শৈশবের গান

ঢাকা, বুধবার, ১৭ জুলাই ২০১৯ | ২ শ্রাবণ ১৪২৬

শৈশবের গান

হরিশংকর জলদাস ২:২৮ অপরাহ্ণ, জুলাই ০৫, ২০১৯

print
শৈশবের গান

আমার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ গান। আনন্দ পেলে গানে উজ্জীবিত হই। বেদনায় বিপন্ন হলেও গানেই আশ্রয় খুঁজি। শৈশবে প্রচুর গান শোনা হতো। আমার শৈশব কেটেছে উত্তর পতেঙ্গার জেলেপাড়ায়। জেলেরা সারা দিন মাছ ধরতেন। আর দিনান্তে একত্র হতেন। অন্য কোথাও বিনোদন পাওয়ার সুযোগ তাদের ছিল না। তাই পাড়াতেই সন্ধ্যায় ঢোল, কাঁসা, মন্দিরা নিয়ে গানের আসর বসাতেন। আমার গানের কানেখড়ি সেখানেই। সেখানে মূলত রাধাকৃষ্ণের বিচ্ছেদের গানগুলো গাওয়া হতো।

আবার আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে মনসার পুঁথি আর ধুয়ো গান হতো। শুনতে বেশ লাগত! শৈশবে এই গানগুলো বেশ সমৃদ্ধ করেছে আমায়। সে সময় একজনের গান আমাকে মুগ্ধ করেছিল। তিনি আনন্দমোহন জলদাস। তার গলায় সুর ছিল অসামান্য। তরুণ বয়সে আমাকে মুগ্ধ করেছিল বিনয়বাসী জলদাসের গান। তিনি একুশে পদকও পেয়েছিলেন।

সে সময় নীনা হামিদ আর আবদুল আলীমের গান ভালো লাগত। জল আর নদী নিয়ে সব গানই আমার পছন্দ। কারণ, আমি জলজ মানুষ। জলের গান আমার রক্তে নাচন তোলে। তাই আবদুল আলীমের ‘পদ্মার ঢেউ রে...’ গানটি খুব প্রিয়।

চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের শিল্পী শেফালী ঘোষ ও শ্যামসুন্দর বৈষ্ণবের গান আমাকে দখল করে রেখেছে আজীবন। সুযোগ পেলে এখনো সেই সব গান শুনি। আর লালনগীতির শিল্পীদের মধ্যে ফরিদা পারভীনের গান ভালো লাগে। আনুশেহর ভাঙা কণ্ঠে লালনগীতি আমাকে মুগ্ধ করেছে। তরুণ বয়সে একটা গান খুব ভালো লাগত।

হয়তো ওই বয়সের কারণেই। মান্না দের গাওয়া গান ‘ও কেন এত সুন্দরী হলো...’ আজ ৬১ বছর বয়সেও এ গান একই রকম মুগ্ধ করে আমায়।

মুক্তিযুদ্ধের সময় যুদ্ধে যেতে পারিনি। কিন্তু যুদ্ধকে বুকে ধারণ করেছিলাম। এক ব্যান্ডের একটা রেডিও ছিল আমাদের। রাতের বেলা রেডিওর ওপর চাদর দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের গান শুনতাম। তখন রথীন্দ্রনাথ রায়, আবদুল জব্বার, আপেল মাহমুদের কণ্ঠে গান স্বাধীনতার পক্ষের মানুষদের তরঙ্গময় জীবনে পৌঁছে দিয়েছিল। এর মধ্যে আপেল মাহমুদের কণ্ঠে ‘একটি ফুলকে বাঁচাব বলে যুদ্ধ করি’ গানটি প্রিয়।

যে গানের কথা না বললেই নয়, সেটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান। আমার জীবনের অধিকাংশ জুড়েই রয়েছে রবীন্দ্রসংগীত। রবীন্দ্রসংগীতের শিল্পীদের মধ্যে কাদেরী কিবরিয়ার গান ভালো লাগে। পাপিয়া সারোয়ারের কণ্ঠ বাস্তব জগৎকে ভুলিয়ে দেয়। আর অসাধারণ লাগে রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা ও অদিতি মহসিনের কণ্ঠ। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের শিল্পীদের মধ্যে কনিকা বন্দ্যোপাধ্যায় ও শ্রীকান্ত আচার্যের গান ভালো লাগে।

গানে দলিত, প্রান্তজনের কথা বলেন বলেই নচিকেতার গান ভালো লাগে। আর ভালো লাগে আরেক ব্যান্ড দোহারের গান। ওদের গানে ভিন্ন একটা আমেজ রয়েছে। যেটা সত্যি অসাধারণ।

আমার প্রথম উপন্যাসেও গানের প্রভাব অনেক বেশি। সেখানে গান, মনসা পুঁথিসহ অনেক বিষয় উল্লেখ করেছি। গানের প্রতি আমার ভালোলাগা অনিঃশেষ। মনে মনে কামনা করি, গান শুনতে শুনতে যেন আমার মৃত্যু হয়।