় মনোরঞ্জন সেটার পিতামহ। মনোরঞ্জনের আগমনের হেতু বুঝতে পান্নালালের বাকি থাকলো না। তিনি স্পষ্টতই বুঝতে পারছেন যে তার স্ত্রীর সঙ্গে পিশাচসিদ্ধ সন্ন্যাসীর দেখা হবার ব্যাপারে এখন কিছু অহেতুক বাক্য ব্যয় করতে হবে। নিজেকে কিছুটা লাগামের মধ্যে রেখে পান্নালাল বাবু মনোরঞ্জনের প্রশ্নের জবাব দিলেন, আরে মনোরঞ্জন যে! আছি ভালো। তোমার খবর কী হে?

-আজ্ঞে আমার খবর ভালো।
-তা আজ দীপাবলির দিন ছেলেপুলে নিয়ে আনন্দ করছো না?
-হেহে... হেহে... আমার মতো লোকের আর আনন্দ। বাবু মা-ঠাকুরাণ নাকি সেদিন ঐ সন্ন্যাসীকে দেখেছেন?
-হ্যাঁ তা দেখেছেন হয়তো। কিন্তু আমার এসবে বিশ্বাস হয় না মনোরঞ্জন। তুমি যাও মা-ঠাকুরাণ ঘরের মধ্যে প্রদীপ জ্বালছেন। তার সঙ্গে আলাপ করো গিয়ে।

মনোরঞ্জনকে দেখে রম্ভা দেবী কিছুটা উৎফুল্ল হলেন। লোকমুখে শুনেছেন, তিনিও নাকি ঐ সন্ন্যাসীর দেখা পেয়েছিলেন। এ ব্যাপারে অভিজ্ঞতা ভাগাভাগির মতো একটা লোক তো অন্তত পাওয়া গেল।

রাত আড়াইটা নাগাদ পাড়ার মন্দিরে মায়ের পূজার আয়োজন চলছে। চারদিকে এখন কিছুটা নিস্তব্ধতা। পূজার আয়োজনে পান্নালালও উপস্থিত। কিন্তু হঠাৎ ঋতুগত আবহাওয়া পরিবর্তনে কিছুটা শারীরিক বেদনা আজ তাকে ঘিরে ধরেছে। তাছাড়া সন্ধ্যা থেকে ছেলের দল নিয়ে বাড়িতে হুল্লোড় করে সে কিছুটা ক্লান্তও। মাকে প্রণাম করে তাই তিনি বাড়ির পথ ধরলেন। ভেতরে ঢুকতে যাবেন এমন সময়ে বাড়ির দোতলার বারান্দা থেকে বাড়ির পাঁচিলের ঠিক আগখানে ধপাস্ করে কী যেন একটা পড়লো। কিছুটা ভড়কে গিয়ে ওদিকে এগোতে যাবেন এমন সময় অন্ধকারের মধ্য থেকে কে যেন তাকে ধাক্কা দিয়ে প্রধান ফটকের দিকে দৌড় দিলো। বুঝতে আর বাকি রইলো না যে বাড়িতে চোর মহাশয় আতিথ্য গ্রহণ করেছেন। সাথে সাথে ‘চোর চোর চোর...’ বলে দৌড় দিলেন চোরের পিছু।

অনেক দৌড়াদৌড়ির পর দুটো পাড়া পেড়িয়ে গিয়ে চোর ব্যাটাকে ধরা হলো। সারা গায়ে চুপচুপে তেল মাখা একটি মাত্র নেংটি পরা বিশালদেহী একটা লোক। ধরা পড়ার পর বেদম প্রহার। শেষে একটা বস্তা দিয়ে হাতমুখ পেঁচিয়ে বেঁধে বাড়ির উঠানে এনে রাখা হয়েছে। তা দেখে রম্ভা দেবীর চোখ চড়কগাছ!

-এ কী! এ যে সেই সন্ন্যাসী বাবা! তোমরা কোনো ভুল করে ওনাকে ধরে আনোনি তো?
-হ্যাঁ রাত দুপুরে তোমার সন্ন্যাসী বাবা সারা গায়ে চুপচুপে তেল মেখে বাড়ি বাড়ি মহান সাধনা করে বেড়াচ্ছেন! এমন কথায় বাড়ির উঠানে সবাই হো হো করে হেসে উঠলেন। পান্নালাল বাবু বিজ্ঞ আইনজীবী। অবস্থা বেগতিক দেখে তিনি পাড়ার ছেলেদের থামিয়ে থানায় খবর দিলেন। কিছুক্ষণ বাদে পুলিশ এসে চুপচুপে তেল মাখা চোরকে দড়ি বেঁধে নিয়ে গেল।

পরের দিন বিকেলে মনরঞ্জনের দোকান আর খোলা পাওয়া গেল না। লোকমুখে শোনা গেল দুপুরে পুলিশ এসে তাকে বাড়ি থেকে ধরে থানায় নিয়ে গেছে। গত রাতে যে চোরটি ধরা পড়েছে সে আর মনোরঞ্জন নাকি বহুদিন ধরেই পরিকল্পনা করে চুরি করে বেড়াচ্ছে।

ঘটনার যবনিকাপাত এখানেই হতে পারতো যদি না আর একটি ঘটনা পান্নালাল বাবুর জীবনে এমন বিপত্তি ডেকে না আনতো। চোরের আর মনোরঞ্জনের সাজা হয়ে গেছে আদালতে। এই ঘটনার মাস দু’য়েক পরে একদিন গোধূলিবেলায় পান্নালাল বাবু তার বাড়ির উঠানে আরাম কেদারায় বসে বিশ্রাম করছেন। সূর্য ডুবে গেছে তবে আকাশে তখন দীপ্তি বিদ্যমান।

এমন সময়ে একখ- লাল কাপড় পরা, সারা গায়ে ছাই মাখা, কপালে সিঁদুরের লেপন দেয়া জটাধারী এক সন্ন্যাসী এসে উপস্থিত। তিনি এসে উঠানে দাঁড়িয়ে হুংকার দিলেন, ‘ভিক্ষান্ন দে!’ পান্নালাল বাবু মনে মনে ভাবলেন পূর্বের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে যাচ্ছে। আবার কোন বাটপাড় এসেছে বাড়িতে চুরির ছক কষতে। তিনি দৌড়ে ঘরে গিয়ে আগে থানায় ফোন করে সব জানালেন এবং সন্ন্যাসীকে শায়েস্তা করার জন্য রসুইঘর থেকে বাম হাতে একটা চেলাকাঠ নিয়ে উঠানের দিকে দৌড় দিলেন।

কিছুক্ষণ বাদে পুলিশ যখন এলো তখন তারা এসে আর কোনো সন্ন্যাসীর দেখা পেলেন না। দেখতে পেলেন পান্নালাল বাবু উঠানে মাটিতে শুয়ে কাৎরাচ্ছেন আর রম্ভা দেবী তার পাশে বসে তাকে সামাল দেবার চেষ্টা করছেন।