রপ্তানির তালিকায় যখন আমাদের নারীরা

ঢাকা, বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮ | ৩০ কার্তিক ১৪২৫

রপ্তানির তালিকায় যখন আমাদের নারীরা

জাকির তালুকদার ৪:৪৪ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ০২, ২০১৮

print
রপ্তানির তালিকায় যখন আমাদের নারীরা

নদীর দুই পাড় ধরে লোক দলে দলে দৌড়াচ্ছে আর আমাদের দিকে ছুঁড়ে দিচ্ছে আকুলতাময় ব্যাকুল প্রশ্ন-আছে! আছে তোমাগের কাছে?
নিম্ন-মধ্যবিত্ত ছাপোষা শখ। তিন বছর ধরে স্বপ্ন দেখা, গল্পগাছা, নানারকম হ্যাকড়ার পরে অবশেষে আজ আমরা নৌকাভ্রমণে বেরুতে পেরেছি। নদী এখন যথেষ্টই শীর্ণ। তাই এপার থেকে ওপারে কথা চালাচালির জন্য খুব বেশি গলা তুলতে হয় না। নদী দুর্বল বলে দুই পাড়েই পয়োস্তি। জলরেখার পাঁজর ঘেঁষে চাষবাস। আমরা তাই দুই পাড়ের মানুষের সাথেই কথা বলতে পারি।

নদীতে নাইতে আসা গ্রামের মেয়ে, ঝাঁপাতে নিয়ে আসা গরুমোষ আর ন্যাংটো বাচ্চাদের লাফালাফি দেখে আহ্লাদিত হয়ে নিজেদের কিঞ্চিৎ আশ্বস্ত করতে পারি যে বাংলার আবহমান ঐতিহ্য এখনো বেঁচে-বর্তে আছে। চলতে চলতে ঘণ্টাখানেক চলার পরে হঠাৎ-ই আমরা নদীর ডানদিকে দেখতে পাই সেই স্কুলের রচনা বইয়ের ছায়া সুনিবিড়। আমাদের বড় ইচ্ছা জাগে সেখানে নেমে ছায়া সুনিবিড় গায়ে মেখে নিতে। কেউ কেউ সতর্ক করে যে নামলেই মোহভঙ্গ হবে- ঐ ছায়া সুনিবিড়ের মধ্যে রয়েছে আসলে হতশ্রী জীবন, ক্ষুধা, প্রতারিত মানুষের অসহায় ক্ষোভ, কিঞ্চিৎ ভাবালুতা, এমনকী বিষণ্ন দ্রোহ। কিন্তু আমাদের মফস্বল-শহুরে প্রায় বস্তিজীবন বার বার ঠেলতে থাকে- যাও যাও অবগাহন করো!

আমরা মাঝিকে নৌকা ভেড়াতে বলি ঐ ছায়া সুনিবিড়ে, নৌকার মুখ ঘোরে সেদিকে, আর সঙ্গে সঙ্গেই যেন ছায়ার ক্যামোফ্লেজ সরিয়ে পিল পিল করে বেরিয়ে আসে মানুষের দঙ্গল, মুখে প্রশ্ন- আছে? আছে?
আমরা ভাবি এরা ক্ষুধার্ত মানুষ, খাদ্য চায়। অথবা গ্রামের মাটিমাখা মানুষ, শহরের চাকচিক্য চায়। তবু নিশ্চিত হবার জন্য আমরা পাল্টা জিজ্ঞেস করি- কী আছে? কী চাও?

তারা আমাদের প্রশ্নের উত্তরে আবার সেই প্রশ্নই ফেরত পাঠায়- আছে? আছে তোমাদের কাছে?
আমরা তাদের দিকে সুস্মিত হাসি নিয়ে নৌকা ঘাটে নিতে যাই। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই পাড়ের মানুষগুলি যেন যুদ্ধংদেহী হয়ে ওঠে- না থাকলে নামবে না খবরদার! আমরা আর শূন্যহাত চাই না।

একজন কথার গুরুত্ব বোঝাতেই বোধহয় হাতের ডাং বাতাসে ঘোরায়। তা দেখার সাথে সাথেই আমাদের মাঝি সভয়ে ‘শালোরা ডাকাত’ বলে নৌকাকে ঘুরিয়ে মাঝনদীতে নিয়ে আসে। কিন্তু তৎক্ষণাৎ আবার পরিবর্তিত হয়ে যায় পাড়ের মানুষগুলোর দেহভঙ্গি। তারা আকুল হয়ে কিছুটা ভিক্ষুকের দীনতা নিয়েই যেন জানতে চায়- আছে! আছে!
কী আছে?
এই মানুষগুলোর উত্তর শোনা হয় না। তার আগেই, রোদাক্রান্ত মুমূর্ষু মানুষ যেভাবে জলের গন্ডুষ চায়, সেইরকম দীন কাতরতা ভেসে আসে নদীর আরেক পাড় থেকে- আছে! আছে!
এপারেও ছায়া সুনিবিড় আছে। যদিও হতশ্রী মানুষের সমাগমে তা কিছুটা মলিন। তবু ছায়া সুনিবিড় নেবার জন্য আমরা মাঝিকে এই পারে নৌকা ভেড়াতে বলি। কিন্তু নৌকার মুখ পাড়মুখি হবার সঙ্গে সঙ্গেই তীক্ষ্ণ চিলের গলায় চেঁচিয়ে ওঠে জমায়েত- না থাকলে নাইমো না কিন্তু! সাবধান!

অতএব নৌকা মাঝনদী দিয়েই এগুতে থাকে। কিন্তু রেহাই পাওয়া যায় না। দুই পাড়ের মানুষের দঙ্গল নৌকার সাথে সাথে সমান্তরালে হাঁটে, আর অবিশ্রাম উচ্চারণ করতে থাকে- আছে! আছে? আছে!...

আমাদের নিজেদের এতক্ষণে পাগল পাগল লাগতে শুরু করেছে। আমরা কখনো এদের প্রতি করুণার্দ্র হতে থাকি ভিখিরি ভেবে, কখনো ভীত হতে থাকি লিঞ্চিং মব ভেবে। কিন্তু আমাদের ফুরফুরে নৌভ্রমণ ততক্ষণে পরিণত হয়েছে রাত পুইয়ে যাওয়ার পরের তন্দ্রার মধ্যে দেখা ভয়ের স্বপ্নে। আমরা তখন এক এক করে দেখাতে থাকি আমাদের সঙ্গে যা যা আছে। এই ভ্রমণ উপলক্ষে কেনা দামি সিগারেট, চিপস, বাদাম, চানাচুরের প্যাকেট, এন্টাসিড ট্যাবলেট, মাথাব্যথার টাইগার বাম, ঠোঁঠফাটা রোধের ভ্যাজলিন, চকোলেট-লজেন্স, সুযোগ পেলে নদীতে স্নান করার জন্য সঙ্গে আনা লুঙ্গি-গামছা-হাফপ্যান্ট, এমনকী মেথরপট্টি থেকে নিয়ে আসা পলিথিনে ভরা পচানি মদও।
কিন্তু এসব দেখে তারা প্রবল প্রত্যাখ্যানে মাথা নাড়ায় আর আরো জোরে চিৎকার করতে থাকে- আছে? আছে! আছে?...

তখন আমাদের একজন, নৌকায় ওঠার আগে যে গাঁয়ের ক্ষেত থেকে একগোছা দুধপুষ্ট ধানের ছড়া ছিঁড়ে নিয়েছিল, সে এখন উত্তর পাওয়ার ভঙ্গিতে নৌকার পাটাতনে তাদের দিকে প্রবল উৎসাহে দোলাতে থাকে ধানের শীষ। লাওয়ের বদলে ধানের শীষ চাও?
দুই পাড়ের দঙ্গল হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে যায়। প্রত্যাশা পুরনের হঠাৎ আনন্দে! কিন্তু একটু পরেই তারা আবার তুমুল বিক্ষোভে ‘আছে! আছে!’ বলতে শুরু করলে বোঝা যায় একটু আগের স্তব্ধতা ছিল প্রবল হতাশার।

আমরা আমাগের লিখোঁজ মিয়্যাডার খোঁজ চাই!
মেয়ে! আমাদের সঙ্গে তো কোনো মেয়ে নাই!
মিয়্যাডার খোঁজ আছে?
কোন মেয়ে?
নিজের বাড়ির রান্ধন ছেড়ে যে মিয়্যাডারে তোমরা লোভে ফুসলায়া পাঠাইছ মরুভূমির দ্যাশের লম্পটগুলানের হেরেমে?
তাদের সন্ধান আমরা জানব কীভাবে!
আমাদের দেশের মাথা-মুরুব্বিরাই বোধহয় জানে না।

আরেকজন বলে ওঠে- আমার মিয়্যাডারে ঢাকার গার্মেন্টের কাম দেওয়ার নাম কর‌্যা নিয়া গেল। তারপরে বর্ডার পার। সেই মিয়্যার খোঁজ আছে তোমাগের কাছে?
নদীর আরেক পাশ থেকে ভাঙাগলার কান্নাময় চিৎকার ভেসে আসে- আমার মিয়্যাডাক ইস্কুলের রাস্তা থাইকা তুলে নিয়া গেল। তার খোঁজ আছে? আছে?
হু হু করে কান্নার রোল ওঠে নদীর দুইপাড় থেকে- মিয়্যা নাই তো বাপের কোল ঠান্ডা নাই। মিয়্যা নাই তো বাড়ির আবরু নাই। মিয়া নাই তো বাড়ির সাঁঝবাতি নাই। উঠানের কোণের গেন্দা গাছে ফুল নাই। উঠানে গোবরলেপা নাই। মিয়্যা নাই তো গাঁয়ে গীত নাই। মমতা নাই। সখ-আল্লাদ নাই।

কান্নাময় কণ্ঠস্বরগুলো আবার আকুল হয়ে জিজ্ঞেস করতে থাকে- আছে আছে? আছে আছে তোমাগের কাছে?
আমাদের উত্তর সেই ‘না’ ছাড়া আর কীই-বা হতে পারে। আমরা গলার শিরা ফুলিয়ে বলি যাতে সবাই শুনতে পায়- না না আমাদের কাছে নাই।
উত্তর শুনে মারমুখি জনতা হঠাৎ-ই যেন হতাশায় নুয়ে পড়ে। মিনিটের পর মিনিট নুয়ে থাকে একই ভঙিতে। এখন দেখলে মনে হয় তারা নড়াচড়ার শক্তিও আর কখনোই ফিরে পাবে না।

কিন্তু না। হতাশা চরমে উঠলে একজন একঠেঙে মানুষ, আরেকটা পা যার কাঠের, সে হঠাৎ টান দিয়ে খুলে ফেলে তার কাঠের পা। তারপর ছুঁড়ে মারে আমাদের দিকে প্রবল আক্রোশে। সেটি পড়ে নদীর পানিতে আমাদের হাত বিশেক তফাতে। আর সেটি পানিতে পড়ার সাথে সাথে দপ করে জ্বলে ওঠে আগুন। আমরা হতচকিত হয়ে জীবনে এই প্রথম দেখি জলের স্পর্শে কাঠের পায়ে আগুন জ্বলে ওঠা। সেই পঙ্গুর কাঠের পায়ে ঘৃণা এতটাই তীব্র হয়ে জমেছিল যা নদীর পানিকেও গান পাউডারে পরিণত করে দিয়েছে!

সেই আগুন অবশ্য সরাসরি আমাদের গ্রাস করতে আসে না। তার বদলে আমাদের নৌকার চারপাশে ঘুরে ঘুরে নাচে, আর গোল হয়ে একটা লক্ষণগন্ডি এঁকে দেয়। এর বাইরে গেলেই পুড়ে মরতে হবে।

আমরা করজোড়ে বলি- ভাইসব আমাদের যাবার দ্যান। আমরা সত্যিই আপনাগের মিয়্যাদের খবর জানি না।
তারা কর্ণপাত করতে চায় না আমাদের কথায়। সেই পঙ্গু বৃদ্ধ বলে- তোমরাই তো সব করো। তোমরা একদল একদল কইরা আসো, আর আমাগের মিয়্যারা একজন-দুইজন-দশজন কইরা হারায়া যায়। তোমরাই আড়কাঠি।
না। আমরা মিয়্যা পাচারের দালাল না। আমরা খালি বেড়াবার আইছি। আমরা শান্তিপ্রিয় নিরীহ মানুষ।
বিশ্বাস করি না।

তাইলে আমাদের নৌকাত আইসা দ্যাখেন!
এ কথায় একটু পরিবর্তিত হয় গ্রামের লোকদের মুখভাব। পঙ্গু বৃদ্ধ এবার পারে এসে উবু হয়ে নদীর পানিতে হাত ছোঁয়ায়। সঙ্গে সঙ্গে নিভে যায় আগুন। তখন আমরা পারে ভিড়াই নৌকা।
লোকজন আমাদের নিয়ে গ্রামের মধ্যে ঢোকে।
আমরা দেখতে পাই খাঁ খাঁ করছে গোটা গ্রাম। কোনো বাড়িতে কোনো লক্ষ্মীশ্রী নেই। কোনো বাড়িতে চুলা জ্বলে না, আঙিনায় মার্জনি পড়ে না, গুল্মলতা-আগাছায় ঢেকে গেছে বাড়ির চারপাশ।
আমরা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করি- এ কী?

গ্রামের লোক একসঙ্গে কেঁদে ওঠে এবার। কাঁদতে কাঁদতেই বলে- আমাগের গাঁয়ের সব মিয়্যাগুলানেক নিয়া গেছে।
সত্যিই বাড়িতে নারী না থাকলে কি কোনো সুবাতাস থাকে?
আমরা অদ্বৈত মল্ল বর্মনের কথা স্মরণ করি- ‘কাদির তার বেয়াইকে অপছন্দ করে তার অসততার জন্য। মুহুরি-বেয়াইয়ের আরেক দোষ, সে দ্বিতীয় বিবাহ করেছে। এই কারণে সে ছেলের বউয়ের সামনেই তার বাপ সম্পর্কে অকথা-কুকথা বলতে দ্বিধা করে না। একপর্যায়ে বিদ্রোহ করে তার ছেলের বউ। চাপাকান্না নিয়ে বলে- ‘চোর হোক ধাওর হোক, তারইত আমি মাইয়া। বাপ হইয়া মার মত পালছে, খাওয়াইছে, ধোয়াইছে- হাজার হোক, তবু বাপ। চোর হইলেও আমারই বাপ, আর কাউর বাপ না। আমি মরলে এই বাপেরই বুক খালি হইব। আর কোনো বাপের বুক খালি হইব না।’ সাথে সে আরো যোগ করে দেয়- যে ঘরে বাপ চোর, মেয়ে বিষমুখী, সে ঘর তার ঘর নয়, পরের ঘর।

এবার কাদিরের বুক চিরে বেরিয়ে আসে স্তোকবাক্য নয়, নিখাদ নিষ্কলুষ ভালোবাসা- ‘হ, হ, পরের ঘর। মুহুরীর মেয়েটা বলে কি? রাত না পোহাইতে উঠিয়া বিশটা গরুর গোয়াল সাফ করা, খইল ভূষি দেওয়া, ঝাঁটা হাতে এতবড় উঠানবাড়ী পরিষ্কার করা, কলসের পর কলস পানি তোলা, রান্ধা, খাওয়ানো, ধান শুকানো, কাক তাড়ানো, উঠান-ভরতি ধান রোদে হাঁটিয়ো পা দিয়া উল্টানো পাল্টানো, তারপর খড় শুকানো, শোলা শুকানো, পাট ইন্দুরে কাটে, তারে দেখা, অত অত ধান ভানা, পের রান্না-বাড়া করা- এত হাজার রকমের কাজ- পরের ঘরে কি কেউ এত কাজ করে কোনোদিন? শরীর মাটি করিয়া এত কাজ যে-ঘরের জন্য করিতেছে, তারে কয় কিনা পরের ঘর! কহিলেই হইল আর কি, মুখের ত আর কেরায়া নাই।’

‘খুশীর চোখে এবার দ্বিগুণ বেগে জল আসিয়া পড়িল। এবার সে ফোঁপাইয়া কাঁদিয়া উঠিল। অনেক কাঁদিবার পর তাহার মনে হইল, এমন কাঁদিয়াও সুখ।’

এই হচ্ছে আমাদের নারী। সেই নারী না থাকলে বাংলাদেশ থাকে কী করে? সেই নারী না থাকলে গ্রাম আর গ্রাম থাকে কী করে?
আমরাও ব্যথিত চিত্তে গ্রামবাসীদের সাথে একাত্মতা বোধ করি। জিজ্ঞেস করি নারীদের হরণ করেছে কারা? ডাকাতরা?
তারা উত্তর দেয় না।

আমরা মনে মনে ভাবি, এমনটি তো হবার কথা নয়। কোনো গ্রামের সব নারীকে যদি তুলে নিয়ে যায় ডাকাতের দল তাহলে সেটা নিশ্চয়ই আমাদের গোচরে আসত। এত এত মিডিয়া আমাদের দেশে, তারা সবাই নিশ্চয়ই ব্যাপারটা গোপন করত না। তাহলে গ্রামের সব নারী গেল কোথায়?
প্রশ্নটা আবার করি আমরা।
উত্তর আসে- তারা সব মরুভূমির দ্যাশে।

সেখানে ক্যান গ্যাছে?
রেগে যায় এবার গ্রামবাসী। তারা বিদ্রুপ মাখানো ক্রোধ নিয়ে বলে- আমাগের জিগাও ক্যান? নিজেগের বাড়ির মিয়্যাদের কাছে শুনো তারা ক্যান গ্যাছে?

আমাদের পরিবারের কোনো নারী তো মরুভূমির দ্যাশে যায়নি!
এবার হো হো করে হেসে ওঠে গ্রামবাসী। বলে- গ্যাছে। তোমরা সেইডাও জানো না!
আমরা চমকে উঠি। তারপর অবিশ্বাসের সাথেই তড়িঘড়ি মোবাইলের বোতাম টিপতে শুরু করি। নিজ নিজ স্ত্রীর কাছে, বোনের কাছে। কিন্তু প্রত্যেকেই শুনতে পাই একটাই উত্তর- দি নম্বর ক্যান নট বি রিচড নাও। ট্রাই এগেইন আফটার সাম টাইম।