বাবা ও আমি

ঢাকা, বুধবার, ১৭ জুলাই ২০১৯ | ২ শ্রাবণ ১৪২৬

বাবা ও আমি

মুর্তজা বশীর ৩:১৩ অপরাহ্ণ, জুলাই ১২, ২০১৯

print
বাবা ও আমি

বাংলা ভাষার প্রবাদপ্রতিম ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। ১৩ জুলাই তার ৫০তম প্রয়াণদিবস। শহীদুল্লাহর ছেলে চিত্রশিল্পী মুর্তজা বশীর ৮৭ বছরে এসে বাবাকে নিয়ে লিখেছেন। বলেছেন দুজনের নানারকম সম্পর্ককথা

আমার বাবার সম্পর্কে অনেক কিছুই বলা যায়। স্মৃতির পরিসীমা যেখানে অসীম। আমাদের ভাইবোনের অনেক কাজই বাবা সহজে মেনে নিতে পারেননি। আমার বড়বোনের লেখার মাধ্যমে গানবাজনা সম্পর্কে জেনেছি সেটা এরকম : আমার বোন নাকি হারমোনিয়াম দিয়ে গান গাচ্ছিলেন, আমার বাবা হারমোনিয়াম ভেঙে ফেলেছেন। অন্যদের কাছে শুনেছি, কোনো সভা-সমিতিতে যখন গান হতো, তিনি কানে আঙুল দিয়ে থাকতেন। আর ছবি আঁকার ব্যাপারটা হলো, যেহেতু আমি তার সন্তান হিসেবে ছবি এঁকেছি। তবে আমার আর্ট ইনস্টিটিউটে ভর্তি হওয়ার পেছনে, এটা সত্যি যে তার আগ্রহ বা অনাগ্রহ কোনোটাই ছিল না। আমি কমিউনিস্ট পার্টির নির্দেশে ওখানে ভর্তি হই। সেই সময় ম্যাট্রিক পরীক্ষার পরে আমি যখন আমার বাবাকে আর্টস্কুলে ভর্তি হওয়ার কথা বলি প্রথম, তিনি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। এটাকে লোকে ভিন্ন ব্যাখ্যা করেছে। তিনি ধর্মীয় কারণে প্রত্যাখ্যান করেছেন।

কিন্তু আমার একটা লেখা, তার মৃত্যুর সাতদিন পরে দৈনিক পাকিস্তানে বেরিয়েছিল, সেখানে কিন্তু আসল কারণটা বলেছি। তিনি বলেছিলেন, তুমি ছবি আঁকতে চাও, আমি প্যারিসে ছিলাম, সেখানে আর্টিস্টদের দেখেছি খুব অভাব, অনটন। তুমি আমার ছেলে, তুমি অভাব, অনটনে পড় এটা আমি চাই না। অতএব তুমি বি.এ. পাস করো, তারপর তুমি ছবি আঁক। যখন তিনি দেখলেন আমি আর্টস্কুলে ভর্তি হওয়ার জন্য খুব উতলা, তখন তিনি বললেন, তুমি আলীগড়ে চলে যাও। যখন দেখলেন, আমি ঢাকাতেই পড়তে চাচ্ছি, তখন তিনি বললেন, ঠিক আছে তুমি শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের প্রতিষ্ঠানে পড়ো। তিনি রবীন্দ্রভক্ত ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠা শেষে তাকে কার্যনির্বাহী পর্ষদের সদস্য নিযুক্ত পত্র লিখেছিলেন। যখন আমি খুব এডামেন্ট, তিনি দুদিন আমার সঙ্গে কথা বললেন না। আমার বয়স তখন সতেরো। তিনি তারপর যেটা করলেন, আমি খুব অবাক হয়ে গেলাম। প্যারিস থেকে তিনি যখন ফিরে আসেন, তখন ভারতীয় ছাত্র অ্যাসোসিয়েশন তাকে দুই খ- লুভর মিউজিয়ামের ছবির রঙিন রিপ্রোডাকশনের অ্যালবাম প্রেজেন্ট করেছিল। তিনি যদি আর্ট লাভার না হন, তাহলে তাকে ওটা কেন দেবে! তাকে কলম দিতে পারত। চর্যাপদ নিয়ে গবেষণা করতে গেছেন সেইটা দিতে পারত। এবং ওই অ্যালবামের মধ্যে বহু নগ্ন নারীর ছবি ছিল। এই বইটা উনি তার একটা ছোট্ট মেহগনি কালারের আলমারি ছিল, সেখানে তার মূল্যবান বইপত্র থাকত এবং সেটা তালা মারা থাকত। কিন্তু তিনি করলেন কী! তিনি আমাকে লাইব্রেরিতে নিয়ে সেই তালা খুললেন, খুলে বই দুটো বের করলেন এবং আমার হাতে দিয়ে বললেন, এই দুটো এতদিন আমার কাছে ছিল, আজ থেকে তোমার। এটা আমি লিখেছিলাম। সে জেনেশুনে, যেখানে অনেক নগ্ন নারীর ছবি আছে, তার অন্যান্য ছেলে, যারা যৌবনপ্রাপ্ত বা বিবাহিত, তাদের কিন্তু দেননি। কারণ হলো, তিনি এইটুকু বুঝেছিলেন ডিফারেন্ট বিটুইন ন্যুড এন্ড ন্যাকেড। ফ্লোরেন্সে থাকাকালীন ওয়াশিংটন ডিসিতে নাইন পাকিস্তানি আর্টিস্ট বলে একটা একজিবিশন হয়েছিল। সেই একজিবিশনে পাকিস্তানের অবজার্ভার পত্রিকায় যাদের যাদের ছবি প্রশংসিত হয়েছে সেখানে আমার নাম ছিল। কিন্তু আমার নাম ভুল মুদ্রিত হয়েছিল। ওখানে মুর্তজা রশীদ লেখা হয়েছিল। তিনি অবজার্ভার পত্রিকার লেটার এডিটরে রিজয়েন্ডার দেন। সেখানে তিনি বলছেন, তিনি অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছেন যে আমার ছেলের ছবি প্রশংসিত হয়েছে। তবে তার নাম এখানে মুদ্রণ বিভ্রাট হয়েছে। তার নাম মুর্তজা রশীদ না, মুর্তজা বশীর। তবে তার আসল নাম এ. কে. এম বশীরুল্লাহ অর্থাৎ আবুল খয়ের মুর্তজা বশীরুল্লাহ। আবুল খয়ের মুর্তজা বশীরুল্লাহ এই নামটি তিনি বারবার ইনসিস্ট করতেন এবং আমি এই নামটাকে বাদ দিয়েছিলাম।

আমরা ১৯৪৯ সালে ঢাকায় এসে পড়লাম। তো বাবার লাইব্রেরিতে আমি দাঁড়িয়ে আছি, এমন সময় ডাকপিয়ন অনেকগুলো চিঠি দিয়ে গেল, আমার বাবা ওগুলো দেখে একটা চিঠি ফেরত দিয়ে দিলেন। বললেন যে, এই নামে কেউ থাকে না।

আমি বললাম, দেখি। বললাম, এটা আমার চিঠি। আমার বাবা অবাক হয়ে গেলেন। তোমার চিঠি! এ তো মুর্তজা বশীরের চিঠি! তুমি মুর্তজা বশীর কবে থেকে হলে! আমি বললাম, আমি আপনার নামে পরিচিত হতে চাই না। আমি আমার নামে পরিচিত হতে চাই। আমার বাবা শুনলেন। চুপ করে থাকলেন। এবং তখন পর্যন্ত আমার নামের বানান ম দীর্ঘ-উ কার ত রেফ জ আ কার লিখতাম (মূর্তজা)।

উনি তখন বললেন, দেখ, মূর্খের বানান হয় ম দীর্ঘ-উ কার। কিন্তু তুমি তো বুদ্ধিমান। তুমি ম হ্রস-উ কার লিখবে (মুর্তজা)। তারপর থেকে ম হ্রস-উ কার লিখি। তারপর ধরো, পরবর্তীকালে যখন ষাট সালে লাহোর থেকে করাচিতে গেছি, আমার বাবা তখন করাচিতে উর্দু ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের চিফ এডিটর। তখন আমি তাকে বলেছি, আমার জন্য রং নিয়ে আসবেন। তিনি আমার জন্য রং নিয়ে আসলেন। যখন দেশের বাড়ি চব্বিশ পরগণায় গেছেন, ফিফটি ফাইভে, আমি তাকে চিঠি লিখেছি, আসার সময় কলকাতার চৌরঙ্গিতে জে.সি. লাহার দোকান থেকে আমার জন্য রং নিয়ে আসবেন। তিনি এনেছেনও।

একবার পবিত্র সরকার বাবা প্রসঙ্গে এক আলোচনায় আমার ছবি আঁকার ঘটনাকে ইঙ্গিত দিয়ে দেখান যে যেহেতু তিনি ধর্মনিষ্ঠ মুসলমান ছিলেন তাই আমার ছবি আঁকাকে সমর্থন করতে পারেননি। আমার সঙ্গে ঢাকায় বাংলা একাডেমিতে তার সঙ্গে দেখা হলে এই প্রসঙ্গের সূত্র এবং উৎস সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি সদুত্তর দিতে পারেননি। তার এই চিন্তার প্রতিফলন দেখি পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি থেকে প্রকাশিত সুনন্দন কুমার সেন রচিত মুহম্মদ শহীদুল্লাহ জীবনীগ্রন্থেও, ওই ভুল ধারণারই প্রতিধ্বনি দেখতে পাই এতে। সেখানে উল্লিখিত হয়েছে তার ধর্মীয় গোঁড়ামির জন্য আমাকে চিত্রশিল্পচর্চায় সম্মতি দিতে পারেননি। তার অনড় ধর্মবিশ্বাসকে এক ধরনের প্রতিক্রিয়াশীল মানসিকতা রূপে চিত্রিত করা হয়েছে যা শহীদুল্লাহ-চরিত্রে কালিমা লেপন ছাড়া আর কিছু নয়।

১৯৫৮/৫৯ সালে আমি যখন করাচিতে আমার একজিবিশন করছি, আমার বাবা সেই একজিবিশনে আসছেন। তখন শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন বগুড়ার হবিবুর রহমান। উনি ওপেন করেছেন। অ্যামেরিকান ফ্রেন্ড অব দ্য মিডলইস্ট, আমেরিকার একটা অর্গানাইজেশন, ওটার ডাইরেক্টর ছিল মিস্টার ওয়াটসন। সেখানে কিন্তু ককটেল সার্ভ হচ্ছে। মদ সার্ভ হচ্ছে। বাবা সেখানে দাঁড়িয়ে। এবং মজাটা হলো, উনি একজিবিশনে ঢুকলেন, পকেটে তার কাপড়ের জায়নামাজ থাকত, চারদিকে পেইন্টিং নারীমূর্তি ইত্যাদি। তিনি দেখলেন এক জায়গায় একটি ছবি স্টিললাইফ যেখানে কোনো নারী কিংবা জীবজন্তুর ছবি নেই। উনি ওখানে পাঞ্জাবির পকেট থেকে কাপড়ের জায়নামাজটা বিছিয়ে নামাজ পড়লেন। আমার লজ্জায় মাথা নত হয়ে গেছে। লোকে কী ভাববে যে আমি একটা গোড়া মুসলমানের ছেলে! আমি তো আধুনিক। ইতালি থেকে আসছি। তিনি যদি ধর্মান্ধ হবেন তাহলে আমার একজিবিশনে গেলেন কেন!

বাবা অসুখে পড়লে এনামুল হক হসপিটালে দেখতে এসেছিলেন। তো আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে এনাকে চেনেন? মুর্তজা বশীর। হি ইজ এ ফেমাস আর্টিস্ট। আমাকে চিঠিপত্র লিখেছে, মুর্তজা বশীর আর্টিস্ট। তার পরিচয়ে আমি কখনো সম্মানিত বোধ করতাম না। কিন্তু উনি মারা যাওয়ার সাতদিন পরে দৈনিক পাকিস্তানে আমার একটা আর্টিকেল বেরুলো, আমার বাবা ও আমি।

শামসুর রাহমান আমাকে বলল, দেখেন, আপনার বাবাকে সবাই খ-িতভাবে দেখেছে। কেউ ধর্মের দিক থেকে। কেউ সাহিত্যের দিক থেকে। আপনি তো আপনার বাবাকে দেখেছেন। আপনি লেখেন। তো প্রথম লাইন যেটা, অনেকেই ভেবেছে এত ঔদ্ধত্য কেন! প্রথম লাইন ছিল: লোকে আমাকে বলুক আমি ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর পুত্র মুর্তজা বশীর, আমি কখনো চাইনি। লোকে বলুক মুর্তজা বশীরের পিতা ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। এবং এই আর্টিকেলে আমার মদ্যপানের কথা আমি লিখেছি। সবই লিখেছি। তবে লাস্টের লাইন পড়ে অনেকের চোখে পানি এসে গিয়েছিল। ‘আজ আমি যতই চিৎকার করে বলি না কেন আমি ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লার পুত্র মুর্তজা বশীর, তিনি এখন শুনতে পারবেন না।’