দেখা না দেখা

ঢাকা, শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ৫ আশ্বিন ১৪২৬

দেখা না দেখা

হাসান আজিজুল হক ২:৩০ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৩, ২০১৯

print
দেখা না দেখা

আমাদের দেশে প্রতিনিয়তই লেখকের জন্ম হচ্ছে এবং লেখক বেঁচে থাকতে থাকতেই মৃত্যুও হচ্ছে। খুবই স্বাভাবিক। কারণ, সৃজনকালের একটা নির্দিষ্ট সময় আছে, এবং শেষও আছে। লেখকদের ক্ষেত্রে এমনটা ঘটে। আমি যখন লিখতে শুরু করি, ঠিক কাছাকাছি সময়েই রিজিয়া রহমানও লিখতে শুরু করেন। আমি বহু জায়গা লিখেছি বা বলেছি, আমি ‘লেখক’ ও ‘লেখিকা’ দুটো শব্দ ব্যবহার করি না।

আমি কেবল একটি শব্দই ব্যবহার করি লেখক। সেক্ষেত্রে, আমি কোনো দিনই নারীর লেখা বলে আলাদাভাবে চিহ্নিত করি না। রিজিয়া রহমানকেও অবশ্যই আমি লেখকই বলব। কারণ, তিনি নিজে যখন লিখছেন, যে সংকট নিয়ে লিখছেন, তা নারী বা পুরুষ বা উভরেই হোক, সমাজেরই হোক, তিনি তো কাউকে বাদ দিয়ে, কারও প্রতি পক্ষপাতিত্ব করে বা কারও দ্বারা সম্পূর্ণরূপে অধিকৃত হয়ে লিখছেন না। তিনি একজন লেখক হিসেবেই লিখেছেন।

রিজিয়া রহমান আমাদের ষাটের দশকের লেখকদের মধ্যে একজন। যদিও ষাটের দশকে তাকে খুব সোচ্চার হতে দেখেছি বলে মনে হয় না। সত্তর এবং আশির দশকেই তাকে আমি উজ্জ্বল হতে দেখেছি বেশি। এ ছাড়া আমিও ঠিক পুরোটা বলতে পারব না। কারণ, আমি রাজশাহীতে লেখাপড়া করেছি এবং এখানেই প্রায় আজীবন চাকরি করেছি। এখন যেমন ষাটের দশক নিয়ে এতো মাতামাতি, তখন কিন্তু এরকম করে দশক বিচার করা হয়নি বা ভাবা হয়নি।

আমার মতে, রিজিয়া রহমান যতটা শক্তিশালী এবং প্রতিভাবান লেখক, সেই অনুযায়ী তার সমান মর্যাদা তিনি পাননি। তার লেখার পাঠ, আলোচনা-সমালোচনা, গবেষণা ইত্যাদি কেন যে কোনো কারণে অনেকটা ছায়াবৃত্ত, সেটা আমি ঠিক বুঝতে পারি না।

আমি আরও অনেক লেখকের নাম উচ্চারণ করতে পারি, যাদের লেখার সঙ্গে রিজিয়া রহমানের লেখার কোনো তুলনাই হয় না, কিংবা তুলনা করলে রিজিয়া রহমান অনেক অনেক উপরের পর্যায়ের লেখক, তাদের লেখাগুলো বা সেই লেখকগণ যেভাবে আলোচনায় উঠে আসে, রিজিয়া রহমানের লেখাকে সেরকমভাবে পাই না। নীরব পাঠক হয়তো থাকতে পারে, কিন্তু বাহ্যিকভাবে রিজিয়া রহমানের গল্প-উপন্যাস যে পাঠ মনোযোগ দাবি করে, তা হচ্ছে বলে আমার মনে হয় না। রিজিয়া রহমানের যে কয়টি উপন্যাস ও গল্প আমি পড়েছি, তাতে আমার মনে হয়েছে, তিনি শুধু প্রতিভাবান লেখকই নন, পরিশ্রমী লেখকও বটে।

প্রতিভা ও পরিশ্রমের অপূর্ব সমন্বয়ের ফলে তার প্রতিটি লেখা-ই মূল্যবান লেখা হয়ে ওঠে। আমাদের কথাসাহিত্যে তার সুপরিণত একটা জায়গা আছে। কোথাও তাকে কাঁচা অথবা কোথাও তিনি তুচ্ছ বিষয় নিয়ে লিখেছেন, এ কথা কখনো মনে হয়নি। তার প্রতিটি গল্প বা উপন্যাসের দিকে আলাদা আলাদাভাবে তাকালে দেখা যায় বিষয় নির্বাচনে তিনি সাহস ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছেন। যা আমরা ভাবতেই পারি না, এমন অনেক বিষয়ই তার গল্প-উপন্যাসে উঠে এসেছে। রিজিয়া রহমানের পড়াশোনার পরিধি অনেকের চেয়ে বেশি, বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত, তা না হলে ‘বং থেকে বাংলা’ বা ‘রক্তের অক্ষর-এর মতো উপন্যাস লেখা সম্ভব হতো না। সমাজের যে সমস্ত জায়গা অন্ধকার হয়ে আছে, ছায়াচ্ছন্ন হয়ে আছে, দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে আছে, যেখানে অন্য কোনো লেখক পৌঁছাতে পারেননি, সেসব জায়গায় রিজিয়া রহমান কীভাবে আলো ফেলেছেন, সেটা আমার কাছে আশ্চর্যই লাগে। রিজিয়া রহমান প্রধানত গল্প-উপন্যাসই লিখেছেন।

রিজিয়া রহমান খুব অল্পভাষী, খুব শান্ত, অনেক নির্লিপ্ত। তার লেখাতেও তাই ধরা পড়ে। এক ধরনের নির্লিপ্ততা বরাবরই কাজ করে তার লেখকসত্তায়। প্রাচীন ইতিহাসের চরিত্র, বারবণিতা, চা শ্রমিক, আদিবাসী, খনি শ্রমিক, হাঙর শিকারি ইত্যাদি বিচিত্র চরিত্র আঁকতে গিয়ে তিনি আশ্চর্য নির্লিপ্ততার পরিচয় দিয়েছেন। তার নির্লিপ্ততাই তার জীবন, এই নির্লিপ্ততাই তার লেখায় পাই। আমরা এখন মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হই বা যাই হই না কেন, প্রতিনিয়ত সাহিত্য তৈরি হচ্ছে, এবং পেছনে চলে যাচ্ছে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, পেছনে যেতে যেতে কি অদৃশ্য হচ্ছে বা বিনাশ হয়ে যাচ্ছে, নাকি কোথাও জমা থাকছে? স্রোতের মতো যাচ্ছে, কিন্তু কেউ কেউ যাচ্ছে না, একটা জায়গায় স্থির হয়ে আছে, তাকে কিছুতেই সরানো যাবে না। বেশির ভাগই স্রোতের মতো কেবলই পেছনেই সরে যায়, কিন্তু কেউ কেউ থাকেন, তার স্থানটি নির্দিষ্ট হয়ে যায়, সেখান থেকে কিছুতেই আর তাকে সরানো যায় না। বাংলাদেশের সাহিত্যে, আরও বড় পরিসরে বললে বাংলা কথাসাহিত্যে রিজিয়া রহমান একটি নির্দিষ্ট স্থান দখল করে ফেলেছেন। এখান তাকে কখনোই সরানো যাবে না, কখনোই তিনি পেছনে সরে যাবেন না। বিচিত্র বিষয় নিয়ে চমৎকার গদ্য লিখেছেন রিজিয়া রহমান। আমি বরাবরই মুগ্ধ হয়ে পড়েছি তার লেখা।

সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, রিজিয়া রহমানের লেখায় একটা দৃঢ়তা আছে। সেই সঙ্গে, অনেক লেখককেই দেখা যায় জ্ঞান দেখানোর চেষ্টা করেন, রিজিয়া রহমান সেটা কখনই করেননি। যতদূর পেরেছেন মিশিয়ে নিয়েছেন, নিজেকে আড়ালে রেখেছেন। এবং লেখা পড়লেই বুঝতে পারা যায়, তিনি যে পরিবেশে বড় হয়েছেন এবং যে পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে জীবনটাকে কাটিয়েছেন, সেখানে কোথাও ফাঁক বা ফাঁকি রাখেননি।