কাছে থেকে যেরকম

ঢাকা, শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ৫ আশ্বিন ১৪২৬

কাছে থেকে যেরকম

মোজাফ্ফর হোসেন ৩:৪৮ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৩, ২০১৯

print
কাছে থেকে যেরকম

যেমন নীরবে বেঁচে ছিলেন রিজিয়া রহমান তেমন নীরবেই চলে গেলেন। আমার ভাবতে ভালো লাগে, নিভৃতচারী এই লেখকের সান্নিধ্য, স্নেহ, ভালোবাসা আমি পেয়েছি। পুত্রতুল্য বললে ভুল হবে, নাতির বয়সী লেখক আমি। কিন্তু তাকে কখনো মনে হয়নি বয়স দিয়ে তিনি তরুণ লেখকদের বিবেচনা করেন। নিজের মতো একাকী বসবাস করলেও সমকালের সাহিত্য নিয়ে যে খোঁজখবর রাখতেন, পাঠ করতেন তরুণদের লেখাও, সেটি আমি প্রথম সাক্ষাতেই বুঝতে পেরেছি। যে-বার প্রথম রিজিয়া রহমানের বাসায় যাই, তিনি আমার অনেকগুলো গল্প ও প্রবন্ধের উল্লেখ করে বলেন যে, আমার লেখা তিনি পড়েন। এর কিছুদিন পর এক রাতে ফোন করে প্রায় এক ঘণ্টা আমার বই নিয়ে কথা বললেন।

এমন ব্যক্তিগত বিষয় উল্লেখ করা উচিত নয়, কিন্তু এই কারণে বলা, যে মানুষটাকে আমরা বিচ্ছিন্ন ভাবি তিনিই আবার কোথাও না কোথাও অন্যদের থেকে আরও বেশি সম্পৃক্ত। সিনিয়র লেখকদের সঙ্গে আমাদের এখানে তরুণ লেখকদের সম্পর্ক প্রায় একতরফা। তরুণরা সিনিয়রদের পড়েন, তাদের বই নিয়ে লেখেন, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কথা বলেন। অগ্রজ লেখকরা তরুণ উদীয়মান লেখকদের লেখা খুব বেশি পড়েন না, পড়লেও সেটি জানানোর প্রয়োজন বোধ করেন না। কিন্তু রিজিয়া রহমান এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ছিলেন। আমি নিজে তার কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছি, অনুপ্রাণিত হয়েছি। ব্যক্তি রিজিয়া রহমানকে কাছ থেকে দেখে বুঝেছি, লেখক হলেন শিল্পী, তিনি তার শিল্পসত্তা নিয়ে থাকবেন।

জীবনে কোনো কিছুতেই যেন বিচলিত হবেন না বলে পণ করেছিলেন এই লেখক। না হলে দেশের তথাকথিত পথে তিনি হাঁটলেন না কেন! কাউকে কোনো তোষামোদ নয়, মিডিয়ার পেছনে ছোটা নয়, প্রকাশকের পেছনে ছোটা নয়, এমনকি পাঠক কি পড়তে চান সেটাও তিনি বিবেচনা করে দেখলেন না। তিনি লিখলেন যা তার লেখা উচিত বলে মনে হয়েছে। নইলে ‘রক্তের অক্ষর’-এর মতো সাহসী উপন্যাস লিখতে পারতেন না।

বাংলা ভাষায় অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে বারবণিতাদের নিয়ে লেখা এ উপন্যাসটি। ১৯৭৮ সালে প্রকাশিত হয়। এরপর গোটা দশেক সংস্করণ বের হয়েছে বলে জানি। ৮০ পৃষ্ঠার এই উপন্যাসটি পড়া শেষ করে ঝিম ধরে বসে থাকতে হয়। আমরা যুদ্ধে মানুষ মরলে টের পাই, গণহত্যা হচ্ছে বলে কষ্ট পাই, বিদ্রোহে ফেটে পড়ি। অথচ নীরবে নির্মমভাবে ‘গণহত্যা’র শিকার হচ্ছে লক্ষ লক্ষ নারীজীবন, পৃথিবীর হাজার হাজার ব্রথেলে। দৃশ্যত খুন নয় এটি; কিন্তু খুনের চেয়ে কি কম সাংঘাতিক? রিজিয়া রহমান যখন ‘রক্তের অক্ষর’ লেখেন তখন যৌনপল্লীতে গিয়ে একজন নারীর পক্ষে ফিল্ডওয়ার্ক করার মতো প্রেক্ষাপট ছিল না। তিনি একে-ওকে দিয়ে তথ্য আনাতে থাকেন। কাগজের রিপোর্টাররা ছবিসহ এলাকার বিবরণ এনে দেন।

নারী লেখক হয়ে তিনি এ ধরনের বিষয় নিয়ে উপন্যাস লিখছেন জেনে চেনা ভদ্রসমাজ নানাভাবে নিরুৎসাহিত করেছে। ভয়ও দেখিয়েছে। পুরুষ লেখকদের কেউ কেউ আগ বাড়িয়ে বলেছেন, এই বিষয় নিয়ে নারীর পক্ষে লেখা সম্ভব নয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো ভিন্ন প্রকাশের পরপরই ভীষণ জনপ্রিয় হয় উপন্যাসটি। বাংলা ভাষায় উল্লেখযোগ্য সংযোজন বলে সাহিত্যবোদ্ধারা বিবেচনা করেন। তবে প্রকাশের পর লেখকের কাছে প্রায়ই ফোন এসেছে অপরিচিত নাম্বার থেকে হুমকি-ধামকি দিয়ে। কেউ কেউ প্রশ্ন করেছেন লেখক নিজে এই জগতের কেউ ছিলেন কিনা। উপন্যাসটি ঠিকমতো হলো কিনা এটি জানার জন্য লোকমারফত বইয়ের এক কপি যৌনপল্লীতে পাঠিয়েছিলেন রিজিয়া রহমান।

মজার ব্যাপার হলো, সেখানে পড়াশোনা জানা এক মেয়ে পড়ে বলেছিলেন জানতে চেয়েছিল, যে লিখেছে, সে কোন বেশ্যাপাড়ায় থাকে! এমনই সফল উপন্যাস এটি। সম্প্রতি উপন্যাসটি অরুণাভা সিনহার অনুবাদে বিদেশি পাঠকের কাছে পৌঁছে গেছে।

এভাবেই একজন লেখক নিজের মতো করে পথ কেটে কেটে হেঁটে গেছেন আমৃত্যু। ছোটগল্প, কবিতা, শিশুসাহিত্য, আত্মজীবনী, অনুবাদের পাশাপাশি তিনি ৩০টার বেশি উপন্যাস লিখছেন। তার উপন্যাসে বিষয়বৈচিত্র্য চোখে পড়ার মতোন। প্রাচীন বাংলার ইতিহাস থেকে আধুনিক বাংলাদেশের জন্মকষ্ট, স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের বাস্তবতা, বস্তিবাসী, বারবণিতা, চা-শ্রমিক, সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর জীবন-লড়াই, প্রবাসীজীবনের নানা সংকট থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট উপজীব্য হয়ে উঠেছে। তিনি লিখেছেন আশ্চর্য নির্লিপ্ততায়, কঠিন শ্রম ও সাধনায়। উপন্যাসের বিষয়বস্তুর দিকে দৃষ্টিপাত করা যেতে পারে।

প্রথম উপন্যাস ‘ঘর ভাঙা ঘর’। স্বাধীনতার পর নদী ভাঙনে শিকার মানুষেরা ঢাকায় চলে আসছে বেঁচে থাকার জন্য। গড়ে উঠছে বস্তি। তাদের নিয়ে এই উপন্যাস। পতুর্গিজ জলদস্যুদের কাহিনী নিয়ে লিখলেন ‘উত্তরপুরুষ’ উপন্যাসটি। আট হাজার বছর আগের সমাজ নিয়ে লিখলেন নৃতাত্ত্বিক উপন্যাস ‘শুধু তোমাদের জন্য’। পাশাপাশি ‘পবিত্র নারীরা’ ও ‘তৃণভূমি বাইসন’ নামে আরও দুটি নৃতাত্ত্বিক উপ্যান্যাস তিনি লেখেন।

‘কাছেই সাগর’, ‘বং থেকে বাংলা’, ‘উত্তরপুরুষ’, ‘একটি ফুলের জন্য’ উপন্যাসগুলো লিখেছেন মুক্তিযুদ্ধ ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে। ‘অলিখিত উপাখ্যান’, ‘আবে-রওয়াঁ’ ও ‘আল বুরুজের বাঘ’ উপন্যাসগুলোও ইতিহাস-আশ্রিত। চা-শ্রমিকদের জীবনবাস্তবতা নিয়ে লিখেছেন ‘সূর্য সবুজ রক্ত’ উপন্যাসটি।

নব্বইয়ের স্বৈরচারবিরোধী আন্দোলন নিয়ে লেখেন ‘হারুণ ফেরেনি’ উপন্যাসটি। ‘বাঘবন্দি’ উপন্যাসটি মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস। নতুন আঙ্গিকে লেখা। মনের ভয় বাঘের প্রতীক হিসেবে এসেছে। গ্রামে বাঘ ঢুকেছে। সবাই ভয় পাচ্ছে। একেকরকম ভয় থেকে বাঘটাকে একেকজন ভিন্ন ভিন্ন করে বর্ণনা করে। যেমন, মৌলবি ওয়াজে বলছেন, মেয়েরা সবাই পর্দা থেকে বেরিয়ে এসেছে, কাজে যাচ্ছে, এজন্য বাঘটা এসেছে।

প্রেমের উপন্যাস লিখেছেন বেশ কয়েকটি, যেমন ‘সবুজ পাহাড়’, ‘প্রেম আমার প্রেম’, ‘তবু গোলাপ তুমি’, ‘বান্ধবী প্রিয়দর্শিনী’, ‘ঝড়ের মুখোমুখি’ ইত্যাদি।

এভাবেই রিজিয়া রহমান কোনো একটি বিষয় বা প্রেক্ষাপটে নিজেকে আবদ্ধ রাখেননি।

তিনি প্রতিনিয়ত নতুন নতুন প্লটের সন্ধান করেছেন। যখন যে বিষয় নিয়ে লিখেছেন সে বিষয়ে ফিল্ডওয়ার্ক প্রয়োজন হলে তা করেছেন। সময় নিয়ে খেটে তিনি লিখেছেন সেই উপন্যাস, যা তিনি লেখা উচিত বলে মনে করেছেন। এমন একজন স্বাধীন সৃষ্টিশীল মানুষ চলে গেলেন আমাদের সম্মুখ থেকে। এখন তার সৃষ্টিগুলো আরও প্রকাশ্য হলো, একজন লেখক থেকে বাংলা ভাষার সম্পদ হিসেবে আমাদের সবার হয়ে উঠল।