আত্মকথায় কালের ভাষ্য

ঢাকা, শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ৫ আশ্বিন ১৪২৬

আত্মকথায় কালের ভাষ্য

শামসুজ্জামান খান ৫:৫০ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৬, ২০১৯

print
আত্মকথায় কালের ভাষ্য

শামসুর রাহমানের কালের ধুলোয় লেখা নানা বিবেচনায় এক গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। শিল্পরসিক-পাঠক এ বইয়ের প্রতি প্রথমে আকৃষ্ট হবেন এটি বাংলাদেশের এবং বাংলা ভাষার সমকালীন এক জনপ্রিয় ও প্রধান কবির বেড়ে ওঠার ইতিহাস বা অন্তর্জীবনের তন্নিষ্ঠ আখ্যান বলে।

রবীন্দ্রনাথ যদিও বলেছেন, ‘কবিকে পাবে না তার জীবন চরিতে’- তবু কবির কাব্য-মুহূর্তের অলৌকিক আনন্দের নিগূঢ় তত্ত্ব ও দুর্জ্ঞেয় রহস্যের উন্মোচনে তা একেবারেই যে বিমুখ করে এমন নয়। কবির মনোজগতের সৃজন-প্রক্রিয়া বা কোনো কোনো কবিতার উৎস সম্পর্কে আকার-ইঙ্গিত-আভাস বা কাব্য নির্মাণের ইতিহাসের টুকরো উপাদান কবির আত্মকথার কখনো প্রচ্ছন্নভাবে উপ্ত থাকে, কখনো বা উজ্জ্বলভাবেই উঁকিঝুঁকির রৌদ্রছায়া বিস্তার করে। সেদিক থেকে শামসুর রাহমানের কালের ধুলোয় লেখা’র বিশেষ মূল্য আছে। কবির জীবন ও তার কবিতা অনুরাগী পাঠক যদি উপর্যুক্ত কারণে এ বইয়ের কদর করেন, তাহলে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তির অনুসন্ধিৎসু পাঠকেরা এ বইয়ে একটি ভৌগোলিক জনগোষ্ঠীর আত্মবিকাশ, আত্মপ্রতিষ্ঠা ও রাষ্ট্রগঠন সংক্রান্ত বহু বিষয়ে একজন প্রভাবশালী সমসাময়িক কবির বয়ান-ভাষ্য ও চিন্তা-চেতনার পরিচয় পাবেন। পরবর্তী সময়ে যারা বাংলাদেশের সুশীল সমাজের ভূমিকা ও ইতিহাস নিয়ে কাজ করবেন তাদের জন্যও শামসুর রাহমানের এ জীবনকথা অপরিহার্য বিবেচিত হবে।

উপর্যুক্ত ভূমিকানুযায়ী কালের ধুলোয় লেখা’র প্রথম গুরুত্বের কারণ, এটি একালের বরেণ্য কবি শামসুর রাহমানের জীবন ও স্মৃতিকথা। বইটিতে কবি ও স্বচ্ছদৃষ্টির প্রগতিশীল মানুষ রাহমানের জীবন ও স্মৃতিকথা। বইটিতে কবি ও স্বচ্ছদৃষ্টির প্রগতিশীল মানুষ হিসেবে তার বেড়ে ওঠার ইতিহাস কিছুটা বিচ্ছিন্নভাবে গেঁথে দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়টি কালানুক্রমিক ও স্তর পরস্পরাগতভাবে এগোয়নি। তাহলে কবির মানস-গঠন ও জীবনোপলব্ধির ধারা ও ধরন বুঝে নিতে আরও সুবিধা হতো। তবু দৈনিক পত্রিকায় সাপ্তাহিক কিস্তি হিসেবে লেখা জীবনকাহিনীতে শামসুর রাহমান তার বাল্যকালে যে সামাজিক-সাংস্কৃতিক আবহে বড় হয়ে উঠেছেন তাতে তার সমকালীন অন্য বাঙালি মুসলমান সাহিত্যিকের প্রস্তুতি-পর্বের সঙ্গে একটু ভিন্নতা আছে; এই ভিন্নতাকে মৌলিকও বলা যেতে পারে। কৃষিভিত্তিক গ্রামসমাজ থেকে উঠে আসা বাঙালি মুসলমান সাহিত্যিকরা গ্রামীণ লোকজ সাংস্কৃতিক মাধ্যমে বাল্যকালে তাদের রসতৃষ্ণা মিটিয়েছেন। অন্যদিকে শামসুর রাহমানের শিকড় নরসিংদীর পাড়াতলী গ্রামের প্রোথিত হলেও আজন্ম ঢাকা শহরে বসবাস করার কারণে বাল্যকালে ঢাকার আদিবাসী সংস্কৃতির সঙ্গেই তার পরিচয় ঘটে।

বাল্যকালে শামসুর রাহমান বাংলা শিশু-সাহিত্যের সেরা বইগুলো পড়বার সুযোগ পাননি। শুধু যৌগীন্দ্রনাথ সরকারের হাসিখুশী বইখানা কেমন করে যেন হাতে এসেছিল এবং মনের আনন্দে বইটি পড়েছিলেন। তবে চিরায়ত শিশু-সাহিত্যের অন্য কোনো বই পড়ার তার সুযোগ হয়নি। এমনকি রবীন্দ্রনাথের কবিতা বা গদ্য রচনাও তিনি পড়েছেন অনেক পরে। অনেকটা আকস্মিকভাবে রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছ পড়ে তিনি দারুণ অভিভূত হন; সেই থেকে তার সাহিত্যবোধ গভীর হতে থাকে। মীর মশাররফ হোসেনের বিষাদসিন্ধু পড়া ছিল বলে ইমাম হোসেনের দুলদুলের ঘোড়া কিশোর বয়সে শামসুর রাহমানকে প্রবলভাবে আকৃষ্ট করে। সেকালের সাম্প্রদায়িকতার পরিবেশ বালক শামসুর রাহমানকে বেপথু করতে পারেনি। অসাম্প্রদায়িকতার শিক্ষা তিনি পেয়েছিলেন মূলত তার পিতার কাছ থেকে। তার পিতা স্বল্পশিক্ষিত হলেও মানবিক খরচেতনায় ছিলেন এক অনুসরণযোগ্য ব্যক্তিত্ব। স্কুলে বালক শামসুর রাহমান কিছু সাম্প্রদায়িক আঁচের মধ্যে পড়লেও অধিকাংশ হিন্দু শিক্ষক বিশেষ করে চিন্তাহরণ সোমের আন্তরিক স্নেহশীলতা তার মানবিকতার দীক্ষাকে নিখাদ করে তোলে।

শামসুর রাহমানের কবিতা লেখার পেছনে তার সাহিত্যিক ও শিল্পী বন্ধুদের বেশ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভূমিকা ছিল। কিন্তু যতদূর বোঝা যায়, তাৎপর্যপূর্ণ অবদান ছিল ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র নবাববাড়ির সন্তান আশরাফ আলী ওরফে মাবেজ, শিল্পী হামিদুর রহমান, মোশাররফ হোসেন চৌধুরী, নবাববাড়ির মেয়ে কবির বড় ভাবী ও উর্দু সাহিত্যের অনুরাগী পাঠিকা জাহানারা বেগম ও অধ্যাপক আজহার হোসেনের। আশরাফ আলীর পড়ার ঘরে ছিল রাশি রাশি ইংরেজি বই। কবিকে তিনি ইংরেজি রোমান্টিক কবিদের বিশেষত জন কীটসের কবিতা পড়ে শোনাতেন। অন্যদিকে জাহানারা বেগম ছিলেন এক বিদূষী মহিলা। উর্দু সাহিত্যে তার ভালো দখল ছিল। তিনি উর্দু সাহিত্যের নির্বাচিত গল্প-কবিতা তরুণ শামসুর রাহমানকে পড়ে শুনিয়েছেন- বুঝিয়ে দিয়েছেন গালিবের কবিতা বা গজলের অর্থ। এর আরও কিছু পরে পাড়ার ছেলে ও পরবর্তী সময়ের বিখ্যাত শিল্পী হামিদুর রহমানের সঙ্গে তার গাঢ় বন্ধুত্ব জন্মে। তিনি শামসুর রাহমানকে লেখালেখির ব্যাপারে যথেষ্ট উৎসাহ জোগান। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে শামসুর রাহমান পাঠ্যবই-পোকা ভালো ছাত্র ছিলেন না- তাই তার তথাকথিত ক্যারিয়ারের প্রস্তুতি ভালো হয়নি, কিন্তু কবিতা-চর্চার দিকটা তিনি বেশ যত্নের সঙ্গেই করেছিলেন।

১৯৫২ সালে কবিজীবনের দুটি ঘটনা বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। ইতোমধ্যে ঢাকার সোনার বাংলা ও দৈনিক সংবাদে এবং কলকাতার পূর্বাশায় কবির কিছু কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু কবি বেশ একটা ধাক্কা খেলেন সংবাদ-কর্তৃপক্ষের কাছে। কবির ‘রূপালি স্নান’ কবিতাটিতে কয়েকটি শব্দ লাল কালিতে দাগ দিয়ে তা বদলাতে বলা হলো। কবি রাজি না হয়ে ফেরত এনে পাঠিয়েছিলেন বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত কলকাতার বিখ্যাত কবিতা পত্রিকায়। সেই পত্রিকায় কবিতাটি যথারীতি ছাপা হলো। এই ঘটনা কবিকে দৃঢ় আস্থাশীল এবং আনন্দাপ্লুত করে। প্রচ- খুশি হন কবি, বন্ধু কায়সুল হকও। ১৯৫২ সালের জুন মাসে বুদ্ধদেব বসুর কবিতা পত্রিকার সংখ্যাটি শুরু হয় শামসুর রাহমানের ‘মনে মনে ও তার শয্যার পাশে’ কবিতা দুটি দিয়ে। এই সংখ্যায় বিষ্ণু দে, সঞ্জয় ভট্টাচার্য, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, অশোক বিজয় রাহা, মনীন্দ্র রায়, লোকনাথ ভট্টাচার্য, রাজলক্ষী দেবী প্রমুখের কবিতা ছাপা হয়। এর ফলে বাংলা ভাষার শক্তিশালী কবি হিসেবে শামসুর রাহমানের আবির্ভাব ঘটে। শামসুর রাহমানের কালের ধুলোয় লেখা বাংলাদেশের বাঙালি মুসলমানদের সামাজিক জাগরণ ও সাংস্কৃতিক উত্থানেরও এক বিশিষ্ট দলিল। অন্যদিকে ঢাকা শহরের নানা বিষয়ের বয়ানে আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিকের কতক চিত্র ফুটেছে এ বইয়ে।

নিজ পরিবারের দুঃখ-দৈন্য ও আর্থিক অনটনের চিত্রও তুলে ধরেছেন আত্মজীবনীকার নিখাদ আন্তরিকতায়। এই আর্থিক অনটন কবিকে পরবর্তীকালেও বারবার পাকড়াও করেছে। এমনকি সন্তানের দুধের খরচ জোগানোর জন্য তাকে উপহারের আংটি পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়েছে। ১৯৪৩ সালে দুর্ভিক্ষ, বিভিন্ন সময়ে ঢাকার দাঙ্গার কিছু কথাও আছে কালের ধুলোয় লেখায়। লেখকের কালের অর্থনৈতিক জীবনধারায় অনুপুঙ্খ বিবরণ এতে না থাকলেও সংস্কৃতিজগত ও সেই জগতের উজ্জ্বল-অনুজ্জ্বল কুশীলবদের ওপর বিস্তৃত আলোকপাত আছে। গোটা বইটিকে প্রধান দুটি ভাগে ভাগ করলে এতে পূর্ব-বাংলা স্বাধিকার ও স্বাধীনতা সংগ্রাম-এর অনুষঙ্গী সাংস্কৃতিক আন্দোলন ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রের কিছু ব্যতিক্রম বাদে (যেমন অধ্যাপক মুহম্মদ আবদুল হাই), সকল বিশিষ্টজনেরই বিস্তৃত পরিচয় লিপিবদ্ধ হয়েছে। ধীমান ঐতিহাসিক হবিবুল্লাহ আর স্নিগ্ধ ব্যক্তিত্বের প্রখ্যাত অধ্যাপক ও সাহিত্যবোদ্ধা খান সারওয়ার মুরশিদ ছাড়াও কবির ঘনিষ্ঠ বন্ধু জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, রশীদ করীম এবং আবদুল বারেক চৌধুরী চিত্রিত হয়েছেন উজ্জ্বল আভায়।

নারী বিষয়ে ‘আশুচেতন’ শামসুর রাহমানের প্রথম প্রেমের কাহিনীও কবি বেশ বিস্তারেই বলেছেন। সেই কন্যাকে তিনি বলেছেন ‘দ্রাবিড় কন্যা’। তাকে গভীরভাবে ভালোবেসেছিলেন- একবার একগুচ্ছ হাস্নাহেনা ফুলও তার হাতে তুলে দিয়েছিলেন, মেয়েটি সে ফুল খোঁপায়ও পরেছিল, কিন্তু তরুণ লাজুক কিন্তু গভীর প্রেমে নিমগ্ন শামসুর রাহমান কখনো মুখ ফুটে সে মেয়েকে বলেননি: তোমাকে ভালোবাসি।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সংস্কৃতি সংসদের অনুষ্ঠানে শামসুর রাহমান আর একবার প্রেমে পড়েন ঈষৎ নীল চোখের এক সুদর্শনার- কবি তাকে ডাকতেন ‘বন্যা’ নামে। বন্যার সঙ্গে ঘুরেছেন কোনো ভাঙা মন্দিরের ছায়ায় কিংবা অন্য কোথা- কিন্তু সেও ছিল তাকে এতটুকু স্পর্শ না করার প্রেম। বন্যাকে হারিয়ে, কবি বলেছেন : আমি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলাম। ঠিক এমন পরিস্থিতিতে বেশ কিছুদিন পর জোহরাকে আমি কিছুক্ষণের জন্য দেখেছিলাম আমার এক বোনের বিয়েতে। বিদ্যুৎ চমকের মতো ঘটনাটি। সেও আমার দিকে তাকিয়েছিল কয়েকবার। হয়তো আমার দৃষ্টিতে সে আনন্দের আভা দেখতে পেয়েছিল। এই ক্ষণিকের চক্ষুমিলন আমাকে দৃষ্টিতে সে আনন্দের আভা দেখতে পেয়েছি এই ক্ষণিকের চক্ষুমিলন আমাকে বিষণ্নতা থেকে মুক্তি দিল, ফিরিয়ে আনল কবিতার আলিঙ্গনে।

এই ‘জোহরাই’ পরবর্তীকালে কবি-পত্নী জোহরা রাহমান। কবি-জীবনে পরে আরও দুই নারীর আনাগোনা লক্ষ করি। এর একজন জাহানারা আকতার, অন্যজন গৌরি;- অনুমান করি, পরের নামটি আসল নাম নয়-কবির দেওয়া ছদ্মনাম। গৌরিকে নিয়ে কবির বেশকিছু কবিতা আছে। পরিশেষে বলি, তাৎপর্যের ব্যাপার হলো শামসুর রাহমানের লেখক জীবনের নানা নিগূঢ় তথ্যের চমৎকার উন্মোচন আছে এতে।