কাছে ও দূরে

ঢাকা, সোমবার, ২২ জুলাই ২০১৯ | ৬ শ্রাবণ ১৪২৬

কাছে ও দূরে

হামীম কামরুল হক ১:৪১ অপরাহ্ণ, জুলাই ১২, ২০১৯

print
কাছে ও দূরে

পত্রিকার অফিসে কাজের সূত্রে পর পর সাত দিন তার গুলশানস্থ ফ্ল্যাটে যেতে হয়। তখন নতুন নতুন পত্রিকার কাজ শিখছি। বিভাগীয় সম্পাদকের পরিকল্পনা অনুযায়ী তিনি মুখে উপন্যাস বলবেন, আমি শ্রুতিলিখনের মতো লিখে আনব। কিন্তু পর পর সাত দিন গিয়ে একটি অক্ষরও তাকে লেখানো যায়নি। এর বদলে এন্তার গালগপ্পো হলো। প্রথম দিন অবশ্য বলেছিলেন, ‘তুমি আমাকে এই সময়ের কিছু বাস্তব কাহিনী বলোতো।’ আমি তাকে একটার পর একটা ঘটনা শোনাই। তিনি চুপচাপ শুনে যান। একটা শেষ হলে আরেকটা বলতে বলেন।

মজার ব্যাপার হলো, প্রতিবার তার বাসায় যাওয়ার আগে ফোন করে আসি। প্রতিবারই তিনি ফোনে প্রথমে চিনতে পারেন না। অথচ মুখে তার বাসায় আমার সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘হামীমের জন্য আমার দিলে একটা দরদ তৈরি হয়েছে।’- শুনে মজা পেয়েছিলাম। কারণ পরের দিনই তিনি ফের আমাকে চিনতে পারতেন না। আর আমি অফিসের কাজে গিয়ে তার নানান গল্পগাছা শুনেই ফিরেছি।

তিনি নানান বিষয়ে গল্প বলতেন। আমি নানান সময় নানান বিষয়ে প্রশ্ন করেছি। বিভিন্ন সাহিত্য ও সাহিত্যিক সম্পর্ক জানতে চেয়েছি। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে তখন যেটুকু মনে হয়েছে, বলেছেন। এসব ২০০৭ সালের ঘটনা। কাফকার লেখা তার ভালো লাগেনি। জাদুবাস্তববাদ নিয়ে এত হল্লা করার কিছু নেই- আমাদের সাহিত্যেই এর নানান দৃষ্টান্ত আছে- এসব বলেছেন খুব স্বাভাবিক ও নির্লিপ্ত গলায়। বাস্তববাদী গল্পই আসল গল্প। পরাবাস্তববাদী ব্যাপার স্যাপার কবিতায় চিত্রকলায় মানায়, কিন্তু সাহিত্য যখন গদ্যে কথা বলে তখন সেটিকে বাস্তবের তাল মেনে ঠুকতে হয়।

কথা বলেছিলেন নিজের জীবন সংগ্রাম নিয়ে, কবি হয়ে ওঠা নিয়ে। সমসাময়িক যে কজন কবি নিয়ে জানতে চেয়েছি বেশ শ্রদ্ধার সঙ্গে আন্তরিকতার সঙ্গে তাদের নাম নিয়েছেন। এদের ভেতরে শামসুর রাহমান ও সৈয়দ শামসুল হক অন্যতম। বলেছিলেন হুমায়ুন আজাদ তাকে তার সম্পাদিত আধুনিক বাংলা কবিতার একটি সংকলনে স্থান দেননি। এ নিয়ে তিনি কোনো বিরূপ মন্তব্য করা তো দূরের কথা বরং বললেন, ‘তিনি সেটা করেছেন তার মনে হওয়া থেকে। আমার সঙ্গে কিন্তু কোনো সমস্যা তার ছিল না। একবার অনেকদিন পর আজিজে দেখা হলে, এগিয়ে এসে হুমায়ুন আজাদ হাতটা ধরে বলেছিলেন, চলেন মাহমুদ ভাই, আপনার সঙ্গে একটা সিগারেট খাই।’

প্রসঙ্গত, অনেক কিছু নিয়েই আলোচনা হয়েছে। কবিতা, গল্প, উপন্যাস, বাংলা নাটক পড়া ও দেখা নিয়ে। সেলিম আল দীনের কথা উঠলে তিনি বললেন, ‘ও আমাকে খুব পছন্দ করত বলেই জানতাম।’ বলে রাখা ভালো, সেসময় সেলিম আল দীন সদ্য প্রয়াত। আল মাহমুদ বললেন, ‘সেলিমকে একদিন শিল্পকলা থেকে রিকশায় তুলে নিয়ে যাচ্ছি। ও আমার হাতে একটা ঘড়ি দেখে বলে, মাহমুদ ভাই, ঘড়িটা সুন্দর। আমি বলি, তোমার পছন্দ হয়েছে! তুমি নাও তাহলে!’- এসব কথা মনে পড়ে।

এর ভেতরে ব্র্যাকের একটি ছোটদের পত্রিকার জন্য এক ভদ্রলোক আসেন। প্রথম দিন তাকে বলেন, পরের দিন আসতে। সে পত্রিকার জন্য ভদ্রলোক তার একটি ছড়া নিতে চান। পরের দিন এলে, মুখে মুখে শরৎকাল নিয়ে ছড়াটা বললেন তিনি আর ভদ্রলোক টুকে নিলেন। আল মাহমুদ নিচে স্বাক্ষর দিলেন। মুখে মুখে একটি সুন্দর ছড়া রচনার সাক্ষী হয়ে রইলাম। এটা তার মতো একজন কবির সঙ্গে চমকপ্রদ স্মৃতি হিসেবেই ধরে নিয়েছি। অনেক পরে সমীর সেনগুপ্তের একটি লেখা পড়েছিলাম শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে। তাতে তিনি শক্তির বেশ কিছু কবিতার রচনার সময়ের সাক্ষী ছিলেন, সেই স্মৃতিকে পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছিলেন। আমি একইভাবে এটি স্মরণ করতে চাই।

যদিও আল মাহমুদের শেষ জীবনের রাজনৈতিক আদর্শের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে আমার মিল ছিল না। কিন্তু কবি হিসেবে তাকে ভালো লাগত সেই ছেলেবেলা থেকে। ‘আমার মায়ের সোনার নোলক হারিয়ে গেল শেষে’ বা ‘আম্মা বলেন, পড়রে সোনা,/ আব্বা বলেন মন দে;’- এই রকম দুটো কবিতা বা ছড়া দিয়ে যাদের আল মাহমুদের সঙ্গে পরিচয় তারা বুঝতে পারবেন এই ভালো লাগার অমোঘ কারণ। সদ্য তারুণ্যে ‘সোনালি কাবিন’-র কবিতায় মাত হননি আমাদের প্রজন্মের কম কবিকেই খুঁজে পাওয়া যাবে। কিন্তু আমাকে বিশেষভাবে আকুল করে তুলেছিল তার ‘দায়ভাগ’ কবিতাটি। এর ‘ভাঙো না কেন ভাঙতে পারো যদি।’- কথাটি সত্তায় চেতনায় ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয়েছে দিনের পর দিন।
ভয়ংকরভাবে কেঁপে উঠেছিলাম তার ‘রবীন্দ্রনাথ’ কবিতাটি পড়ে। যখন পড়েছি-/ ‘এ কেমন অন্ধকার বঙ্গদেশ উত্থান রহিত/ নৈঃশব্দের মন্ত্রে যেন ডালে আর পাখিও বসে না।/ নদীগুলি দুঃখময়, নির্পতগ মাটিতে জন্মায়/ কেবল ব্যাঙের ছাতা, অন্য কোনো শ্যামলতা নেই।’ বা একটু পরেই যখন এ কবিতায় বলেন-
‘শুনুন, রবীন্দ্রনাথ আপনার সমস্ত কবিতা/ আমি যদি পুঁতে রেখে দিনরাত পানি ঢালতে থাকি/ নিশ্চিত বিশ্বাস এই, একটিও উদ্ভিদ হবে না/ আপনার বাংলাদেশ এ রকম নিষ্ফলা, ঠাকুর।’

আল মাহমুদ আরো কাঁপিয়ে দিয়েছেন তার ছোটগল্পের ভেতরে। ‘পানকৌড়ির রক্ত’ ‘জলবেশ্যা’ বা ‘মাংসের তোরণ’-এর মতো আরো কিছু গল্প একবার স্বাদ নেওয়ার পর বহু দিন টিকে থাকবে পাঠকের মনের টাকরায়। লিখেছেন বেশ কিছু উপন্যাস। তার নান্দনিকতার দিক থেকে যতই যা হোক, পাঠের দিক থেকে যারা পড়েছেন, তাদের হৃদয়স্পর্শ করেছে বলেই বোধ করি। যদিও ভালো লাগা বা হৃদয় স্পর্শই সাহিত্যের শিল্পসফলতার প্রধান শর্ত বলে অনেকেই মনে করেন না।

এতে আলবেয়ার কাম্যুর একটি উক্তি মনে পড়ে। তিনি অনেকটা এরকম বলেছিলেন, আঁতেলজাতীয় লেখকরা পায় কিছু মন্তব্যকারী, আর সত্যিকারের লেখকরা পায় পাঠকদের।

তার কথায় নতুন করে টের পেয়েছিলাম, কবিদের এখন গদ্য লেখার সময়। কবিকে কেবল কবিতা নিয়ে পড়ে থাকলে চলে না। বিপুল গদ্যকর্ম রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে জীবনানন্দ দাশ বা আলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত বা শঙ্খ ঘোষের মাধ্যমে সেটি নিদারুণভাবে সত্যতা পায়। সাহিত্যসাধনায় প্রাপ্তি প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, উপেক্ষা করো এবং অপেক্ষা করো। আধুনিকতার কথা বার বার উচ্চারিত হয়েছে তার মুখে।

আল মাহমুদের সাহিত্যকর্মের পাঠক বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলে ছড়িয়ে আছে। তার বইগুলি প্রকাশিত হয়েছে বাংলাদেশের প্রধান কিছু প্রকাশনীর মাধ্যমে। ফলে তিনি এই দেশের সাহিত্যে কতটা রয়েছেন তার এটা একটা প্রমাণ। যদিও তাকে নিয়ে নানান বিতর্কও আছে।

শামসুর রাহমান বনাম আল মাহমুদ- এমন দলও আছে। কে প্রধান কবি, কে অপ্রধান এসব তর্কও কম নেই, তবু স্মরণের বাতিঘরে বাংলাদেশের সাহিত্যের যে আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছে তার একটি রশ্মির নাম যে আল মাহমুদ- এটি এখনও ভরসা নিয়ে বলা যায়।