একই সূত্রে বাবাও!

ঢাকা, শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ৫ আশ্বিন ১৪২৬

একই সূত্রে বাবাও!

অনল রায়হান ৫:২৮ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৬, ২০১৯

print
একই সূত্রে বাবাও!

আমাদের মাঝে বাবা নেই দীর্ঘদিন হয়ে গেল। দীর্ঘ হতে হতে আরও দূরে চলে যাচ্ছে সময়। হয়তো এক সময়ে সভ্যতার স্তম্ভ হিসেবে বাবা থাকবেন। একাত্তরে যারা সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশাজীবীদের নির্বিচারে হত্যা করেছিল, তাদেরই একজন আমার বাবা জহির রায়হান। অপরাধীদের বিচার চেয়ে আমরা বারবার রাষ্ট্রের কাছে আবেদন জানিয়েছিলাম। তাদের বিচার আদৌ হবে এ বিশ্বাস কারও ছিল না। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সেরকম পরিস্থিতি কখনোই ছিল না। আঁধারে ঢাকা ছিল গোটা জাতি। এখন বিচার হচ্ছে এবং সামনে আরও ফলপ্রসূ হবে, এ বিশ্বাস করি।

সরকারের যুদ্ধাপরাধী বিচার করবার জন্য যত উদ্যোগ তার সবই অবিস্মরণীয়। ট্রাইব্যুনাল গঠন, আন্তর্জাতিক বিশ্বস্ততা অর্জন, অপরাধীদের বিচারের আওতায় নিয়ে আসা এবং কার্যকর করা। এর সবই ছিল ধ্রুপদী উদ্যোগ। একবার যখন একটি রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল গঠন করে এবং সেটার বিচারকার্য সম্পাদন করে ফেলে তখন তা কিন্তু একটা রেকর্ডেড ডকুমেন্ট। আলোড়ন তোলার মতো ডকুমেন্ট।

দেশের বাইরে যারা পলাতক আছেন আশরাফ উদ্দিন, চৌধুরী মঈনুদ্দীনসহ অন্যরা তাদেরও খুব দ্রুত সাজার আওতায় আনা দরকার। তবে বাবাসহ যেসব বুদ্ধিজীবী হত্যা করা হয়েছে, গণহত্যা করা হয়েছে সেসব নিয়ে গভীরভাবে কোনো পর্যবেক্ষণ লক্ষ করিনি। এর কারণ মূলত, আমরা দীর্ঘসময় মুক্তিযুদ্ধের চর্চা করতে পারিনি। মুক্তিযুদ্ধ চেতনা থেকে ছিটকে পড়েছিলাম। বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড দেশ তথা বিশ্বের কাছে সবচেয়ে ন্যক্কারজনক ঘটনা। তালিকা করে, লক্ষ্য করে আস্তে আস্তে ডেকে এনে এদের হত্যা করা হয়েছে। সেটাকে নিয়ে আরও বিস্তারিত, গভীরভাবে গবেষণার দরকার ছিল। সে গবেষণাপত্র হাতে পেলে সেটাকে বিশ্লেষণ করে সামনে এগুনো যাবে। আমরা আশাবাদী তা হবে।

মার্চের হত্যাকাণ্ড, জুন-জুলাইয়ের হত্যাকাণ্ড এবং ডিসেম্বরের হত্যাকাণ্ড সবই একসূত্রে গাঁথা। স্বাধীনতা-পরবর্তী জহির রায়হান হত্যাও একই সূত্রে গাঁথা। এক সময়ে জহির রায়হানের ‘অন্তর্ধান’ বিষয়টি সামনে চলে আসছিল। কিন্তু আজ তা একেবারে স্পষ্ট, জহির রায়হানকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের দেড় মাস পরে মিরপুর স্বাধীন হলো। ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি। কয়েক লাখ বিহারি, জামায়াত-আলবদর, পাকিস্তানি, রাজারকার সেখানে আশ্রয় নিয়েছিল। দেড় মাস ধরে ওরা ওখানেই ছিল। এরই মাঝে দেশ স্বাধীন ভেবে যেসব বাঙালি মিরপুরে ঢুকেছিল তাদের জবাই করে হত্যা করা হয়েছিল। জহির রায়হান যখন কলকাতা থেকে ফিরে এসে জানলেন, মুনীর চৌধুরী, শহীদুল্লাহ কায়সারসহ তার ঘনিষ্ঠজন নেই। তখন বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের একটা তদন্ত কমিটি ঘোষণা করা হয়। সেখানে কবীর চৌধুরীও ছিলেন। জহির রায়হান তদন্ত কমিটির প্রধান ছিলেন। সেই তদন্তে বেরিয়ে এলো জামায়াত, মুসলিম লীগ ও পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর যৌথ পরিকল্পনায় হত্যাকাণ্ডটি ঘটানো হয়েছিল। ১৯৭২ সালের ২৫ জানুয়ারি প্রেস ক্লাবে জহির রায়হান একটি সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন। সেখানে তিনি জানিয়েছিলেন, বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের নীলনকশা তার কাছে আছে; কেন, কী উদ্দেশ্যে হত্যা করা হলো এবং তিনি তা শীঘ্রই প্রকাশ করবেন।

এরপর ওনাকে জানানো হলো শহীদুল্লাহ কায়সার, মুনীর চৌধুরী মিরপুরে বেঁচে আছেন। এরপর ৩০ জানুয়ারি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট মিরপুরে অপারেশনে গেল। জহির রায়হান সিভিলিয়ান হিসেবে ওই দলের সঙ্গে ছিলেন। সকাল সাড়ে ৮টায় রাজাকার, পাকিস্তানি, আলবদরদের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। সেখানেই জহির রায়হান নিহত হন। এরপর আমরা সেই গণহত্যা এবং বুদ্ধিজীবী হত্যার গবেষণাপত্রটিও আর পাইনি। সেটা পেলেও বাবাকে হত্যার রহস্য উন্মোচন হতো।