হায় নজরুল!

ঢাকা, রবিবার, ১৮ আগস্ট ২০১৯ | ২ ভাদ্র ১৪২৬

হায় নজরুল!

সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় ৩:৫৯ অপরাহ্ণ, মে ২৪, ২০১৯

print
হায় নজরুল!

বর্তমানের কবি আমি ভাই, ভবিষ্যতের নই নবী’-তার ‘আমার কৈফিয়ত’ পড়ে মনে হলো নজরুল ইসলাম তাচ্ছিল্যের হাসিতে ফেটে পড়েছেন। উত্তরসূরিরা তার মূল্যায়নে যে রকম লাজনম্র নববধূর মতো দ্বিধাকম্পিত বাক্যরাশি নিবেদন করে চলেছেন, এতটা তার দূর প্রত্যাশায়ও ছিল না। নজরুলকে নিয়ে বাঙালি শিল্পী সমাজের, বিশেষত কবিদের, অস্বস্তির শেষ নেই। তাকে বাতিল করা যায় না স্বভাব-কবি বলে, কিন্তু গ্রহণ করায় সমস্যার ব্যাপ্তি প্রচুর।

আমাদের সান্ধ্য লিরিক-বিতানে নজরুল প্রায় এক সাংস্কৃতিক উপদ্রব। যেন ইতিহাসের আয়নায় একটা ফাটা দাগ : যতই অপচয়িত প্রতিভা বলে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি, যেদিক দিয়েই তাকাই, পারা যায় না। জনতার সামনে ও সখ্যে তিনি আছেন। রূপসীর অধরোষ্ঠের পাশে একটি নিষ্প্রয়োজনের তিল যেন, কিন্তু উপেক্ষার উপায় নেই। সরকার আসে। সরকার যায়। কিন্তু উভয় বঙ্গেই সীমানা-নিরপেক্ষভাবে নজরুল ইসলামের ছাড়পত্রে সমর্থনের সিলমোহর গাঢ় থেকে গাঢ়তর ছাপ ফেলে যায়।

আমাদের যেমন সাহিত্যবিচার তাতে প্রশ্ন উঠতেই পারে। এমনকী বুদ্ধদেব বসুর মতো কবি যে অনুরক্তির আতিশয্যের মধ্যেও নজরুলের কাব্যে যে প্রবল অব্যবস্থার কথা উল্লেখ করেছেন তা আমরা ভুলে যাই না। বরং দিনের পর দিন বঙ্গীয় কবি সমাজের অবস্থান, তার প্রসঙ্গে, কঠোর হয়ে যাচ্ছে। সৌজন্যের মলাটে মুড়ে রাখা অবজ্ঞার ভঙ্গি খুঁজে পেতে সাধারণ বুদ্ধির অতিরিক্ত আর কোনো চর্চার দরকার পড়ে না।

নজরুল যেন সত্যিই কাব্যের অতিশয়োক্তি; বিয়ারের উপচেপড়া ফেনা। এই তো সদ্য সদ্য আবার শামসুর রাহমানের ‘কাজী নজরুল ইসলামের প্রতি’ নামের রচনাটি পড়ে উঠলাম। সেখানেও তো একই অনুযোগ যে ‘কবিতা তার স্তনের গোলাপকুঁড়ি’ উন্মোচন করলেও ‘গোলাপের উজ্জ্বলতা ছেড়ে’ নজরুল ‘বাগ্মিতা নামের দজ্জাল মেয়ের কাছে’ কেন ছুটে গেলেন! ফলাফল? শামসুর রাহমান সখেদে জানান, ‘যার ক্ষিপ্ত তুমুল নর্তনে স্বপ্নগুলি/পড়লো ছড়িয়ে ভাঙা ঘুঙুরের মতো’। আর বুদ্ধদেব বসু ‘প্রাণশক্তির এমন অসংবৃত উচ্ছ্বাস’ বিষয়ে সশ্রদ্ধ অবলোকনের প্রমাণ রাখলেও বলতে সংকোচ করেননি, ‘যেখানে তিনি ভালো লিখেছেন, সেখানে তিনি হৈ-চৈটাকেই কবিত্বমণ্ডিত করেছেন’।

যারা তার স্বাভাবিক মিত্র হিসেবে প্রচারিত সেই বামপন্থীরাও নজরুলের উচ্ছৃঙ্খলতা বরদাশত করেন না। ম্যাকসিম গোর্কি একদা আলেকসেই তলস্তয়কে একটি চিঠিতে জানিয়েছিলেন, তার ‘অন্তর্গত নৈরাজ্য’ তার প্রতিভার প্রাপ্য স্বীকৃতির পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। নজরুল প্রসঙ্গেও ধ্রুপদী বামপন্থীদের আক্ষেপ অনেকটা এই রকম। নজরুলের কবিত্বে কলঙ্ক প্রচুর। সেসব দাগ মোছার কোনো অর্থ হয় না। সে তো ঈশ্বর গুপ্তের লেখাতেও অজস্র পদস্খলন। যেমন সাংবাদিকতা ও ভাঁড়ামি। কিন্তু ঈশ্বর গুপ্ত না থাকলে মধুসূদনকে হয়তো আধুনিকতার প্রবর্তক হিসেবে চেনা যেত না। নজরুলের ছেলেমানুষি না থাকলে জীবনানন্দের হাতে ভাষা আচমকা এত রূপবতী হয়ে উঠত না। নজরুল এক মস্ত ত্বরণ-তাকে অনুঘটক হিসেবে পেয়েই বাংলা ভাষা অবিশ্বাস্য দ্রুততার সঙ্গে মানচিত্রের পুনর্বিন্যাস ঘটাতে সক্ষম হলো।

যদিও বলা হয় তার সম্পর্কে, তবু নজরুল ধূমকেতুর মতো মহাকাশ রহস্য কি না সন্দেহ আছে। নজরুলের অপরিকল্পিত উচ্ছ্বাস আমাদের ভাষার ঐতিহ্যগত সম্মোহন তছনছ করে দিয়েছিল। শব্দের নিয়ন্ত্রণহীন কাঁপন, ছন্দের অসংযম তো কমলবনে মত্ত কুরঙ্গবত। এই কবি, আজ মনে হয়, ভাগ্যক্রমে মনীষার পূজারি ছিলেন না। এই স্বভাব অ্যাজিট-প্রপ যেভাবে আরবি, ফারসি ও উর্দু শব্দের প্লাবন ঘটিয়েছেন তাতে তৎ?সম ও তদ্ভব শব্দের আশ্রয়ে লালিত অনেক তপোবনের বিপর্যয় ঘটেছে। সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, হাজার হোক, রবীন্দ্র অনুসারী। তার পক্ষে অবিবেচনাপ্রসূত উন্মাদনা অসম্ভব। নজরুলের ভাষা সুষম যৌগ নয়, অনেকটা সংকর পদার্থ। কিন্তু ভাষার সুস্থিতি নড়িয়ে দেওয়ার পক্ষে এই নোনাজল যথেষ্ট। ‘যোনিচক্রস্মৃতি’-এমন দু’একটি শব্দ ছাড়া জীবনানন্দের প্রথম বই ‘ঝরা পালক’ তো নজরুল সমীপে আত্মসমর্পণের চূড়ান্ত নমুনা। মোহিতলাল মজুমদার ও যতীন সেনগুপ্ত-দুজনেই বাংলা ভাষার বহমানতাকে প্রশ্ন করেননি। প্রথম জন বড় জোর মাতৃভাষাকে ফিরিয়ে দিতে উদ্যোগী হলেন ও দ্বিতীয় জন সন্দিগ্ধ নাট্য। ভাষার ভারসাম্য ভেঙে দেওয়ায় নজরুলের অপরিণামদর্শী হানাদারি ইতিহাস বরং আকাক্সক্ষাই করেছিল। তার প্রমাণ সে যুগের শহরে মফস্বলে ছড়িয়ে থাকা যুবজনতার সমর্থন।

কি দুর্জয় সাহসে যে তিনি হিন্দু ও মুসলমানের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আক্রমণ করেছিলেন! আর তার স্বজাতিও তো সহ্য করেছিল সেসব পুরুষ বাক্য ও তিরস্কার। বসনহীনা সরস্বতী আঁকা যাদের কাছে আজ অপরাধ তারা নজরুলের মতো বিধর্মী, যে ভগবান-বুকে পদচিহ্ন আঁকতে সংকল্পবদ্ধ-জানতে পারলে কি পরিমাণ কুপিত হতেন আজ ভাবলেও শঙ্কা হয়! অন্যদিকে ‘খোদার আসন আরশ ছেদিয়া’ যে বিদ্রোহ বাসনা তা কখনই কোনো মৌলবাদী বিশ্বাসের দ্বারা স্বীকৃত ও অভিনন্দিত হওয়ার কথা নয়, তবু তো নজরুল নিজবাসভূমে পরবাসী ছিলেন না। তবে কি সে যুগে ধর্মবিশ্বাস ও প্রথাপালন আজকের মতো অসহিষ্ণু ও নিষ্ঠুর ছিল না? উত্তর হাতের কাছে নেই কিন্তু নজরুলকে যে ‘হিন্দুর আফজল’ হতে হয়নি তার নিদর্শন তো তার কাব্যে, গানে থরে থরে সাজানো রয়েছে।

মার্কসবাদী কেন্দ্রীয় কমিটির মুসলিম সদস্য যদি ধর্মনিরপেক্ষতার স্বার্থে নির্বাচনী প্রচারে হনুমানের চরণবারি পান করেন, যদি হিন্দু মুখ্যমন্ত্রীকে মসজিদের ‘দোয়া’ নিতে হয় সংখ্যালঘু প্রীতির স্মারক হিসেবে তবে তা সেক্যুলার পরাবাস্তবতার চিহ্ন হোক বা না হোক নজরুলের বাস্তবতা হলো এই যে ঈদের দরগা ও তুলসীতলাকে তিনি বন্ধনীভুক্ত করতে চেয়েছিলেন ঠিকই কিন্তু ঈশ্বরের সঙ্গে মানুষের সন্তানের সংলাপে কোনো মধ্যস্থতাকারীর তোয়াক্কা করেননি। ‘মৌ-লোভী যত মৌলবী’ তার জাত মেরে দিয়েছে কিন্তু হিন্দু পুরুত তার জন্য তাকে ‘পাত নেড়ে’ বলার অভ্যাস ছাড়তে পারেনি। নজরুলের জয় এখানেই যে সংসদীয় নাস্তিকরা তার মতো বেপরোয়া আস্তিককে দেখলে লজ্জায় মুখ লুকোয়!

একটা যুগ তার ওষ্ঠে থরথর করে কেঁপেছে। ধর্মীয় ঘেরাটোপের বাইরে একটা জীবন যত রঙিন হয় ততটাই রঙিন ছিলেন তিনি। একজন আধুনিক যতটা ধর্ম-অতিরিক্ত পরিসরে থাকতে পারেন সামন্ততান্ত্রিক সভ্যতায় ততটাই ছিলেন কাজী নজরুল। হাত পেতে পান নিয়েছেন কিন্তু পারিতোষিক নেননি। অনিয়মের ব্রত পালন কম কথা নয়! স্বাধীন জীবনযাপন কম কথা নয় মোটেই!

উক্তির স্মরণযোগ্যতা যদি কবিতার অন্যতম শর্ত হয়, তবে নজরুলের অবস্থান নিয়ে প্রশ্নের অবকাশ নেইভ। ‘হিন্দু না ওরা মুসলিম? ওই জিজ্ঞাসে কোন্ জন?/ কাণ্ডারি! বলো, ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মা’র’। অথবা ‘এই হৃদয়ের চেয়ে বড় কোনো মন্দির কাবা নাই’, এই পঙ্ক্তিগুলোর রচয়িতা কে সে কথা না জানলেও বাংলার পথেপ্রান্তরে এসব লাইন ছড়িয়ে আছে, যেমন রামপ্রসাদের গান। যদি এই বিদ্যুৎ? লেখাগুলোকে উপেক্ষাও করি, তবেও দেখব ‘আমি বন্ধনহারা কুমারীর বেণী, তন্বী নয়নে বহ্নি’, যিনি লিখতে পারেন তার কবিত্ব বোধ সম্বন্ধেও সংশয়ের অবকাশ নেই।

নজরুল আসলে আধুনিক কবিদের মতো নিজেকে ভাষার প্রদেশে সংকুচিত রাখেননি। সেখানেই তাকে বোঝার পক্ষে আমাদের ভুল হয়ে যায়। তিনি আদি কবিদের মতো। সমাজের অসুস্থতার নিরাময় দাবি করেছেন প্রগলভতার মধ্যে।

তিনি যদি নিতান্ত ভাষাকর্মী হয়ে জীবন নির্বাহ করতেন তাকে বিচার করার সময় আমাদের এত অসুবিধে হতো না। বদলে তিনি তখনো কংগ্রেসের অহিংস নীতি, তখনো স্বরাজ্য দলের মধ্যপন্থাকে তছনছ করে দিতে চেয়েছেন। তার মনে হয়েছিল, দুর্ভাগা সেই দেশ যার এখনো কবিকে ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড়ের মধ্যে দেখবার প্রয়োজন হয়, দুর্ভাগা সেই দেশ যার বীরের প্রয়োজন হয়। ফলে তিনি কবি ও দেশনেতা দুই মূর্তিরই গায়ে কালি ছিটিয়ে দিলেন, তাতে সময় তাকে অধরোষ্ঠ দান করল, কিন্তু নন্দন-তাত্ত্বিকরা বিরক্ত হলেন। নজরুলকে আমি বলব না, যে তিনি মায়াকোভস্কির মতো ‘পাতলুন পরা মেঘ’ লিখতে পারতেন। তিনি তত দূর প্রতিভাবান ছিলেন না। কিন্তু যা কিছু সঞ্চয় ছিল, তাকে অকাতরে দান করেছেন। নজরুল যখন বোহেমিয়ান হয়েছেন, তখন আকাশ বাতাস তার উন্মাদনা দেখেছে। তিনি কলঙ্কিত হয়েছেন। কিন্তু প্রসাধিত নৈরাজ্য তার চরিত্রে ছিল না। তিনি অন্তরে এবং বাইরে যখন ভুল করতেন, তখন একই রকম ভুল করতেন আর সেই জন্যই যখন সময়ের ডাকে সাড়া দিতেন, তখন বঙ্গভাষী জনসমষ্টি অজস্র ভিড়ের মধ্যে থেকেও তার কণ্ঠস্বর আলাদা করে চিনতে পারত।

যেমন গান, এ কথা সত্য, সংগীতেও তার শৃঙ্খলা ছিল না। ফুলের জলসা থেকে তিনি জাহান্নামের আগুনে ঝাঁপ দিতে পারতেন যে কোনো মুহূর্তে যুক্তিরহিতভাবে। লিখতে পারতেন মার্চিং সং। তার পর মুহূর্তেই বাইজির পায়ের নূপুর অসংগতভাবে বেজে উঠত তার গানে আর কখনো অকারণে উদাসীন এক কবি লিখে ফেলতেন, ‘ভরিয়া পরাণ শুনিতেছি গান/আসিবে আজি বন্ধু মোর’। নজরুল এ রকমই। অসংগতির শব্দরূপ-সাবধানী, সদা সর্বদা সংগতি-প্রেমিক উত্তরসূরি তাই তার দেখা পায় না সহসা।