সবার জন্য অবারিত

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৬ জুলাই ২০১৯ | ১ শ্রাবণ ১৪২৬

সবার জন্য অবারিত

জাহিদ সোহাগ ২:৩২ অপরাহ্ণ, মে ১০, ২০১৯

print
সবার জন্য অবারিত

আমি ক্লাস নাইনে পড়ি। শহরের একটা বইয়ের দোকান থেকে বাকিতে গীতাঞ্জলি কিনলাম। দোকানদার আব্বার বন্ধু, বললেন, ‘কাকু এই বই কিন্তু পরে ফেরত দিতে পারবা না। বুইঝা নিও।’ আমি নিলাম। তখন জেমস-হাসানের যুগ। বন্ধুরা ওসব নিয়েই মেতে আছে। কদিন পরে কিনলাম রবীন্দ্র সংগীতের ক্যাসেট। দোকানদার আমার দিকে তাকিয়ে বলল পুরনো ক্যাসেট আনার জন্য, সেটাতে তিনি ১০ টাকায় রেকর্ড করে দেবেন। নতুন ক্যাসেটের দাম ৩০ টাকা অহেতুক খরচ করব কেন? আসলে তার স্রোতা পছন্দ হইনি। আমি শুধু রবীন্দ্রসংগীত নয়, তখন ক্ষুব্ধ হয়ে নজরুল সংগীতের ক্যাসেটও কিনলাম। এবং আমাদের বাড়িতে গান শোনার একটা গোপন যন্ত্র ছিল। বাড়ির সবাই ঘুমালে বা কেউ না থাকলে শুনতাম। আর গীতাঞ্জলির ওপর নোট বইয়ের কভার লাগিয়ে পড়তাম। এই গল্পটা এজন্য বললাম, রবীন্দ্রনাথের কাছে পৌঁছুতে আমার অনেক বাধা অতিক্রম করতে হয়েছে। ঢাকায় এসে তরুণ, কিছুটা অগ্রজ কবিদের সঙ্গে মিশে বুঝলাম রবীন্দ্রনাথ মহাপাপ করে ফেলেছেন কবিতা লিখে; তার কিচ্ছু হয়নি। কেউ কেউ সংশয় প্রকাশ করতেন, রবীন্দ্রনাথ টিকবে কি না! সেই সব শেয়ালরা এখন কেথায়?

রবীন্দ্রবিরোধিতার পেছনে পাকিস্তানি ব্যাপার ছিল, স্বাধীনতার পর তাদের বংশবদরা নানা ছুতোয় সেই চর্চা অব্যাহত রেখেছে; তারা রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ভারতীয় আধিপত্যবাদ ও ব্রাহ্মণ্যবাদের সংযোগ ঘটাতে চান। লালন ফকিরকে উপস্থাপন করেন প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে। ফলে ফেসবুকে ‘রবীন্দ্র পতদল চর্চা’ বা ‘রবীন্দ্রনাথের গান হালকা লাগে’ স্ট্যাটাস দেওয়া দু’চারজন পাবেন, যারা ক্ষুব্ধ হয় এই জন্য, রবীন্দ্রনাথ মুসলিমবিদ্বেষী ছিলেন বলে মুসলমানদের নিয়ে, নবী মুহম্মদ (সা.) কিছুই লেখেননি, এবং তারা এবং তাদের গুরু সহযোগে প্রচুর হামদ-নাদ লিখছেন এবং ইসলামিক জীবনযাপন করছেন এমন আশাও আমরা করি না।

সূক্ষ্মভাবে বাঙালি জাতীয়তাবাদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক আছে। বাঙালির মেধা-মনন গড়ে তুলেছেন রবীন্দ্রনাথ। বাঙালির যদি রবীন্দ্রনাথ না থাকত তাহলে আমরা কতখানি কালচারড তা বুঝতে পেতাম। আমাদের জাতীয় জীবনে আমাদের যে চারিত্র্য তা তো আমাদের অসংস্কৃতি হওয়ার ফল।

আরেকটা গল্প বলি। রণজিৎ দাশ ঢাকায় এসেছেন। তার কিছু পাঁড় ভক্ত সন্ধ্যায় সুরাসহযোগে আড্ডা দিচ্ছেন। কথা প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ উঠল, একজন রণজিৎ-ভক্ত বললেন, ‘রবীন্দ্রনাথ পড়া যায় না।’ কেন পড়া যায় না, তার উত্তরে সে যা বলল, তার মধ্যে কয়েকটি ইংরেজি শব্দ, যেমন মডার্নিজম, ল্যাঙ্গুয়েজ এই শব্দগুলো উচ্চারিত হলেও কোনো অর্থ দাঁড়াল না। রণজিৎ দাশ খুব ক্ষুব্ধ হলেন। পরে জেনেছি ওই ব্যক্তির রবীন্দ্রনাথের ভাষা নিয়ে প্রবল আপত্তি আছে; মানে পূর্ববঙ্গে মুসলমানদের মতো ‘করছি’ ‘গেছি’ ‘খাইছি’ লেখেন নাই, তাই রবীন্দ্রনাথ সমগ্র বাঙালির হতে পারে না। এটা শানে নজুল।

এর অনেক দিন পর রণজিৎ দাশের একটি সাক্ষাৎকার নিতে ঢাকা ক্লাবে গিয়েছি। তাকে ওই দিনের ঘটনা মনে করিয়ে দিলাম। তিনি শান্তভাবে বললেন, তার মাথার কাছে সবসময় ‘ছিন্নপত্র’ থাকে; এই বই তিনি শেষ করেন না, বা করতে পারেন না। ভ্রমণের সময়ও এই অভ্যাস বজায় রাখেন। তিনি লাগেজ খুলে ‘ছিন্নপত্র’ দেখালেন।

রবীন্দ্রনাথ এত বিপুল ও বিশাল, খণ্ডিত পাঠের মধ্য দিয়ে তাকে জানা যাবে না। সব কাজের মধ্য দিয়েই রবীন্দ্রনাথের কাছে পৌঁছুতে হবে। রবীন্দ্রনাথ সবার জন্য অবারিত।