ঘোড়া

ঢাকা, বুধবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৮ | ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৫

ঘোড়া

কবীর রানা ১১:২৮ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ৩০, ২০১৮

print
ঘোড়া

আমার চাবুকের সাধনা ছিল, ফাঁদের সাধনা ছিল, কারণ আমার গৃহে ঘোড়া আসুক এই সাধনা ছিল, একটা চাবুক আসুক এই সাধনা ছিল। চাবুক সাধনার সফলুায়, ফাঁধ সাধনার সফলুায় ঘোড়া আসে দূরের বন থেকে, চাঁদ আসে দূরের আকাশ থেকে। ছাবুক সাধনায় জানা হয় আমার ভেতরে ছোট একটা ঘোড়া আছে ; ফাঁদ সাধনায় জানা হয় আমার ভেতরে ছোট একটা চাঁদ আছে।

দেশের আয়তনের তুলনায় বন অপ্রতুল হয়ে গেলে, পশু-পাখি অপ্রতুল হয়ে গেলে নানাজন বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কমিটি তৈরি করে। পরিবেশবাদী নানা চিন্তা তৈরি হয়। তৈরি হয় পরিবেশবাদী নানা সংগঠন। আমি উদ্ভিদবিদ্যা কিংবা প্রাণীবিদ্যা কিংবা বনবিদ্যা নিয়ে কখনো পড়াশোনা করিনি। দর্শনবিদ্যা ছিল আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্য বিষয়। তবুও আমার ভেতর এই কাজ করে যে বন ও বন্যপ্রাণী টিকে থাকুক। আমার মনে এই ভাবনা আসে যে গৃহ ও গৃহের প্রাণী টিকে থাকার জন্য বন ও বন্যপ্রাণীর টিকে থাকার দরকার। আরো মনে হয় বন ও বন্যপ্রাণী থেকেই তো গৃহ ও গৃহপ্রাণীর আগমন। আমার সঙ্গে আরো কারো কারো চিন্তা ও ইচ্ছা মিলে গেলে একটা পরিবেশ বাদী সংগঠনের জন্ম হয়। নাম হয় তার ‘হরিণগাছী বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কমিটি’। এই কথা এখানে পৃথিবী সৃষ্টির মতো গুরুত্বপূর্ণ, হরিণগাছী নামে আমার এক জন্মগ্রাম ছিল, যে গ্রাম যমুনার ভাঙনে হারিয়ে গেছে। আমার ভেতরে সে গ্রাম সংরক্ষণের যে আকাক্সক্ষা ছিল তাকে এই নামের ভেতর দিয়ে ধারণ করতে চাচ্ছিলাম, বাঁচতে চাচ্ছিলাম। এই গ্রাম হারিয়ে গেলে কত কিছু যে হারায়। নুন স্থলভূমির সন্ধানে এ গ্রামের মানুষেরা, পশুরা নানান দিকে সাঁতার দেয়। সকল কিছু সাঁতরাতে না পারলে, উড়তে না পারলে তারা জলজ সমাধি মেনে নেয়। আমারো সাঁতার ছিল বাঁচার জন্য, পলায়নের জন্য। সাঁতরে সাঁতরে স্থলভূমি পেলে জলের দিকে তাকিয়ে ভেবেছি জলের ক্ষমতা।

বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কমিটি তৈরি হয়ে গেলে আমাদের কাজ শুরু হয়ে যায়। কাজ দেখানোর জন্য আমরা একটা ভালো ক্যামেরা কিনি সে সকল কাজের ছবি তোলার জন্য। ফেসবুক পেজ খুলি, ওয়েবপেজ খুলি। পত্রিকাওয়ালাদের সাথে যোগাযোগ করি আমাদের কার্যক্রম প্রচার করার জন্য।

আমাদের এই অঞ্চলে দীর্ঘদিন শকুন দেখতে না পেলে আমরা ভাবি শকুন তাহলে বিলুপ্তপ্রায় প্রাণী। আমরা স্মরণ করি আমাদের বিলুপ্ত গ্রাম হরিণগাছীতে আমাদের শৈশবের কথা। আমাদের শৈশবে গরু মরলে কীভাবে ঝাঁকে ঝাঁকে শকুন নেমে আসতো আকাশ থেকে। শকুনের চেয়ে বড় পাখি আমরা কখনো দেখিনি। বড় বিষয়ের বিস্ময় আমরা দেখেছি শকুনের ভেতর। যে সকল শকুন আমাদের বিলুপ্ত গ্রামের আকাশে উড়লে আমাদের বিলুপ্ত আকাশকে বড় মনে হতো, আমাদের বিলুপ্ত মাঠে নামলে আমাদের মাঠকে বড় মনে হতো। সে সকল শকুনের প্রেমে পড়া কি যে ভালো ছিল।

তাদের আমাদের বিলুপ্ত গ্রামের আত্মীয় অতিথি মনে হতো। যারা গ্রামের গরু মরলে আমাদের গ্রামে গরু খেতে আসতো। আমরা দূরে দাঁড়িয়ে থেকে সেই সকল শকুনের আহার দেখণাম। বড়রা, যারা তাদের শৈশবে আরো বড় বড় শকুন, বড় বড় আকাশ দেখেছিল, সে সকল বড় বড় শকুন ও সে সকল বড় বড় আকাশের গল্প বলতো। রাতে ঘুমের দিকে আমাদের যাত্রা শুরু হতো শকুনের পিঠে চড়ে। তখন সিন্দাবাদের কথা মনে আসে। সিন্দাবাদ একবার অথবা অনেকবার শকুনের পিঠে চড়ে পার হয়েছিল এক সমুদ্র অথবা অনেক সমুদ্র; দেখেছিল এক পাহাড়ের চূড়া, অনেক পাহাড়ের চূড়া। এখন আমাদের মনে হয় শকুন বিলুপ্ত হবার কারণে আমরা পার হতে পারছি না সমুদ্র, দেখতে পারছি না পাহাড়ের চূড়া। আমরা তবে তাই যাই শকুনের সন্ধানে। শকুনের সন্ধানে যেতে আমরা প্রথমে তবে একটা গৃহপালিু গরু হত্যা করি। আমরা শৈশবের অভিজ্ঞতা থেকে জেনেছি মৃত গরুর সন্ধান পেলে শকুনেরা তাদের দূর আকাশ থেকে মাটিতে নেমে আসে।

একটা গরু হত্যা করে আমরা সেটিকে মাঠে রেখে আসি। সকাল যায়, শকুন আসে না, দুপুর যয়ি শকুন আসে না, সূর‌্য ডুবে যায়, শকুন আসে না। আমরা রাতে না ডুবে ভেসে থাকি, জেগে থাকি, মাঠে থাকি। রাত আরো একটু ক্ষয় হলে আকাশের ভেতর, বাতাসের ভেতর মাঠের ভেতর উড়ালের শব্দ শুনি। আমরা আলোহীন আকাশ চাঁদহীন। দূর থেকে নক্ষত্রদের অপার্থিব আরো আসে। সেই আলোয় মাঠ যতটা আলোকিত হয় তার ভেতর দেখি মাঠের ওপরে একটা শকুন। নেমে এসেছে সে বিলুপ্ত আকাশ থেকে। আমরা কজন বিস্মিত, উত্তেজিত, আনন্দিত আমাদের সফলুায়। তাহলে বিলুপ্ত আকাশের কোথাও, বিলুপ্ত দূরের কোথাও শকুন আছে। শকুনটা জবাই করা গরুটার খুব নিকটে যায়।

অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। গরুটার পাশে আমাদের ছুরি ছিল, দড়ি ছিল, রক্ত ছিল, আমাদের পায়ের ছাপ ছিল। আমরা চাই শকুনটা গরুর মাংস ভক্ষণ করুক। কিন্তু হায় শকুনটা গরুর মাংস খায় না। আমরা অপেক্ষা করি। অপেক্ষার ভেতর দিয়ে শকুনটাকে মন ভরে, প্রাণ ভরে চোখ ভরে দেখি। শকুনটার অবস্থান কালের ক্ষণস্থায়িত্বে আমরা ভয় পেয়ে ক্যামরার দিকে হাত বাড়াই। আমরা আমাদের ক্যামরার সাহায্যে শকুনটার ছবি তুলি। অস্পষ্ট ছবি। বিলুপ্ত প্রায় ছবি। তারপর সকাল হবার কালে দেখি গরুটার মাংস স্পর্শ না করে শকুনটা উড়ে যায় বিলুপ্ত আকাশে। আমরা পত্রিকায়, ফেসবুকে, ওয়েব পেজে শকুনটার ছবি দিয়ে জানাই আমরা রাতের বেলা দূরের আকাশ থেকে এই শকুনটাকে আমাদের গ্রামের মাঠে নামাতে পেরেছিলাম।

শীতকালে আমাদের চরাঞ্চলে পাখি উৎসব চালু হয়। কত সব সাইবেরিয়া থেকে আমাদের চরাঞ্চলে নানা রকম পাখি এলে আমরা তাদের দেখতে যাই। আমার মনে এই আকাক্সক্ষা থাকে, যদি খুঁজে পাওয়া যায় আমাদের বিলুপ্ত গ্রাম হরিণগাছীর পাখিগুলো। এবার আমি একা হই। একা যাই। দলের ভেতর থেকে দেখেছি আমি আমাকে খুঁজে পাই না। দলের ভেতর আমি সর্বদা আমাকে হারাই।

সন্ধ্যার কিছু আগে নৌকা চড়ে আমি যাই ট্যাংরাগুড়া চড়ে। বাঙালি নদীর মাঝখানে যে কয়টা চর বুক দেখায় তার মধ্যে এটি একটি। হাঁটতে ভালো লাগলে হাঁটতে থাকি হাঁটতে হাঁটতে কোথাও পৌঁছাতে না চাইলে আরো ভালো লাগে। সূর‌্য কোথাও ডুবে যায়। চাঁদ চলে আসে। চলে আসে চাঁদের আলো। চাঁদ নামে বাঙালির নদীর জলে, বাঙালি নদীর চরে। চাঁদকে ক্রমে ক্রমে ফাঁদ বলে অনুভূত হয় আমার। আকাশ থেকে নেমে এসেছে এই ফাঁদ। এই ফাঁদে ধরা দিতে ভালো লাগে। স্যান্ডেল খুলে ফেলি। এখানে বিলুপ্ত হবার স্বাদ জাগে। এই সন্ধ্যার ভেতর বিলুপ্ত হতে কোনো যোগ্যতা লাগে তা জানা ছিল না। তবুও বিলুপ্ত হবার কামনায় বালির ওপর পা ফেলে হাঁটতে থাকি। বালির ওপর পা ফেলতে ভীষণ ভালো লাগে। বালির ভেতর বালির ফাঁদ, এই বোধে শরীরে পুলক জাগে মনে শিহরণ জাগে। ঝুর ঝুর ঝুর। বালি বালি বালি। বালির ভেতর পা ফেলতে কী ভীষণ আনন্দ, আমি আমার আগেরকার সকল হাঁটা অস্বীকার করি, আগেরকার সকল ভূমিকে অস্বীকার করি এবং অস্বীকার করি আমার সকল পূর্বের পাপসমূহকে। আমি বালির ফাঁদে প্রেমে পরি। হাঁটতে হাঁটতে আমি কোথাও হেঁটে যেতে চাই না। এই হাঁটা আমার অনন্তকাল হোক। এই চাঁদ আমার অনন্তকাল হোক।

একা হাঁটতে হাঁটতে তবু দেখি আমি তো হতে পারি না। চরের এক জায়গায় কিছু মানুষের একটা জটলা। ৩০-৪০ জন মানুষ ঝগড়া করছে। দেখি তাদের মাঝখানে একটা মৃত ঘোড়া। আমি বোঝার চেষ্টা করি বিষয়টা। একটা ঘোড়া মারা গেছে। ঘোড়ার মালিক কাঁদছে। মালিক চায় ঘোড়াটার দাফন হোক। সে চায় না তার মৃত ঘোড়াটা শেয়াল কুকুরের খাদ্য হোক। ঘোড়ার দাফন করা যায় কি না এটাই সমস্যা। একদল বলছে ঘোড়া দাফন করা যায় না। আরেক দল বলছে ঘোড়াটাকে দাফন করা যায়। ঘোড়ার মালিকের সাথে কথা বলে জানা হয় ঘোড়া পোষা তাদের পারিবারিক ঐতিহ্য। তাদের পরিবারে একটা করে ঘোড়া পালনের রীতি আছে। সে জানায় মৃত ঘোড়াকে তারা সব সময় মানুষের মতো দাফন করে এসেছে। কারণ তাদের পরিবারের সকল সদস্য এ ঘোড়ার পিঠে আহোরন করে নিজেদের যোদ্ধা ভেবেছে। ঘোড়ার পিঠে চড়ার অনুভূতি না জানলে একজন জানবে না ঘোড়ার ইতিহাস, ঘোড়ার মর্যাদা। সে আরো জানায় ঘোড়ার সঙ্গে তাদের পরিবারের সবার মর‌্যাদা জড়িত আছে। আমার প্রতি এবার অন্যান্য সবার নজরে পরে। জটলার যে প্রধান সে আামাকে জিজ্ঞাসা করে আমাদেরে এলাকায় কোনো ঘোড়া মারা গেলে তার দাফন করা হয় কি না। তার জিজ্ঞাসার ভেতর হত্যা ছিল। আমার সকল জ্ঞান ছদ্দবেশ ধারণ করে। আমি তাকে জানাই আমাদের গ্রামে ঘোড়া পাওয়া যায় না। তাই জানি না ঘোড়া মারা গেলে দাফন করা যায় কি না। তারা খুব বিস্মিত হয়ে এই কথা শুনে। তারা আমার দিকে এবার করুণার দৃষ্টিতে তাকায়। তারা জানতে চায় আমাদের গ্রামে আর কোন প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে গেছে কি না।

আমি থামি, পানিতে নামি, এ থামার ভেতর থেমে আছে আমার বিলুপ্ত গ্রাম হরিণগাছী। এ পানির ভেতর ডুবে আছে আমার বিলুপ্ত গ্রাম হরিণগাছী। তারা পূর্ণবার জিজ্ঞসে করে কি কি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বিলুপ্ত হয়ে গেছে কি আমাদের সমাধিসমূহ। তারা জানায় সমাধি তাদের স্মৃতি চিহ্ন। যে জীবন শেষ হয় তারা তাকে ধরে রাখে সমাধিতে। সমাধি মৃতকে নয় জীবনকে ধরে রাখে। তারা জানায় তারা এক সময় মৃত বক্সকেও সমাধিস্থ করত। আমি তাদের জানাই আমার গ্রাম হরিণগাছী ডুবে গেছে নদীর জলে। আর সেই সাথে গ্রামের সব কিছু ডুবে গেছে নদী জলে। ডুবে গেছে আমার গ্রমের সকল প্রাচীন সমাধি। তারা আমার কথা শুনে আমার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। তবে তারা বলে নদীর জলে গ্রাম ভেসে থাকে।

আমি তাদের জটলা থেকে, তাদের সমাধিবিষয়ক কথাবার্তা থেকে, তাদের মীমাংসা অমীমাংসা থেকে বেরিয়ে আসি। আমার এখন মনে হয় আমি কখনো প্রাণীবিদ্যা পড়িনি, উদ্ভিদ বিদ্যা পড়িনি, পড়েছি দর্শন বিদ্যা। নদীতে নৌকা ছিল। নৌকা দিয়ে পার হই সামান্য নদী, পার হই হয়তো আমার বিলুপ্ত গ্রাম। তারপর কি বিস্ময় কাঁচা রাস্তায় একটা ঘোড়ার গাড়ি। আমি তার যাত্রি হই। কোচোয়ান গাড়ি চালাচ্ছে। আকাশে তখনো চাঁদ। আকাশে তখনো ফাঁদ। আমার গালে এক ফোঁটা চাঁদের মতো গোল এক ফোঁটা জল কিংবা চাঁদ এসে পড়লো। ওপরে তাকিয়ে দেখি সেই শকুনটা চাঁদটিকে, আমার লুপ্ত গ্রামটিকে বহন করে চলছে। কোচোয়ানের হাতে চাবুক। হ্রেষাধ্বনি।