পল্লবিত কথাকার

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৮ | ১ অগ্রহায়ণ ১৪২৫

পল্লবিত কথাকার

তু্হিন ওয়াদুদ ৭:০৬ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ০৯, ২০১৮

print
পল্লবিত কথাকার

বাংলা কথাসাহিত্যের বরপুত্র হুমায়ূন আহমেদের ৭০তম জন্মবার্ষিকী আগামী ১৩ নভেম্বর। তিনি শুধু কথাসাহিত্যিকই ছিলেন না, ছিলেন একাধারে নাট্যকার, পরিচালক, গীতিকার। জনপ্রিয় চরিত্র হিমু আর মিসির আলী তারই সৃষ্টি। তার কালজয়ী সৃষ্টি নিয়ে আজন্ম বেঁচে থাকবেন আমাদের হৃদয়ে। হুমায়ূন আহমেদের আবির্ভাবকে স্মরণীয় রাখতে খোলা কাগজের ‘হুমায়ূন স্মরণ’

বাংলা সাহিত্যেলোকে ঈর্ষণীয় পাঠকপ্রিয়তায় আসীন হওয়া একজন কথাশিল্পী। নাট্যজগতেও তিনি যে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন তাও তাকে অনন্যতা দান করেছে। গীতিকার কিংবা চলচ্চিত্রকার পরিচিতিও তার অপরাপর কৃতিত্বের কাছে মলিন নয়। একজন হুমায়ূন আহমেদ পল্লবিত হয়েছেন শিল্পের বিচিত্র শাখায়।

সিরিয়াস ধারা এবং জনপ্রিয় ধারা উভয় ক্ষেত্রেই তার পদচারণা বিদ্যমান। বাংলা সাহিত্যে তিনি এমন কিছু চরিত্র সৃষ্টি করেছেন যেগুলো সারা দেশের সব পাঠকের মুখে মুখে। নাটকেও এমন কিছু চরিত্র আছে যার নাম নাট্য দর্শকমাত্রই জানেন। বাকের ভাই চরিত্রটি এখনো মানুষের মুখে মুখে ফেরে। হুমায়ূন আহমেদের সবচেয়ে বড় অর্জন হচ্ছে তিনি প্রচুর পাঠকের কাছে পৌঁছতে পেরেছেন। শুধু তাই নয়, তার গদ্যভঙ্গি পাঠকের কাছে সুখপাঠ্য হওয়ার কারণে তিনি কখনো তার ভক্তপাঠকের কাছে দূরের হয়ে ওঠেন নি।

হুমায়ূন সৃষ্ট একটি চরিত্র হিমু। তার নিজস্ব এক যাপিতজীবন আছে। হুমায়ূন আহমেদ তার অসংখ্য লেখায় এ চরিত্রের অবতারণা করেছেন। তার পাঠকরা বারবার একই চরিত্রের প্রতি বীতশ্রদ্ধ না হয়ে ওই চরিত্রকে বারবার গ্রহণ করেছেন এক গভীর মন্ত্রমুগ্ধতায়।

তার আর একটি অনন্য সৃষ্টি মিসির আলী। মিসির আলি বেশ খানিকটা দুর্বোধ্য। হুমায়ূন আহমেদ নিজেই হিমু এবং মিসির আলী চরিত্র সম্পর্কে নিজস্ব মত উল্লেখ করে গেছেন। তার কাছে হিমু চরিত্র সৃষ্টি করা সহজসাধ্য। কিন্তু মিসির আলী চরিত্র সৃষ্টি করতে তাকে বেশ বেগ পেতে হতো। বাংলা সাহিত্যে এ চরিত্রটিকেও মহিমা দান করেছেন হুমায়ূন আহমেদ।

হুমায়ূন আহমেদ কখনো উচ্চকিতভাবে নন্দিত হয়েছেন কখনো সাধারণ অর্থে গৃহীত হয়েছেন। তার কিশোর-তরুণদের জন্য লিখিত দীর্ঘ কলেবরের লেখাগুলোতে একই বিষয়ের পুনরাবৃত্তি আছে। এতে করে পাঠকের অনেক সময় অপচয় হয়েছে কি না এমন প্রশ্ন কাউকে কাউকে তুলতে দেখা যায়। এ ক্ষেত্রে আমাদের নিজেদের অভিজ্ঞতা উল্লেখ করা যেতে পারে। আমরা যখন শৈশব-কৈশোর অতিক্রম করেছি তখন আমরা অন্যান্য লেখকের পাশাপাশি হুমায়ূনও পড়তাম। শুধু সাদামাটা পাঠ নয়। গোগ্রাসে গিলে ফেলার মতো অবস্থা। কার বাড়িতে হুমায়ূন আহমেদের বই আছে আমরা সেসব সংগ্রহ করে পড়ে শেষ করতাম।

তখনো আমাদের কাছে সাহিত্যের শিল্পমূল্য-আঙ্গিকমূল্য-বিষয়-ভাবনা সাহিত্য মূল্যায়নের কোনো সূচক হয়ে ওঠেনি। সাহিত্য তখনো আমাদের কাছে আনন্দ গ্রহণের মাধ্যম। পরবর্তী সময়ে যখন সাহিত্যের বিবিধ মূল্যায়ন শিখতে শুরু করি তখন হুমায়ূন আহমেদ ভিন্নমাত্রায় বিবেচিত হয়েছে। সেই মাত্রা হুমায়ূন আহমেদকে বাতিল করে দেওয়ার মতো নয়। আবার শিল্প মূল্যে সবচেয়ে উঁচুতে তুলে ধরার মতো বিষয় নয়। তবে হুমায়ূন আহমেদ বাংলা সাহিত্যকে যে সমৃদ্ধি দান করেছেন তা ক্ষয়ে যাবে না।

বহুমাত্রিক পাঠ আমাদের ক্রমে ক্রমে হুমায়ূন আহমেদ মূল্যায়ন সহজ করে দেয়। আমাদের শৈশব এবং কৈশোরে শুধু হুমায়ূন পড়ে পড়ে বেড়ে উঠিনি। আমরা হুমায়ূন আহমেদের নাটক দেখে দেখেও বেড়ে উঠেছি। আজকের দিনের শিশু-কিশোর কেউ অনুমানও করতে পারবে না ২৫ বছর আগে যখন বাংলাদেশের গ্রামগুলোতে কোনো বিদ্যুৎ নেই। ব্যাটারি দিয়ে টেলিভিশন দেখা হতো। কোনো গ্রামে টেলিভিশন আছে কোনো গ্রামে টেলিভিশন নেই। যে গ্রামে একটি টেলিভিশন আছে সেখানে পাশ্ববর্তী গ্রাম থেকে মানুষ এসে উঠানে বসে-দাঁড়িয়ে হুমায়ূন আহমেদের নাটক দেখতেন। হুমায়ূন আহমেদের ‘অয়োময়’, ‘এই সব দিন রাত্রি’, ‘বহুব্রীহি, কোথাও কেউ নেই’ ‘আজ রবিবার’সহ অনেক নাটক দর্শকপ্রিয়তার শীর্ষে ছিল। তার ‘আগুনের পরশমণি’, ‘দুই দুয়ারী’, ‘শ্যামল ছায়া’, ‘শঙ্খনীল কারাগার’, ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ চলচ্চিত্রগুলো দর্শকদের কাছে সমাদৃত হয়েছে।

হুমায়ূন আহমেদ বাংলাদেশের শীর্ষ সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। তার কথাশিল্প, নাটক চলচ্চিত্র সবটাই স্বীকৃতি লাভ করেছে। হুমায়ূন আহমেদ জীবদ্দশাতেই সেই জনপ্রিয়তা দেখে গেছেন। তাঁর প্রয়াণের পরও সেই জনপ্রিয়তায় কোনো কমতি নেই। হুমায়ূন আহমেদের অনুপস্থিতিতেও তার পাঠকপ্রিয়তা এখনো আছে।

হুমায়ূন আহমেদ সব ধরনের পাঠকের জন্য সাহিত্য রচনা করেছেন। একজন রোগী হাসপাতালে বসেও অসুস্থতা নিয়ে হুমায়ূন আহমেদের বই পড়তে পারেন। বিষয় এবং ভাষার সারল্যের কারণে এটা সম্ভব। ‘নন্দিত নরকে’, ‘শঙ্খনীল কারাগার’, ‘জোছনা ও জননীর গল্প’-এর মতো উপন্যাস হুমায়ূন আহমেদকে সাহিত্যের উঠানে দৃঢ় করে তুলেছে। তাই বলে তার আরও প্রায় তিনশ উপন্যাস যে তাকে দৃঢ়তা দেয়নি তা নয়। সময় লিখে রাখবে হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয়তা কমে যাবে নাকি বেঁচে থাকবে। বিষয়টি পাঠকের গ্রহণ-বর্জনের ওপর নির্ভর করবে। উপলব্ধি থেকে বলা যায়, বাংলা শিল্পসাহিত্য থেকে হুমায়ূন আহমেদ মুছে যাবেন না।