তৃষিত বর্ষার পদাবলি

ঢাকা, সোমবার, ১৯ আগস্ট ২০১৯ | ৩ ভাদ্র ১৪২৬

তৃষিত বর্ষার পদাবলি

মৃণাল বসুচৌধুরী ১২:২৭ অপরাহ্ণ, আগস্ট ০২, ২০১৯

print
তৃষিত বর্ষার পদাবলি

বর্ষা নিয়ে আমরা সকলেই কমবেশি আবেগপ্রবণ। প্রকৃতির ছয় ঋতুর মধ্যে বর্ষা ও বসন্তকে নিয়েই যেন অজানা আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে ওঠে আমাদের হৃদয়। প্রেমের ঋতু, বর্ষা না বসন্ত, এ নিয়ে বিতর্ক হলে, বর্ষাই বোধহয় বেশি জায়গা করে নেবে অনেকের কাছেই।

যৌবনে পা দেওয়ার অনেক আগে থেকেই কালিদাস ও ‘মেঘদূত’-এর কথা শুনেছি। জেনেছি কাজে গাফিলতির সাজা হিসেবে নির্বাসিত যক্ষের কথা। পরবর্তীকালে, কবি বুদ্ধদেব বসুর অনুবাদে পড়েছি মহাকবি কালিদাসের অমর কীর্তি ‘মেঘদূত’। স্ত্রী অলকার কাছে বিরহমাখা বার্তা পাঠানোর জন্য মেঘের শরণাপন্ন যক্ষের আকুতি, মুগ্ধ এবং ভারাক্রান্ত করেছে মন। পূর্বমেঘ এবং উত্তরমেঘের প্রতিটি ছত্র শুধু আলোড়িত করেনি, হয়তোবা কাব্যানুরাগী করে তুলেছিল আমায়। মন্দাক্রান্তা ছন্দের দোলায় কেমন যেন শিহরিত হয়ে যেত মন। ‘আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে’ বহু ব্যবহৃত এই শব্দবন্ধটি এখনো সেই কামাতুর যক্ষের কথা মনে করায়।

‘প্রথম বৃষ্টির বিন্দু’ কি কালিদাসের হাত ধরেই এসেছিল সাহিত্যে? না বোধহয়। বাল্মিকীর রামায়ণেও ঘন বর্ষায় বন্দিনী সীতাদেবীর বিরহে রামচন্দ্রের কিছু অনুভূতির বর্ণনার কথাও পড়েছি কোথাও। সে যাই হোক সাহিত্যে বৃষ্টির ইতিহাস নয়, কবিদের সঙ্গে বৃষ্টির বিরহমধুর সম্পর্কের মধ্যেই কীভাবে অমর হয়ে আছে আমাদের বৃষ্টিকথা সেটাই বরং ফিরে দেখার চেষ্টা করি। যতটা পারি।

বৈষ্ণব পদাবলির কবিদের কবিতায় বর্ষা ও বিরহ অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে। বিশেষ করে বিদ্যাপতির কবিতায়- ‘তিমির দিঘভরি ঘোর যামিনী/অখির বিজুরিক পাতিয়া/মত্ত দাদূরী ডাকিছে ডাহুকী/ফাটি যাওত ছাতিয়া।’ রাধাকৃষ্ণের প্রেম কাহিনী, তাদের কামনা-বাসনা বর্ষার ছোঁয়ায় উত্তাল। বিদ্যাপতির লেখনীতে রাধার বিলাপ- ‘এ সখি হামারি দুখের নাহি ওর/এ ভরা বাদর মাহ বাদর/শূন্য মন্দির মোর ‘চলতি হিসাবে ভাদ্রমাস বর্ষা ঋতুতে পড়ে না।।’ কিন্তু চণ্ডীদাসের চোখে বর্ষা ছিল চারমাস।

কবি মধুসূদন দত্তও বর্ষা নিয়ে কবিতা লিখেছেন ‘বর্ষাকাল’। গভীর গর্জনে নদ নদী যখন উথলে পড়ে ধরণীর বুকে, তখন..‘রমণী রমন লয়ে সুখে কেলি করে/ দানবাদী দেব যক্ষ সুখিত অন্দরে’।

বর্ষা ছিল রবীন্দ্রনাথের প্রিয় ঋতু। সেজন্যই বোধহয় বর্ষার ওপর তার গানের সংখ্যা সব থেকে বেশি। বসন্ত নিয়ে তার গান তুলনায় কম। প্রায় শৈশব থেকেই তার গান মুগ্ধ করেছে আমায়। স্কুলের প্রথম দিন থেকেই তার গানের সঙ্গেই বেড়ে ওঠা। বর্ষা মানেই ‘মেঘের পরে মেঘ জমেছে’ বা ‘আজি ঝরঝর মুখর বাদল দিনে’ অথবা ‘বহুযুগের ওপার হতে’র মতো সব গানের ডালি। তার অনেক কবিতাই কণ্ঠস্থ ছিল এক সময়। ‘বর্ষামঙ্গল’ও। ‘ওই আসে ওই অতি ভৈরব হরষে’ শব্দ-মাধুর্যে অনবদ্য এই কবিতাটি আমার অবসর যাপনের সঙ্গী ছিল, সুযোগ পেলেই শুনিয়ে দিতাম অন্যদের। আরেকটি প্রিয় কবিতা ছিল ‘বর্ষার দিনে’ ‘এমন দিনে তারে বলা যায়,/এমন ঘনঘোর বরিষায়।’

বয়স যত বেড়েছে, বুঝেছি- মেঘদূত বা রামায়ণে বর্ষাকে জড়িয়ে যে কামনা, বাসনার প্রকাশ ঘটেছে, তা রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিতে নেই। সব লেখাতেই এক অদ্ভুত সুষমা জড়ানো। তিনি ছিলেন প্রকৃত অর্থে সৌন্দর্যের পূজারী। প্রকৃতির বিভিন্ন রূপের সুন্দর বর্ণনা আছে কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায় ও গানে। তার ‘বর্ষা-বিদায়’ কবিতা কারও আজানা নয়। ‘ইন্দ্রপতন’ কবিতায় আষাঢ় মাস আপনরূপে উদ্ভাসিত ‘তখনো অস্ত যায়নি সূর্য, সহসা হইল শুরু/অম্বরে ঘন ডম্বরু- ধ্বনি গুরুগুরু গুরুগুরু। কবি নজরুলের অসাধারণ সব গানের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে আমাদের।

‘নক্সী-কাঁথার মাঠ’, কবি জসীমউদ্দীনের অমর সৃষ্টি। জীবনের চিরন্তন গান। তার কবিতায় গ্রাম বাংলার লোকায়ত রূপের পাশাপাশি আমরা প্রকৃতিকে পেয়ে যাই অন্য মুগ্ধতায়। ‘আড়িয়া মেঘা, হাড়িয়া মেঘা কুড়িয়া মেঘার নাতি /নাকের নোলক বেচিয়া দিব তোমার মাথার ছাতি/কৌটো-ভরা সিঁদুর দিব, সিঁদুর মেঘের গায়/আজকে যেন দেওয়ার ডাকে মাঠ ডুবিয়া যায়।’

বর্ষা নিয়ে কবিতা লেখেননি এমন কবি প্রায় নেই বললেই চলে। কবি মধুসূদন দত্ত থেকে শুরু করে এই শতকের নবীনতম কবি, সবাই বর্ষাকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন, কাগজ-কলমে অথবা মানসপটে। তবে সবার দেখার ভঙ্গিটা হয়তো এক নয়। কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত তার মহাকাব্যসম দীর্ঘ কবিতা ‘সংবর্ত’র প্রথম পংক্তিণ্ড ‘এখনো বৃষ্টির দিনে মনে পড়ে তাকে’ দিয়ে শুরু করেছিলেন। জীবনানন্দ দাশকে অনেকেই হেমন্তের কবি বলেন। বৃষ্টি নিয়ে কিছু কবিতা তিনিও লিখেছেন।

বর্ষা নিয়ে আবেগ জড়ানো অসংখ্য কবিতা ভেসে বেড়াচ্ছে হাওয়ায়। কয়েক দিন আগে বারান্দায় বসে বৃষ্টির সঙ্গে কথা বলতে বলতে মনে পড়ল কবি শামসুর রাহমান এর অনবদ্য কবিতা ‘এমন বর্ষার দিনে’র দুটি পঙক্তিণ্ড ‘এমন বর্ষার দিনে তোমার কি সাধ জাগে কেউ/ নিরিবিলি টেলিফোনে ‘রাধা’ বলে ডাকুক তোমাকে?’

কর্মসূত্রে দীর্ঘদিন মুম্বাই শহরে ছিলাম একা। বৃষ্টি এসে প্রায়ই ভিজিয়ে দিতো আমার বারান্দা। সমুদ্রের কাছাকাছি সেই আকাশচুম্বী বাড়ির চৌদ্দ তলায় বসে জানলা দিয়ে দেখতাম বৃষ্টি ও সমুদ্রের খুনসুটি আর বিরহকাতর হৃদয়জুড়ে কখনো স্মৃতি কখনো কবিতা খেলা করত। সামনে এসে দাঁড়াতো প্রিয় সঙ্গিনীর সঙ্গে বৃষ্টিভেজার আনন্দময় দিনগুলো। জাগতিক সুখ স্বাচ্ছন্দ্য, শহুরে জীবন, চকমকি আলো নয়, তখন আমি উদাসপুরের আলাভোলা এক পথিক। সমুদ্র ও বৃষ্টি আমায় রাজভিখারির সাজে সাজিয়ে দিতো। স্মৃতির মোড়ক খুলে বেরিয়ে আসতেন কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়। মনে হতো আমারই পাশে দাঁড়িয়ে বলছেন- ‘সে কি জানিত না যত বড় রাজধানী/তত বিখ্যাত নয় এ হৃদয়পুর/সে কি জানিত না আমি তারে যত জানি/আ-নখ সমুদ্দুর/আজ সেই ঘরে এলায়ে পড়েছে ছবি/এমন ছিল না আষাঢ় শেষের বেলা/উদ্যানে ছিল বরসা-পীড়িত ফুল/আনন্দ ভৈরবী।’

এই বৃষ্টিবাহী স্মৃতি মাঝেমধ্যে সব লণ্ডভণ্ড করে দেয়। ছোটবেলার স্কুল পালানো, কাদা মাঠে বাতাবি লেবু নিয়ে খেলা, ডুবসাঁতারে আলতো করে তোমায় ছোঁয়া, করিম চাচার সঙ্গে একা নদীর পাড়ে জাল ফেলে মাছ ধরতে শেখা, এমন অনেক কিছুই ভিড় করে আসে। আসেন কবি শঙ্খ ঘোষ। তার একটি পঙক্তি ধীর পায়ে হেঁটে যায় ঘরের ভেতরে- ‘বৃষ্টি হয়েছিল বুকে সেদিন অনন্ত মধ্যরাতে।’ অনায়াস মুগ্ধতায় বসে থাকি যখন বলেন ‘বৃষ্টি নয় বিন্দুগুলি শেফালি টগর গন্ধরাজ’ এই সব গন্ধময় ফুলের সঙ্গে স্মৃতিরা ঘুমোয়।

শহরের মানুষ আমরা। বৃষ্টি নিয়ে অনেক সুখস্মৃতি, রোম্যান্টিক অনুষঙ্গ হয়তো আছে, কিন্তু এই বৃষ্টিই যখন চরম দুর্দশা ডেকে আনে, বজ্রপাত, চলন্ত বা দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ির ওপর ভেঙে পড়া গাছ, রাস্তায় জমে থাকা জল যখন বিঘ্ন ঘটায় আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায়, তখন আমরাই মুক্তি চাই এই অতিবৃষ্টির যন্ত্রণা থেকে। এমন যন্ত্রণার মুখোমুখি হতে হয়েছে বেশ কয়েকবার। অফিসের কাজে মুম্বাই যেতে হয়েছিল তিন দিনের জন্য। অঝোরঝরণ বৃষ্টিতে সেখানে সব কাজ পণ্ড। ফিরে আসার চেষ্টা করে জানা গেল, ট্রেন, প্লেন কিছুই চলছে না। দিন দুয়েক পরে একটা ফ্লাইটে কলকাতায় নেমে তো অবাক। কলকাতা তখন প্রায় সমুদ্র। দশগুণ বেশি ভাড়া নিয়ে একটি ভ্যান প্রায় ভাসতে ভাসতে পৌঁছে দিয়েছিল সেদিন। সত্যি বলতে কি, খুব ভালো লেগেছিল ডুবে থাকা কলকাতাকে দেখতে। দু’-একবার এই নদী হয়ে যাওয়া শহরে, জলের মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে অফিসও গিয়েছি আনন্দে। হয়তো বা বৃষ্টিকে কুর্নিশ জানাতে।

বৃষ্টিকে বিরহের ঋতু বলা হতো এক সময়। বৃষ্টিতে, ভেসে যেত নদীনালা, জল জমে বন্যায় বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকতো গ্রামগুলো। কাজের জন্য শহরে থাকা মানুষ সহজে ফিরতে পারত না প্রিয়জনদের কাছে। সে সব দিন হয়তো এখন নেই, কিন্তু অতিবৃষ্টির নানান উপসর্গে সাময়িকভাবে এখনো বিঘ্নিত হয় জীবন। পল্লীগ্রামের এই সব দুর্দশার কথা বিভিন্ন সময়ে কবিতার বিষয় হলেও, শেষ পর্যন্ত বৃষ্টির সঙ্গে ভালোবাসার সম্পর্কটাই চিরন্তন।

কয়েক বছর আরব দেশে ছিলাম। প্রায় তিরিশ বছর আগে। সেখানে তখন দশ মিনিটের বৃষ্টি হলেও মনে হতো বিরাট উৎসব। মনে আছে কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটি কবিতা খুব আবৃত্তি করতাম সে সময়। ‘দ্বিতীয় বয়ঃসন্ধি’। ‘বৃষ্টি থেমেছে, গাছগুলো ধরে ঝাঁকালে/আবার বৃষ্টি পাবে /এই ফোঁটাগুলি সোনালি বয়েস মাখা/ঢাকা থাকে কিংখাবে।’ ‘পরানের গভীর গহন থেকে’ উঠে আসতেন কবি সৈয়দ শামসুল হক। কবি বেলাল চৌধুরী, কবি রফিক আজাদ, তখন আমার বিছানার পাশে।

তাদের কবিতাই বৃষ্টি এনে দিতো ওই বালিস্বর্গে। এখন যেমন কবি নিমলেন্দু গুণ, কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা, কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী, আমার অবসরের মননসঙ্গী।

মেঘ ও বৃষ্টির সঙ্গে যেন জড়িয়ে আছে আমাদের জীবন। মানুষের সমস্ত সম্পর্কেও রোদ বৃষ্টি মেঘের খেলা। সেখানে কখনো সোনালি সূর্যরেখা, কখনো বা কালো মেঘ। ভুল বোঝাবুঝি। মেঘের গর্জন। বৃষ্টিকে কেউ কেউ প্রেমিকার কান্না বলে ভাবেন। কিন্তু আমার কাছে বৃষ্টি আর আনন্দ সমার্থক। আনন্দেও জল আসে চোখে। বিরহীর কান্নার মধ্যেও এক লুকনো আনন্দ থাকে। কাউকে মনপ্রাণ দিয়ে ভালোবাসার আনন্দ। যাকে ভালোবাসি তার জন্য অস্থির হবার আনন্দ।