বাঙালির পরানসখা

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৬ জুলাই ২০১৯ | ১ শ্রাবণ ১৪২৬

বাঙালির পরানসখা

সৈকত দে ২:৪০ অপরাহ্ণ, মে ১০, ২০১৯

print
বাঙালির পরানসখা

তখন ছোট ছিলাম, পত্রিকায় নাম দেখার ইচ্ছে ছিল খুব। সেই ২০০৩/৪-এর কথা। তা, এক রবীন্দ্র জন্মবার্ষিকীতে লেখা জমা দিয়েছি। প্রথম লাইন : ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা সাহিত্যের একমাত্র বহুজাতিক কোম্পানি, দীনু ঠাকুর ছিলেন প্রথম সি ই ও এবং জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির অসারতার প্রামাণ্য দলিল কেন না তিনি ছিলেন তার ঋষি পিতার চৌদ্দ নাম্বার সন্তান।’

লেখাটি ছাপা হলো না। সাহিত্য সম্পাদক এক দিন রাস্তায় পেয়ে, ভালোবেসে বলেছিলেন, ‘সৈকত সাহিত্য নিয়ে মশকারি করিও না। সাহিত্য মশকারির জিনিস না।’

অথচ, এটি আমার বিশ্বাস। রবীন্দ্রনাথ না জন্মালে অখণ্ড বাংলা ভাষার অন্তত তিরিশ লাখ লোক সরাসরি বেকার। আমাদের শ্রুতির আনন্দ বিধ্বস্ত। আমাদের পাঠের আনন্দ, গভীর অশ্রু সূর্যালোকের প্রতিফলনহীন। এবং রবীন্দ্রনাথই একমাত্র যিনি জন্মের পরে পরেই লাভ করেছিলেন বিরাট এক স্তাবক ও ঘৃণাজীবী সম্প্রদায়। উদয়ন ঘোষ মন্তব্য করেছিলেন একদা, রবীন্দ্রগানে তার যৌন উত্তেজনা ঘটে।

চিঠিপত্রের রবীন্দ্রনাথ এক বিস্ময়। শিশুদের কাছে নির্মল আনন্দে যখন লিখছেন তখন তিনি সহজ রবীন্দ্রনাথ। যেমন, রাণু মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে যে পত্রালাপ, এখন আমরা পাই আঠারো নম্বর খণ্ডে, সেইটিতে দেখি একজন স্বচ্ছ, রসিক মানুষকে, এমনকি হাঁসের বাচ্চা আঁকা বিষয়েও আলাপ জুড়ছেন ছয় বছরের বালিকার সঙ্গে, জেনে নিচ্ছেন দেখা হলে ভানুদাকে চিনে উঠতে পারবে কি না সে, আবার একই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কিন্তু হেমন্তবালা দেবীর সঙ্গে কথা বলার সময় ধর্ম সমাজতত্ত্বের এমন সব গূঢ় কথা সরলভাবে বলছেন যা আজকালকার ভাষায় অভাবনীয়।

আমার রবীন্দ্রনাথ হলেন, চিঠির গানের আর চিত্রকলার রবীন্দ্রনাথ। যার প্রেমে অজস্র দেশি-বিদেশি পড়েন কিন্তু নিজের স্থান সম্পর্কে অতিচেতন থাকবার জন্য স্পষ্ট করে একটি প্রেম করতে পারেন নাই। অবশ্য তার চিঠিপত্রের ‘বিটুইন দ্য লাইন’ পড়লে প্রেম দেখা যায়।

রবীন্দ্রপ্রেম ঔপনিষদিক, পুরাণনিঃসৃত। তার দেবতা ও প্রিয় একাকার। সূফীবাদীদের সঙ্গেই তার মিল দেখি। এমন একজন প্রেমিক ছিলেন তিনি যেখানে আরাধ্য আর ভক্ত পরস্পরে লীন হয়ে যায়। তিনিই তো লিখেছিলেন, প্রেমকে ভাগ করলে পাওয়া যায় জ্ঞান আর আনন্দ। ‘একটুকু ছোঁয়া’ আর ‘একটুকু গান’ ঠিকঠাক মানুষের কাছ থেকে পেলে এক জীবন তো তুচ্ছ জন্মজন্মান্তর কাটানো যায়। এই স্পর্শ যে পেয়েছে সে অমর।

এই হলো রবীন্দ্রশিক্ষা। যে রবীন্দ্র সম্যক উপলব্ধি করে সে মিথ্যে বলতে পারে না, ‘উইদাউট কনসেন্ট’ কাউকে ছুঁতে পারে না, কেবল শরীরের জন্য ভালোবাসাহীন সম্পর্কে জড়াতে পারে না। এই হলো আমার রবীন্দ্রনাথ। যিনি মাকে নিয়ে অনেক দূরে যেতে চেয়ে অনেক দূরে দেখতে শিখিয়েছিলেন একটি শিশুকে। যিনি মনের সব অন্ধকার আলোয় ভরিয়ে দিয়েছেন।

বাঙালি হয়ে জন্মেছি ভাগ্যিস তাই রবীন্দ্রনাথকে পেয়েছি। আরেক রবীন্দ্রনাথ আমরা পাই, চিঠিপত্র নবম খণ্ডে হেমন্তবালা দেবীর সঙ্গে পত্রালাপে। ধর্ম, সমাজ প্রসঙ্গে এতো খোলামেলা আর কারও সঙ্গেই নন তিনি, পরিমাণে সবচেয়ে বেশি চিঠি। আঠারো নম্বর খণ্ডে আমরা পাই, আন্তরিক হৃদয় সংবেদী রবীন্দ্রনাথ, লেডি রাণু মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে জীবনব্যাপী পত্রবিনিময়ে, এই খণ্ডে দুদিকের চিঠি পাওয়াটা অনন্ত আনন্দের খনি।

আমার রবীন্দ্রনাথ অবশ্য গানের। বিশেষত দেবব্রত কণ্ঠে, গীতা ঘটকেরও। চিত্রকলার রবীন্দ্রনাথ নিজের আত্মার যাবতীয় অবদমন উন্মুক্ত করেছেন। আমরা অনেকেই পড়ে থাকব, ছোটগল্পের রবীন্দ্রনাথে আমরা পাই, একজন সাহসী গল্পকারকে। বিশেষত, ‘নষ্টনীড়’ ‘ল্যাবরেটরি’ আর ‘রবিবার’ গল্পে।

এই ভদ্রলোককে সারা জীবন নানান বিপর্যয় ও চেক-ব্যালান্সের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে, রবীন্দ্রনাথ হয়ে উঠতে। একটি ঘটনা, জীবনানন্দ দাশকে বোঝেননি এই কথা মানতে চাই না, ইচ্ছেকৃত এই গুরুগিরির জন্য তাকে ক্ষমা করতে পারি না। আরেকটু দীর্ঘায়ু হলে তিনি চলচ্চিত্র মাধ্যমেও হাত পাকাতেন আমি নিশ্চিত। ‘নটীর পুজা’র একটি নমুনা মাঝে মাঝে আন্তর্জালে ঘুরতে দেখি।

জীবন-মরণের সীমানা ছাড়ায়ে তিনি পরানসখা, দাঁড়িয়ে থাকেন বাংলা ভাষার আদিতম মানচিত্রে যেখানে কাঁটাতার নেই। পরানসখা যে মানুষ সম্পর্কের এক অসীম স্পেস, যেখানে জাগতিক হিসেব নেই, এই অনুভূতিও রবীন্দ্রনাথ আমাদের মধ্যে সঞ্চারিত করে। তার গান, আমি জানি, সব যাপনের গ্লানি শুষে নিতে পারে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, তুমি বিনা আমাহেন নাস্তিকের আর ঠাকুর নাই।