কবিতায় রঙের ব্যবহার

ঢাকা, বুধবার, ২৪ জুলাই ২০১৯ | ৮ শ্রাবণ ১৪২৬

কবিতায় রঙের ব্যবহার

ফজলুল হক সৈকত ১২:৫২ অপরাহ্ণ, জুলাই ১২, ২০১৯

print
কবিতায় রঙের ব্যবহার

রঙ নিয়ে খেলা শিল্পীর কাজ। ক্যানভাসে নানান রঙে তিনি আঁকেন জীবনের বলা, না বলা গল্প আর কল্পনায় ভিড়-করা সমূহ যন্ত্রণা ও আনন্দবোধ। রঙে আঁকা ছবিতে কখনো কখনো আশ্রয় নেয় কবিতায় সৌন্দর্য ও সাতর্শ্য। আবার কোনো কোনো কবিতাও ধারণ করে রঙ-ছাপা বিপুল পরিসর। আর এভাবেই আমরা কবিকেও খুঁজতে থাকি রঙতুলি হাতে দাঁড়িয়ে থাকা শিল্পীর আদলে। বাংলাদেশের, বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি আল মাহমুদের (জন্ম : ১১ জুলাই ১৯৩৬) কবিতা পড়তে পড়তে এমনই এক শিল্পীর চেহারা পাঠকের চোখের সামনে ভেসে ওঠে রঙিন পর্দার বুকজুড়ে।

আল মাহমুদের কবিতার রঙচঙ কিংবা রঙচঙে কবিতা আমাদের নতুন করে যেন পাঠকের কাতারে সারিবদ্ধ করে। আমরা মুগ্ধচোখে দেখতে থাকি ‘সূর্যের আহ্নিক রঙে পাঠকের কাতারে সারিবদ্ধ করে। আমরা মুগ্ধচোখে দেখতে থাকি ‘সূর্যের আহ্নিক রঙে প্রতিদিন জ্বলে তার চুল’, জমাট চুলের রঙ। তিনি যখন সাজাতে থাকেন শব্দের কথামালা, তখন বারবার তার ভাবনার পাথর ভেঙে দিগ্বিদিক ছুটতে তাকে রঙ-বেরঙ চিন্তাসূতো। কখনো কখনো নির্জন পটের মধ্যে রঙের বেশ ধরে প্রবেশ করে অচেনা কোনো ভয়ংকর পোকা মাকড়।

মাহমুদের কবিতাশাড়ি-পরা কোনো রমণীর কবিতা গায়ে রঙ মাখে ‘কাটা সুপারির রঙ, পা সবুজ, নখ তীব্র লাল/ যেন তার তন্ত্রে মন্ত্রে ভরে আছে চন্দনের ডাল।’ তিনি কবিতার চোখ দিয়ে দেখেন ‘বর্ণালী মাকড়’, ‘কালো ভুরুর টান’, ‘ঘোলাটে রঙের জিভ’ কিংবা ‘চৈনিক কালির মতো উপচানো/ পিচ্ছিল আঁধার।’ তিনি জানেন, ‘রঙের তুলিতে আঁকা অসাধ্য হবে না’ ‘লেপ্টানো মাংস আর বিবর্ণ কলজের’ কাতাব সূক্ষ্ম ছুরিতে ‘টাঙানো থাকবে এই দীপ্ত লাল হালাল বিষয়। বর্ণহীন নির্বিরোধ কবি আল মাহমুদ, কতক সময় বুঝতেই যেন পারেন না, কী করে রঙিন হলো রঙিন পোশাক, রঙিন বাসনা, ‘প্রাণের রঙের মতো পরাজিত প্রেমের কেতন, ‘কৃষ্ণে ধবলে সবল দু’খানি পাখা’ আল মাহমুদের কবিতায় ঢালতে থাকে মৃদু গাঢ় বাতাস। আর রাত্রির গভীর অন্ধকারে সন্ত্রস্ত ‘কোনো নারী কোনোদিন তার তরে মাখেনি কাজল’। স্থির কালো টানা চোখের আভায় ‘কুকুর বিড়াল কালো ছাগ’, ‘কালো ভুরুর টান’ চিবুকের পাশে ঠেসে-থাকা ‘কালো তিল’ ‘চৈনিক কালির’ পিচ্ছিল আঁধার, ‘কালো করুণ কাফন ঢাকা’ চোখে গভীর ‘সুর্মা’ আর ‘কালো মাটির’ অতলতা তার কবিতায় লেপতে থাকে কালোর কঠিন মমতা। আর শক্ত হতে থাকে তার কবিতার নরম মেটেল ভিত। অসহ্য গরমে ‘গাত্রবর্ণ কালো’ হওয়া কবি আল মাহমুদ ‘কাজল ভিজিয়ে’ নামেন ‘কালিময় নয়নের’ নদীতে। ‘ভুরুর নিচে জমালো ঝুলকালি’র হালকা জমিনে বুনতে থাকেন ‘গভীর কালো চোখের’ ‘কিছু কালো চিহ্ন’
তুমি আমার একটি থোকা কালো আঙুর/সারা শরীর জড়িয়ে আছি লতা গাছি,/তোমার দেহে মনে আমার বেঞায়া সুর/আমি ভ্রমর আমি তোমার কালো মাছি।/তুমি আমার তিতাস, কালো জলের ধারা/পানকৌড়ি আমি, আমি পানির ফেনা,/ডুব-সাঁতারে নিত্যকালের এই চেহারা/তুমি আমার কালো শালুক, চিরচেনা।/কালো মাটির কালো পুতুল তুমি আমার/সোঁদা মাটির গন্ধ হয়ে লুকোই গায়ে/আমি তোমার নীলাম্বরী শাড়ির দু’পাড়.তুমি আমার রাত্রি, আমার অমানিশা/আমি তোমার ছোট্ট কালো জোনাক পোকা,/এইতো আলো, এইতো কালো, নেই যে দিশা/আমি তোমার রুদ্ধদ্বারে একটি টোকা (বেহায়া সুর : কালের কলস)

কবির সজাগ ‘কালো দৃষ্টিতে ভেসে-ওঠা ‘কালো চুলের ঢেউ’, ‘রহস্যের ময়লা কারো জলে’ কিংবা খেতের আড়ালে ভিড়-করা ‘কলো মানুষের ধারা’য় অদৃশ্য হয় ক্রমাগত। কবি তখন ‘মহাকালের কালোর চেয়ে কালো’ ‘কালো লেখা’ লিখে কালো বুকের পশমে সাহস সঞ্চয় করতে থাকেন নতুন কোনো কালো ক্যানভাস দেখার প্রবল প্রত্যাশায়। এ প্রত্যাশা কিংবা প্রতীক্ষা কার জন্যে? আল মাহমুদের প্রতীক্ষার পথে দাঁড়িয়ে থাকা এক কালো বিড়ালের ছবি ‘সান্ত্রির সজাগ চোখ, তাক করা বন্দুকের মাছি/ পার হয়ে চলে আসে এক বিড়ালিনী রোজ;/ দু’চোখ ঘুরিয়ে দেখে, আমি তারি প্রতীক্ষায় আছি।’ (কবি ও কালো বিড়ালিনী ১ : মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো) ‘কালো রোমের পালিশে’ কবি যেন খুঁজতে থাকেন আরো গভীর কোনো কালোশিল্প-

কবরের কাছে একটা কালো গাছের দিকে চোখ পড়তেই
আমার স্মৃতির ওপর বিদ্যুৎ বইল।/হাঁ, পঁচাত্তুরের এক চিত্র প্রদর্শনীতে এই শেয়ালটাকে/আমি দেখেছিলাম,
কামরুলের কালোশিল্পের মধ্যে এই ধূর্ত লেজ উঁচিয়েছিল;/ সেই কুটিল চোখ আর লোভাতুর মুখচ্ছবি আমার চেনা।/ আমি ফররুখের কবর পেছনে রেখে,/একটা কালো শেয়ালকে তাড়াতে তাড়াতে/বাংলাদেশের মানচিত্রের উপর দিয়ে/আমার কাফন নিয়ে দৌড়াতে লাগলাম।
(ফররুখের কবরে কালো শেয়াল; ওই)

‘আকাশের রঙ’ বিশালতা আর উদারতা প্রতীকী আমেজে ও উৎসাহে পাখা মেলে কবিদের ভাবনা সুতোয়। আর তখন কবিতার শরীরে লাগতে থাকে আকাশ-আকাশ বাতাস। আকাশের রঙ কি নীল না আকাশি? এ প্রশ্নও বোধ হয় কতকটা প্রাসঙ্গিক। যেমন কেউ বলেন নীল আকাশ। আবার কেউ বলেন আসমানি রঙ। হালকা নীলকে কি আকাশি বলে? যাই হোক আমরা অন্তত নীল আর আকাশিকে আলাদা করে না দেখে এক প্লাটফরমে রেখে দেখার চেষ্টা করি। আল মাহমুদ তার কবিতায় আকাশের প্রসন্নতাকে ধারণ করেন নীলের তাৎপর্যে। লেখেন ‘তুমি এসো, কোমরে পেঁচিয়ে নীল শাড়ি/দুঃখের ঘরকে করো শোকোত্তীর্ণ প্রাণের বাগান।’ কষ্টের ‘নীল তরল আঙুল’ কাঁপতে থাকা, কিংবা লাউয়ের মাচায় ঝুলতে থাকা ‘সিক্তনীল শাড়ির নিশেন’ তার কবিতাকে নিয়ে যায় চেতনার নিবিড় অন্তর্লোকে। ব্যক্তিক উলাস আর পাখির স্বাধীনতার নীল নীল অনুভূতি, উদ্ভিদহীন পত্রহীন, হাহাকারে ভরা দগ্ধদেশে, গরম বাতাসের অন্তরালে ‘ভীষণ নীল’ জেগে থাকা, আর কোনো কবির মাতৃভূমিকে নীল পোশাকে মুড়িয়ে রাখার দারুণ আবেগ আল মাহমুদের কবিতার অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়ায় গভীর মমতায়। নীলকে তিনি আহ্বান জানান ‘হে নীলিমা, হে অবগুণ্ঠন!’ বলে। আর তার প্রত্যাশা প্রকাশ পায় এভাবে-

মানুষের বাসস্থান, লতি মাচা, নীরাম্বরী নিয়ে/আমরা থাকতে চাই; এ হৃদয় যেন ঝিলকিয়ে/কখনো উঠতে চায়, আমাদের পূর্বপুরুষের/তাড়ির আসরে গিয়ে অকস্মাৎ দাঁড়িয়ে নিজের/আদিম সাহসে বলে, আমাদের হাতে হাত দিন/কর্পুর গন্ধের বিন্দু ফোঁটা ফোঁটা বাসনা রঙিন।
(প্রত্যাবর্তন : কালের কলস)

হাঁসেদের আশ্রয়-ঘর নীল আকাশ। কিংবা রেল স্টেশনে ট্রেন ছাড়ার নীল বর্ণ আলোর সংকেত নীল বিহঙ্গ-এর দুর্লভতা, অসুখী নীল বইচা মাছের মতো চোখ’ দেহের ভাঁজে ভেজা নীলাম্বরী আর অহরহ দংশনের ভয়ে নীল হয়ে যাওয়া কোনো ভাবুক প্রেমিকের হৃদয়ে দাগ কাটে কবিতার শরীর। কবি তার এই কষ্ট, কষ্টের ভীষণতা আর কষ্ট উত্তরণের বোধে তাড়না অনুভব করেন অনবরত। আর প্রকাশ করতে থাকেন তার সমূহ ভাবনার শিল্পরাজি। কথা সাজান এভাবে
বিষের আতপে নীল প্রাণাধার করে থরো থরো/আমারে উঠিয়ে নাও হে বেহুলা, শরীরে তোমার,/প্রবল বাহুতে বেঁধে এ-গতর ধরো, সতী ধরো,/তোমার ভাসানে শোবে দেবদ্রোহী বাটির কুমার।/কুটিল কালের বিষে প্রাণ যদি শেষ হয়ে আসে,/কুন্তল এলিয়ে কন্যা রু করো রোদন পরম।
(সোনালী কাবিন- ৮)

বিবর্ণতা, বিষণ্নতার রঙ হলুদ। ঝরে পড়া কিংবা দিনশেষের গন্ধ মেখে এ রঙ হাজির থাকে মানুষের চিন্তায়, বাস্তবতার অলিগলিতে আর কবির প্রিয় খাতায়। যেন ‘রাতের হলদে পাতা ঝরে যায় শীতের গতিতে!’ এইভাবে আল মাহমুদ তার কবিতা যাত্রায় সঙ্গী করেন হলুদ রঙকে। হলুদ লাল ফুলের মিশ্র চেতনা যেমন তার কবিতা বুননে প্রেরণা জোগায়, তেমনি হলুদ পাতা আশা জাগায় পুরাতনের বিদায়ের স্রোতে নতুনের আগমনের এমন সব দারুণ চিন্তা আর আবেগের হাত ধরে হাঁটতে থাকে আল মাহমুদের রঙের কবিতা কিংবা দাগ কাটতে থাকে কবিতায় রঙ। রঙের ফারাক তিনি বোঝেন। রঙের আবেগ আনন্দ বেদনা জাগানোর শক্তি তিনি জানেন।

‘হাওয়ায় হলুদ পাতা বৃষ্টিহীন মাটিতে প্রান্তরে/ শব্দ করে ঝরে’ যাওয়ার অর্থ তার কানে বাজে প্রতিনিয়ত। পিঠার মতো হলুদ মাখা চাঁদ, প্রাতরাশের হলদেটে টাটকিনি মাছ, নিম ডালে বসে থাকা হলুদ পাখি সারি সারি দাঁড়াতে থাকে কবির কবিতায়।

আপাতভাবে মনে হবে, রঙ নিয়ে খেলা কবির কাজ নয়, চিত্রশিল্পীর কাজ। কিন্তু কবিতায় যখন কবি তৈরি করেন নানান রকম ছবি আর গল্পের ক্যানভাস, তখন রঙ-প্রয়োগে কবির সামর্থ্যরে বিষয়-আশায় সামনে এসে পড়ে। কবিতায় থাকে ছবি, ছবিতে থাকে রঙ, আবার ছবিতেও থাকে কবিতার কতো না বলা কথা এভাবেই অনিবার্যরূপে কবিতা আর চিত্রের মধ্যে নির্মিত হয় এক অকৃত্রিম নিবিড় সেতু। আল মাহমুদের কবিতা পড়তে পড়তে তার রঙ-প্রয়োগচাতুর্য আমাদের নজরে আসে।