মেঘ মল্লার

ঢাকা, বুধবার, ২৪ জুলাই ২০১৯ | ৮ শ্রাবণ ১৪২৬

রেইনকোট থেকে

মেঘ মল্লার

হামিদ কায়সার ২:৫৬ অপরাহ্ণ, জুন ২৮, ২০১৯

print
মেঘ মল্লার

আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের রেইনকোট গল্পটা পড়েছিলাম বেশ আগে, কোনো এক মুক্তিযুদ্ধের গল্প সংকলনে। তখনই মনে দাগ কেটেছিল! একজন মুক্তিযোদ্ধার পরিহিত রেইনকোট কীভাবে আগুনের পরশমণি ছুঁয়ে দিতে পারে প্রাণে, ভীতু একজন মানুষকে কীভাবে করে তুলতে পারে সাহসী সেই প্রণোদনার হৃৎস্পন্দন যেন নিজের অন্তর্নিহিত তাৎপর্যে ধরে রেখেছে গল্পটি।

কেমিস্ট্রির অধ্যাপক নুরুল হুদা ভীতু মানুষ। হ্যাঁ, ভীতুই তো। কোন কলেজ গল্পকার তা উল্লেখ করেননি, তবে অধ্যাপকের বাসযোগে কলেজ যাওয়ার বর্ণনা ও বাস থেকে নামার সূত্র ধরে অনুমান করতে পারি, সেটা ঢাকা কলেজই হবে, বা ঢাকা কলেজ না হোক, তা যে কোনো কলেজই হতে পারে সেটা ধর্তব্যের বিষয় নয়; বিষয়টা হলো সেই কলেজের অধ্যাপক নূরুল হুদা অন্য দশজন মানুষের চেয়ে বেশিই আতংকগ্রস্ত ছিলেন একাত্তরের সেই অগ্নিগর্ভ সময়ে।

শ্যালক মুক্তিযুদ্ধে নাম লেখানোয় ছিলেন আরো বেশি তটস্থ। সে-কারণে পাঁচবার বাড়ি পাল্টিয়েছেন। অতি সতর্ক, মিলিটারি যেন কোনোভাবে শ্যেন-দৃষ্টিতে না তাকায়, রাজাকাররা যেন এতটুকু সন্দেহের চোখে না-দেখে। মুক্তিযুদ্ধে নাম লেখানো দূরে থাক, রেডিওতে স্বাধীনবাংলা বেতারকেন্দ্রের খবর শুনতেও তার অনীহা। স্ত্রী আসমা যখন মিরপুরের আশেপাশে মুক্তিযোদ্ধাদের বোমা ফাটানোর কথা বলে সে ভীষণ অস্বস্তি বোধ করে, এসব আলোচনা করার প্রয়োজন কী!

এমন সতর্কতার পরও ভয় কাটে না। যখন বাসার দরোজায় কারো নক পড়ে মিলিটারি এলো কিনা ভেবে দোয়া-দরুদ পড়তে থাকে। কিন্তু তার পরও কি নিজেকে সে বাঁচাতে পারলো? একদিন ঘোর বৃষ্টির দিনে কলেজের পিয়ন ইসহাক বাসায় এসে জানালো, কলেজে যেতে হবে জরুরি ভিত্তিতে। প্রিন্সিপাল স্যার যেতে বলেছেন। অখ- পাকিস্তানে বিশ্বাসী সেই প্রিন্সিপালের ডাকে কলেজে যেতে যখন বের হবে, প্রচন্ড বৃষ্টিতে যেন সে ভিজে না যায়, স্ত্রী আসমা তাকে মুক্তিযোদ্ধা ভাইয়ের রেখে যাওয়া রেইনকোটটা গায়ে পড়িয়ে দেয়। আর সেটা যে কোনো সাধারণ রেইনকোট নয়, বাসে যেতে যেতেই টের পায় অধ্যাপক। সে মিলিটারির লোক কিনা বা আইনের, সে-রেইনকোট দেখে চোরছেচ্চড় টাইপের লোকজন বাস থেকে নেমে পালাচ্ছে।
যা হোক, এই রেইনকোট পড়া ভীতু মানুষটা কলেজে প্রিন্সিপালের রুমে প্রবেশমাত্র সেখানে আগে থেকেই অপেক্ষারত পাকবাহিনীর মেজর এবং সৈনিকরা ওকে ধরে নিয়ে যায় টর্চার সেলে। নূরুল হুদার প্রতি অভিযোগ, সেদিন যে কয়েকজন কুলি কলেজে আলমিরা দিতে এসেছিল ওরা আসলে কারা? ওদের সঙ্গে সে কি কি বলেছিল? মিলিটারি অফিসার সরাসরি অভিযোগ তুললো, ধরা পড়া কজন মুক্তিযোদ্ধা বলেছে নূরুল হুদাও ওদের সঙ্গে জড়িত। স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য ওর ওপর চালানো হয় নির্মম নির্যাতন। ভীরু মানুষটা শেষে আর অস্বীকার করে না যে, সে মুক্তিযোদ্ধা নয়! “তার পাছায় চাবুকের বাড়ি পড়ে সপাং সপাং। তবে বাড়িগুলো বিরতিহীন পড়তে থাকায় কিছুক্ষণের মধ্যে সেগুলো নূরুল হুদার কাছে মনে হয় স্রেফ উৎপাত। মনে হচ্ছে যেন বৃষ্টি পড়ছে মিন্টুর রেইনকোটের ওপর। রেইনকোটটা এরা খুলে ফেলেছে। কোথায় রাখলো কে জানে। কিন্তু তার ওম তার শরীরে এখনো লেগেই রয়েছে। বৃষ্টির মতো চাবুকের বাড়ি পড়ে তার রেইনকোটের মতো চামড়ায় আর সে অবিরাম বলেই চলে, মিসক্রিয়েন্টদের ঠিকানা তার জানা আছে! শুধু তার শালার নয়, সে ছদ্মবেশী কুলিদের ঠিকানাও জানে।” রেইনকোটের উত্তাপ যেন ওকে জাগিয়ে দেয়। এবং এভাবেই গল্পটি শেষ হয়।

গল্পটি যখন পড়েছিলাম, তখন ভুলেও মনে হয়নি যে, এটি সিনেমা হতে পারে বা এ গল্পে সিনেমা হওয়ার উপাদান রয়েছে। কেননা গল্পটি এগিয়েছে সরলভাবে। কলেজের ভীরু অধ্যাপক বাসা থেকে বাসে কলেজে যায় এবং সেখান থেকে তাকে তুলে নেওয়া হয় পাকবাহিনির টর্চার সেলে। অথচ এই সরল গল্পটিকে অবলম্বন করেই চিত্রপরিচালক জাহিদুর রহিম অঞ্জন নির্মাণ করেছেন পূর্ণ দৈর্ঘ্য বাংলা চলচ্চিত্র মেঘমল্লার। যার চিত্রনাট্য শুধু বৈচিত্র্যময়ই হয়ে ওঠেনি, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বাংলাদেশে যে-কটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে, তার মধ্যে বলবো মেঘমল্লার-ই অন্যতম সেরা।

পরিচালক জাহিদুর রহিম অঞ্জন আগেভাগেই যেন দর্শককে জানিয়ে রাখতে চান, মেঘমল্লার দেখা শেষ হওয়ার পর, তোমাদের কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে থাকতে হবে, বিমূঢ়তা কাটিয়ে ওঠতে সময় লাগবে; চেতনায় পড়বে জল, নড়বে পাতা, পাতা নড়বেই! তাই ছবি শুরু হওয়ার আগ-থেকেই পর্দায় দোলে ওঠে অপূর্ব এক দৃশ্যকাব্য: ধইঞ্চার সবুজ পাতাগুলো কোন ব্যথার কাতরতায় বাতাসে দোল খাচ্ছে, আকাশ না দেখিয়েও আলোছায়ায় বোঝানো যাচ্ছে প্রকৃতি বিষণ্ন মেঘে ঢাকা। ঝিরিঝিরি পাতার শব্দের সঙ্গে নেপথ্যে বেজে উঠছে মেঘমল্লার রাগ। এই মেঘমল্লারের সুরে সুরেই আমরা মিড ক্লোজ আপে দেখি দেড় টনি ট্রাকের ভেতর একজন মহিলা তার ছ-বছরের কন্যাকে নিয়ে কোথাও চলে যাচ্ছে, ট্রাকের সামনে দেখা যাচ্ছে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়ছে। মেঘমল্লার বেদনার রাগ বেড়ে যায়, আকাশে ফুটে ওঠে কালো মেঘ, তার পাশে শুরু হয় সিনেমার সাবটাইটেল মেঘমল্লার!

রেইনকোট গল্পটির শুরু হয়েছিল বৃষ্টির বর্ণনা দিয়ে, ‘ভোররাত থেকে বৃষ্টি। আহা! বৃষ্টির ঝমঝম বোল।’ এই ঘনঘোর বৃষ্টির দিনেই কলেজ থেকে পিয়ন এসে জানিয়ে গেল, প্রিন্সিপাল সাহেব ওকে কলেজে যাওয়ার ফরমান দিয়েছে! তারপরই বাসে করে ওর কলেজে ছুটে যাওয়া আর কলেজে যাওয়ামাত্রই বন্দিত্ব! কিন্তু মেঘমল্লার-র শুরুটা হয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের বৃষ্টির মধ্যে নৌকা দিয়ে টানে নামার দৃশ্যের মাধ্যমে। তারপরের দৃশ্যেই দেখা যাচ্ছে রেইনকোট পরা একজন মুক্তিযোদ্ধা রেললাইন ধরে হাঁটছে। পরের দৃশ্যে রেইনকোট পরা মুক্তিযোদ্ধা মিন্টু অধ্যাপক নূরুল হুদার বাড়িতে। ঘরের ভেতর ছয় বছরের বাচ্চার সঙ্গে। অধ্যাপক-স্ত্রী সুধা এসে ভাইকে তাগিদ দিচ্ছে রেইনকোট খুলে পোশাক পাল্টিয়ে গোসল করতে।

নির্মাতা ইচ্ছেমতোই এভাবে গল্পের বাইরের দৃশ্য সংযোজনের স্বাধীনতা নিয়েছেন এবং সেটা মূল গল্পের সঙ্গে সমন্বিত রেখে। অবশ্য কখনো কখনো সেসব দৃশ্যের সূত্রও দেওয়া ছিল মূল গল্পে। যেমন কলেজের দৃশ্যপটগুলোতে। মূল গল্পে কলেজে যাওয়ার ব্যাপারটা ছিল একবারের জন্য। কিন্তু মেঘমল্লারে অধ্যাপক নূরুল হুদাকে কলেজে যেতে দেখা গেছে দু-তিনদিন। এতে করে কলেজের সার্বিক অবস্থা যেমন, তেমনি তখনকার সময়ের ভীতিকর পরিস্থিতিও ফুটে উঠেছে। যা চলচ্চিত্রটির জন্য প্রয়োজনীয় ছিল। পাকিপ্রেমী প্রিন্সিপাল চরিত্রে জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয় অসাধারণ, তিনি এদেশের শিক্ষিত রাজাকারদেরকে যথাযথভাবে উপস্থাপন করেছেন।

কলেজ-পর্বের প্রতিটি দৃশ্যপট নিপুণ এবং বেশ মানসম্মত হলেও, মুক্তিযোদ্ধাদের পরিচালক যখনই দেখাতে গিয়েছেন, মনে হয়েছে যথাযথ হলো না। মিন্টু চরিত্রে আরো নায়কোচিত কাউকে কাস্ট করা যেত, যার কণ্ঠও হতে পারত দৃঢ় এবং গম্ভীর। প্রথম দৃশ্য বাদে মুক্তিযোদ্ধাদের আর কোনো দৃশ্যই মন কাড়েনি এবং মনে হয়েছে দুর্বল উপস্থাপনা। নির্মাতা কেন যে দীর্ঘ সময় ধরে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দুর্বল মুহূর্ত দেখাতে গেলেন, তা বোধগম্য হচ্ছে না। একজন মুক্তিযোদ্ধা বাড়ির কথা মনে করে কাঁদছে। তাকে সান্তনা দিচ্ছে অন্য চার পাঁচজন। ফেলে আসা ঘরবাড়ি স্বজনের জন্য সেই কেঁদো মুক্তিযোদ্ধা এতোটাই শোকার্ত যে, সে শোকে মুখ তুলতে পারছে না, সেদিনকার জন্য ওর ওপর অর্পিত রান্নার দায়িত্ব পালনেও ব্যর্থ। মূল গল্পে কিন্তু অধ্যাপক নূরুল হুদাকে ভীতু দেখালেও মুক্তিযোদ্ধাদেরকে ঘিরে তার ভাবনা ছিলো অসম সাহসিকতার, “আহা এই তুমুল বৃষ্টির মধ্যে ছেলেটা কোথায় কোন নদীর তীরে ওত পেতে বসে রয়েছে। হয়তো পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি প্ল্যাটুন গ্রাম জ্বালিয়ে শ দুয়েক মানুষ মেরে লাশগুলোকে ফেলে জিপে করে নিয়ে যাচ্ছে জ্যান্ত জোয়ান মেয়েদের, মিন্টুর স্টেনগান নিশ্চয়ই তাক করা রয়েছে ওই মিলিটারিগুলোর দিকে। মিলিটারির সব কটাকে খতম করে মেয়েগুলোকে বাঁচাতে পারবে তো? পারবে না?” নূরুল হুদা এবং তার কলিগ সাত্তারের কলেজের আসা-যাওয়ার দৃশ্যগুলো আরো বাস্তবানুগ হতে পারতো। দুদিনের যাত্রাপথে দেখানো হলো একই বাস। আর এই বাসটি ছাড়া পথে অন্য কোনো যানই চোখে পড়লো না, কোনো মানুষের আসাযাওয়াও, এমনকি একটি কুকুরের ছায়াও। তবে এসব ছোটখাটো ভুলত্রুটি বা অসামঞ্জস্য চোখে লাগে না ক্যামেরার অপূর্ব দৃশ্যায়ণের ফলে। বৃষ্টিভেজা গ্রাম্য প্রকৃতিকে ক্যামেরাশিল্পী অত্যন্ত নান্দনিকভাবে উপস্থাপন করেছেন, তার সঙ্গে দুর্দান্ত সাউন্ডগ্রাফি দর্শককে ছবিটির প্রতি বিমোহিত করে রাখে। মেঘমল্লার রাগের ওঠানামা বিস্তার মাঝে মাঝে ভোকালের ব্যবহার ছবির বিষয়বস্তুর সঙ্গে এমনভাবে মিশে গিয়েছে যে, বিষয়ের গভীরে হারিয়ে যেতে হয়।

কলেজ থেকে মিলিটারি নূরুল হুদা এবং তার বন্ধুকে ধরে যখন টর্চার সেলে নিয়ে গেল, রেইনকোটের গল্প অনুযায়ীই সব হয়েছে কিন্তু ছবির পরিণতিতে পরিচালক বড় ধরনেরই পরিবর্তন এনেছেন, অসমসাহসী হয়ে ওঠা নূরুল হুদার দৃঢ়তার কাছে অবশেষে পরাজিত হয়ে পাক মেজর অসহ্য ক্রোধে নূরুল হুদার গায়ে গুলি ছুড়লো। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস যা করেননি, পরিচালক তাই-ই করেছেন। উপরন্তু, তিনি নূরুল হুদার মুখে জয় বাংলা স্লোগান ধরিয়েছেন। একবার নয় বারবার। এমনকি মেজরের গুলি খাওয়ার পরও থামেনি ওর জয় বাংলা বলা। জয় বলতে বলতেই ত্যাগ করেছেন প্রাণপাখি। শহীদুজ্জামান সেলিমের দুর্দান্ত অভিনয় এবং দৃশ্যায়নের নিখুঁত উপস্থাপনায় সে-দৃশ্য দেখার পর কিছুক্ষণ স্তম্ভিত হয়ে থাকতে হয়। অচিরেই আবার বৃষ্টির দৃশ্য যেন আমাদের বুকের কান্না হয়ে ঝরে।

তবে মৃত্যুর আগে আগে নূরুল হুদার মুখে বোধহয় উর্দু সংলাপ না চড়ালেই ভালো হতো, সেটা আমাদের একুশের চেতনার সঙ্গে খুব যেত। রেইনকোটের বদৌলতে যেহেতু নূরুল হুদার চরিত্রটা হয়ে উঠেছে মহৎ সাহসে দীপ্যমান, সে তো ঘৃণাভরে এড়াতেই পারতো উর্দু বলার দৌরাত্ম্য। তাই না?