সুবিমল মিশ্রের ঐতিহাসিক অবতরণ

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৩ জুলাই ২০১৯ | ৮ শ্রাবণ ১৪২৬

সুবিমল মিশ্রের ঐতিহাসিক অবতরণ

হামিদ কায়সার ২:৫৫ অপরাহ্ণ, জুলাই ১২, ২০১৯

print
সুবিমল মিশ্রের ঐতিহাসিক অবতরণ

দুনিয়া এখন কোনো দুর্বলের পক্ষে দাঁড়ায় না। সে যেখানেই বলুন! ফেসবুক কী বাস্তব জীবন, পথঘাট কী অফিস-আদালত। দুর্বলকে সবাই ঝেটিয়ে বিদায় করতে চায়। আপনি দুর্বল হলেন তো ফেঁসে গেলেন। কোথাও জায়গা নেই আপনার। নিতে হবে একাকীত্বের চরম স্বাদ, মাঝে মধ্যেই জর্জরিত হতে হবে অপমানের চরম যন্ত্রণায়। এখন থাকতে হয় পদবী, থাকতে হয় ক্ষমতা, জোট, সংঘবদ্ধতা। তাহলে ফেসবুকে লাইকের পর লাইক পড়ে, যেখানেই থাকুন সবাই আপনার পক্ষে দাঁড়ায়। এবং আমাদের সমাজ আমাদের রাষ্ট্র প্রত্যক্ষভাবে না হলেও পরোক্ষভাবে তার জন্যই কাজ করে চলে। আমি এত কথা বলতাম না, আমাকে এসব কথা বলতে উসকে দিয়েছে সুবিমল মিশ্রের গল্প ‘‘ঐতিহাসিক অবতরণ”। ত্রিশ-একত্রিশ বছর আগে পড়া গল্পটি আবারো পড়তে হলো নতুন করে।

সুবিমল মিশ্রের মধ্যে ভনিতা নেই। তিনি সরাসরি বলতে চান। সেই ভদ্রমহিলার মতো। স্বামী যাকে জোছনারাতে রোমান্টিক পরিবেশে ভূমিকাস্বরূপ বলেছিলেন, আজ কী সুন্দর চাঁদ উঠেছে, দেখেছো? তখন ভদ্রমহিলা ঝামটা মেরে ওঠলেন, আসল কথা বললেই তো পারো যে তুমি আমাকে নিয়ে এখন শুতে চাও! চাঁদ নিয়া টানাটানির দরকার কী। সুবিমল মিশ্রও ওসব চাঁদকথার দিকে যেতে চান না। তার গল্পবলা সরাসরি শুরু হয়ে যায়। ‘জ্যৈষ্ঠ মাসের এক শনিবার দুপুরে টালিগঞ্জের চার নম্বর বাস টার্মিনাল থেকে একটা বাস ছাড়ছে। বাসটির সবগুলো সিটেই লোক বসে আছে, শুধু সামনের দিকের একটা দুজনঅলা সিটের কোণে একজন মাঝবয়সী ভদ্রলোক, অন্য সিটটি খালি। ভদ্রলোকের দু’একটি চুল পাকা, বাড়িতে কাচানো সাদা লংক্লথের পাঞ্জাবিতে নীলের ভাগ বেশি পড়াতে একটা নীল আভা ফুটে রয়েছে।’

এই যে, যে মাঝবয়সী ভদ্রলোক, সে একজন দুর্বল মানুষ, তাকে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে গল্প, কিন্তু তাকে আমার প্রধান চরিত্র বা নায়ক বলার রুচি হচ্ছে না। কেননা, আমিও তো এ-সমাজের একজন। সবল আর ক্ষমতাবানের দলে থাকতে ভালোবাসি। আমি তাই এই গল্পের নায়ক বলতে ওই তিন যুবককেই নেব। যারা একটু পরই যখন বাসটা ছেড়ে দিল, তার আগে আগে বাসে চড়ে বসলো। এবং বাসে চড়ে যেহেতু তারা তিনজন জোটবদ্ধ, কাউকে ফেলে কেউ একা বসতে পারে না, একজনের জন্য আরেকজনের সহমর্মিতা হয় এবং অনুভূতি কাজ করে, তাই তারা সেই দুর্বলের পাশে খালি-থাকা মাত্র একজনের জন্য বাসের সিটটায় তিনজনই একসঙ্গে বসতে চাইল এবং বসেই গেল।

ওরা একজনের সিটে এই তিনজন বসার ধৃষ্টতা বা সাহস যাই বলি না কেন, সেটা কোথা থেকে পেল জানেন? মূলত মাঝবয়সী ভদ্রলোকটির গায়ের ওই পাঞ্জাবির কাছ থেকে, যাতে নীলের ভাগ বেশি পড়াতে তার একটা আভা ফুটে রয়েছে এবং এ-বর্ণনার কারণে পাঠকেরও বুঝতে অসুবিধা হয় না যে দুর্বল মানুষটি সমাজের কোন্ স্তরে অবস্থান করছে। ফলে, তার পাশের খালি সিটে একজনের জায়গায় দুজন কেন, তিনজনও অনায়াসে বসা যায়। এবং যুবক তিনজন তাই-ই বসেছে, যেহেতু যুবক তিনজন জানে যে, ভদ্রলোক সংখ্যায় একা এবং সমাজের নিম্নস্তরের মানুষ আর ওরা সংখ্যায় তিনজন এবং সমাজে ওদের একটা ডাটফাট অবস্থান রয়েছে, শারীরিক শক্তিতেও এগিয়ে। তাই বাসের যারা সাধারণ যাত্রী, তারা সবাই ওদের তিনজনের পক্ষেই দাঁড়াবে। অথবা দেখেও কিছুই দেখেনি এমন একটা না দেখার ভাব করবে। এবং বাসের যে কর্তৃপক্ষ ও ড্রাইভার কন্ডাক্টর বা হেলপার ওরাও তিনজন যুবকের পক্ষেই এগিয়ে আসবে। আদতে হয়ও তাই। সেটাই যে দগদগে বাস্তবতা!

আমি যেহেতু এ-সমাজেরই মানুষ, আমি এই গল্পের দুর্বল মানুষটি শেষাবধি যে পরিণতির শিকার হলো, তার জন্য ওকেই দায়ী করবো। দুজনের সিটে যখন চারজন বসা হলো এবং দুর্বল মারাত্মক রকমের কোনঠাসা হয়ে গেল, ওর তো তখন উচিত ছিল চুপচাপ সে-যাতনাই সয়ে যাওয়া! দুর্বল মানুষ পৃথিবীতে এসেছেই তো যাতনা পেতে! যত যাতনা যত অবহেলা অপমান গঞ্জনা- সবই সে মুখ বুঁজে সহ্য করবে। এটাই তো নিয়ম। কেন সে হঠাৎ একটু অধৈর্য হয়ে বিরক্তি মেশানো কন্ঠে বলতে গেল, কি হচ্ছে? তাতেই তো গায়ে তাত লাগলো যুবকত্রয়ের, কিছু না একটু বসতে যাচ্ছি আর কি!
ভদ্রলোক এই ভাবে বসে?

ইয়ে বাপ! দাদু খঁচেছে?
এই যে শুরু হলো দুর্বল পৌঢ়টিকে খোঁচানো, তা ক্রমশ বিদ্রুপ থেকে শ্লেষ, শ্লেষ থেকে গায়ে হাত তোলার পর্যায় পর্যন্ত চলে গেল। শেষাবধি দুর্বল মানুষটিকে নিজের সিট বিসর্জন দিয়ে উঠে দাঁড়াতে হলো। উঠে দাঁড়িয়েও কি স্বস্তি মিললো? তাতেও ওই তিন যুবকের খোঁচানো থামে না। ওরা যে কোনভাবে দুর্বলকে উত্তেজিত করতে চায়। হোক মুরুব্বি দাদু টাইপের, কিন্তু ওর অবস্থান তো ছোট, ওর কেন এত সাহস হবে আমাদের বিরুদ্ধে কথা বলার, যেন মাঝবয়সীর ক্ষমা নেই। ছেলে তিনটি গান ধরলো, দাদু বড় বড়িয়া গান- টেপির মাগো শোনো নাগো তোমার টেপিকে আর বাইরে আসতে দিয়ো নাগো। তিনজনে বাসের মধ্যে সুর করে গানটি গাইতে লাগলো। বাসের লোকরা উৎকর্ণ হয়ে শুনছিল। তাদের হাসি হাসি মুখ দেখে বোঝা গেল তারা বেশ উপভোগ করছে ব্যাপারটা। বাসের মধ্যে যে দু’একজন গম্ভীর প্রকৃতির লোক ছিলেন তারা অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে থাকলেন। এসব ফালতু ব্যাপারে নাক গলিয়ে নিজেদের প্রেস্টিজ নষ্ট করতে তারা রাজী নন।

এখানে এসেই গল্পকার কোনোভাবে আরোপিত নয়, ন্যাচারালভাবেই সমাজের গালে কষে একটা থাপ্পড় মারলেন। মোটা দাগে নয়, স্ক্ষূ আঁচড়ে। আমাদের এ-সমাজে, চোখের সামনে একজন হাইজ্যাকার বুকে ছুরি মেরে সর্বস্ব নিয়ে গেলেও কেউ এগিয়ে আসে না। বাস থেকে হেলপার একজন যাত্রীকে ফেলে মেরে দিলেও কারো প্রতিক্রিয়া হয় না। শ শ লোকের সামনে রিফাত শরীফকে নির্বিঘ্নে হত্যা করে সবল-নির্মিত বন্ড। সুবিমল মিশ্রের গল্পেও সমাজের লোকদের সে-চেহারাটাই পাওয়া গেল। অথচ কেউ একজনও যদি তিন যুবকের আচরণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাত, মাঝবয়সী ভদ্রলোককে হয়তো এতটা অপমান সহ্য করতে হতো না। বরঞ্চ সবার এই নিস্পৃহতা যুবকত্রয়কে আরো বেশি দুবির্নীত করে তোলে। দাঁড়িয়ে থাকা মাঝবয়সী ভদ্রলোক যখন বিদ্রুপের গান অবশেষে আর সহ্য করতে না পেরে ক্ষিপ্তপ্রায় হয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন, তোমাদের বাবাকে শুনিয়ো এই গান, বুঝেছো- তোমাদের বাবাকে শুনিয়ো। তখন ওরা তিনজন আরো বন্য হয়ে উঠল, ‘বাবা তুলেছে- একজন ঝট করে উঠে দাঁড়ালো। ভদ্রলোকটির পাঞ্জাবি খামচে ধরে: এতক্ষণ সহ্য করেছি আর করবো না- উইড্র করুন। অন্য দুজনও দাঁড়িয়ে পড়েছিল। তারাও বললো: উইড্র করুন। না হলে ছাড়ছি না- উইড্র করুন।

ভদ্রলোক রাগে-দুঃখে অপমানে ঠকঠক কাঁপতে থাকলেন। তার হাত থেকে থলেটা পড়ে গেল। ভেতরের একটা ন্যাকড়ায় বাধা সেরখানেক চাল, সেগুলো ছড়িয়ে পড়লো বাসের ভেতর। ভদ্রলোক নিচু হয়ে পুটুলিটা কুড়োতে গেলেন। কিন্তু ছেলেটি তার পাঞ্জাবি ছাড়লো না।

ষোলকলা পূর্ণ করতে হাজির হলেন কন্ডাক্টর, জোর করে ওই তিন যুবকের কাছ থেকে মাঝবয়সী ভদ্রলোককে উদ্ধার করলো ঠিকই, তারপর যে তৎপরতা দেখালো, সেটা হলো- ‘নেমে যান এখানে।’ কন্ডাক্টর ঘন্টি দিল। বাস থামলে প্রায় জোর করে নামিয়ে দিল ভদ্রলোককে। নামবার আগে মাঝবয়সী কিসের জন্য যেন একবার হাত বাড়ালেন। বোধ হয় পুটুলিটার জন্য। কন্ডাক্টর ধমক দিল: নামুন নামুন। একবাস লোকের ভেতর থেকে একটি লোক নেমে গেল। সবাই গলা বাড়িয়ে তার নেমে যাওয়া দেখতে লাগল।

এই যে সবাই যারা গলা বাড়িয়ে তার নেমে যাওয়া দেখতে লাগলো, যারা হাসি হাসি মুখে মাঝবয়সী দুর্বলের অপমান হওয়া বেশ উপভোগ করলো আর যারা গম্ভীর প্রকৃতি নিয়ে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে থাকে- ফালতু ব্যাপারে নাক গলিয়ে নিজেদের প্রেস্টিজ নষ্ট করতে রাজী নন; তাদের চরিত্রকে এইভাবে গল্পে গল্পে যিনি বার বার উন্মোচিত করে থাকেন- তার বই পড়তে তাকে মনে রাখতে বয়েই গেছে সবার! আজকাল নীলক্ষেত বা নিউ মার্কেটে সুবিমল মিশ্র পাওয়া যায় না। কার দায় পড়েছে নিজের টাকা দিয়ে বই কিনে সে বইয়ের চটকানা খেতে? তবে ঘরের লাইব্রেরিতে সাজিয়ে রাখবার জন্য বেশ কড়া মূল্য দিয়েই হয়তো সংগ্রহ করা যাবে সুবিমল মিশ্র সমগ্র- বড়ো কোনো বইয়ের দোকান থেকে, যাদের অনেক পুঁজি! সৃদৃশ্য সে-বই লাইব্রেরির শোভাবর্ধন করবে বটে!