বিশ্বস্তা ষাঁড়টি

ঢাকা, শনিবার, ২৫ মে ২০১৯ | ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

আর্নেস্ট হেমিংওয়ে

বিশ্বস্তা ষাঁড়টি

ভাষান্তর : মিলন আশরাফ ১:১২ অপরাহ্ণ, মার্চ ১৫, ২০১৯

print
বিশ্বস্তা ষাঁড়টি

কোনো এক সময়ে একটি ষাঁড় ছিল, তবে অবশ্যই তার নাম ফার্দিনান্দ নয়। ফুলকে সে তোয়াক্কা করত না। সে পছন্দ করত লড়াই করতে। সমবয়সী তো বটেই, এমনকি যে কোনো বয়সের ষাঁড়ের সঙ্গেই লড়াইয়ে লিপ্ত হতো। ষাঁড়টি ছিল লড়াইয়ে সবার সেরা। কাঠের মতো শক্ত ছিল তার শিং। ধারালো ছিল শজারুর কাঁটার মতো। অন্যরা তাকে বিশ্রিভাবে আঘাত করলেও সে তেমন পাত্তা দিত না। ষাঁড়টা যখন লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হতো তখন তার ঘাড়ের মাংসপেশি ফুলেফেঁপে পিণ্ডের আকার ধারণ করত, এটাকে স্প্যানিশ ভাষায় বলা হয় ‘মরিল্লো।’ মরিল্লো দেখতে কিছুটা পর্বতের মতো। সবসময় লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত থাকত সে।

তার গায়ের রং ছিল চকচকে কালো। চোখ ছিল জ্বলজ্বলে। যে কোনো কিছুর জন্যই সে লড়াই করতে প্রস্তুত থাকত। লড়াইটা সে খুব ভয়ঙ্করভাবে করত, ঠিক যেন কোনো মানুষ কিছু খাচ্ছে অথবা পড়ছে কিংবা গির্জায় যাচ্ছে। প্রত্যেক সময়ে সে মরণপণ লড়াই করত কিন্তু অন্যান্য ষাঁড়রা তাকে ভয় পেত না, কারণ তারা ভালো ও ঠাণ্ডা রক্ত হতে সৃষ্ট, সে জন্য তারা ভীত ছিল না। তাকে রাগানোরও কোনো ইচ্ছে ছিল না তাদের। এমনকি লড়াই করারও। সে না ছিল উৎপীড়নকারী, না দুর্বৃত্ত। কিন্তু সে লড়াই করতে পছন্দ করত ঠিক যেমন মানুষরা গান গাইতে কিংবা রাজা অথবা প্রেসিডেন্ট হতে চায়। সে কখনই এত কিছু ভাবত না। লড়াই ছিল তার কাছে আনন্দ ও দায়িত্ব পালনের মতো।

সে লড়াই করত উঁচু কাঁকরের ভেতর কিংবা ওক গাছের নিচে অথবা নদীর ধারে তৃণক্ষেতে। প্রতিদিন সে ১৫ মাইল হেঁটে নদীর ওপরে উঁচু পাথুরে জমিতে যেত এবং কোনো ষাঁড় তার দিকে তাকালে তৎক্ষণাৎ লড়াই বাঁধাতো। সে কখনো রাগান্বিত ছিল না, এমনটি সত্য নয়। সে ভেতরে ভেতরে ক্রুদ্ধ ছিল। কিন্তু সে জানতো না, কেন এমন করত সে? হতে পারে সে যে কোনো বিষয়ে ওত ভাবতো না। সে ছিল উদার ও পছন্দ করত লড়াই করতে। অতঃপর কী হয়েছিল তার? যে ব্যক্তি তার মালিক হতো প্রথমে তিনি খুশিই হতেন এই ভেবে, কী সুন্দর ষাঁড় তিনি পেয়েছেন। কিন্তু অল্পদিনে তার ভুল ভাঙতো।

লড়াইয়ে ষাঁড়টি অনেক অর্থ খসিয়ে দিত তার। প্রত্যেক ষাঁড়ের পেছনে খরচ হতো একশ ডলারের মতো। মাঝে মাঝে বড় বড় লড়াইয়ে খরচ চলে যেত প্রায় দুইশ ডলার। সুতরাং মানুষটি অর্থাৎ যে কি না, ভালো মানুষ হিসেবে পরিচিত তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন ষাঁড়টির রক্ত তার স্টকে রেখে দেবেন অথবা তাকে হত্যা করার জন্য রিং পরাবেন। তিনি ষাঁড়টির রক্তপাতের জন্য নির্বাচিত করলেন। কিন্তু ষাঁড়টি ছিল খুব অদ্ভুত। যখন তাকে রক্তপাত ঘটানোর জন্য তৃণক্ষেতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল তখন সে ওখানে একটা তরুণী সুন্দরী ষাঁড়কে দেখতে পেল। তরুণী ষাঁড়টি ছিল খুব স্লিম ও সুন্দর মাসলের অধিকারিণী।

অন্যদের তুলনায় উজ্জ্বল ও সুন্দরী। সুতরাং সে তার সঙ্গে লড়াই করল না। বরংচ তার প্রেমে পড়ে গেল। এমনকি তার সব মনোযোগ অন্যান্য ষাঁড়দের থেকে ঘুরিয়ে শুধু তার দিকে নিল। সে শুধু তার সঙ্গ চাইছিল। অন্যরা সেই মুহূর্তে তার কাছে গুরুত্বহীন। খামারের মালিক সেই মুহূর্তে ভাবলেন, ষাঁড়টি বুঝি শিক্ষা পেয়ে বদলে গেছে। কিন্তু তার ধারণা ভুল। ষাঁড়টি একই ছিল। সে শুধু সুন্দরী তরুণী ষাঁড়টির ক্ষেত্রে এমন আচরণ করছিল, বাকিগুলোর সঙ্গে আগের মতোই। অবশেষে লোকটি অন্যান্য আরও পাঁচটি ষাঁড়ের সঙ্গে রিংয়ের ভেতর নিয়ে এলেন লড়াইয়ের জন্য।

ষাঁড়টি তখনো পর্যন্ত লড়াইয়ের জন্য ছিল বিশ্বস্থা। ষাঁড়টি চমৎকার লড়াই করছিল, সবাই তার প্রশংসায় মশগুল এমনকি যে তাকে হত্যার জন্য নিয়ে এসেছে সেও। লড়াইয়ের শেষে ঘাতকের জ্যাকেট ভিজে উঠল। কণ্ঠ গেল শুকিয়ে। ঘাতক স্প্যানিশ ভাষায় বলল, ‘কুই টরোমাস ব্রাভো’ বলেই তলোয়ারটি ক্রীড়া শিক্ষকের কাছ থেকে নিজের হস্তগত করলেন। ছোরাটা সোজা বসিয়ে দিলেন সাহসী ষাঁড়ের বুক বরাবর। ধারালো ব্লেডে রক্তে ভরে উঠল। গলার রিং ধরে চারটি ঘোড়া দিয়ে টেনে আনলেন। ক্রীড়া শিক্ষক সবকিছুই জানতেন। তিনি বললেন, ‘ষাঁড়টি ছিল ভিল্লামেয়রের মার্কুইস, তাকেও শেষ পর্যন্ত পরাজিত হতে হলো, কারণ সে ছিল বিশ্বস্তা।’ ঘাতক বলল, ‘সম্ভবত আমাদের সবাইকে বিশ্বস্তা হওয়া উচিত’।