লিসোটো রাজ্যে জংগল ট্যুর

ঢাকা, বুধবার, ১৭ জুলাই ২০১৯ | ২ শ্রাবণ ১৪২৬

লিসোটো রাজ্যে জংগল ট্যুর

পর্ব ১

মঈনুস সুলতান ২:২৫ অপরাহ্ণ, জুলাই ০৫, ২০১৯

print
লিসোটো রাজ্যে জংগল ট্যুর

প্রচুর পর্বত ও হাল্কা বনানীতে পূর্ণ আফ্রিকার ছোট্ট রাজ্য লিসোটো-তে কিছুদিন হলো আমি বসবাস করছি। লিসোটোর রাজধানী হচ্ছে মাসেরু। শহরটি জনবহুল নয় একেবারে। কিছু দিন আগে আমি মাসেরুতে বেড়াতে আসি। তখন খুঁজে বের করি, বছর দুয়েক আগে জিম্বাবুয়ের কবি সম্মেলনে পরিচয় হওয়া এক তরুণী কবি নাকাতুলে মোপালেসাকে। নাকাতুলে আজকাল পালাগানের কায়দায় সুদীর্ঘ কবিতা লিখে তা মঞ্চে গীতিআলেখ্যর মতো উপস্থাপন করছে। মেয়েটি অত্যন্ত দক্ষ ড্যান্সার। তাই তার পারফরমেন্সে স্বকণ্ঠে গীত কবিতার সঙ্গে মিশ্রিত হচ্ছে নৃত্যের ললিত ব্যঞ্জনা। নাকাতুলের সঙ্গে নিকট-অতীতে আমার জানাশোনা বন্ধুত্বের পর্যায়ে পৌঁছেছিল, তাই এ যাত্রায় তার দরাজ হাতে সঙ্গদানের উপর ভরসা করেছিলাম। কিন্তু নসীব খারাপ, ইতিমধ্যে লিসোটোতে কর্মরত জাতিসংঘের উন্নয়ন সংস্থা ইউএনডিপির এক বিপত্নীক কান্ট্রি রিপ্রেজেনটেটিভ ড. সাইমন ইনগ্রাম হিলের সঙ্গে তরুণী কবিটির জোরালো সম্পর্ক গড়ে ওঠেছে। মাসেরুতে এসে আমি নাকাতুলের সঙ্গ পেয়েছি স্বল্প, তবে সে একটি উপকার করেছে, ড. ইনগ্রাম হিলের সঙ্গে আমার যোগসূত্র ঘটিয়ে দিয়ে কনসালট্যান্ট হিসেবে ছোটখাটো কিছু কাজ পাইয়ে দিয়েছে।

ড. সাইমন ইনগ্রাম হিলের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান অন্তরঙ্গতার কারণে নাকাতুলের সাথে ঘুরে বেড়ানোর সম্ভাবনা আমার মন থেকে যখন প্রায় খারিজ হতে বসেছিল, ঠিক তখনই সে আগ বাড়িয়ে মাসেরু শহরের বাইরে জংগল ট্যুরে অভারনাইট আউটিং এর প্রস্তাব দেয়। এতে আমি যুগপৎ অবাক ও উদ্দীপ্ত হই। ঘুরে বেড়ানোর এক্সাইটমেন্ট আমার মধ্যে নিবিড় অ্যাডভেঞ্চারের উদ্দীপনা ছড়ায়, এবং তৎক্ষণাৎ সাত-পাঁচ না ভেবে প্রস্তুতি নেই জংগল ট্যুরের।

মাসেরু থেকে ট্যুর গাইড এর হিল্লা ধরে পেশাদার পর্যটনী সংস্থার ভ্যান-গাড়িতে চড়ে ঘণ্টার তিনেকের ড্রাইভে প্রথমে চলে আসি জংগল ট্যুরের নির্দিষ্ট লোকেশনে। অতঃপর গাড়ি থেকে নেমে মিনিট বিশেক হাইক করে উপরের এলিভেশন থেকে আমরা নেমে আসি পাহাড়ের ঢালে। গাইডের মারফত জানতে পারি যে এ দিককার গাছপালা ও ঝোপঝাড়হীন বিরাণ ভূভাগ লিসোটোর রাজার ব্যক্তিগত মহালের অন্তর্গত। কিন্তু এদিকে জংগল কোথায়? রাজার খাস মহালে ঝোপঝাড় সামান্য আছে বটে, তবে পাথরের গায়ে লেগে আছে সাদাটে পাথরের স্থর। ট্র্যাকস্যুট পরা নাকাতুলে অবলীলায় হেঁটে যাচ্ছে। তার হিপে ক্লিপ দিয়ে ঝোলানো সিডি ওয়াকম্যান। কানে ইয়ারফোন গোঁজা, ঠিক বুঝতে পারি না মেয়েটি কী ধরনের গান শুনছে? ড্রাইভার আমাদের জংগল ট্যুরের জন্য এখানে নামিয়ে দিয়েছেন। তিনি বাংলোতে গাড়ি পার্ক করে জিরাবেন। কথা হয়েছে ট্যুর-গাইড মাকগথলা মাবই এর তদারকিতে মাইল তিনেকের জংগল পরিক্রমা পায়ে হেঁটে সেরে ঘুর-পথে আমরা গিয়ে উঠবো বাংলোতে। নাকাতুলে হাঁটতে হাঁটতে বাঁকা হয়ে চকচকে নুড়িপাথর কুড়িয়ে নিয়ে পরখ করে তা ছুড়ে দিচ্ছে সাদা পাথরের চাকলায়। যেতে যেতে আমাদের পথপার্শ্ব ভরে ওঠে ম্লান ফিকে সবুজাভ বাদামি ঘাসে। এ প্রান্তরের শেষে এককালে ছিল রাজার ইটে গড়া কটেজ। অনেক বছর তা ব্যবহার হয়নি, তাই দালান ধসে পড়ে শুধু দেয়ালের খানিকটা অংশ দাঁড়িয়ে আছে আকাশের তলায়। তার সামনে ঘাস খাচ্ছে তিনটি রাজকীয় অশ্ব। এদের একটি শ্বেতকায় ও অন্যটি লালে-সাদায় চিত্রাপকরা। আরেকটি মারকুটে কিসিমের ঘোড়া আমাদের দেখতে পেয়ে বিরক্ত হয়ে চিঁ হি হি করে লেজ মুছড়ায়। গাইড মাকগাথলা মাবই তার দিকে তাকিয়ে ‘চো-য়া-প চো-য়া-প’ আওয়াজ তুলে মাথা ঝুঁকিয়ে অভিবাদন জানান।

এদের ছাড়িয়ে সামনে যেতেই আমি দাঁড়িয়ে পড়ে নাকাতুলের মাধ্যমে জানতে চাই,‘মাকগথলা মাবই, আপনি এরকম বিতিকিচ্ছিরিভাবে খুঁড়াচ্ছেন কেন?’ তিনি কোমর বাঁকা করে যেন ঢেঁকি পাড় দিতে দিতে আগ বাড়ছেন। আমার সওয়াল শুনতে পেয়ে থেমে পড়ে মাকগথলা মাবই বেশ ইলাবরেটলি জবাব দেন। নাকাতুলের অনুবাদে বুঝতে পারি জংগলের এদিকে আছে রাজার খাস গোচারণভূমি। মাকগথলা কিশোর বয়সে ওখানে রাখালের কাজ করতেন। কাছের দেশ সোয়াজিল্যান্ডের রাজা লিসোটোর মহারাজকে পাঠান একটি শক্তপোক্ত ষাঁড়। মাকগথলার উপর দায়িত্ব পড়ে ষন্ডটির দেখভালের। রাজকর্মচারীরা যুবক বয়সী সোয়াজি ষাঁড়ের জন্য হন্যে হয়ে জোড় খোঁজছেন। প্রজাতি, ব্রিড ইত্যাদি মিলিয়ে সহজে যথাযোগ্য পাত্রি পাওয়া যাচ্ছে না। এদিকে ষাঁড়টি যথাসময়ে গাভি না পাওয়ায় ত্যাক্তবিরক্ত হচ্ছে। একদিন খেপে গিয়ে সে রাখাল মাকগথলাকে শিং দিয়ে চেপে পেড়ে ফেলে মাটিতে। তিনি প্রাণে বেঁচে যান বটে তবে কোমরে বেদম আঘাত পান। সুস্থ হলে রাজ-আদেশে তাকে রাখালির দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। সে অব্দি তিনি খুঁড়িয়ে হাঁটছেন। ট্যুর গ্রুপ নিয়ে তিনি রাজার মাহালে আসেন বটে, তবে গোখামার থেকে সহস্র হস্ত দূরে থাকেন। গণ্ডার-ফণ্ডারে তার তেমন ভীতি নেই, তবে সোয়াজি ষাঁড়টি বড়ই বেতমিজ। মাকগথলা মাবই তার সাক্ষাতে পড়তে চান না। এ পর্যন্ত বিস্তারিত বয়ান দিয়ে তিনি আবার ঢেঁকি পাড়ের কায়দায় সামনে বাড়েন। আমরাও তাকে অনুসরণ করি।

চলে আসি কাঁটাগাছে নিবিড় আরেকটি উপত্যকায়। খুব আয়েশি চালে আমরা হাঁটছি। হঠাৎ করে দেখি, দাঁতাল এক হাতি শুঁড়ে তুলে নিচ্ছে ঘাসপাতা। বুনোহাতি দেখে আমার তো হালত খারাপ হয়ে যায়। আতঙ্কে গাছে চড়ে বসতে বাসনা হয়। নাকাতুলে খিলখিল করে হেসে কোমর বাঁকা করে দাঁড়িয়ে হাতির দিকে হাত নাড়ে। মাকগথলা মাবই দেঁতো হাসি হেসে আমাকে আশ্বস্ত করেন, ‘মিস্টার, এ হচ্ছে রাজ মহালের নিজস্ব হাতি, আমার পরিচিত, একে ভয় পাওয়ার কি আছে?’ বলে কাছাকাছি গিয়ে গজরাজকে ‘তোরো ইয়াকা’ সম্বোধন করে গড় হয়ে প্রণতি জানান। হাতিটি তাকে তেমন একটা পাত্তা দেয় না। নীরবে ঘাসপাতা খেতে খেতে ত্যাগ করে বিপুল পরিমাণে নাদি। মাকগথলা গদগদ হয়ে বলেন,‘ তোরো ইয়াকা আমাদের মহারাজার সমবয়সী। সাউথ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গ বুয়াররা তার মা-কে রাইফেল দিয়ে শুট করে কেটে নিয়ে যায় আইভরি। রাজ পরিবার তখন কটেজে অবসর কাটাচ্ছিল। শিশু-হাতিটি তার আঙ্গিনায় এসে খাবার প্রার্থনা করে। রাজকন্যা নিজ হাতে তাকে এক ঝুড়ি সবজি খেতে দিয়ে নাম দেন তোরো ইয়াকা বা মাই ড্রিম। হাতিটি মাঝে সাজে একটু আধটু ড্রিংক করতে ভালোবাসে। বিলাতের রানি এলিজাবেথের নাতি প্রিন্স হ্যারি আমাদের রাজপুত্রের মেহমান হয়ে এখানে এসে তাঁবু খাটান। তোরো ইয়াকার সঙ্গে তার জবর অন্তরঙ্গতা হয়। তিনি তাকে ফায়ার ওয়াটার বলে পরিচিত এক গামলা মামপোর পান করতে দেন। তা চেটেপুটে খেয়ে হাতিটি এতো তুষ্ট হয় যে, সে বিলাতের রাজকুমারকে শুঁড় তুলে স্যালুট জানায়।’ হাতি সম্পর্কে এ্যয়সা লম্বা চওড়া এবারত শোনার পর হস্তিমূর্খের মতো হে হে হেসে তাকে জবরদস্থ রকমের রয়েল স্যালুয়েট দিয়ে আমরা আবার পা চালাই।

খুব এক মনে হেঁটে যাচ্ছিলাম। ঘাস এদিকে নিবিড় হয়ে ঢেকে দিয়েছে পাথুরে আস্তরণ। যেতে যেতে মাকগথলা ‘সেরুরুবেলে সেরুরুবেলে’, বলে চেঁচামেচি করে ওঠেন। শব্দটি বুঝতে না পেরে জানতে চাই বিষয় কী? নাকাতুলে ফিসিফিসিয়ে বলে,‘লুক অ্যাট অল দিজ বাটারফ্লাইজ্ ।’ কিন্তু প্রজাপতি কোথায়? ঘাসে মনে হয় ফুটে আছে বেশ কিছু থোকা থোকা সাদাটে রূপালি ফুল। নিরিখ করে তাকাতেই বুঝতে পারি, ফুল নয় সাদা প্রজাপতিগুলো নাড়ছে রূপার ফুটকি দেওয়া তাদের নরোম ডানা। প্রচুর শোঁয়াপোকা জন্মে বলে এ ধরনের ঘাসকে বলা হয় কেটারপিলার গ্রাস। প্রজাপতিদের মৃদুমন্দ উড়াউড়িতে স্থানটিকে এসেছে পরির দেশের অলিক ব্যঞ্জনা। আমাদের জংগল ভ্রমণ শেষ হতে চলে। বিকাল এখনো গড়িয়ে যায়নি, হাতে সময় আছে প্রচুর। আস্তে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে বাংলোর বিষয়টি নাকাতুলে বুঝিয়ে বলে। বাংলোর কাছাকাছি জংগলে গাছপালা খানিকটা ঘন হয়ে উঠেছে। বাংলোর দিকে হাঁটতে হাঁটতে ভাবি আমার ভেতরে নীরবে ধোঁয়াচ্ছে যে হিংসা, ঠোকাঠুকি করার মওকা পেলে হয়তো এ পোড়ানি থেকে ত্রাণ পাওয়া যেত।