ঈদ আমার স্বাধীনতার দিন

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৫ অক্টোবর ২০১৯ | ২৯ আশ্বিন ১৪২৬

ঈদস্মৃতি

ঈদ আমার স্বাধীনতার দিন

শারমিনুর নাহার ৩:৩১ অপরাহ্ণ, আগস্ট ০৯, ২০১৯

print
ঈদ আমার স্বাধীনতার দিন

আমার ঈদের আনন্দ আর আট দশজনের মতো ছিল না। একান্ত পারিবারিক- সামজিক এই দিনই ছিল আমার একান্তই ব্যক্তিগত দিন। এই দিন ছিল আমার মুক্ত দিন। মুক্তির দিন, স্বাধীনতার দিন। যদিও বন্দি আমি নই মোটেও, তবু ঈদের দিনের বিশেষত্ব হলো- কোথায় গেলাম, কী করলাম, কারা ছিল, কী খেলাম, কখন ফিরব এসবের বালাই ছিল না। আমরা দল বেঁধে ঈদ উদযাপন করতাম।

কেবল ঈদের দিন নয়- মোটামুটি পরের আরও দুটো দিন ছিল আমাদের একান্ত ব্যক্তিগত দিন। আমরা মানে বন্ধুরা- যারা একসঙ্গে হেসে-খেলে বড় হয়েছি- একসঙ্গে কবিতা পাঠ করে শহর মাতিয়েছি- একসঙ্গে চনমনে দুপুর, ঝমঝম বৃষ্টি, সুকর্ত-কুতর্ক করে অভিমান- আলিঙ্গন করেছি। এইসব ব্যক্তিগত ঈদ কিন্তু শৈশবে নয়, কৈশোরে। মানে যখন আমরা স্কুলের বড় ক্লাসে পড়ি, কলেজে যাব বা যাই সেসময়। একেবারে ছোটবেলার ঈদ তো বাবার হাত ধরে। ভাই-বোনের সঙ্গে চুইনগাম খেয়ে অথবা নানা বাড়িতে ঘুরে ঘুরে ঈদি তুলে। চকচকে টাকার সুঘ্রাণ গালে মেখে- লুকিয়ে লুকিয়ে কাঠিওয়ালা আইসক্রিম খেয়ে অথবা বড় কারও সঙ্গী হয়ে। ওটা ছিল সামাজিক ঈদ ব্যক্তিগত নয়।

একটু একটু ব্যক্তি হয়ে না উঠলে কি আর ব্যক্তিগত ঈদ হয়? আধা-আধা ব্যক্তি হয়ে ওঠার দিনগুলোতে ঈদ ছিল সত্যিকার অর্থে কাক্সিক্ষত। সেই কটা দিন যদিও কেবল দিনে নয়, রাতেও- মানে রাতের অনেকটা সময়জুড়ে ছিল স্বাধীনতা। আমরা মানে শহর দাপিয়ে বেড়ানো সেই বন্ধুরা নিজেদের পছন্দমতো ঘুরে-ঘুরে বেড়াতাম।

এখানে-সেখানে এবং অবশ্যই অপরিচিত গণ্ডিতে। পরিচিত গণ্ডিতে ঘুরলে তো আর স্বাধীন স্বাধীন লাগে না। তাই দলবেঁধে আমরা চলে যেতাম কোনো বনে, কোনো সামান্য উঁচু জায়গা যাকে স্থানীয় লোক টিলা বলে অথবা পরিত্যক্ত কোনো স্থানে সেখানে আমাদের দলকে কেউ খুঁজে পাবে না। একবার ঈদে আমরা ট্রেনে চেপে বসলাম। ঠিক কতদূর গেলে আবার ফিরে আসা যাবে এই ভাবনা নিয়ে যাত্রা শুরু হলেও তা রক্ষা করা যায়নি।

ফলে বিপত্তি বাঁধল যদিও ঘটনাটা আজো ফাঁস হয়নি। তবে সেদিনের পু-ঝিঁক- ঝিঁক শব্দে হারিয়ে যাবার একটা নতুনত্ব মনে গেঁথে আছে। স্টেশনে হকারদের ইয়ত্তা নেই। ঈদে হকারদের রোজগার হয়তো ভালো তাই বিকাল গড়ানোর আগেই তারা রিপিটেসন বকবক শুরু করে। কোথায় চলে এসেছি জানি না কেউই। কারণ যে সময়ের কথা বলছি তখন গুগল মামা থাকলেও আমাদের হাতে নেই। খুব জনাকীর্ণ নয় তবুও জনের বিশেষ অভাব বোধ হয় না।

এমন একটি স্টেশনে ক্লান্ত রিক্ত আমরা প্লাটফরমের চেয়ারে হেলান দিয়ে আছি। কেউ কেউ ঘুমিয়ে পড়েছে। স্টেশন মাস্টার বা কোন কর্মকর্তা না থাকায় কখন ফিরতি ট্রেন আসবে তা কারও জানা নেই। যাই হোক আমরা ঝিমাচ্ছি। রেল লাইনের একটু সামনে খুব সফেদ লুঙ্গি-শার্ট পরা লোকটি রিপিটেসন কথাগুলো বলে যাচ্ছে। কি বলছে? লোকে আগ্রহ নিয়ে কি শুনছে- কৌতূহল নিবৃত্ত করতে উঠে গেলাম। হকার সাহেবের গলার জোর বাড়ল। একটা ছোট কাঠের বাক্স- ঠিক সাপুড়েদের কাছে যেমন থাকে- ভেবেছিলাম সাপ হয়তো। কিন্তু খুলি খুলি করেও লোকটা বাক্সটা খোলে না। একই কথা কেবল বলে যায়।

কি বলছে তাও স্পষ্ট নয়। শুনতে শুনতে পরে একটু স্পষ্ট হলো। কথাগুলো কানে যেতেই আমার কান রীতিমত লাল হয়ে উঠল- কী পচা পচা কথা বলছে বাবা—!! আমি ওখান থেকেই স্টেশনের নোংরা চেয়ারে বসা বন্ধুদের দিকে তাকালাম। তারা একত্রে হো হো করে হাসছে। এবার আরো লজ্জা পেলাম..

একটু ধাতস্থ হলে এক বন্ধু বলল, তুই জানিস না ওরা কি বলে? না, জানলে কি আবার শুনতে যাই। প্রায় মধ্যরাতে সেবার ফিরেছিলাম। বাড়িতে আর যাইনি। আর এক বন্ধুর বাসায় থেকে গিয়েছিলাম। ঈদ না হলে এসব কী আর পেতাম!