চিরায়ত রূপ যেখানে

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২১ মার্চ ২০১৯ | ৬ চৈত্র ১৪২৫

চিরায়ত রূপ যেখানে

সুবিদ সাপেক্ষ ১:৫০ অপরাহ্ণ, মার্চ ১৫, ২০১৯

print
চিরায়ত রূপ যেখানে

উনিশ বছর বয়সী ছোটকাগজ চিহ্নের আয়োজনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ্ কলা ভবন চত্বরে তিন বছর পরপর অনুষ্ঠিত হয় চিহ্নমেলার। এবার ১১ ও ১২ মার্চ ২০১৯ চতুর্থবারের এ আয়েজনের শিরোনাম ছিল ‘চিহ্নমেলা চিরায়তবাঙলা’। এতে দেশ ও দেশের বাইরের দুই শতাধিক বাংলাভাষী লিটলম্যাগ কর্মী-সম্পাদক, লেখক, পাঠকের সম্মিলন ঘটে। মেলার বিশেষত্ব প্রান্তিক দুজন সাহিত্যিককে সৃজনশীল ও মননশীল শাখায় পুরস্কার প্রদান এবং একইসঙ্গে দুই বাংলার আটটি ছোটকাগজকে সম্মাননার স্বীকৃতি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা। সৃজনশীল শাখায় এবার পুরস্কার পেয়েছেন কবি সরকার মাসুদ আর মননশীল শাখায় গদ্যকার হোসেনউদ্দীন হোসেন। বাংলাদেশের পাঁচটি পত্রিকা পেয়েছে সম্মাননা। ঢাকা থেকে ‘অমিত্রাক্ষর’, চট্টগ্রাম থেকে ‘খড়িমাটি’, সিলেট থেকে ‘বুনন’, মাগুরা থেকে ‘বেগবতী’, রাজশাহী থেকে ‘অ্যালবাম’। দেশের বাইরে পশ্চিমবাংলা থেকে তিনটি পত্রিকা যথাক্রমে কলকাতার অলোক বিশ্বাসের ‘কবিতা ক্যাম্পাস’, মেদিনীপুরের ‘এবং সায়ক’ এবং জলপাইগুড়ির ‘এখন বাংলা কবিতার কাগজ’। দুই বংলার এ পত্রিকাগুলো দীর্ঘদিন ধরে লিটলম্যাগ আন্দোলনে আছে বলে মনে করে চিহ্ন।

চিহ্নপুরস্কারে মনোনীত সরকার মাসুদ সৃজনশীলতার জন্য পেয়েছেন পঁচিশ হাজার টাকার চেক, ক্রেস্ট এবং সম্মাননা। একইসঙ্গে মননশীল শাখায় হোসেনউদ্দীন হোসেন সম্মানিত হয়েছেন। চিহ্নের বিবেচনায় দুজনই প্রান্তিক এবং প্রচারবিমুখ সাহিত্যসেবী। দীর্ঘ সময় ধরে তাঁরা সাহিত্যের অঙ্গনে নির্লোভ দায়বোধের কাজ করে চলেছেন। এ চেতনার ভেতরে গড়ে উঠেছে আমাদের সাহিত্যের চিরায়ত অভীপ্সা। মেলার প্রথমদিন ১১ মার্চ ২০১৯ সোমবার সকাল দশটায় শুরু হয় উদ্বোধন ও র‌্যালি। বর্ণাঢ্য এ র‌্যালিতে অংশ নেন পশ্চিমবঙ্গের লেখক দেবেশ রায়, কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হকসহ দেশের নানা পর্যায়ের লেখক ও সাহিত্যিকবৃন্দ। মুখোশ পরে, প্ল্যাকার্ড-ফেস্টুন প্রদর্শন করে পাঁচশতাধিক সাহিত্যপাগল মানুষের এ বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রায় অংশ নেন যা ছিল অনন্য ও চিত্তাকর্ষক।

প্রাসঙ্গিকভাবে এ উৎসবমুখরতায় যুক্ত হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ত্রিশ হাজার তরুণ শিক্ষার্থী ও শিক্ষকবৃন্দ। এরপর বেলা এগারোটায় শুরু হয় হাসান আজিজুল হকের সভাপতিত্বে প্রভাত চৌধুরীর রবীন্দ্র-তর্পণ বিষয়ক আলোচনা। রবীন্দ্রনাথকে এক বিশেষ দৃকপাতে উপস্থাপন করেছেন তিনি। প্রভাত চৌধুরী একাধারে কবি ও কলকাতার ‘কবিতাপাক্ষিকে’র প্রাণপুরুষ। বর্ষীয়ান এ কবি পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রথম বাংলাদেশে এসেছেন। তিনি বলেন, রবীন্দ্রনাথ চিরজীবিত। তিনি সার্বক্ষণিক আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছেন। দীর্র্ঘ এ আলাপচারিতায় রবীন্দ্রচেতনার এক নতুন স্বরূপসন্ধানের কথা তুলে ধরেন তিনি। সকাল সাড়ে এগারোটায় শুরু হয় ‘ডিজিটাল বাংলাদেশে বাঙালি জীবনের সাহিত্য’ বিষয়ক গোলটেবিল আড্ডা। এতে অংশ নেন সনৎকুমার সাহা, মহীবুল আজিজ, কাজল কাপালিক, শোয়েব শাহরিয়ার, প্রবালকুমার বসু, হাসান আজিজুল হক, প্রভাত চৌধুরী প্রমুখ। মনোজ্ঞ এ আড্ডায় মুখরিত হন তার্কিকবৃন্দ। শিল্প-সাহিত্যের নতুনচিন্তা ও প্রবণতা উন্মুক্ত হয় সকলের সম্মুখে।

কলকাতার মোস্তাক আহমেদের সঞ্চালনায় পরের অনুষ্ঠান শুরু হয় বেলা সাড়ে বারোটায়। এরপর বর্ণালী রায়ের সঞ্চালনায় ‘ছোট প্রকাশনা : সম্ভাবনা ও সমস্যা’ শীর্ষক আলোচনানুষ্ঠান চলে। কথা বলেন : রাখাল রাহা, মনিরুল মনির, মনজুর রহমান, অলোক বিশ্বাস, কাজী মামুন হায়দার। এরপর কবিতাপাঠের আসর। পরে বিকেল তিনটায় চিহ্ন-প্রকাশিত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চা গ্রন্থটির ‘পাঠ-উন্মোচন’ অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান ছিলেন নাট্যকার মলয় ভৌমিক। আলোচনা করেন পি.এম.সফিকুল ইসলাম, সুজিত সরকার, আযাদ কালাম, তারিক উল ইসলাম ও জামিল রায়হান।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘ সংস্কৃতিচর্চার ইতিহাস এতে নির্ণীত হওয়ার প্রয়াস পেয়েছে। আলোচনায় উঠে এসেছে নানা প্রশ্ন ও জিজ্ঞাসা। বিকেল চারটায় অধ্যাপক তারেক রেজার সঞ্চালনায় ‘কবির প্যাথোস ও আজকের কবিতা’ শিরোনামে এক দারুণ আড্ডা জমে ওঠে। এতে ছিলেন শোয়েব শাহরিয়ার, সরকার মাসুদ, কুমার দীপ, বদরুল হায়দার, সৈকত হাবীব, ও মহীবুল আজিজ। কবিতা ও প্যাথোস, করণকৌশল, সাম্প্রতিক কবিতার তাৎপর্যপূর্ণ এ আলোচনায় বাংলা কবিতার স্বরূপ ও স্বার্থ চিহ্নিত করে। প্রায় একঘণ্টার এ আলোচনায় উঠে আসে কবি ও কবিদের নানা প্রসঙ্গ। বিকেল পাঁচটায় হাসান আজিজুল হকের সভাপতিত্বে শুরু হয় কথাশিল্পী দেবেশ রায়ের বক্তৃতা।
বিষয় : ‘সাহিত্যপাঠের সমাজতত্ত্ব ও ছোট পত্র-পত্রিকা’। এ এক দারুণ উপস্থাপনা। লিটলম্যাগের সংজ্ঞা যেমন এতে নির্ণীত হয় তেমনি সাহিত্যের সমাজজিজ্ঞাসারও স্বরূপ উন্মোচিত হয়ে ওঠে। একক বক্তৃতাটিতে অনেক নতুন বিষয় অবমুক্ত হয়। পত্র-পত্রিকার কাজ ও লেখক, সমাজজিজ্ঞাসা ও লেখকের ভাষা সেখানে বঙ্কিমচন্দ্র থেকে আজকের হাসান আজিজুল হক পর্যন্ত আলোচনার বিস্তৃতি ঘটে। দারুণ উচ্চারণে দেবেশ রায় মাতিয়ে তোলেন সবদিক। কোনো দুর্বোধ্যতা থাকে না সমাজতত্ত্বেও আলোচনায়।

‘বিবর্তনের আলোয় সংগ্রহের ইতিহাস-১’ শীর্ষক একটি বিশেষ প্রদর্শনী বিকেল সাড়ে পাঁচটায় অনুষ্ঠিত হয়। গোপাল বিশ্বাস ও উজ্জ্বল সরদার ছাড়াও চন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় এতে অংশ নেন। এটি চিহ্নমেলার সবচেয়ে আকর্ষক বস্তুতে পরিণত হয় দর্শকদের কাছে। কলকাতা কথকতার সংগঠকগণ দারুণ উপস্থাপনের মাধ্যমে এটির ইতিহাস, তাৎপর্য তুলে ধরেন। সন্ধ্যে সাড়ে ছয়টায় হয় বিশিষ্ট কবিদের কবিতা পাঠ চলে। অতঃপর সারাদিনের অনুষ্ঠানটি একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ভেতর দিয়ে শেষ হয়।

পরের দিন ১২ মার্চ ২০১৯ মঙ্গলবার শুরু হয় কবিতা-পাঠের ভেতর দিয়ে। সাড়ে দশটার প্রসঙ্গ সাহিত্য ও বিজ্ঞান নিয়ে আলোচনার শিরোনাম : ‘সাহিত্য ও বিজ্ঞান : দোঁহে অভেদ’। নাজমুল হাসান পলকের উপস্থাপনায় প্র্রফেসর বিধানচন্দ্র দাসের প্রবন্ধকে সূত্র করে কথা বলেন, ইমেরিটাস অধ্যাপক অরুণকুমার বসাক, অধ্যাপক মুহম্মদ নূরুল্লাহ্, অধ্যাপক গোলাম সাব্বির সাত্তার। বেলা এগারোটায় শুরু হয় ‘এই যে আমি চলেছি’ শিরোনামে প্রবালকুমার বসুর সঙ্গে কিছুক্ষণের আড্ডা। বারোটার বিষয় ‘গল্পের দোয়েল ফড়িং ও বৈদ্যুতিন মানুষ’।

সালমা বাণী ও মোজাফফর হোসেনের সঞ্চালনায় কথা বলেন মহীবুল আজিজ, ইমতিয়ার শামীম, সরকার মাসুদ, মাসুদুল হক, শেখ নাজমুল হাছান, মাসুদুল হক এবং রাজা শহীদুল আসলাম। বিকেল তিনটার আলোচ্য হয়ে ওঠে ‘এ পর্যন্ত লিটলম্যাগ : বয়ে চলা স্বপ্ন’। সঞ্চালক : শামীম নওরোজ ও রণক রফিক। অংশ নেন : দেবাশীস চক্রবর্তী, অমলেন্দু বিশ্বাস, সরোজ দেব, অতনু বন্দ্যোপাধ্যায় ও শ্যামল জানা।

বিকেল চারটায় বসন্তের কবিতা পড়ে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগঠন ‘স্বনন’। বিকেল পাঁচটায় বিশেষ প্রদর্শনী ‘বিবর্তনের আলোয় সংগ্রহের ইতিহাস-২’। চন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের সঞ্চালনায়, বক্তা ছিলেন : ফাল্গুনী দত্ত রায় ও সৌভিক মুখোপাধ্যায়। পরে সাতটায় ক্রেস্ট প্রদান ও কলকাতার গানের দল ‘মনভাষা’ পরিবেশিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দুইদিনের চিহ্নমেলা চিরায়তবাঙলা ২০১৯র অনুষ্ঠান শেষ হয়। পড়ে থাকে পেছনের স্মৃতি। অনেক অভিজ্ঞতা। দুই বাংলার মানুষের সৃষ্টিশীল চেতনার স্বাক্ষর হয় চিহ্নমেলা।

চিহ্ন বিশ্বাস করে, এই বিপুলায়োজনে সকলের হার্দিক-প্রাণনা অনেকদিন পরস্পরকে বয়ে নিয়ে চলুক।