জেল আপিল শুনানির জন্য প্রস্তুত হচ্ছে হলি আর্টিজান মামলা

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২০ | ২৮ শ্রাবণ ১৪২৭

জেল আপিল শুনানির জন্য প্রস্তুত হচ্ছে হলি আর্টিজান মামলা

নিজস্ব প্রতিবেদক ২:৪৬ অপরাহ্ণ, জুলাই ০১, ২০২০

print
জেল আপিল শুনানির জন্য প্রস্তুত হচ্ছে হলি আর্টিজান মামলা

রাজধানীর গুলশানে কূটনৈতিক পাড়ার হলি আর্টিজান বেকারিতে দেশের ইতিহাসের ভয়াবহতম জঙ্গি হামলা ও নৃশংস হত্যাযজ্ঞ মামলায় মৃত্যদন্ডে দন্ডিতদের ডেথ রেফারেন্স শুনানির জন্য পেপার বুক প্রস্তুত শেষ পর্যায়ে রয়েছে।

সুপ্রিমকোর্টের মুখপত্র ও বিশেষ কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাইফুর রহমান আজ বাসস’র সঙ্গে আলাপকালে বলেন, দেশে নজিরবিহীন এ জঙ্গি হামলায় নৃশংস হত্যাযজ্ঞের মামলায় বিচারিক আদালতের রায় হয়েছে গত ২৭ নভেম্বর। রায়ে জেএমবির সাত সদস্যকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়। এখন আইনি প্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপ হাইকোর্টে আসামিদের মৃত্যুদন্ড অনুমোদন (ডেথ রেফারেন্স) শুনানির জন্য পেপার বুক (মামলার বৃত্তান্ত) প্রস্তুত কার্যক্রম বিজি প্রেসে শেষ পর্যায়ে রয়েছে।

সুপ্রিমকোর্ট মুখপাত্র বলেন, পেপার বুক প্রস্তুত শেষে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেয়া হবে। তিনি বলেন, পেপারবুক আসার পর বিষয়টি প্রধান বিচারপতির নজরে আনা হবে। এরপর প্রধান বিচারপতি হাইকোর্টে এখতিয়ারাধীন বেঞ্চ নির্ধারণ করে দেবেন। সেই বেঞ্চেই ডেথরেফারেন্স ও দন্ড বিষয়ে আনা আপিল শুনানি শুরু হবে।

২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে ঢাকার গুলশানে হোলি আর্টিজান বেকারিতে নৃশংস হামলা চালায় জঙ্গিরা। তারা অস্ত্রের মুখে দেশি-বিদেশি অতিথিদের জিম্মি করে। ভয়াবহ ওই হামলার ঘটনায় স্তম্ভিত হয়ে পড়ে পুরো দেশ। সেদিন জঙ্গিরা কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করে ২০ জন দেশি-বিদেশি নাগরিককে। যাঁদের মধ্যে ৯ জন ইতালীয়, ৭ জন জাপানি, ১ জন ভারতীয় ও ৩ জন বাংলাদেশি। সেই রাতে অভিযান চালাতে গিয়ে পুলিশের দুই কর্মকর্তাও নির্মমভাবে নিহত হন।

জঙ্গি হামলার দুই বছরের মাথায় ২০১৮ সালের ২৩ জুলাই আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয় পুলিশ। ওই বছরের ২৬ নভেম্বর আট আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় মামলার বিচার। নজিরবিহীন ওই জঙ্গি হামলা ও নৃশংস হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় করা মামলার বিচার শুরুর এক বছরের মাথায় বিচারিক আদালত রায় দেন। গত বছরের ২৭ নভেম্বর ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মজিবুর রহমান রায়ে আট আসামির মধ্যে সাতজনকে মৃত্যুদন্ড ও একজনকে খালাস দেন। মৃত্যুদন্ড পাওয়া সাত আসামি হলেন রাকিবুল হাসান ওরফে রিগ্যান ওরফে রাফিউল ইসলাম, জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজীব গান্ধী, আসলাম হোসেন ওরফে র‌্যাশ, হাদিসুর রহমান সাগর ওরফে সাগর, আবদুস সবুর খান ওরফে সোহেল মাহফুজ, মামুনুর রশীদ ওরফে রিপন ও শরিফুল ইসলাম খালেদ। আর খালাস পান মিজানুর রহমান। মৃত্যুদন্ড পাওয়া সাত আসামি কারাগারে রয়েছেন।

বিচারিক আদালতের রায়সহ মামলার যাবতীয় নথিপত্র গত বছরের ৫ ডিসেম্বর হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় পৌঁছে। এরপর ডেথ রেফারেন্স শুনানির জন্য পেপার বুক প্রস্তুতির কার্যক্রম নেয়া হয়।

ফিরে দেখা হোলি আর্টিজান ঘটনা :
দেশি-বিদেশি নাগরিকের পদচারণায় সবসময় মুখর থাকতো হলি আর্টিজান বেকারি। ২০১৬ সালের ১ জুলাই প্রতিদিনের মতোই ব্যস্ত হয়ে পড়ে গুলশানের লেক পাড়ের মনোরম পরিবেশের ওই বেকারিটি। কিন্তু ওইদিন সন্ধ্যা গড়াতেই তা হয়ে ওঠে ভয়ঙ্কর মৃত্যুপুরী। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সেখানে চালানো হয় জঘন্যতম জঙ্গি হামলা। ভয়াবহ এ হামলায় নৃশংস হত্যাযজ্ঞ এবং প্রায় ১২ ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস জিম্মি সংকটের ঘটনায় স্তম্ভিত করেছিল পুরো দেশকে। ওই দিন রাতে এ জঙ্গি হামলায় ২ পুলিশ কর্মকর্তা ও ১৭ বিদেশি নাগরিকসহ নিহত হন ২২ জন। পরে সেনাবাহিনীর প্যারা কমান্ডো সদস্যদের পরিচালিত ‘অপারেশন থান্ডারবোল্টে’ অবসান হয় জিম্মিদশার, নিহত হয় হামলাকারী ৫ জঙ্গি।
হলি আর্টিজানে হামলার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ফোর্সসহ প্রথমে পৌঁছান গুলশান থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) রিপন কুমার দাস। মামলার এজাহারে ঘটনার বিবরণীতে তিনি উল্লেখ করেন, ঘটনার দিন গুলশান থানার রোড নম্বর-৭১ থেকে ৯২ এবং এর আশপাশ এলাকায় পেট্রোল ডিউটির দায়িত্বে ছিলেন তিনি।

রাত আনুমানিক পৌনে ৯টায় ওয়্যারলেসে ভেসে আসে হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বেকারিতে গোলাগুলির খবর। খবর পেয়েই ফোর্সসহ রাত আনুমানিক ৮টা ৫০ মিনিটে ফোর্সসহ ঘটনাস্থলে পৌঁছান এসআই রিপন। সেখানে উপস্থিত হয়ে তারা দেখতে পান, রেস্টুরেন্টের ভেতরে কতিপয় সন্ত্রাসী ‘আল্লাহু আকবর’ ধ্বনি দিয়ে এলোপাতাড়ি গুলি বর্ষণ ও বোমা নিক্ষেপ করছে।

পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে সন্ত্রাসীরা পুলিশকে লক্ষ্য করেও বোমা নিক্ষেপ ও এলোপাতাড়ি গুলি বর্ষণ করতে থাকে। আত্মরক্ষার্থে উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা পাল্টা গুলি চালায়। একপর্যায়ে সন্ত্রাসীদের নিক্ষিপ্ত গুলি ও গ্রেনেডের আঘাতে এসআই ফারুক হোসেন ও কনস্টেবল প্রদীপ চন্দ্র দাস ও আলমগীর হোসেন মারাত্মক আহত হন। আহতদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয় এবং এসআই রিপন কুমার দাস বিষয়টি তাৎক্ষণিক ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেন। এরপর ডিএমপি কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়াসহ ডিএমপির বিভিন্ন ইউনিটের অফিসার ও ফোর্স ঘটনাস্থলে এসে উপস্থিত হয়। এরপর পুলিশসহ অন্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা হলি আর্টিজানের বেকারির চারপাশে কর্ডন করে ফেলে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সন্ত্রাসীদের নিবৃত্ত করার চেষ্টা করলে সন্ত্রাসীরা তাদের লক্ষ্য করেও অনবরত গ্রেনেড ও গুলি বর্ষণ করতে থাকে।

এ অবস্থায় রাত আনুমানিক সাড়ে ১০টায় সন্ত্রাসীরা হলি আর্টিজানের বেকারির পশ্চিম দিকের বাড়ির সামনে অবস্থানরত পুলিশ অফিসার ও ফোর্সদের লক্ষ্য করে গ্রেনেড নিক্ষেপ ও গুলিবর্ষণ শুরু করে। এতে অন্তত ৩০ থেকে ৩৫ জন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য আহত হন, কেউ কেউ মারাত্মক জখম প্রাপ্ত হয়। এ সময় চারদিকে ঘিরে থাকা র‌্যাব-পুলিশসহ অন্য বাহিনীর সদস্যরা দৌড়ে নিরাপদ দূরত্বে যান। আহতদের সবাইকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ ঘটনায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত ১১টা ২০মিনিটে বনানী থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সালাহউদ্দিন খান মৃত্যুবরণ করেন। এর কিছুক্ষণ পরই ডিবির সহকারী কমিশনার (এসি) মো. রবিউল করিম নিহত হন।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে রাতেই পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবির পাশাপাশি সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনীর কমান্ডোরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ, র‌্যাব, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স সম্মিলিতভাবে ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’ পরিচালনার সিদ্ধাšন্ত নেয়। নিরাপত্তার স্বার্থে ঘটনাস্থলের পাশ থেকে গণমাধ্যমকর্মীসহ সাধারণ মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে দেয়া হয়।

রাত দেড়টার দিকে গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলাকারী উল্লেখ করে পাঁচ তরুণের ছবি প্রকাশ করে জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস)। জঙ্গিগোষ্ঠীর ইন্টারনেটভিত্তিক তৎপরতা নজরদারিতে যুক্ত যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাইট ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ এ তথ্য জানায়। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তক্রমে ২ জুলাই সকাল আনুমানিক ৭টা ৪০মিনিটে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্যারা কমান্ডো ব্যাটালিয়ন জিম্মিদের উদ্ধার ও সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করার লক্ষ্যে অভিযান পরিচালনা করে। ১২ থেকে ১৩ মিনিটের মধ্যেই সব সন্ত্রাসীকে নির্মূল করে ওই এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়।

অভিযান পরিচালনাকালে পাঁচ জঙ্গি
মালয়েশিয়ার মোনাশ ইউনির্ভাসিটির ছাত্র নিবরাস ইসলাম, ব্রাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, স্কলাসটিকার সাবেক ছাত্র মীর সামিহ মোবাশ্বের, বগুড়ার বিগিগ্রাম ডিইউ সেন্ট্রাল ফাজিল মাদ্রাসার সাবেক ছাত্র খায়রুল ইসলাম পায়েল, বগুড়ার সরকারি আযিযুল হক কলেজের ছাত্র শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল নিহত হন।