চিন্তা থাকলে চিন্তার লিখিত রূপও থাকবে

ঢাকা, বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮ | ৩০ কার্তিক ১৪২৫

চিন্তা থাকলে চিন্তার লিখিত রূপও থাকবে

শফিক হাসান ৩:৫৬ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ০২, ২০১৮

print
চিন্তা থাকলে চিন্তার লিখিত রূপও থাকবে

১৯৩৯ সালের ১৮ আগস্ট নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় জন্ম যতীন সরকারের।বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অধ্যাপনা করেছেন দীর্ঘ চারদশক। প্রগতিশীল লেখক ও মুক্তচিন্তার মানুষ হিসেবেই পরিচিত তিনি। স্বাধীনতা পুরস্কার, বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা অর্জন করেছেন। সাম্প্রতিক সাহিত্য ও নানা বিষয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন শফিক হাসান

বাংলাদেশের প্রবন্ধ সাহিত্য আটকে আছে ষাটের দশকেই। অবিকশিত থাকার কারণ কী বলে মনে করেন?
ষাটের দশক থেকে প্রবন্ধ সাহিত্য বিকশিত হয়নি-এ উক্তির সঙ্গে আমি পুরোপুরি একমত নই। সাহিত্য হিসেবে যথার্থভাবে মূল্যায়ন করা যায় এরকম প্রবন্ধের সংখ্যা হয়তো কম। এটা সব সময়ই কম থাকে। কাজেই ষাটের দশকের পর থেকে এ পর্যন্ত প্রবন্ধ সাহিত্য বিকশিত হয়নি-এটা ঠিক নয়। অনেকেই প্রবন্ধ লিখছেন। নতুন নতুন অনেক প্রাবন্ধিক আমি দেখছি। সামনেই দেখতে পাচ্ছি মুহম্মদ সাইফুল ইসলাম, তপন বাগচীর মতো নতুন প্রাবন্ধিককে। এরকম অনেকেই আছেন। এ মুহূর্তে নাম বলতে পারছি না। সব প্রবন্ধই যে সমান মাপের হবে তা নয়। কোনো জিনিসই সমান মাপের হয় না। তবে আমি মনে করি, প্রবন্ধ সাহিত্য বিকশিত হচ্ছে।

সামষ্টিকভাবে সাহিত্য কোন দিকে এগোচ্ছে?
জনপ্রিয়তার বিচারে যদি ধরি-উপন্যাসে হুমায়ূন আহমেদ, ইমদাদুল হক মিলন এগিয়ে। কিন্তু এমন কথা বলতে পারি না, উপন্যাস সাহিত্য খুব উচ্চমানের হয়েছে। তবে একটু আগে যে প্রবন্ধ সাহিত্যের কথা বললাম, এর ক্ষেত্রটা অন্য যে কোনো ক্ষেত্রের চেয়ে বেশি বিকশিত হচ্ছে বলে আমার ধারণা। ছোটগল্পের দিক থেকে যতটা প্রত্যাশিত ছিল ততটা হয়নি। কবিতায় মোটামুটি এগোচ্ছে।
উপন্যাসের জনপ্রিয়তার তুলনায় যথার্থ উপন্যাস রচিত হয়নি। কিছু কিছু রচিত হচ্ছে। আমাদের সেলিনা হোসেনের মতো ঔপন্যাসিক আছেন। যার উপন্যাস যথার্থ অর্থেই অনেক উচ্চমানের। ছোটগল্পে হাসান আজিজুল হক এখনো অপ্রতিদ্বন্দ্বীরূপে বিদ্যমান। নতুন নতুন অনেক ছোটগল্পকারও রয়েছেন।

কবিতায় শামসুর রাহমানের পরে নতুন কবির নাম বলতে পারছি না। যাদের কবিতা মানুষ গ্রহণ করেছে। পুরনোদের মধ্যে আসাদ চৌধুরী, নির্মলেন্দু গুণের মতো কবিরা আছেন। অবশ্য এটাও ঠিক, আমি এখন আগের মতো পড়তে পারি না। সবার খোঁজ রাখাও সম্ভব হচ্ছে না। অসুস্থতার জন্য গৃহবন্দি আছি।

মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্যকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্য খুব একটা কম রচিত হয়নি। তবে পরিমাণে যতটা আছে, টিকে থাকবে কতটুকু তার বিচার পরে হবে। কিন্তু এখন মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্য যা রচিত হচ্ছে সেগুলোও আমাদের গ্রহণ করতে হবে।

মুদ্রিত বইয়ের টিকে থাকা নিয়ে কেউ কেউ শঙ্কা প্রকাশ করছেন। আপনি কী মনে করেন?
অনেকেই অনেক কথা বলে। যখন টেলিভিশন এলো, লোকজন বলা শুরু করেছে রেডিওর দিন শেষ। টেলিভিশন আসার পরে শোনা গেলো সিনেমার বাজার থাকবে না। তারপর এখন শোনা যাচ্ছে মুদ্রিত পত্রিকা থাকবে না। তবে কাগজের লেখা বই থেকে যদি অন্যভাবে বই পড়া যায়-ক্ষতি কী! আগে আমরা দোয়াতের কালি দিয়ে ভিজিয়ে লিখতাম। তারপর এলো ফাউন্টেন পেন। এখন তো ফাউন্টেন পেনও অনেকেই চেনে না। তারপর এলো বল পেন। এভাবে কাগজের বইয়ের বদলে অন্যকিছু এলে তা নিয়ে অত চিন্তাভাবনার কিছু দেখি না। বই থাকবেই। চিন্তা থাকলে চিন্তার লিখিত রূপও থাকবে।

সাহিত্যের প্রসারে লিটল ম্যাগাজিনের ভূমিকা কতটুকু?
অবশ্যই অনেক বেশি। তবে আমাদের দেশে লিটল ম্যাগাজিন যেভাবে বিকশিত হওয়া উচিত ছিল সেভাবে হয়নি। বরং পশ্চিমবঙ্গে আমাদের চেয়ে অনেক বেশি বিকশিত হয়েছে। আমি দেখি, পশ্চিমবঙ্গ থেকে যে সব লিটল ম্যাগাজিন আসে, তার সঙ্গে তুলনা করলে আমাদের লিটল ম্যাগাজিনের যথার্থ বিকাশ ঘটেছে বলে মনে করি না।

দৈনিক পত্রিকার সাময়িকীগুলো সাহিত্যের বিকাশে কতটা অবদান রাখতে পারছে?
দৈনিকের সাহিত্য সাময়িকীগুলো সমৃদ্ধ হওয়া উচিত। তবে যথার্থ সাময়িকী দেখি শুধু একটা-সমকালের কালের খেয়া। এ ছাড়া প্রতি সপ্তাহে সাহিত্যের ওপর নজর দেওয়া সাহিত্য পাতা কেউই বের করে না। অথচ প্রত্যেকটি দৈনিক পত্রিকার এটা একটা দায়িত্ব। সেই দায়িত্বটা যদি দৈনিক পত্রিকা পালন করে তাহলে আমাদের সাহিত্যের বিকাশে অনেক কাজ হবে বলে আমি মনে করি। কেউ কেউ বলে- লেখা পাওয়া যায় না ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি এটা বিশ্বাস করি না। আমার মনে হয় অনেক পুরনো লেখা, ক্লাসিক ও হারিয়ে যাওয়া লেখাগুলো উদ্ধার করে দৈনিক পত্রিকাগুলো ছাপতে পারে।

ইদানীং কোথাও কোথাও বইয়ের দোকানগুলো বাংলাদেশি বই বিক্রি বন্ধ করে ভারতীয় বইয়ের দিকে মনোযোগী হয়েছে। ভারতীয় বইয়ের চাহিদাও ব্যাপক। এটাকে কোন দৃষ্টিতে দেখছেন?
এটা হতেই পারে। আবারও বলছি, আমি দীর্ঘদিন ধরে ঘর থেকে বেরুতে পারি না। কাজেই এ সম্বন্ধে বলা কঠিন। তবে একটা কথা হচ্ছে, আমাদের বইমেলায় প্রতিবছর যে পরিমাণে বই বের হয়, এটা আগে চিন্তাও করা যায়নি। আমার মতো কাঠখোট্টা লেখকের পেছনেও প্রকাশকদের লাইন পড়ে গেছে। তখন আমি বুঝি, বই যদি মানুষ না-ই পড়তো-এত প্রকাশক থাকবে কেন, তারা পাণ্ডলিপি চাইবে কেন!
জনপ্রিয় ঔপন্যাসিকদের কথা বাদ দিলাম, তাদের কাছে বেশিসংখ্যক পাঠক যাবেই। কিন্তু আমার মতো মফস্বলের মানুষের কাছে যখন প্রকাশকরা হুমড়ি খেয়ে পড়ে-এটা দেখে মনে করতে পারি না, আমাদের বইয়ের চাহিদা নেই, পাঠক নেই।

পাঠবিমুখ তরুণ প্রজন্মকে কীভাবে পাঠমুখী করা যায়?
পাঠের বাইরে চলে যাচ্ছে-এটা আমি প্রায়ই শুনি কিন্তু পুরোপুরি বিশ্বাস করি না। কারণ আমার ৮৩ বছর বয়সে চলে গেল, এখন যদি শৈশবের দিকে তাকাই- কতজন বই পড়তো? পাঠকের সংখ্যা বরাবরই কম ছিল। তবে হ্যাঁ, অন্যভাবেও এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যায়। কয়েক বছর আগে নেপালের এক লোকের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। বই সম্বন্ধে তিনি আমাকে বলেছিলেন, আপনাদের পাঠকের পার্সেন্টেজ কত সেটা আমি জানি না। তবে আমাদের নেপালে যত লোক রয়েছে তার চেয়ে অনেক গুণ বেশি পাঠক রয়েছে আপনাদের। অন্তত আমাদের নেপালে যত লোক, ততজন পাঠক তো আপনাদের রয়েছে! পাঠকের সংখ্যা নেই-মানুষ অন্যদিকে ভিড়ে গেছে এমন দাবি সঠিক নয়।

আগে তো বিনোদনের এত উপকরণ ছিল না, তখনো কি খুব বেশি মানুষ বই পড়তো? আমার ছেলেবেলায় দেখেছি, আমি যতটা বই পড়েছি, বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে শতকরা দুইজনও পাইনি যারা আমার মতো বই পড়েছে। এখানে আমার কৃতিত্ব জাহির করছি না। তখনকার এবং এখনকার বাস্তবতার তুলনামূলক আলোচনায় চলে এলো।

একজন লেখক হিসেবে পাঠকের কাছে আপনার প্রত্যাশা কী?
পাঠকের উদ্দেশে আমার বলার কথা একটাই-পাঠক যেন আরও বেশি সিরিয়াস হন। তারা যেন দাবি করেন-আমরা এটা চাই, এভাবে চাই। সেই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে দেখা যাবে, আমাদের ভালো বই বেরুচ্ছে, পত্রপত্রিকার নতুন পাতা বেরুচ্ছে। মানে পরিবর্তনের একটা ছোঁয়া পাওয়া যাবে পাঠকের চাহিদা ও দাবির ভিত্তিতেই।