অনুবাদ মূলানুগ নাকি স্বাধীন

ঢাকা, সোমবার, ১৪ অক্টোবর ২০১৯ | ২৯ আশ্বিন ১৪২৬

অনুবাদ মূলানুগ নাকি স্বাধীন

মোজাফ্ফর হোসেন ২:৩৭ অপরাহ্ণ, জুলাই ০৫, ২০১৯

print
অনুবাদ মূলানুগ নাকি স্বাধীন

ইংরেজ কবি জন ড্রাইডেন (১৬৩১-১৭০০) তার Preface to OvidÕs Epistles-এ অনুবাদকে তিন শ্রেণিতে ভাগ করেছেন : মেটাফ্রেজ, প্যারাফ্রেজ এবং ইমিটেশন। Metaphrase হলো ‘word for word and line by line’ অনুবাদ; যাকে বলা যায় আক্ষরিক অনুবাদ। Paraphrase বিশ্বস্ত স্বাধীন অনুবাদ। অনুবাদক মূলের শব্দগুলো হুবহু অনুসরণ না করে তার অর্থকে অনুসরণ করেন। কখনো কখনো পুরো বাক্যাংশ কিংবা বাক্যও পাল্টে যেতে পারে। একে ‘sense for sense’ অনুবাদও বলা যায়। Imitation হলো এটা এক ধরনের অনুকৃতি। রবীন্দ্রনাথ যাকে বলছেন প্রতিরূপ।

এ অনুবাদে শাব্দিক ও ভাবগত সাযুজ্য উভয়কে বিসর্জন দেওয়া হয়। এটি স্বাধীন অনুবাদ না অনুসরণ, তা নিয়ে মতভেদ আছে। imitation বা অনুকৃতি স্বাধীন অনুবাদ নয়, কারণ এখানে মূলটা অনেক সময় হারিয়ে গিয়ে নতুন একটি টেক্সটের জন্ম হয়। বড়মাপের কবিরা সাধারণ এই ধরনের অনুবাদ করে থাকেন। এজন্য বলা হয়ে থাকে কবিরা আদর্শ অনুবাদক হতে পারেন না। ওক্টাবিও পাস তাই বলছেন, ‘তাত্ত্বিকভাবে কবিদেরই উচিত কবিতার অনুবাদ করা। কিন্তু প্রায়োগিকভাবে লক্ষ করা যায়, খুব কমসংখ্যক কবিই ভালো অনুবাদক।’ অধিকাংশ সময় দেখা যায়, কবিরা অনুবাদের মাধ্যমে মূলকে নিজের করে ফেলেন। উদাহরণ হিসেবে আমরা দেখব বাংলা সাহিত্যে ত্রিশের কবিতা বিদেশি কবিতা থেকে প্রত্যক্ষভাবে অনেক কিছু গ্রহণ করেছে। সেটা এক ধরনের অনুবাদই। কিন্তু এমন করে আত্মস্থ করে স্বভাষায় প্রকাশ করেছেন যে সেটি আর মূলানুগ থাকেনি। স্বাধীন সৃষ্টি হিসেবে আমরা সেগুলো গ্রহণ করতে পারি। একটা উদাহরণ দেওয়া যায়। জীবনানন্দ দাশের ‘হায় চিল’ কবিতা প্রখ্যাত আইরিশ কবি ডব্লিউ বি ইয়েটসের ‘He Reproves the Curlew’ কবিতাটির অনুকরণে লেখেন। যেমন রবার্ট ব্রাউনিং যখন ‘The Pied Piper of Hamelin’ লেখেন তখন সেটিও নতুন সৃষ্টি হিসেবে বিবেচিত হয়। ড্রাইডেনের ভাষায় এগুলোকে ইমিটেশন বলা যায় : ‘মূলের সংকেত দ্বারা অনুপ্রাণিত স্বাধীন ও নতুন সৃষ্টি।’ ড্রাইডেন যদিও ইমিটেশনকে অনুবাদেরই একটা শ্রেণি হিসেবে গণ্য করেছেন, তবে তাকে গুরুত্ব দেননি। রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলি অনুবাদ, ঈশ্বরচন্দ্রের ভ্রান্তিবিলাস বা গিরীশ ঘোষের ম্যাকবেথ, মুনীর চৌধুরী ও প্রফেসর কবীর চৌধুরীর ওথেলো, সৈয়দ শামসুল হকের ম্যাকবেথ এগুলোও অনুবাদ করা হয়েছে মূল থেকে খানিকটা সরে এসে। এক ধরনের পুনর্লিখনের প্রয়াস সেখানে আছে।

এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় রূপান্তর করতে গেলে কাছাকাছি সমার্থক শব্দ বা near-equivalent নিয়ে ভাবতে হয়। মার্কিন ভাষাতাত্ত্বিক ইউজেনে নিদা এই সমার্থক শব্দ নির্বাচনের প্রয়াসকে দুভাবে চিহ্নিত করেছেন। একটি হচ্ছে Formal equivalence-এর অনুসন্ধান, অন্যটি Dynamic equivalence-এর অনুসন্ধান। প্রথমটি অনেকটা কাছাকাছি বা আক্ষরিক অনুবাদের প্রয়াস। দ্বিতীয়টি লক্ষ্য ভাষায় যুতসই সমার্থক শব্দ বের করা। একটি কথা মনে রাখা প্রয়োজন, একটি ভাষার অধিকাংশ শব্দের হুবহু প্রতিশব্দ অন্য ভাষায় হয় না। এমনকি আন্তঃভাষাতেও সেটি সম্ভব নয়। অনেক সময় অর্থ হুবহু এক হলেও ধ্বনিগত ব্যঞ্জনা আলাদা হওয়ার কারণে গ্রহণ করা যায় না। যেমন, বাংলা ভাষায় ‘বিফল’ শব্দের সমার্থক শব্দ হিসেবে অভিধানে আমরা পাই : ফলহীন, অচল, নিষ্ফল, অসমর্থ, ব্যর্থ। এর কোনোটিই বিফলের সম্পূর্ণ চরিত্র ধারণ করে না। ইংরেজিতে বহুল ব্যবহৃত ‘সিরিয়াস’ শব্দটির যে ব্যবহারিক ব্যাপ্তি, তা ধারণ করে এমন কোনো যুতসই প্রতিশব্দ বাংলাতে নেই। যে কারণে serious person, serious subject, serious issue, serious art প্রভৃতি ক্ষেত্রে বাংলা অনুবাদের সময় ‘সিরিয়াস’ শব্দের ভিন্ন ভিন্ন সমার্থক শব্দের প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ অনুবাদ করার সময় অনেকগুলো অপশনের ভেতর বোঝাপড়া বা নেগোসিয়েশন করতে হয়। ইতালির কথাসাহিত্যিক উমবার্তো ইকো যে কারণে বলছেন, অনুবাদ মানেই হলো নেগোসিয়েশন। তাঁর একটা বই আছে অনুবাদবিষয়ক : মাউস অর র‌্যাট? ইঁদুরের ইংরেজি প্রতিশব্দ মাউস হবে না র‌্যাট হবে। সিদ্ধান্তটা অনুবাদক নেবেন। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তার হাতে। কেউ নির্দিষ্ট করে বলতে পারবেন না যে, এটুকু হলে মূলানুগ, আর এতটুকু হলে রূপান্তর। অর্থাৎ বহুমাত্রিক স্তরের মধ্যে দিয়ে অনুবাদককে যেতে হয়।

অনুবাদের প্রক্রিয়াটা অনেকটা এরকম, আপনি একটি জায়গা দেখে এসে সে সম্পর্কে লিখলেন বা ছবি আঁকলেন। একটি শিল্প, অন্যটি সাহিত্য। কিন্তু দুটোই আপনার বোধের ভাষিক অনুবাদ। কতটা বিশ্বস্ত থাকবেন, কতটা বানিয়ে লিখবেন, সেটা আপনাকে নির্ধারণ করতে হবে। এই বিশ্বস্ততা মানে এই নয় যে মূলকে হুবহু কপি করা, অন্ধ অনুকরণে অনেক সময় মূলের প্রতি অবিচার করা হয়। কারণ তাকে মূলটা লক্ষ্যভাষায় বিকৃত হয়ে উপস্থাপিত হয়। মূলের বিশ্বস্ততা বলতে তাই আমি বুঝি মূলকে ঠিক রেখে গল্পটাকে লক্ষ্যভাষার সম্পদ করে তোলা। অর্থাৎ ভালো অনুবাদের প্রয়োজনেই অনুবাদককে মূল থেকে সরে এসে সাংস্কৃতিক অনুবাদ করতে হবে। অনূদিত টেক্সট যদি নিজ ভাষার সাহিত্য হয়ে না ওঠে তবে তা সার্থক অনুবাদ হবে কিনা আমার সন্দেহ আছে। আপনি একঝুড়ি আম রাজশাহী থেকে রাশিয়া পাঠাচ্ছেন, ঝুড়িটা পৌঁছল, আমটা পড়ে গেল বা পচে গেল মাঝপথে। তাহলে কি কিছু দাঁড়ালো? এই ঝুড়িটা হলো ভাষার বাহ্যিক আবরণ; এর প্রাণটা হলো আম। বাংলাদেশের আমকে রাশিয়া পাঠাতে গেলে এ-দেশি ঝুড়িতে পাঠালে চলবে না। সেখানে রাশিয়ার আবহাওয়া বা জলবায়ু উপযোগী ঝুড়ি তৈরি করতে হবে। সেই জন্যে আমি বলি, ভালো অনুবাদ সবসময় ট্রান্সক্রিয়েশন, বা পুনসৃষ্টি।

অনুবাদ মূল টেক্সটের একরকম সমালোচকীয় পাঠও বটে। এজরা পাউন্ড এরকমই বলতে চেয়েছেন। তার মানে অনুবাদক যে তার চিন্তাশক্তি কাজে লাগিয়ে মূল টেক্সটকে ভেঙে ফেলবেন বিষয়টি তা নয়। কাজটি কীভাবে হতে পারে তার একটি উদাহরণ দিতে পারি মধ্যযুগের স্বাধীন অনুবাদক আলাওল থেকে। চসার থেকে আলাওলের মতো মধ্যযুগীয় অনুবাদকরা স্বাধীন অনুবাদ করেছেন। প্রয়োজনমতো অনেক কিছু যুক্ত করেছেন। আলাওল বলেও নিয়েছেন সেটা: স্থানে স্থানে প্রকাশিমু নিজ মন উক্তি। আধুনিক কালে এসে অনুবাদকের সেই স্বাধীনতা খর্ব হয়েছে। জীবিত খ্যাতিমান লেখকদের প্রতিনিধি থাকে অন্যভাষায় অনূদিত গ্রন্থের মান নিশ্চিত করার জন্য। অধিকাংশ লেখক চান না তার লেখার স্বাধীন অনুবাদ হোক। পাঠকও এখানে অনুবাদে মূল লেখকের বলার ভঙ্গি ও স্বরটা ধরতে চান। ফলে অনুবাদকের কাজ আরও কঠিক হয়ে পড়েছে। তাকে লক্ষ্য ভাষার পাঠকদের কাছে সহজপাঠ্য করে তোলার জন্য মূলানুগ ও রূপান্তরের মাঝে নেগোসিয়েশন করতে হয়।

অনুবাদের ক্ষেত্রে উৎস ভাষার অভিধানিক অর্থ জানাই যথেষ্ট নয়। অঞ্চলভেদে এমনকি সময়ভেদেও শব্দের প্রায়োগিক বা ব্যবহারিক অর্থও জানতে হবে। একই ধরনের দুটি শব্দ পুরোপুরি ভিন্ন অর্থ বোঝাতে পারে। ইংরেজিতে ‘pious’ মানে ধার্মিক ব্যক্তি বোঝায়, অন্যদিকে ফরাসি ভাষায় এর অর্থ রসবোধসম্পন্ন মানুষ। ফ্রান্সে ‘liberal’ মানে ডানপন্থী, আমেরিকায় সেটা বামপন্থী। এমনকি সংস্কৃতিগত কারণেও স্থানভেদে এক স্থানের স্তূতিকথা অন্যস্থানে গালি হিসেবে ব্যবহারের নজিরও দেখা যায়। যেমন, যুক্তরাজ্যে ‘fag’ মানে সিগারেট, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে ‘fag’ বলতে হোমোসেক্সুয়াল পুরুষ বোঝায়। আবার আমেরিকানদের কাছে ‘ব্লাডি’ গালি না হলেও ব্রিটিশদের কাছে গালি হিসেবে চিহ্নিত। এই কারণে অনুবাদ কেবল ভাষাগত বিষয় নয়, সাংস্কৃতিক বিষয়ও বটে। ভাষা হচ্ছে এক ধরনের অদৃশ্য দেয়াল যা বিভিন্ন সংস্কৃতির কাছে পৃথিবীকে বিভিন্নভাবে দেখায়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, পশ্চিমা বিশ্বে ড্রাগন ভীষণ বিপজ্জনক প্রাণী অথচ প্রাচ্যদেশে সেটি সৌভাগ্যের প্রতীক। বাংলাদেশে কাউকে তুচ্ছার্থে ‘গরু’ বলা হলেও উত্তর আফ্রিকায় গরু সৌভাগ্যের প্রতীক।

অনুবাদের একটি আধুনিক পদ্ধতি প্রস্তাব করেন নিউমার্ক (১৯৮২)। তিনি অর্থগত অনুবাদ, ভাব-বিনিময়গত অনুবাদ, অনুবাদ এবং সংস্কৃতি এই তিনটি পদ্ধতির কথা উল্লেখ করেছেন। তার মতে, অর্থগত অনুবাদের ক্ষেত্রে মনোযোগ দেওয়া হয় লিখিত বক্তব্যের ওপর। অন্তর্নিহিত শক্তি এখানে বিবেচ্য নয়। এক্ষেত্রে অনুবাদকের কাজ হয়ে থাকে উৎস-ভাষার বাক্যগঠন ও অর্থদ্যোতনা অপরিবর্তিত রেখে উদ্দিষ্ট ভাষায় প্রকাশ করা।

অনুবাদ এক্ষেত্রে ভাষা বদলের মধ্য দিয়ে দুটি ভিন্ন সংস্কৃতিকে সম্পৃক্ত করে।