মৃণালের খণ্ডহর

ঢাকা, সোমবার, ২২ এপ্রিল ২০১৯ | ৮ বৈশাখ ১৪২৬

মৃণালের খণ্ডহর

হামিদ কায়সার ১:৩৫ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ০৮, ২০১৯

print
মৃণালের খণ্ডহর

সম্প্রতি প্রয়াত মৃণাল সেনের মৃত্যু সংবাদ শুনে আপনার হয়তো ভুবন সোমের কথাই প্রথম মাথায় এসেছিল। অন্য কারোর হয়তো মনে পড়বে একদিন প্রতিদিন অথবা খারিজ, নতুবা মৃগয়া বা জেনেসিসসহ অন্য যা কিছু মৃণালমুভি। তবে আমার মনে পড়ল খণ্ডহর। কেননা খণ্ডহর আমার প্রথম মৃণাল সেন অভিজ্ঞতা। ছবিটি নির্মিত হয় ১৯৮৪ সালে। আর আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই ১৯৮৫-তে। জড়িয়ে পড়ছি ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে, সাংস্কৃতিক নানা কর্মকাণ্ডে।

ধানমন্ডিস্থ ভারতীয় সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে আজ যদি তরুণ মজুমদারের গণদেবতা তো কাল গ্যোটে ইনস্টিটিউটে গোর্কির মাদার অথবা পাবলিক লাইব্রেরিতে ফেলেনি বা গোদার। নাভিশ্বাসে ছুটে যাই। তখন আলমগীর কবির-তানভীর মোকাম্মেল-মোরশেদুল ইসলাম-তারেক মাসুদ-জুনায়েদ হালিম-জাহেদুর রহিম অঞ্জন-তারেক শাহরিয়ার-মানজারে হাসিন মুরাদ-জাকির হোসেন রাজু প্রমুখ পরিবেষ্টিত বিকল্পধারার চলচ্চিত্র আন্দোলন উত্তুঙ্গ পর্যায়ে। কোথাও না কোথাও প্রতিদিনই ভালো ছবি দেখানোর ব্যবস্থা হচ্ছে। সেই সুযোগে আমাদের মতো তরুণ চলচ্চিত্র প্রেমিকরা দেখে নিচ্ছি দুর্লভ যত শিল্পবৈভব সিনেমা।

তখন তো একসঙ্গে মৃণালের অনেক সিনেমাই দেখেছিলাম। খণ্ডহর, জেনেসিস, একদিন প্রতিদিন, বাইশে শ্রাবণ, নীল আকাশের নিচে, কলকাতা একাত্তর, ভুবন সোম, আকালের সন্ধানেসহ আরও কী কী। সব ছাপিয়ে খণ্ডহরেই আমার মুগ্ধতা এত প্রবল কেন? বোধহয় খণ্ডহর দেখার জন্য আমি মানসিকভাবে আগেই তৈরি হয়েছিলাম। আমার শৈশবই আমাকে দিয়েছিল খণ্ডহর দেখে মুগ্ধ হওয়ার প্ল্যাটফর্ম।

খণ্ডহরে যে পড়ো ভাঙা জীর্ণশীর্ণ ধংসোন্মুখ জমিদারবাড়িতে যামিনী ওর অসুস্থ অন্ধ মাকে নিয়ে থাকে, সে বাড়িটাকে আমি জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই চিনতাম, হাঁটতে শেখার পর থেকেই জানতাম। কীভাবে? অবিকল সে রকমই এক জমিদারবাড়ি রয়েছে আমার শৈশবের লীলাভূমি কাশিমপুরে, সেই একই পিরিয়ডে নির্মিত।
আমার বাড়ি থেকে এক মাইল দূরে কাশিমপুর গেলে অনিবার্যভাবেই সে বাড়িটা আমার মুখোমুখি দাঁড়াত। আমি অশ্বক্ষুরের শব্দ শুনতে পেতাম, কোনো বাঈজীর ঘুঙুরের রিনিঝিনিও। বিশাল দুটি ঝাউগাছ, পেছনে নদী, সামনে ফুটবল খেলার মাঠ নিয়ে সে সত্যিই একটু অন্যরকম, আলাদা। গেট পেরিয়ে জমিদারবাড়ির ভেতরে ঢুকলেই দেখো ভাঙা প্রাসাদ, পড়ো ঘর, কাঠের সিঁড়ি, দেয়ালে শিশু বটবৃক্ষ। সবমিলিয়ে একটা রোমাঞ্চকর আবহ।

বিশাল সেই ভগ্ন-প্রাসাদের কুঠুরিতে বাস করত নানা পরিবার। বলার অপেক্ষা রাখে না, তাদের অনেকেই ছিন্নমূল। কিন্তু ততটা দারিদ্র্যের দৈন্য তারা যেন চেহারায় রাখতে চাইতেন না। বরঞ্চ ঘষেমেজে নিজেদের নিম্ন-মধ্যবিত্ত পর্যায়ে রাখার একটা প্রচেষ্টা তাদের ছিল। আমি মাঝে মধ্যেই সে বাড়ির ভেতর অনাহুত ঢুকে বিস্মিত হয়ে সেসব মানুষকে দেখতাম। যামিনীর মতো অনেক নারীকেও দেখেছি। যৌবন উদ্ভাসিত কিন্তু দারিদ্র্যে বিষণ্ণ কাতরা।

সেসব নারী-পুরুষকে ঘিরে আমার মনের ভেতর কৌতূহল গুমরে মরত, কিন্তু আমি সীমানার দেয়াল ভেদ করে তাদের অন্তর্জগতে পৌঁছাতে পারিনি কখনো। খণ্ডহর যেন আমাকে সেই মানুষদের অন্তর্জগত দেখার সুযোগ করে দিল। তা ছাড়া, তত দিনে তেলেনাপোতা আবিষ্কার গল্পটাও আমার পড়া হয়ে গেছে। জেনে ফেলেছি প্রেমেন্দ্র মিত্রকেও অনেকটাই। কার চুল এলোমেলো কীবা তাতে এসে গেল। কার চোখে কত জল কেবা তা মাপে।

খণ্ডহরে মুগ্ধ হওয়ার আরও একটি কারণ হতে পারে। সত্যজিতের অরণ্যের দিনরাত্রির মতো এটিও বিশুদ্ধ বেড়ানোর গল্প। ফটোগ্রাফার সুভাষ ওর আরেক বন্ধুকে নিয়ে দিপুর সঙ্গে ওদের গ্রামে বেড়াতে এসেছে। ওদের থাকতে হবে এই ভাঙা রাজপ্রাসাদে। আর ওরা এখানে যে রাতে এলো সে রাতেই, বন্ধু দুজন ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়লেও কী এক অজানা রহস্যের সন্ধানে ভাঙা প্রাসাদে টর্চ হাতে নিয়ে ঘুরতে বেড়ায় সুভাষ। ওর টর্চের আলোর ফোকাসে ধরা পড়ে এক নারীমুখ। মুখটি করিডোর থেকে লুকিয়ে যায়। এত রাতে ভগ্ন প্রাসাদে এ নারী কীভাবে এলো, একটা চিন্তার জাল তো ওর মস্তিষ্কের কোষে হাতড়ে বেড়াবেই।

এদিকে এই ভগ্নপ্রাসাদে দিপুর সঙ্গে শহর থেকে ওর দুই বন্ধু আসার সংবাদ পেয়ে একটি জীর্ণ কক্ষের দুই নারীর মনেও বিপুল আলোড়ন খেলা করে। যামিনী আর ওর অসুস্থ অন্ধ মা। মা জানতে চায় দিপুর সঙ্গে নিরঞ্জন এসেছে কি না। নিরঞ্জন যামিনীর পানিপ্রার্থী। দুই বছর আগে বলে গেছে ও ফিরে এসে যামিনীকে বিয়ে করবে। এটা যে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি যামিনী বুঝলেও মাকে বলতে পারে না। এবারো মাকে বলতে পারল না যে দিপুর সঙ্গে নিরঞ্জন আসেনি। তারপর এলো সেই হিমশীতল মুহূর্ত। সেই বন্ধু মানে সুভাষকে নিয়ে অন্ধ মায়ের সামনে এসেছে দিপু। সুভাষ বলতে পারল না যে সে নিরঞ্জন নয়, যামিনী বলতে পারল না যে এ নিরঞ্জন নয়, দিপুও নিশ্চুপ। কী অসহ্য এক পিনপতন নিস্তব্ধতা! আপনি দর্শক, আপনারও শ্বাস পড়তে চাইছে না। জীবন কী নির্মম! জীবনে কত পরিহাস! মৃণাল সেন যে এমন একটা হিমশীতল নৈশব্দতার ভেতরে আপনাকে আনতে পারল, এটাই তার ক্ষমতা।

যামিনীর সঙ্গে তুলনা করব না। কারণ ও ইন্টিলিজেন্ট, সমঝদার, সেনসেটিভ, সিভিলাইজড। কিন্তু যামিনীর মতো নৈঃসংগতাড়িত অনেককেই আমি দেখেছি, আমাদের সেই ভগ্ন জীর্ণ কাশিমপুর জমিদারবাড়িতে। তারা একজন নয়, অনেক। তাদের সম্পর্কে এখানে বলে লাভ কী?