জৌলুসহীন অনুপমপুরের তাঁত

ঢাকা, রবিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২১ | ৪ মাঘ ১৪২৭

জৌলুসহীন অনুপমপুরের তাঁত

কামরুজ্জামান তোতা, কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ)  ১০:০৫ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ২৫, ২০২০

print
জৌলুসহীন অনুপমপুরের তাঁত

রঙিন সুতোয় স্বপ্নময় শাড়ি-কাপড় তৈরি করলেও জীবন তাদের সাদাকালো। এক সময় এমন ছিল না জীবন। খুব রঙিন না হলেও সম্মান ছিল। প্রতিপত্তিও ছিল মোটামুটি। ঠোঁটের হাসিতে লেগে থাকত রঙের ছটা। বিশ্বজুড়ে ছিল এদেশের তাঁতশিল্পের সুনাম। সখের বশে নয়, কীভাবে তৈরি হচ্ছে এই পরিচ্ছদ- দেখতে ছুটে আসতেন পর্যটক দল। দেশের মানুষের কৌতূহল তো ছিলই। বার্ষিক মেলায় গিয়ে প্রিয়জনের জন্য তাঁতের শাড়ি না নিয়ে ফিরেছেন, এমন মানুষ ছিলেন খুবই কম। দেশের অর্থনীতিতে তখন বড় ভূমিকা ছিল শিল্পটির। কালের বিবর্তনে ঐতিহ্য হারাতে বসেছে ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জের অনুপমপুর ইতিহাসের এই প্রখ্যাত তাঁতশিল্প। যান্ত্রিক যুগের অসহায় হয়ে পড়েছেন পেশাজীবীরা। ক্ষোভ আর লজ্জায় অনেকে ত্যাগ করছেন আদি পেশা।

কালীগঞ্জ শহর থেকে মাত্র ৪ কিলোমিটার পথ গেলেই অনুপমপুর। সেখানে গেলে আজও শোনা যায় তাঁত বুননের শব্দ। তবে দিনদিন ক্ষীণ হয়ে আসছে শব্দের জোড়। এক সময় এই এলাকায় সচ্চল তাঁত মালিক জামাত আলির অধীনে চলত ১০টি তাঁত। পারিবারিকভাবে চলে আসছিল এ ব্যবসা। দিনরাত কাটাত ব্যস্ত সময়। তৈরি হতো শাড়ি, লুঙ্গি, গামছা, ধুতিসহ নানা পরিধেয় বস্ত্র। এখন টিকে আছে মাত্র চারটি তাঁত। তার পরিবারের অনেকেই ত্যাগ করলেও তিনি কোনো রকম ধরে রেখেছেন আদি পেশা। তার মতোই অনুপমপুরের এ সম্প্রদয়ের ১৮টি পরিবারের অবস্থা এখন বেহাল, জরাজীর্ণ।

রফিকুল ইসলাম জানান, তার দুটি তাঁত টিকে আছে। স্ত্রী, পুত্র ও পুত্রবধূ নিয়ে কাজ চালিয়ে নিচ্ছেন। একটি তাঁতে প্রতিদিন ৪ থানে গামছা হয় ৮টা, যার পাইকারি মূল্য ৩৩০ থেকে ৩৫০ টাকা। এই গামছা তৈরির সুতা আনতে হয় কুষ্টিয়ার বিত্তীপাড়া থেকে। নিজেদের পরিশ্রম, সুতা, রঙ, চরকা, মাকুর খরচ দিয়ে পোষানো অনেক কষ্টের। একই গ্রামের তাজুল রহমান জানান, এখন শাড়ির কাজ হয় না বললেই চলে। কারণ শাড়ির খরচ পুুষিয়ে মূল্য পাওয়া কষ্ট। তাঁতের একটি শাড়ি তৈরিতে সময় লাগে প্রকারভেদে এক থেকে দুই দিন। খরচও লাগে প্রকার ভেদে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা। যা বিক্রি হয় ৬০০ থেকে ১০০০ টাকা। তাঁতের শাড়ি থেকে মেশিনে তৈরি শাড়ির চাকচিক্য থাকে বেশি। সময়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে গেলে ব্যবসায়িক ও অর্থনৈতিক সাহায্য প্রয়োজন। যা তাঁত শিল্পীরা পাচ্ছেন না।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এ পেশার সঙ্গে জড়িত মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় পেশাগত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের কোনো ব্যবস্থা নেই। পরিবর্তিত রুচি ও পছন্দের সঙ্গে সংগতি রেখে তাঁত বস্ত্রেও কিছু পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। কিন্তু প্রয়োজনীয় সামর্থ্য তাঁতী সমাজের কাছে নেই, ফলে তারা সনাতন পদ্ধতিতে সেই সনাতনী মানের কাপড় উৎপাদন করতে বাধ্য হচ্ছেন। এই অবস্থায় তাঁতশিল্পের বিকাশের পথে প্রধানতম অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারি সহায়তা ও কম সুদে ঋণ পেলে তাদের এ শিল্প টিকিয়ে রাখতে পারবে।