পাঠসূত্রের চির অহংকার

ঢাকা, শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ৫ আশ্বিন ১৪২৬

পাঠসূত্রের চির অহংকার

শহীদ ইকবাল ৩:১৪ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৩, ২০১৯

print
পাঠসূত্রের চির অহংকার

সাতচল্লিশ-পরবর্তী সময়ে যাঁরা ঔপন্যাসিক হয়ে উঠেছেন তাঁরা মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে অর্জিত বাংলাদেশে নতুন উদ্দীপনায় উপন্যাস লেখা শুরু করেন। এ উদ্দীপনা আসলে নতুন স্বাধীন দেশের জন্য আনুগত্য-আবেগ ও স্বস্তির বার্তাবাহক। এবং স্বপ্ন-আকাক্সক্ষাও সৌধস্পর্শী অনুভব। এ ধারাটিতে তাঁরাই রইলেন, যাঁরা পঞ্চাশ-ষাটে নিজস্ব ভাষায় দাঁড়িয়েছেন। রিজিয়া রহমান (১৯৩৯-২০১৯) তাঁদেরই একজন। সংগ্রামে-অস্তিত্বে, ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনায় দৃঢ়তররূপে মূর্তিমান তিনি। প্রথম উপন্যাস ঘর ভাঙা ঘর (১৯৭৪)।

এটি লেখা শুরু ১৯৬৮-৬৯র দিকে। পরে স্বাধীন বাংলাদেশে বই আকারে বের হয়। উপন্যাসের পাশাপাশি রিজিয়া রহমান গল্পও লিখেছেন। তাঁর গল্প পরিশ্রমী, ধ্যানী ও জীবনচেতনা সংবেদ জারিত। গল্পে ইতিহাস বা সংগ্রাম, পুরাণ এসব না এলেও খণ্ড পরিসরে জীবনের অবহেলিত দিকের খণ্ডাংশকে স্পর্শ করছেন তিনি। অগ্নিস্বাক্ষরা (১৯৬৭) তাঁর গুরুত্বপূর্ণ গল্পগ্রন্থ। ‘লুপ্ত সভ্যতার ইতিহাস-সমর্থিত আবহে কল্পিত বাস্তবতা, ঐতিহাসিক পটভূমিতে প্রেম ও বিদ্রোহ, আদিম আধিপত্যবাদ ও ঈর্ষা, প্রকৃতি প্রীতি, তীব্র রোমান্টিকতা, বিপন্ন মানবতা, দারিদ্র্য-দীনতা, মানুষের মূল্যবোধের ভিন্নতা ও পরিবর্তনশীলতা’- এমন বিষয় নিয়ে তাঁর অগ্নিস্বাক্ষরার দশটি গল্প। এছাড়া বেরিয়েছে নির্বাচিত গল্প (১৯৭৮)। তবে গল্পের চেয়ে উপন্যাসেই তাঁকে অধিক স্বাচ্ছন্দ্য মনে হয়।


চট্টগ্রামের ফিরিঙ্গিবাজারে পর্তুগিজ বংশোদ্ভূত পরিবার অ্যান্টনি ডিক্রুজের উত্তর পুরুষ বনি ডিক্রুজের দ্বন্দ্ব; প্রসঙ্গত এ দ্বন্দ্ব নবীন-প্রবীণ দ্বন্দ্ব। উত্তর পুরুষ (১৯৭৭) এমন দ্বন্দ্বাত্মক প্রজন্মবৃত্তান্ত। প্রৌঢ় অ্যান্টনি ভালোবাসে পর্তুগিজ ইতিহাস-সংস্কৃতি এবং তার অতীতস্মৃতি। কিন্তু পুত্র বনি একেবারে বিপরীত। সে বঙ্গদেশের প্রেমে আসক্ত। বনির বাবা ডিক্রুজের উল্টো মানসিকতা এবং অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিত বর্ণিত হয়ে শ্যামল-সুন্দর প্রকৃতির প্রতি তার অনিমেষ ভালোলাগা। বনি ভালোবাসে বাঙালি কবি রবীন্দ্রনাথকে।

উপন্যাসে এসব বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত হয় বোন লিসির উদ্ধত চলাফেরা এক পর্যায়ে জেরি ফার্দিনান্দের সঙ্গে সম্পর্ক এবং বিরূপ পরিণতি। বনির পরিচ্ছন্ন ও যুক্তিসিদ্ধ মন সবকিছু এড়িয়ে চলে এবং মংপুর জটিল ব্যবসায়িক চাতুরি থেকেও সে বেরিয়ে আসে। এরপর মূলত মিসেস ডিক্রুজের হাতেই পড়ে কাহিনীর যাবতীয় মীমাংসার ভার। রিজিয়া রহমান শিল্পীর সামাজিক দায়িত্বকে তীব্রভাবে স্কন্ধে ধারণ করেন। তবে এ উপন্যাসে কাহিনীর উৎস ও পরিণতিতে কিছুটা অসতর্ক ও পরিচর্যার অভাব রয়েছে। বাংলাদেশের জাতিত্ব ও নৃতত্ত্বের অস্থিকে অবলম্বন করে শিল্পকল্পনার মেদমজ্জায় বং থেকে বাংলা (১৯৭৮) উপন্যাস লিখেছেন রিজিয়া রহমান। বং এবং এলা নামের চরিত্র সেই অনার্য যুগ থেকে প্রতিরোধে কীরূপে নিজস্বতা পেয়েছে এবং স্বাধীনতা পেলো তার ইতিবৃত্ত উপন্যাসটি।

প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক যুগের ইতিহাস, রাজন্য রাজত্বকাল, ভঙ্গুর সামন্তবাদ, উত্থিত পুঁজিবাদ, ইংরেজ শক্তি, স্বদেশীদের আন্দোলন, জাতীয়তাবাদী শক্তির উত্থান, বিভাগোত্তর পাকিস্তানি অপশাসন এবং মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাস ও নৃতত্বের বৃত্তান্ত বর্ণিত হয়েছে উপন্যাসে। এক্ষেত্রে বং এবং এলার বংশধর, প্রজন্মান্তর বিধৃত। এ চরিত্রই মূলত উপন্যাসের কাহিনীকে এগিয়ে নিয়ে চলে।

দশ অধ্যায়ে বিভক্ত উপন্যাসে বঙ্গালের সংগ্রাম ও প্রতিরোধ, সংস্কার, ধর্মীয় রীতি, কোমল প্রকৃতির বিহ্বলতা কাহিনীবৃত্তকে তৈরি করেছে। অনার্য বা ব্রাত্যকুল আর্য-প্রতিরোধে বাইদ্যা, পাইক্কী, কৈয়ারত নিরন্তর সংগ্রাম করে। ক্রমশ তা গোত্র, সমাজ পেরিয়ে দিনান্তে পরিপক্ব মাত্রা পায়। অনার্য প্রতিনিধিরা উপন্যাসে বিভিন্ন খণ্ডে বিচিত্র নামে আবির্ভূত হয়। তারই ধারায় বাঙালি সত্তার বিকাশ এবং পূর্ণায়ত স্বাধীনতা। তাঁর ভাষা প্রত্যয়নিষ্ঠ। তবে প্লটবিন্যাস একটু শিথিল। রক্তের অক্ষর (১৯৭৮) পতিতাজীবীদের নিয়ে লেখা অসামান্য উপন্যাস।

এ উপন্যাসের মূল চরিত্র ইয়াসমীন। ইয়াসমীনের জীবন বাস্তবতা, পতিতাবৃত্তি, শেষ পর্যন্ত তার ঘুরে দাঁড়ানো, আশাবাদ ও মানুষের মুক্তির সংবেদ উপন্যাসের অভিনব শিল্পমাত্রা। সমাজতন্ত্রের আদর্শও প্রতিফলিত এতে। তবে নিছক আরোপিত আদর্শ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেননি লেখক। মুক্তিযুদ্ধের সময় ধর্ষিত ইয়াসমীন কেন পতিতাবৃত্তি নিল, কেন সংসার ও স্বামীর বিরূপতার মুখে পড়ল- কীভাবে সে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে ঘৃণ্য ও প্রতারণার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হলো- তার অনুপুঙ্খ প্রশ্নোত্তর তৈরি হয়েছে উপন্যাসে। ইয়াসমীনের পাশাপাশি কুসুম, জাহানআরা অনন্য চরিত্র। বিচিত্র ভাবনার একত্রীকরণে মানুষের বহুরৈখিক চিত্রও এতে বিবৃত হয়। রক্তের অক্ষর শুধু উপন্যাস নয়, প্রশ্নচিহ্নে দীপিত সময়ের নিকষ সাহসী দলিল। মুক্তিযুদ্ধে ধর্ষিত ইয়াসমীনের জীবন-আখ্যান।

মংলাছড়ি চা-বাগানের কাহিনী সূর্য-সবুজ রক্ত (১৯৮১)। রিজিয়া রহমান ব্যক্তির সঙ্গে ইতিহাস নির্ধারিত সমাজ-সংস্কৃতি ও শ্রেণি-শোষণচিত্র অবলোকন করেন। এ প্রত্যয়েই দায়নির্ভর ভাষা পুনর্গঠিত হয় উপন্যাসে। ভাষার ভেতরেই প্রতিকার-প্রতিরোধের প্রকাশ বর্ণিত হয়। চেনা যায় হরিয়া, অর্জুন, লছমিদের। স্মর্তব্য, লেখক বিষয় যেমন নির্ধারণ করেন তেমনি তার ভাষা বা প্রতিবেশ (অলঙ্কারসমেত বর্ণনা)ও পুর্নগঠিত হবে।


মুক্তিযুদ্ধের পরে আমাদের আশাভঙ্গ, স্বপ্নভঙ্গও ঘটে। পঁচাত্তরের পরে উর্দিশাসন আসে, ক্ষাত্রশক্তির দাপট গণ-মানুষকে বিরূপ করে তোলে। নবীন-প্রবীণ উভয় লেখকরাই এ অভিজ্ঞতার মুখে পড়েন। তখন নিশ্চয়ই লেখকের উপন্যাসে শৈলীগত তফাৎ তৈরি হয়, অনেক বিষয়ে দ্বিমত-ভিন্নতা আসে। রিজিয়া রহমানের কথাসাহিত্যেও তার প্রতিফলন ঘটেছে। নাগরিক চেতনা, নারী চেতনা, মুক্তিযুদ্ধের ভাবনা ইত্যাকার বিষয় রিজিয়া রহমানে আমৃত্যু আজীবন শৈলিবন্দি করেছেন। আমরা জানি জনগোষ্ঠীর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আহার-নিরাপত্তা তৈরি হয়। এবং তা বিপত্তির মুখেও পড়ে।

এদেশে শ্রেণি তৈরি হয়। বৈষম্য প্রত্যেক ক্ষেত্রেই প্রবলতর হয়। মুক্তিযুদ্ধের ঐক্যের আদেশ বা আশীর্বাদ ক্রমশ ফ্যাকাশে হয়ে পড়ে। এর ফলে স্বদেশপ্রেম, কমিটমেন্ট, স্বপ্নের ঐক্য এক থাকে না। সত্তর-আশি-নব্বই পেরিয়েছে, সৃষ্ট মনোপোলার বিশ্বে বিপর্যস্ত স্বাধীনতা, হুমকির মুখে সার্বভৌমত্ব-এসব উপন্যাসের কাহিনীকে আরও কঠিন ও জটিল করেছে। রিজিয়া রহমান নিরন্তর সেই সমাজ ও রাষ্ট্রকে তার সৃষ্টিতে শ্রেয়োশীল করেছেন।

নানামুখী রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ায় ক্ষুব্ধ প্রান্তবর্তী মানুষের নিষ্ফল হৈচৈ দেখে আশাবাদটুকুও একসময় হয়েছে অবসিত। তার প্রকরণও হয়েছে তেমনই। উপরে বর্ণিত আলোচ্য উপন্যাসগুলো তেমনটিই বলে। তাঁর আঙ্গিক কর্কশ, দ্বিধাকাতর; মেদবহুল- ফুরফুরে রোমান্টিকতায় আচ্ছন্ন নয়। এ লক্ষ্যে রিজিয়া রহমান আমাদের সাহিত্যে চিরজীবিত থাকবেন। তাঁর সাহিত্য বাংলাদেশে পঠিত হবে, বড় বড় কাজও সম্পন্ন হবে- তাঁকে নিয়ে- সেটি সংশয়হীন থেকেই বলা যায়।