‘ননফিকশন’ চর্চার প্রথম প্রয়াস

ঢাকা, শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ৫ আশ্বিন ১৪২৬

‘ননফিকশন’ চর্চার প্রথম প্রয়াস

নাজমুল হাসান পলক ৪:২৪ অপরাহ্ণ, আগস্ট ৩০, ২০১৯

print
‘ননফিকশন’ চর্চার প্রথম প্রয়াস

প্রথম থেকে তেরো সংখ্যা অবধি ‘চিহ্ন’ বেরিয়েছিল ছোটোকাগজের মেজাজে। এরপর থেকে সাহিত্যের কাগজের প্রতিশ্রুতি নিয়ে। পঁচিশ সংখ্যায় এসে আমরা আরেকটি বদলের সাক্ষী হয়েছিলাম; নিয়মিত বিভাগের পাশাপাশি চিহ্ন বের করতে শুরু করলো বিশেষ বিষয়ভিত্তিক ক্রোড়পত্র।’ এটি অবশ্য স্বীকার্য যে-কালের সমান্তরালে ছোটকাগজের সংজ্ঞান্তর ঘটেছে; গ্রহীষ্ণুতা, সম্প্রসারণ প্রবণতা, আপোষকামিতা বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এই চরিত্র বিকাশের মাত্রা আলোচনা সাপেক্ষ এবং বিতর্কিত।

অর্ধ-সহস্রেরও অধিক পৃষ্ঠা সংবলিত এই সংখ্যাটিকে চিহ্ন ননফিকশন সংখ্যারূপেও অবহিতকরণের সুযোগ রয়েছে; ধারণা করা চলে আগামীতে পরিচয়টি এমনই দাঁড়াবে। ‘ননফিকশন’ শব্দটির একটি গ্রহণযোগ্য, মোক্ষম বাংলা প্রতিশব্দ এখনো আমাদের ভাষাবিদ-পণ্ডিতেরা তৈরি করতে পারেননি, এটি যেন সান্ধ্যশব্দ; ভাষার দারিদ্র্য নয় এর পশ্চাতে ক্রিয়াশীল রয়েছে আমাদের ভাষিক চর্চায় পরিচ্ছন্নতার অভাব। আদতে ‘ননফিকশিন’ কী? রচনার কোন প্রকরণগুলো এর সীমানার অধীন? এটি নিয়ে এখনো অস্পষ্টতা রয়েছে; চিহ্নর এই সংখ্যায় সম্পাদকও বিষয়টির প্রতি আমাদের দৃষ্টি ফিরিয়েছেন একটি অতি সংক্ষিপ্ত বাক্যে-‘নন-ফিকশন ব্যাপারটা মাঝেমধ্যেই ঘোঁট পাকায়।’ ক্রোড়পত্র অংশে দুটি বিভাগ রয়েছে, প্রথমটি পরিকল্পিত হয়েছে নতুন রচনার সন্নিবেশে; যেখানে খ্যাত-অখ্যাত কুড়িজন লেখক রয়েছেন।

বিভাগটির পাঠোদ্ঘাটন ঘটে নাসিমুজ্জামান সরকারের এক নাতিদীর্ঘ গদ্যে- ‘প্রসঙ্গ : ননফিকশনাল গদ্য’। এটি ক্রোড়পত্রের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ রচনার অন্যতম; কারণ এর বিষয়, লেখক এখানে প্রয়াসী হয়েছেন ‘ননফিকশন’ কথাটির চরিত্র বুঝতে; এনেছেন বাংলা ভাষায় ননফিকশনচর্চার এক আপাত ক্ষুদ্র রূপরেখা। তার বক্তব্য- ‘পক্ষান্তরে বৃহৎ অর্থে বলতে গেলে কথাসাহিত্য বহির্ভূত সকল গদ্যই ননফিকশন, যদিও সাহিত্যে এই প্রসঙ্গটির ভিন্ন উপযোগিতা রয়েছে।’ তিনি স্মৃতিকথা, সাংবাদিক, ঐতিহাসিক, বৈজ্ঞানিক, প্রাযুক্তিক এবং অর্থনৈতিক রচনাকে ননফিকশনরূপে গ্রহণের পক্ষাবলম্বী; এর সমান্তরালে ননফিকশনের অন্তর্ভুক্ত হিসেবে দেখেছেন জার্নাল, ফটোগ্রাফ, পাঠ্যপুস্তক, ভ্রমণ বইসহ অ-কাল্পনিক রচনাগুলোকে।

নাসিমুজ্জামান সরকারের এই বক্তব্যের মান্যতা কতটুকু, তা পাঠক-পণ্ডিতগণ নিশ্চয় বিবেচনা করবেন; তবে পাঠের প্রথমেই লেখাটি চিন্তার উপাদান যোগান দেয় সন্দেহাতীতভাবে। বিভাগের পরের লেখাগুলি মৌলত চিন্তাপ্রবণ গদ্য; যা আমাদের নিকটে ননফিকশনের ব্যবহারিক চেহারা উন্মোচিত করে। এগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে দৃষ্টি প্রদান করা যেতে পারে দেবেশ রায়ের রচনাটিতে; যা ‘চিহ্নমেলা চিরায়তবাঙলা’য় তার পঠিত বক্তৃতার লিপিবদ্ধ রূপ। ঔপনিবেশিক চশমা পরিত্যাগ করে বাংলা ভাষা-সাহিত্যকে দেখা ও বিচার করা দেবেশ রায়ের পরিচিত প্রবণতা- ‘ছোটপত্রিকা ও সাহিত্যপাঠের সমাজতত্ত্ব’ লেখাটিতেও তিনি অভিন্ন।

উপনিবেশের কৃত্রিম ইতিহাস বাতিলের সমান্তরালে এখানে তিনি প্রকাশ করেছেন গদ্য বিকাশের কাল থেকে বর্তমান অবধি সাহিত্যের কাগজের গুরুত্বকে। দেবেশ রায় এটি স্মরণ করাতেও বিস্মৃত হন নি যে- বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরেরও কাগজের আশ্রয় নিতে হয়েছিল বাংলা সাহিত্যে অভিনব প্রকরণ জন্ম দেওয়ার অভিপ্রায়ে।

ক্রোড়পত্রের প্রথমভাগে সন্নিবেশিত প্রদীপ বসুর ‘উত্তর-উপনিবেশতত্ত্বের প্রাথমিক চিন্তাভাবনা’তেও প্রকাশিত হয়েছে বাংলা সাহিত্যে উপনিবেশের প্রভাব; সঙ্গে উত্তর ঔপনিবেশিক তাত্ত্বিকদের ভাবনাবিশে^র সংক্ষিপ্ত পরিচিতি। মহীবুল আজিজ ‘ঘৃণার ব্যাকরণ’ শিরোনামে তার রচনায় প্রসঙ্গ করেছেন জাতিবিদ্বেষকে। হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস প্রিয়তমেষু নিয়ে মোহাম্মদ আজমের বিশ্লেষণ ভারি আগ্রহ জাগানিয়া; তিনি উপন্যাসের পাঠকে কাটাছেঁড়া করেছেন ধর্ষণ, নারী মূলকতা এবং আইনের সীমানা ধরে। চিহ্নর এবারের ননফিকশন আয়োজনে বইকে কেন্দ্র করে স্বাদু গদ্যের আস্বাদ, সাক্ষাৎ বিরল নয়- এপথেই আমাদের নিকটে গুরুত্ব দাবি করে আবু হেনা মোস্তফা এনাম ও মাহবুব বোরহানের রচনা দুটি।

মাহবুব বোরহান বিষয় করেছেন হুমায়ুন আজাদের আমার অবিশ^াস গ্রন্থটিকে; যেখানে আজাদের দার্শনিক প্রত্যয় অন্বেষণে প্রয়াসী তিনি। আবার, এর সমান্তরালে কবিতাকে আশ্রয় করেও নিজেদের ‘ননফিকশন’ গদ্যজাল বুনন করেছেন লেখকগণের অনেকে; এঁদের মধ্যে রয়েছেন- শোয়েব শাহরিয়ার, তরুণ মুখোপাধ্যায়, অমলেন্দু বিশ্বাস, তারেক রেজা এবং সরকার মাসুদ। তরুণ মুখোপাধ্যায় তার সংক্ষিপ্ত রচনায় বাংলা কবিতার বাইরে এক ভিন্ন স্বাদ এনেছেন মীর ও গালিবকে সংযুক্তির মাধ্যমে। এবার প্রবেশ করা যেতে পারে ‘ননফিকশন’ ক্রোড়পত্রের দ্বিতীয় বিভাগে; এখানে ক্রমপাওয়া জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, শশীভূষণ দাশগুপ্ত, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, হুমায়ুন আজাদ, সলিমুল্লাহ খান এবং জুলফিকার মতিনের সাতটি রচনা আদতে পুনর্মুদ্রণ।

এঁদের রচনার গুণ, মান নিয়ে প্রশ্ন তোলার বিদ্যে বা হার্দিক বল, কোনোটাই আমার নেই; এটুকু বলতে পারি- পাঠে প্রতিটি রচনার প্রাসঙ্গিকতা এবং উপযোগিতা আসন্ন পদক্ষেপে অনুভব করেছি, তার বস্তুসার জারণ করেছি মস্তিষ্কে। এখানে ব্যক্ত করা উত্তম পণ্ডিতপ্রবর শশীভূষণ দাশগুপ্ত বহুকাল পূর্বে ‘রচনা-সাহিত্যের স্বরূপ-লক্ষণ’ শিরোনামে ‘ননফিকশন’ বিষয়টিকে বোঝাপড়া এবং বিশ্লেষণের প্রয়াস দেখিয়েছিলেন; তার বক্তব্য- ‘মোটের উপরে গল্প, উপন্যাস এবং নাটক ব্যতীত গদ্যরীতিতে আর যাহা কিছু লিখিত হয় তাহাই ‘রচনা-সাহিত্য’ নামে অভিহিত।’ তার পর্যবেক্ষণ সবিশেষ মূল্যবান, এ বিষয়ে প্রতর্কের অবতারণা বৃথা; তবে, দীর্ঘকাল অতিবাহিত হলেও ‘ননফিকশন’ শব্দটির বাংলা প্রতিরূপ হিসেবে ‘রচনা-সাহিত্য’ শব্দটি কেন প্রচলিত হলো না- এটিও চিন্তার প্রসঙ্গ হতে পারে।