সময়ের চর্চিত চিহ্ন

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৯ মার্চ ২০১৯ | ৫ চৈত্র ১৪২৫

সময়ের চর্চিত চিহ্ন

আদিত্য মুফিজ ১১:৪৪ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ১১, ২০১৯

print
সময়ের চর্চিত চিহ্ন

বাংলাদেশে লিটলম্যাগ চর্চার ধারা সমুন্নত রাখা দুরুহ। নানারকম সংকট-সংকীর্ণতাযুক্ত। এ সংকট-সংকীর্ণতা উত্তরণে কেউ কেউ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। হাতেগোনা কয়েকটি লিটলম্যাগ ‘লিটলম্যাগ চর্চার ধর্ম’ বহন করে যাচ্ছে। বাকিগুলো এক ধরনের সাহিত্য পত্রিকা বলা যায়। তেমনি একটি সাহিত্য পত্রিকা ‘বাংলানামা’। এ মাসেই বেরিয়েছে। এটি বাংলানামার তৃতীয় বর্ষের প্রথম সংখ্যা। বিশেষ একটা থিম নিয়ে আমাদের সামনে বাংলানামা হাজির করেছেন সম্পাদক হোসেন শহীদ মজনু। যে থিম বা ক্যাটাগরি বাংলা সাহিত্যে খুব বেশি চর্চিত নয়। এমনকি এক ধরনের কুৎসা নিয়ে খুবই ক্ষুদ্রায়িতভাবে বাংলা সাহিত্যে এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলা সাহিত্যের নবীণ এ ধারাটির নাম ‘অণুগল্প’। যদিও একবারে নবীণও নয়, কারণ বনফুল শুরু করার পর অনেকেই লেখার চেষ্টা করেছেন কিন্তু ঐ যে কুৎসার ভেতর দিয়ে যেতে যেতে দিন দিন ‘অণুগল্প’ পিছিয়ে পড়েছে। আমাদের অগ্রজরা খুবই সচেতনভাবে এড়িয়ে গেছেন বিষয়টা। কিন্তু তরুণদের মাঝে অণুগল্প লেখার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সেটা হয়তো সময়ের চাহিদার কারণে তরুণরা অণুগল্পে ঝুঁকছেন।

বাংলানামার সম্পাদককে বিশেষ কৃতিত্ব দিতেই হয়, এরকম একটা অস্বীকৃত বিষয় নিয়ে কাজ করার জন্য। সংখ্যাটিতে উনিশটি অণুগল্পের পাশাপাশি রয়েছে লিটলম্যাগ ‘অমিত্রাক্ষর’ সম্পাদক আমিনুর রহমান সুলতানের সাক্ষাৎকার, আলোকচিত্রের ভাষা নিয়ে একটি প্রবন্ধ, এগারোটি কবিতা, একটি রম্যগল্প, তিনটি বড়গল্প এবং একটি চিত্রনাট্য।

অণুগল্প নিয়ে আমার আগ্রহ অনেক, মূলত বিষয়টা বোঝার জন্য। বাংলা ভাষায় কেমন বা কি রকম অণুগল্প চর্চিত হচ্ছে তা জানার জন্য। তাই হাতে পেয়ে খুবই উৎসাহ নিয়ে পড়া শুরু করি ‘বাংলানামা’। শুরুতেই ধকল। আবু হেনা মোস্তফা এনামের ‘পাজুতো’ শেষ করে টের পেলাম এ অণুগল্পের ঘটনাচিত্র কখনই ভুলব না। যেমন একটা লাইন এরকম ‘ঘামের ভেতর ধানের গন্ধ, আর উঠোনে ধূলির মিছিল যেন সূর্যের জোৎস্না।’ নিঃসন্দেহে ‘পাজুতো’ একটি যুতসই অণুগল্প।

কবীর আলমগীরের শিরোনামের সাথে গল্পের মেজাজ, ফ্লট মিল পাইনি। পুরো গল্পটাই একজন কথক বলে যাচ্ছিলেন, যে বস্তুত মৃত। কিন্তু শিরোনাম ‘রেল লাইনে বেওয়ারিশ মানুষটা’!

দেবদুলাল মুন্নার অণুগল্পটিও একটি লাশের বয়ানে বলা। এদিক দিয়ে তার শিরোনাম ‘মৃত্যুর গান’ সার্থক মনে হয়েছে। তারেক খানের ‘উপহার’ পড়ে মনে হলো তিনি একটি অনুবাদ গল্পের সারাংশ তুলে দিয়েছেন। মনোজ দের ‘খোলামকুচি’ আমার ধারণায় অণুগল্প বলা যেতে পারে। তবে পরিপূর্ণ মনে হয়নি। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল ছোটগল্প পড়ে যাচ্ছি কি না। মনোজ দের অণুগল্পটি দুর্বল করে দিয়েছে ঘটনার সমাপ্তির কারণে। ধস করে চিন্তার জায়গাটা নিচে নামিয়ে নিতে পারিনি। শফিক হাসানের একগুচ্ছ অণুগল্প দেয়া আছে এখানে। কোনোটাকেই চিন্তাশীল মনে হয়নি। ‘রসঅণু’ বললে মনে হয় না খুব ভুল হবে না। পত্রিকার সম্পাদক হোসেন শহীদ মজনুর ‘তাণ্ডব’ নামে অণুগল্প রয়েছে। গতানুগতিক ছোটগল্পের আদলে লেখা ‘তাণ্ডব’। তবে গল্পের শুরুর একটা প্রশ্ন আমাকে ভাবিয়েছে। প্রশ্নটা এমন, ‘আচ্ছা বড়রা কি কবরকে ভয় পায়?’ আর বাকি অণুগল্পগুলো গড়পড়তাই মনে হলো। দেখার খুব একটা ফিকশন কারো মাঝে পাইনি।

আমিনুর রহমান সুলতানের সাক্ষাৎকারটি আরো বিস্তৃত হতে পারত। লিটলম্যাগের নানা সংকট-সম্ভাবনা নিয়ে তার সাথে কথা বলেছেন নিপা জাহান। সাক্ষাৎ গ্রহণকারী নিপা জাহানের কোথায় যেন সংকট ছিল। সাক্ষাৎকারটা আলাপ মনে হয়নি। প্রস্তুত করা লিখিত প্রশ্ন মনে হয়েছে।

পত্রিকায় একটি মাত্র প্রবন্ধ রয়েছে। ‘আলোকচিত্রের ভাষা, রেপ্রেজেন্টেশন ও দেখা’ শিরোনামে লিখেছেন মুহাম্মদ মোজাম্মেল হক। বিষয় বৈচিত্র্যের কারণে খুব আগ্রহ নিয়েই পড়েছিলাম। কিন্তু হতাশ বনে গেলাম। প্রবন্ধটি তথ্যনির্ভর, ফিচারাইজ। নিজস্ব উপলব্ধি, বিশ্লেষণ, ভাষার গতিপথ সবকিছুই অনুপস্থিত। মাঝারি আকারের এ প্রবন্ধে সাঁইত্রিশটি তথ্যসূত্র দেওয়া হয়েছে! তবে প্রবন্ধের শেষাংশে ‘আলোকচিত্র পাঠ, বিশ্লেষণ ও রসাস্বাদন’ অধ্যায়ে যুক্তি-তক্কের আরও সুযোগ ছিল।

বাংলানামার শেষে রয়েছে ড. কাজল রশীদ শাহীনের ‘অপ্রকাশিত চিত্রনাট্য’ একবার বিদায় দে মা। বিপ্লবী ক্ষুদিরামের ব্যক্তিজীবনের ঘটনাবলি নিয়ে চিত্রনাট্যটি। ইতিহাসকেন্দ্রিক রচনার কারণে তেমন কিছু বলার থাকে না। কারণ ঘটনাগুলো পূর্বঘটিত। তাই সিনেমায় চিত্রায়নের আগে চিত্রনাট্য সম্পর্কে বলা কঠিন। সর্বোপরি বাংলানামার আয়োজন ছিল সংগ্রহে রাখার মতো, এর মূল কারণ ‘অণুগল্প’।

সম্পাদককে সম্পাদনার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার দরকার ছিল। অতিরিক্ত বানান বিভ্রাট পাঠকের জন্য বিরক্তিকর কারণ হয়ে দাঁড়াবে। মেকাপে আরও মনোযোগী হতে পারতেন। সংগৃহীত অলংকরণ শিল্পসৌন্দর্যে ব্যাঘাত ঘটিয়েছে। প্রচ্ছদ করেছেন, মাহী মজুমদার। অলংকরণে, আবু হেনা মোস্তফা এনাম। ১৬৪ পৃষ্ঠার পত্রিকাটির কোনো বিনিময় মূল্য কিংবা উৎপাদন মূল্য নেই। সব শেষে সফলতা কামনা করি শ্রমসাধ্য ‘বাংলানামা’র।