কালমুড়ি

ঢাকা, শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ৫ আশ্বিন ১৪২৬

কালমুড়ি

মাসুদুল হক ৬:৫১ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৬, ২০১৯

print
কালমুড়ি

এখানে শীত-বর্ষা-গ্রীষ্মের বালাই নেই, দিনমান চলে শুধুই কাজ, ফসলের ক্ষেতে কাজের উপর কাজ। এমনই চলছে এ বাজনাহারের মানুষের জীবন। এ হিসাবের বাইরে গেলেই যেন বেঁচে থাকার সম্ভাবনা শূন্য। এখানে দিন-রাতের ভেদ-বিভেদ নেই শুধুমাত্র কৃষিকর্মের প্রয়োজনে। জমিতে কাজই এ-গ্রামের মানুষের ভুত-ভবিষ্যৎ; আশা-আকাক্সক্ষা সব কিছু। বাইরে থেকে এ-গ্রামে প্রবেশ করলে প্রথমটায় এমনই মনে হবে।

এমনি একদিন কাজের মধ্যে আমি আর শ্রীপতিদা ঢুকে পড়লাম বাজনাহার গ্রামে। আমাদের সঙ্গে ইস্পাতের গাধা সেই সাইকেলটি। শ্রীপতিদা’র সঙ্গে আনা একজোড়া মুরগি, চায়ের পাতা, চিনি, স্টার আর গোল্ডলিফ প্রভৃতি। শ্রীপতিদা ইস্পাতের গাধাতে প্যাডেল মারছেন, আমরা এগিয়ে যাচ্ছি জমি লাগোয়া কাঁচা রাস্তা ধরে। ভুট্টাবীজ বোনার কাজে এ-গ্রামের মানুষগুলোর জীবন যেন ক্ষয়ে যাচ্ছে; কাজের চাপে দারুণ ক্লান্তির ছাপ তাদের চেহারায়।

চৈত্রের খাঁ খাঁ নিদাঘদুপুরে কংকালসার গাছগাছালির শাখা-প্রশাখায় নবকিশলয় উঁকিঝুঁকি মারছে। রাস্তার ডানপাশজুড়ে বাঁশবন। সে বনের মাথার উপর চৈত্রের ঘনঘোর দাবদাহের দুপুরে ঘষা শ্লেটের মতো আকাশজুড়ে ইতিউতি উড়ছে কয়েকটা চিল। ক্লান্ত এ-দুপুরে চি-হি-হি-হি করে চিৎকার করছে সেসব চিল।

যত সামনে বাড়ছি ততই অদ্ভুত পরিবেশ এ-গ্রামের। গাছ-লতা-বাঁশবনের প্রকা- আলো-আঁধারির খেলা দেখে মন শিউরে ওঠে। বড় বড় রেইনট্রিগুলো চারদিক ছড়িয়ে দিয়েছে ওদের ডালপালা; সেগুলোর ফাঁকে ফাঁকে শিমুল গাছগুলোতে রক্তলাল ফুলের সমারোহ। তার মাঝে ঘোটকো আর টিয়াপাখির ওড়া-উড়ি। নিচে মানুষের বিশ্রামহীন কাজের চাপ। সারাদিন হৈ হৈ-রৈ রৈ, এক অদ্ভুত গ্রাম এ বাজনাহার।

আমরা শ্রীপতিদা’র পৈতৃক ভিটায় বহুক্ষণ বসে আছি। বাড়ির ভেতরে মুরগি রান্না হচ্ছে; তার সৌরভে মাখামাখা অদ্ভুত এক ঘ্রাণ। সিগারেট টানছি। একদফা চা খাওয়া হয়ে গেছে। এমন সময় আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায় কালো একটি ষাঁড়। ষাঁড়টা ফোঁসফঁসাতে থাকলে শ্রীপতিদা জানান, এটা তার বাবার শ্রাদ্ধের সময় মানত করে ছেড়ে দেওয়া। যাকে বৃষোৎসর্গ ষাঁড় বলে।

লোকমুখে একে খোদার নামে ছেড়ে দেয়া ষাঁড়ও বলে থাকে। ষাঁড়টা দুবছরে বেশ মোটা-তাগড়া হয়ে উঠেছে; মানুষের জায়গা-জমিন, বাড়ি-ঘরে নানা ধরনের আনাজপত্র খেয়ে। ষাঁড়টার শরীর দেখে আমার বিস্ময় জাগে। আমার অখ মনোযোগের মধ্যে কয়েকবার ডেকে ওঠে। আকাশে তাকিয়ে দেখি, আস্তে ধীরে গনগনে দুপুরের শেষে ঈষাণকোণে জমতে থাকে হাঁড়িয়া মেঘ। ষাঁড়টা ফোঁসফোঁস শ্বাস টেনে আমাদের পেছনে রেখে বেশ রাজসিক চালে হাঁটতে থাকে। সহসা টিনের ঘরের বাঁশবাতার সিলিং থেকে কিচিরমিচির করে বেরিয়ে আসে চড়–ইপাখি। ওরা খুব দ্রুত উঠানে এসে পড়ে থাকা ধান খুটতে থাকলে হঠাৎ হঠাৎ মেঘের ফাঁক-ফোকর দিয়ে শোনা যায় গুরুগুরু জলদগম্ভীর গর্জন আর আকস্মিক কড়কড় কড়াৎ শব্দে বজ্র ও বিদ্যুতের ঝিলিক। আমরা ঘরে এসে বসি।

দুই.
সখিনা বিয়ের আগে এ-গ্রামে কখনোই আসেনি। ওদের হরিপুর গ্রামে টাঙন নদী, সে নদীর পাশে ওর বাবা কৃষিকাজ করত বটে। কিন্তু সখিনা আগে থেকেই গায়ে খাটা মজুরি পছন্দ করত না। ওর কালো পেটা শরীরটাকে সেই বয়সে সবাই ঘুরে একবার করে দেখতো। এমনও ওর গর্ব। সে গর্ব নিয়েই মজিদ মিয়ার বিবি হয়ে এ-গ্রামে আসে। কিন্তু এসেই দেখে এ-গ্রামের একটাই মন্ত্র- কাজ আর কাজ! কাজ ছাড়া অন্যকিছুর ভাবনা ভাবতে গেলেই পিছিয়ে পড়তে হবে সবকিছু থেকে। এ-গ্রামে অল্পবয়সী বধূরা বছর বছর কাজের চাপাচাপিতে বেসামাল হয়ে শেষ পর্যন্ত সহ্য করতে না পেরে স্বামী-সংসার, ঘর-দোর, জমি-জিরাত ফেলে বাপের বাড়িতেই নাকি ফিরে যায়। এ কাহিনী সখিনা এ-গ্রামে এসেই জানতে পেরেছে। এও সে জেনেছে, অনেকে আবার কাজের চাপে শরীরে রোগের মালা পরিধান করে এ জগৎ-সংসার চিরদিনের মতো ছেড়ে চলে গেছে। কে আর হিসাব রাখে কার!

মজিদ মিয়ার সঙ্গে অবশ্য সখিনা মানিয়ে নিয়েছিল। কিন্তু বাধ সাধলো ভাগ্য। কয়েকদিনের মধ্যেই ক্ষয়রোগে মারা যায় মজিদ মিয়া। সখিনার জীবনে ঘটলো উল্টো ঘটনা। সংসার ছেড়ে পালাবে কি স্বামীই পালালো পরকালে। মজিদ মিয়া মানুষের জমিতে আধির কাজ করতো। ইতোমধ্যে সখিনার মেয়ে জমিলার বয়স পাঁচমাস। জমিলার পাঁচমাস বয়সেই মজিদ মিয়া পরলোক গমন করে। এভাবেই স্বামীর ভিটাতে কোনোমতে জীবন কাটাতে থাকে সখিনা আর তার মেয়ে জমিলা। জীবন কাটাতে কাটাতে নষ্ট মেয়ের অপবাদ জুটে যায় কপালে। তবুও জীবন থেমে থাকে না। সখিনা জমিলাকে পরিচর্যা দিয়ে বড় করে তুলতে থাকে। সেই জমিলার বয়স এখন ১৬ বছর।
ইদানীং সখিনার চোখে ঘুম কমে গেছে। রাত পোহানোর সঙ্গে সঙ্গে ঘুম থেকে উঠে ঘর থেকে ছাগলটা বের করে ঘরদোর ঝাড়– দিয়ে পরিষ্কার করে ধান কাটার প্রস্তুতি নেয়। ওর কাজের নানা শব্দে জমিলার ঘুম ভেঙে যায়।

তিন.
দুই একটি তাল বা ন্যাড়া বেলগাছ, বেশ কয়েকটা শিমুল, রেইনট্রি, শালবন আর বাঁশের জঙ্গল নিয়ে গড়ে ওঠা এই বাজনাহার গ্রাম। শ্রীপতিদা’দের বাড়ির পেছনে-সামনে বাঁশবন। বাঁশগুলো সবই মাক্লা। উঠানের পাশেই একটা পাঁকুড় গাছ বড় হচ্ছে শিবমন্দিরের ঠিক বাঁ-পাশে। সন্ধ্যা হচ্ছে হচ্ছে, এমন সময় বাইরের কাচারি ঘরের বারান্দাতে চেয়ার নিয়ে বসে আছি। শ্রীপতিদা যেন কোথায় গেছে। দূর থেকে বাঁশ কাটার শব্দ, সন্ধ্যায় কাকদের উচ্চকণ্ঠ প্রলম্বিত হচ্ছে বাতাসে। একটা কুকুর অযথাই যেন ভুকছে। সখিনা আর জমিলার কথাই ভাবছি। ভাবতে ভাবতে সন্ধ্যা ঘন হয়ে আসে। একটা পূর্ণচাঁদ উঠে আসতে থাকে বাঁশবাগানের মাথা থেকে। উঠানে দুধ-জ্যোৎস্নার ছড়াছড়ি। ভরা জ্যোৎস্নায় এক ধরনের শূন্যতা জমে ওঠে উঠানটি জুড়ে। এইমতো শূন্যতার মধ্যে ঘণ্টাখানেক কেটে যায়। সহসাই একটি নারীদেহ এসে আমার পাশে উঠানের থাম জড়িয়ে দাঁড়ায়। কালো ছিপছিপে দেহ। মুখটাতে অপুষ্টির ছাপ। সম্ভবত পান চিবোচ্ছে। আস্তে করে জানতে চায় দাদা, শ্রীপতিদা বাড়িত্ আছে?
আমার কৌতূহল বাড়ে। আমি ওর পরিচয় জানতে চাই।

একি! এই তো সেই সখিনা। তারপর আমি ওকে জানাই, মুঁইও ঘণ্টাখানেক ধরি ওক্ খুঁজি পাছোঁ নাই।
-মোক্ যে এংনা আসিবা কহিচলো।
-ও, তাই নাকি।
-হেঁ, তাহিলে মুঁই এংনা বইসো।
কথাটা বলেই বারান্দায় উঠে থামের পাশেই শরীর এলিয়ে বসে পড়ে সখিনা।
আমি সখিনাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করি। দুই একবার চোখে চোখ পড়ে যায়। সখিনা পান খাওয়া মুখে টিপে টিপে হাসছে। এ রকম অনেকক্ষণ থাকার পর আমি সখিনার জীবন-বৃত্তান্ত জানতে চাই।

সখিনা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমার দিকে তাকায়। তারপর শুরু করে, ‘মোর আর জীবন! মোর বাপের বাড়ি হরিপুর। টাঙন নদীর উপর। মোর বাফও ক্ষেত-খামারত্ কাম কইছলো। কিন্তু এই বাজনাহারত্ মোর বিহা হয়া মোর জীবনের তামান সুখ-শান্তি উঠি গেইল্। ভাতারের বাড়ি আসি খাটিখাটি মোর জীবনটা গড়ি গেইল্। শেষত্ ভাতারটাও মরি গেইল্। মোর এংনা বেটি জমিলা। ওঁয় এখোন বড় হইচে, বুঝিবা শিখিছে। দেহাত্ জোরও বাড়ি গেইছে। মোর নামে তো যেইঠে- সেইঠে বদনাম আছেই; কাইল্ ফের মোর বেটিটারও বদনাম ছড়ি গেইল্। ঐ নেপাল ছোঁড়াটা নাকি ঘরত্ সেন্দাই ফস্টিনস্টি কইছলো। বিচার কইছে উত্তম মেম্বার। ওম্হারাই বিচার করি হামাক ৫০০ টাকা দিয়া ওম্হারাই টাকার বেশিরভাগ নিয়া গেইল্। নেখাপড়া করি নাকি বাকি টাকা দিবে। বেটিটাক্ মুঁই খুবে মানু। ওঁয় এখোন মোর সাথে গোস্বা করি কাথা কহেনা।

সখিনার বর্ণনার এই পর্যায়ে শ্রীপতিদা হন্তদন্ত হয়ে উঠান পেরিয়ে আমাদের কাছে আসে।
-কি রে সখিনা কখোন আলু?
-এই তো এংনা আগত্।
-মুঁই আইজ্ খুব ভেজালত্ আছোঁ। তুঁই কয়দিন পরে আয়।
-তাহিলে আইজ্ যে আসিবা কহিছিলেন?
-আরে বাপু মুঁই এংনা হঠাৎ ঝামলাত্ পড়ি গেনু।
-মোর বেটির কাথা তো শুনিচেন?
-কি আর করিবু? ধইয্য ধরেক্। এইলা কিছু হবে নাই। ভালো একটা ছোঁড়া দেখি বিহা দিয়া দে। তখোন নাহয় কিছু টাকা লাগিলে মোঁহোঁ দিম্।
-বাবু, বেটিটা মোর খউবে দুঃখ পাইছে।
-তা তো পাবেই। ঠিক আছে তুঁই এখোন যা।
সখিনা চলে যায়। শ্রীপতিদা’কে কেমন যেন উদভ্রান্তের মতো দেখায়। আমি প্রশ্ন করি, কুণ্ঠে গেইছিলেন?
-আর দাদা কহিবেন না। ঐ পাশের গাঁওত্ গেইছুনু। একখান্ জমিজমার বিষয় আছোলো।
কথাগুলো কেমন যেন অস্তিত্বহীন মনে হয়। আমার সন্দেহ জাগে সে কি আমার কাছে কিছু গোপন করছে? কি জানি! কিছুই বোঝা যায় না। দূরে কোথাও ঢাকের আওয়াজ বেজে ওঠে। শ্রীপতিদা বলে, চলেন, কবিগান শুনিবা যাই।
আমরা কবিগান শুনতে চলে যাই।

চার.
খুব সকাল বেলা আমার ঘুম ভেঙে যায়। গভীর রাতে বেশ খানিকটা বৃষ্টি হয়ে গেছে। সূর্যের পরিচ্ছন্ন রোদ এসে পড়ছে উঠানে। আমি বারান্দায় এসে দাঁড়াই। এমন সময় সেই কুকুরটা চিৎকার করে ওঠে। আর একজন লোক দৌড়ে এসে জানায়, জমিলা গালাত্ দড়ি দিছে। শ্রীপতিদা ঘটনা শুনেই বলে, চলেন এলায় শহরত্ চলি যাই। এইলা ঝুট ঝামেলাত্ জড়াই লাভ নাই।

বিষয়টা আমি মেনে নিতে পারি না। তবুও মনের বিরুদ্ধে তার ইস্পাতের গাধা সাইকেলটায় চেপে বসি। পথে আসতে আসতে আমার কাছে বালিকাটির মুড়ি কেনার দৃশ্য ভেসে ওঠে। কি মায়ায় ভরা দুই চোখ, লাবণ্যে ভরে ওঠা মুখ। নেপাল, নাকি অন্য কোনো কুৎসিত মানুষ ওর আগ্রাসী লোভে মেয়েটির শরীরটাকে ছিঁড়ে খুবলে শেষ করে দিয়েছে। যে কারণে আত্মহত্যার বিকল্প নেই। জমিলা ভয়ে বিস্ময়ে নিথর হয়ে মরে গেছে। আহা বালিকাটির আপ্যায়নের মুড়ি যেন কালমুড়িতে রূপান্তরিত হয়েছে।
ওর চোখে ভিন্ন একটা জ্যোতি আমি দেখেছিলাম। ইস্পাতের গাধা ছুটে চলেছে। শ্রীপতিদা নির্বিকার, যেন প্যাডেল মেরে চলছে। এই মৃত্যুটি নিয়ে কোনো কথাই নেই তার মুখে। একটানা প্যাডেল মেরে একটা বাজারের কাছে এসে আমরা থামলাম। শ্রীপতিদা বললেন, মুড়ি খাবেন?
আমি কিছুই বলিনা। কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে তাকে অনুসরণ করি।